২য় পর্ব
১ম পর্বের লিংক
লাশের বুকে রাখা হাতের সূত্র ধরে আখতার মিয়ার মনে পড়ে, নবুর মৃতদেহটির কথা। নবুর মৃত্যু আখতার মিয়ার কিশোর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ঐ মৃত্যুটি যদিও আখতার মিয়ার দেখা প্রথম মৃত্যু নয়, কিন্তু তার সমবয়সী কেউ যে এইভাবে চলে যেতে পারে—এই ভাবনা তাকে ভয়ার্ত করে তুলেছিল। তবে নবুর মৃত্যু আখতার মিয়ার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল আখতার মিয়ার মা রুকুবিবিকে। নবুর মৃত্যুর পূর্বে বাড়ির বাইরে এক-আধবেলা আসা-যাওয়ার যে সুযোগটা ছিল তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সেই অবরূদ্ধ সময়টাতে আখতার মিয়ার বড় ভাই সগীর, ‘হরিবোল’ কিংবা ‘কলেমা-শাহাদাৎ’-এর শব্দ শুনলে জানালা খুলে জিজ্ঞেস করত, ‘কিসকি লাশ?’
ক্ষুদ্র সমাগম থেকে কখনও জবাব আসত, ‘ইন্দরকি লাশ’, কখনও-বা জবাব আসত ‘বকু মরগিয়া’। আবার কখনও লাশ ঘিরে থাকা ছোট্ট জমায়েতটি কোনো উত্তর পাবার পক্ষে সগীরকে উপযুক্ত বিবেচনা না-করে নীরবতা অবলম্বন করত। তবে চরম কৌতূহল নিয়ে জানালার পাশে অপেক্ষারত থাকলেও সগীর সাধারণত ঘোড়া কিংবা গরুর গাড়িতে টানা কফিন বা মরদেহ দেখলে কোনো প্রশ্ন করত না। কারণ সে জানত, সব মৃত্যু একইরকম হলেও, সব শবযাত্রা একরকম হয় না। যদিও রুকুবিবির পরিবার মূলত কোনো মতবাদেরই অনুসারী ছিল না, তারপরও সাফেদরের স্ত্রী হিসেবে রুকুবিবির পরিচয় পরিবারটিকে শিয়া মতবাদের দিকেই ঠেলে দিত। পরিবারের অভ্যন্তরে ধর্মীয় আচারের প্রবল অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কোনো একটা পক্ষে দাঁড় করানোর প্রয়োজন দেখা দিলে, সমাজ-সংসার অনেকটা জোর করেই তাদের পরিবারটিকে শিয়া-মতবাদভুক্ত করে ফেলত। যদিও আখতার মিয়ার তাতে আপত্তি ছিল না, আপত্তি ছিল না মারফতিরও, কিন্তু সগীরের তাতে প্রবল আপত্তি ছিল। এই আপত্তির কারণ ধর্মীয় নয়, আপত্তির কারণ ছিল ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার ভয়।
মূলত ঢাকা শহরে শিয়াদের উত্থান ছিল শিয়া-তরিকায় বিশ্বাসী নায়েবে-নাজিম আর বাংলার স্বাধীন নবাবদের ওপর ভর করে।
সগীর টের পেয়েছিল, শিয়ারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ঢাকার কথিত শেষ নায়েবে-নাজিমের মৃত্যুর পর তারা নেতাহীনও বটে। যদিও মৃত্যুকালে নায়েবে-নাজিমের মুষ্ঠিতে হাত রেখে, একটা অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাবার আশায়, খাজা আলিমুল্লাহ ওয়াদা করেছিলেন, তিনি সুন্নিদের মতই শিয়াদের খেদমত করবেন। দুই মতবাদের মানুষদের মধ্যে বিভেদ করবেন না এবং সেই ওয়াদা মোতাবেক হোসেনী দালানের সংরক্ষণ এবং মহররমের তাজিয়া মিছিলের সব ব্যয় নির্বাহ করে গেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু যে অধিকার নিয়ে নায়েবে-নাজিমের সামনে যেয়ে একসময় শিয়া নেতারা দাঁড়াতেন সেই একই অধিকার নিয়ে পরবর্তী নেতারা ঢাকার খেতাবি নবাবদের সামনে দাঁড়াতে পারতেন না। মূলত ঢাকা শহরে শিয়াদের উত্থান ছিল শিয়া-তরিকায় বিশ্বাসী নায়েবে-নাজিম আর বাংলার স্বাধীন নবাবদের ওপর ভর করে। ফলে তাদের পতনের পর ঢাকার শিয়ারা আর তেমনভাবে ঘুড়ে দাঁড়াতে পারে নি।
