চরিত্র
বাঁধন (এক অটিস্টিক কিশোর)
হীরা (একটা টিয়াপাখি বা তোতা পাখি)
: হীরা (শিস দেয়), হীরা...
: শিস।
: ঘুমিয়েছিস? আমি ঘুমিয়েছি খুব। আজ কততম দিন রে? দাঁড়া! হুম। এই তো ডায়রিতে লেখা আছে। আজ সাত দিন। সেভেন ডেইজ। তুই আর আমি। এই ঘরে। সেভেন ডেইজ। খাবি কিছু?
: শিস।
: তোকে খাওয়ানো সোজা। তোর বেঁচে থাকাও সোজা। এই নে। খা। প্যাকেটের রেডিমেড খাবার ঢেলে দিলেই হলো। ঠুকরে খাবি। কেমন আছিস তুই? জ্বর আছে? কাশি?
: তোবিদ তোবিদ, তরোনা, তরোনা...
: হা, হা। তুইও শিখে গেছিস। কোভিড, করোনা। বল তো আমার সাথে, আইসোলেশন। আই... সো... লেশন। বল, আই...
: শিস।
: এই ফাঁকিবাজ! বল। আই...
: বাঁদন। বাঁদন। বাঁদন।
: হা, হা, খুব পাজি তুই। খুব চালাক। আমার নাম বলতে বলেছি।
: চাঁ, চাঁ, চাঁ।
: চা খাবি? চা পাব কোথায়? ক’টা বাজে? নাস্তা তো দিয়ে গেল না! ওহ, মাত্র ছয়টা ঊনচল্লিশ, সাতটাও বাজে নি! নাস্তা তো দেবে সেই নয়টায়। যখন খুশি দেক, আমার খিদে পায় নি। চা, হুম, চা পেলে মন্দ হতো না। কী বলিস? বাজাব ঘণ্টা? না, থাক, ওরা হয়তো ঘুমাচ্ছে। ঘুমাক। সবাই ক্লান্ত।
: চাঁ, চাঁ, চাঁ।
: খাবি। একটু ধৈর্য ধর। তোর তো কোনো অসুবিধা হবার কথা না। জীবনভর কাটিয়ে দিলি খাঁচায়। তোর তো কোনোখানে যাবার নাই। কিচ্ছু করার নাই। ও হীরা, হীরা, তোর তো চিরজীবনের আইসোলেশন।
: বাঁদন, বাঁদন, বাঁদন...
: বল, বাঁধন, বাঁ, বা তে চন্দ্রবিন্দু, নাসিক্য ধ্বনি, বল, বাঁ, ধন, ধন মহাপ্রাণ ধ্বনি। মহাপ্রাণ ধ্বনি বুঝিস? যে ধ্বনি উচ্চারণে বাতাস বেশি লাগে। ফুসফুস ভরে শ্বাস নিতে হয়। সেই ধ্বনি হলো মহাপ্রাণ ধ্বনি। খ, ঘ, ছ, ঝ, ফ, ভ, থ, ধ... বুঝলি কিছু... আবার বলি শোন, একদমে বলি, একটানে বলি... খ, ঘ, ছ, ঝ, ফ, ভ, থ, ধ, ভ... ওহ, ঠ আর ঢ বাদ পড়েছে। আবার বলি খ, ঘ, ছ, ঝ, ঠ, ঢ, ফ, ভ, থ, ধ, ভ... হাহ... নাহ, ফুসফুস ঠিক আছে। নইলে একটানে অতগুলো ভারি ভারি অক্ষর বলতে পারতাম? আমাদের বারেক স্যার শিখিয়েছিল। আবৃত্তি। সবাই বলে আববৃত্তি, স্যার বলতেন আ..বৃত্তি। ‘আ’ একটু টেনে, বড় করে... বল, আ...
: শিস।
: ধুর পাজি। আচ্ছা তোকে যে আমার সঙ্গে রেখেছে, তোর করোনা হবে না? এক মিনিট... না গুগল বলছে, এখনও কোনো পশুপাখির করোনা হয় নি। When it comes to pet birds, at this time, there is no evidence to support that it could transfer to them. Given that birds and mammals are two largely different groups ... This makes it more likely that the virus cannot spread from humans to pet birds. কী বুঝলি? ইংরেজি বুঝিস?