খাজা পরিবার, যারা পরবর্তী সময়, অনেক সাধনার পর, ইংরেজদের কাছ থেকে নবাব উপাধি পেয়েছে, তারা ক্রমবিকাশমান হিন্দু মধ্যবিত্ত, ধনী হিন্দু ব্যবসায়ী এবং মুসলমান ‘আশরাফ’দের খেদমতে যতটা আন্তরিক ছিল ততটা আন্তরিক ছিল না গরিবের প্রতি। তারা ছিল অর্থ-ক্ষমতা এবং উঁচু শ্রেণির মানুষের ভক্ত। তাদের নিজস্ব একটা ‘জাত-বিচার’ ছিল। সেই জাতের বিচারে তারা খেদমত করত। শিয়া বা সুন্নি যে মতের অনুসারী হোক না কেনো তারা যদি নবাব বাড়ির বিচারে ‘আশরাফ’ বা ‘উচ্চ জাত’-এর না হতো তাহলে উৎসব-পার্বণে বাড়ির পুব পাশের বিস্তৃত ঘাসের ওপর দস্তরখানা পেতে খাবার পরিবেশন করেই দায়িত্ব শেষ করত। তাদের জন্য জল, জলের পাত্র, আসন-বিন্যাস—সবই ছিল পৃথক।
আর তাদের সামনে দিয়েই আহসান মঞ্জিলের বিশাল বলরুমে চলে যেত বিশিষ্টজনেরা।
আহসান মঞ্জিলের অধিবাসীরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতো গ্রিক, আর্মেনিয় আর সাদা চামড়ার সাহেবদের জন্য। ঢাকার নব্য বিকাশমান হিন্দু ব্যবসায়ীতেও তাদের আপত্তি ছিল না। ফলে নিজেদের অর্থ-প্রতিপত্তি-প্রভাব মানুষকে জানান দেয়ার চেয়েও আহসান মঞ্জিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ইংরেজ এবং আশরাফ শ্রেণির মনোরঞ্জনের স্থান হিসেবে। এমনকি রূপলাল হাউস কিংবা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বসাক পরিবারেও ছিল একই রীতি। নীচু জাতের হিন্দু বা গরিব মুসলমানদের প্রতি তাদের যতটা উদাসীনতা ছিল ততটা ছিল না আশরাফ-খ্যাত মুসলমানদের প্রতি। ইংরেজ এবং ধনাঢ্য শ্রেণির মনোরঞ্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকত ঢাকার উদীয়মান ধনী ব্যবাসায়ীরা।
ধনী না হলে শিয়া, সুন্নি কিংবা হিন্দুদের পক্ষে যে বিত্তশালীদের গৃহে প্রবেশ নিষিদ্ধ তা সগীর জানত এবং বুঝত।
ধনী না হলে শিয়া, সুন্নি কিংবা হিন্দুদের পক্ষে যে বিত্তশালীদের গৃহে প্রবেশ নিষিদ্ধ তা সগীর জানত এবং বুঝত। তাই ধনী বা উঁচু শ্রেণিভুক্ত কারো লাশের পরিচয় সে জানতে চাইত না। জগতের ভেতরে সর্বদাই দুই জগৎ থাকে। সেই জগতে নিজের পক্ষটা সগীর ভালো চিনত। এবং কোনো একটা অজানা কারণে ধনীদের প্রতি একটা তীব্র বিদ্বেষ নিয়ে সে জীবনযাপন করত। তার পরবর্তী জীবনে এই ভাবনার গভীর প্রভাব পড়েছিল।
নিজের পরিচিতজনদের বাইরের কারও লাশ নিয়ে সগীরের কৌতূহল না থাকলেও পড়শিদের কৌতূহলের কোনো অভাব ছিল না। প্রকৃত নবাব আর নায়েবে-নাজিমদের প্রস্থান ঘটলেও তাদের স্থান দখল করে নিয়েছিল ক্রমবিকাশমান হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং মুসলমান আশরাফরা। তারা সগীরের মতো জানালা থেকে প্রশ্ন ছুড়ে কোনো জবাব না পেলে রাস্তায় নেমে আসত। ঘোড়া কিংবা গরুর গাড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে জেনে আসত কার লাশ শ্মশান কিংবা গোরস্থানে যাচ্ছে। তারপর যে পথে খবর সংগ্রহ করত সেই পথেই ফিরে আসতে আসতে উৎসুক জনতার জানালার দিকে চেয়ে চিৎকার করে বলত, ‘গোকুল মুন্সির বউ’ কিংবা ‘ নওয়াব বাড়িকা মুর্দা’।
অবশ্য খাজা পরিবার, ফরাশগঞ্জের দাস পরিবার কিংবা হাটখোলার বসাক পরিবারের কারো মৃতদেহ হলে লোকে তার নাম জানতে চাইত না। কারণ তাঁরা তাদের পরিচিত গণ্ডির বাইরে অন্য আরেক জগতের বাসিন্দা। প্রতিটি নামকরা পরিবারের জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ততদিনে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এই ঢাকা শহরে এমন বিশাল বটবৃক্ষের আকার ধারণ করেছে যে, তাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সাধারণের পক্ষে কঠিন। তবে নবাববাড়ি কিংবা মুন্সিবাড়ি কিংবা সুরেন্দ্র কুমার বসাকদের মতো অবস্থাসম্পন্ন কোনো বাড়ির কারও মৃত্যুসংবাদ শুনলে সাধারণ মানুষেরা এক ধরনের স্বস্তি পেত। সবকিছু দখলে নিলেও ধনীরা যে মৃত্যুর দখল নিতে পারে না—সেই সত্যটি সাধারণ মানুষদের বেঁচে থাকায় উৎসাহ যোগাত।
মাঝে মাঝে লাশের পরিচয় জানলে সগীর বিচলিত হয়ে পড়ত। তার মনে পড়ত, এই তো সেদিন জিন্দা মানুষটির সাথে সে লোহার পুলের ওপর দাঁড়িয়ে বিড়িতে টান দিয়েছে কিংবা পাখি শিকার করতে দোলাইখাল থেকে নৌকা বেয়ে চলে গেছে বেগুনবাড়ির খালের ধারে। তখন সে খুব নিঃশব্দে লুঙ্গির ওপর একটা বোতামওয়ালা লাল গেঞ্জি চাপিয়ে ঘর থেকে বের হবার প্রস্তুতি নিত। কিন্তু কী করে যেন প্রতিবার তার মা রুকুবিবি টের পেয়ে যেতেন।
পরিণতি নিয়ে ভাবিত নয় এমন সাধারণ মানুষদের এড়িয়ে চলাই আশরাফ পরিবারের ধর্ম।
খুব নিঃশব্দে দোতলা থেকে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে সগীর দেখত, খিড়কি এঁটে, দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মাটিতে বসে আছেন রুকুবিবি। মাথা ঘাড় থেকে একটু সামনের দিকে ঝুলে আছে বটে, কিন্তু চোখের মণি ওপর দিকে তোলা। তার একপাশে, ঠিক তারই মতো করে, দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা তীক্ষ্ণ ছুরি। যে ছুরিটি চল্লিশ বছর আগে উত্তরের এক জনপদ থেকে ঢাকা শহর পর্যন্ত বয়ে এনেছিলেন রুকুবিবি। যে ছুরিটি, রুকুবিবির শরীরেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।
একবার ছুরির দিকে আরেকবার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সগীর উঁচু গলায় মারফতিকে বলত, ‘হামার পেডে বেদ্না। ভুখ লাগা।’
সগীরকে দেখে মনে হতো, শুধু ক্ষুধার তাড়নায় সে গায়ে কাপড় চাপিয়ে দোতলা থেকে বাড়ির একতলায় নেমে এসেছে। অন্য আর কোনও কারণ নেই। যদিও সগীর ছিল দুর্ধর্ষ প্রকৃতির মানুষ। এই ঢাকা শহরে সে কাউকে পরোয়া করত না। একদিন নবাব আব্দুল গনির ভাই আব্দুল হাকিমের ঘোড়ার গাড়িটি তার গায়ের ওপর এসে উঠলে, সে ভয়ার্ত হয়ে সরে পড়ে নি। পেছন থেকে দৌড়ে এসে নবাব বাড়ির ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেছিল। কোচোয়ানকে টেনে নামিয়ে এনেছিল মাটিতে। তারপর তার অসুরের মতো শক্তি দিয়ে পিটিয়ে যখম করে কোচায়ানকে। পুরো ঘটনাটি নবাব গনি মিয়ার ভাই আব্দুল হাকিম বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন। তার ‘হট যাও, হট যাও’ চিৎকারের বিপরীতে আব্দুল হাকিম দেখেছিলেন, সগীরের ক্রুদ্ধ চোখের চাহনি। তার মনে হয়েছিল, সগীর পরিণতি নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়, আব্দুল হাকিম আর একটু বাড়াবাড়ি করলে তার পরিণতিও কোচোয়ানের মতোই হবে। নবাবের ভাই বা নবাব পরিবারের সদস্য বলে সগীরের কাছ থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা পাবেন না আব্দুল হাকিম। পরিণতি নিয়ে ভাবিত নয় এমন সাধারণ মানুষদের এড়িয়ে চলাই আশরাফ পরিবারের ধর্ম। তাই আব্দুল হাকিম নিজেকে সংবরণ করে নিয়েছিলেন।
রুকুবিবি সগীরকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘তুই আসলি মর্দ।’
সেই ঘটনার পরিণতি অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারত। কিন্তু যখন নবাব আব্দুল গনি মিয়া জানতে পারেন, সগীর রুকুবিবির পালিত পুত্র তখন আর বিষয়টি অনেক দূর গড়াতে দেন নি। নবাব গনি মিয়া জানত, সিপাহী বিপ্লবের ঢাকা অংশের সমাপ্তির পর তাকে ঘৃণা করা মানুষদের মধ্যে রুকুবিবি একজন। সুযোগ পেলে তাকে কিংবা তার পরিবারের কাউকে কতল করতে একটুও দ্বিধা করবেন না রুকুবিবি। প্রতিহিংসাপরায়ণ মায়ের চেয়ে হিংস্র আর কোনো প্রাণী জগতে নেই—এই সত্য নবাব আব্দুল গনিকে সতর্ক করে দিত। তবে আখতার মিয়ার মনে পড়ে, খাজা পরিবারের কোচোয়ানকে পেটানোর ঘটনায় রুকুবিবি খুব খুশি হয়েছিলেন। রুকুবিবি সগীরকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘তুই আসলি মর্দ।’
কিন্তু সেই ‘আসলি মর্দ’ সগীরও রুকুবিবির কাছে ছিল অসহায়।
উত্তরের কোনো জনপদ থেকে আতিয়া পরগনা হয়ে ঢাকা শহরে এসে উর্দু বলা শিয়া-পরিবারের মধ্যে জীবনের শেষ অংশটা কাটালেও রুকুবিবি কখনও তাদের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠেন নি। শিয়া-পরিবারের সংস্কৃতি কিংবা উর্দু ভাষা শেখার যে অল্পবিস্তর সুযোগ পেয়েছিলেন, তা কাজে লাগানোরও কোনো চেষ্টা করেন নি রুকুবিবি। অথচ স্নেল পরিবারের সান্নিধ্যে থেকে রুকুবিবি ইংরেজি রপ্ত করেছিলেন উর্দুর চেয়ে ঢের বেশি। কখনও কখনও খুব ভোরে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে যখন বলতেন, ‘বিউটিফুল ওয়েদার’ কিংবা সগীর বাজার করে আনার পর সবজি গোছাতে গোছাতে বলতেন ‘ফ্রেশ ভেজটাবল’ তখন আখতার মিয়া চমকে উঠত। সে জানত, তারপরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো যে, এই কথাগুলো রুকুবিবির মুখ থেকেই বের হয়ে আসছে।
বিয়ের সূত্রে শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত উর্দু পরিবারের সদস্য হয়েও শিয়াসংস্কৃতি বা উর্দু ভাষায় রুকুবিবির যে কোনো দক্ষতা আসে নি, তাতে রুকুবিবির কোনো দায় ছিলো না। কারণ ঢাকা শহরে আসলেও তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটেছে স্নেল পরিবারের অন্দরমহলের পরিচারিকা হিসেবে। স্নেল পরিবারের প্রাসাদোপম দালানের বাইরের জগতের সাথে তার যোগাযোগ ছিল সীমিত। প্রান্তিক জনপদ থেকে বয়ে আনা দুর্বল বাংলা ভাষার পর যে দ্বিতীয় ভাষাটির ওপর রুকুবিবির দখল জন্মেছিল তা ইংরেজি। ভাষাগত দুর্বলতা এবং যথেষ্ট শব্দভাণ্ডারের অভাবে, নানারকম মিশ্র ভাষায় কথা বলা স্বজনদের শাসন করার জন্য রুকুবিবি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিলেন অভিব্যক্তির ওপর।
যদিও রুকুবিবি সগীরের আপন মা ছিলেন না। তবে রুকুবিবির আপন সন্তান বলে দাবি করা আখতার মিয়া নিজের সাথে সগীরের কোনো তফাৎ দেখতে পায় নি। রুকুবিবির আচরণ সকলের প্রতিই ছিল সমান পরিমাণ নিরাসক্ত এবং নির্লিপ্ত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করে গেছেন শিবুর জন্য। শিবুর আগে আর শিবুর পরে জন্ম নেয়া সকল সন্তানের অস্তিত্বকে তিনি এক রকম অস্বীকার করে গেছেন সারা জীবন। উপস্থিত না থেকেও শিবু সারা জীবন এমনভাবে রুকুবিবির ভাবনায় উপস্থিত ছিল যে, আখতার মিয়া নিজেও রুকুবিবির আপন সন্তান হয়ে উঠতে পারে নি।
আখতার মিয়ার জন্মের বহু আগেই পরী বা তার অবৈধ সন্তান সাফেদরের পরিবারের স্মৃতি থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
আখতার মিয়ার কথিত পিতা সাফেদরের ভাষ্যমতে, রুকুবিবি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। আর সমাজ-সংসার জানে রুকুবিবি আখতার মিয়ার তৃতীয় স্ত্রী। পরী নামে যে নারীকে সাফেদরের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তাকে সাফেদর কোনোদিন মৌখিক স্বীকৃতি দেয় নি। আবার সাফেদরের পরিবারে পরীর আগমন এবং প্রস্থান এত স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘটেছিল যে, আখতার মিয়ার জন্মের বহু আগেই পরী বা তার অবৈধ সন্তান সাফেদরের পরিবারের স্মৃতি থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে গল্প শেষ হলেও যেমন গল্পের রেশ থাকে তেমনি তাদের পরিবারে কোনো এক সময়ে পরীর উপস্থিতির রেশ থেকে গেছে বহুদিন।
আখতার মিয়ার বাবা সাফেদর মিয়া তখন ইংরেজ নীলকর স্নেল সাহেবের বিশ্বস্ত ভৃত্য। নীলকর স্নেল সাহেবের আতিয়া পরগনায় কাছাকাছি দুটি জমিদারিতে হিস্যা ছিল। সেই দুই জমিদারির অধিকাংশ জমিতে ততদিনে নীল চাষ শুরু হয়ে গেছে। দুই জমিদারিতে চাষ হওয়া নীল গাছ থেকে নীল উৎপাদনের জন্য একটাই কুঠি ছিল। এক সময় সেই কুঠির মূল ম্যানেজার ছিলেন ফরাসি যুবক পিয়েরে পল সান্দেল। যদিও পিয়েরে পল সান্দেল উত্তর-ভারতে তার কর্মজীবন শুরু করেন, কিন্তু এক সময় তিনি ভালো প্রস্তাব পেয়ে বাংলায় চলে আসেন। তার উদ্ভাবিত কলা-কৌশলের কল্যাণে অল্প সময়ের মধ্যে স্নেল পরিবারের পড়ন্ত নীল চাষ, কিছু সময়ের জন্য, ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
জমি থেকে নীলগাছ তোলার পর নীল উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হতো। বিশেষ করে নীল গ্যাঁজানোর পর অল্প সময়ের জন্য এক সাথে বেশকিছু শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয়। চারপাশে শ্রমিকের অভাব ছিল না তখন, কিন্তু অভাব ছিল বলশালী শ্রমিকের। নীল গ্যাঁজানোর পর কয়েক ঘণ্টা চার ফুট লম্বা মাথা-চওড়া একটা দণ্ড দিয়ে অনবরত নীলগাছকে পেটাতে হতো। তখন স্নেল সাহেবের স্ত্রী কেলি, অল্প কিছুদিনের জন্য, নিজবাড়ির ভৃত্যদের মধ্যে যারা বলিষ্ঠ গড়নের তাদের পাঠিয়ে দিতেন আতিয়া পরগনার নাগরপুর নীলকুঠিতে বা পাবনার সুজাপুর নীলকুঠিতে।
এমনি এক নীল তোলার মৌসুমে আতিয়া পরগনার নাগরপুর নীলকুঠিতে যেয়ে সাফেদর আবিষ্কার করেছিল রুকুবিবিকে।