: শিস।
: বলছে, পাখি আর স্তন্যপায়ী আলাদা জাতের, মানে তোরা ডিম পারিস, তুই অবশ্য পারিস না, মানে তুই পাখি, উড়তে পারিস, মানে তুই পারিস না। কিন্তু আমরা স্তন্যপায়ী, মানে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হই, এখন অবশ্য গরুর দুধ খাই, না হলে কৌটার দুধ, মানে আমরা মায়ের পেট থেকে জন্মেছি। যাকে বলে নাড়ি কেটে বের হওয়া... তো পাখি আর স্তন্যপায়ীর জাত আলাদা... আমরা উড়তে পারি না, মানে বিমানে করে, প্যারাসুটে করে পারি... কিন্তু... কিন্তু কী বকছি এ সব! আমার জ্বর কত? হুম। ৯৮। জ্বর নাই। কাশি? খুক খুক খুক খুক। না কাশিও তেমন নাই। ওয়েট। ওয়েট আ মিনিট হীরা। হু আ হু আ হুহহহহহ... হুম, লাংসও ঠিক আছে। ওরা আমার দরজা খুলে দিলেই পারে। আমি এখন অসুস্থ নই। ভালো আছি। সম্পূর্ণ ভালো আছি। খেলাটা এখানেই। আমি সুস্থ হলেও জীবানুরা আমাকে ছেড়ে যায় নি। নোভেল করোনা ভাইরাস আছে আমার শরীরে। আমি হাঁচি কাশি দিলে ছড়িয়ে পড়বে। তাই আমাকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এই ভাইরাস থেকে কী রোগ হয় জানিস? কোভিড নাইনটিন। এ রোগের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো লাংসটাকে ইনফেক্টেড করে ফেলে। লাংস হলো দুটো। এই যে এইপাশে একটা আর এইপাশে একটা। আম্মার দুটো লাংসই খেয়ে ফেলল করোনা ভাইরাস। অক্সিজেনের পর অক্সিজেন দেয়া হলো। তবু আম্মা আর শ্বাস নিতে পারল না। মরে গেল। শ্বাস নিতে না পারলেই মানুষ মরে যায়। এইভাবে, বাইরের বাতাসটা বুকের ভেতরে, ফুসফুসে ঢুকিয়ে নিতে হবে আবার ভেতর থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিতে হবে। অক্সিজেন নেয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড ছেড়ে দেয়া। অক্সিজেন হলো O2 আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড হলো CO2।
: বাদন বাদন...
: আরে বাঁধন, বাঁধন করিস না। শেখ। এগুলো হলো সায়েন্স। কিছুই তো জানিস না। খাঁচায় বসে খালি দানা খাস আর শিস দিস। বোকা পাখি, কতকিছু জানার আছে জানিস? এটা কত সাল বল তো? ২০২১। অঙ্ক কর এখন। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরের সালটা কত?
: শিস।
: ওই তোর এক উত্তর। শিস। সব কথায় শিস দিলে হয়। ৫০ বছর পর হবে ২০৭১ সাল। বেঁচে থাকলে তখন আমি বুড়ো লোক। আব্বার চেয়েও বুড়ো। কী মনে হয় তোর? ৬০-৬৫ বছর বাঁচব আমি? আরো ৫০ বছর বাঁচব? ২১২১ সংখ্যাটা সুন্দর না? ঠিক ১০০ বছর পার হলে পৃথিবীতে আসবে ২১২১ সাল। অতদিন মনে হয় না বাঁচব। কিংবা কে জানে, হয়তো বেঁচে যাব। বিজ্ঞানের নিশ্চয়ই আরো উন্নতি হবে। ডাক্তাররা নিশ্চয়ই আরো স্মার্ট হবে। আমার মায়ের মতো আমাকে নিশ্চয়ই হুট করে মরতে দেবে না। হয়তো আর কোনো রোগই থাকবে না পৃথিবীতে।
: আল্লা, আল্লা, আল্লা...
: এটা ভালো, আল্লাহর নাম নেয়া। আল্লাহ মহান। আম্মা বলতেন, আল্লাহ নোজ এভরিথিং। মানে আল্লা সব জানে। আল্লা জানত আম্মা মরে যাবে। মরে যাওয়া বুঝিস? মরে যাওয়া মানে এই পৃথিবীতে আর না থাকা। তোকে এখানে আর কেউ দেখতে পাবে না। আর কেউ খুঁজে পাবে না। আমি কেঁদে কেটে একাকার করে ফেললেও আম্মাকে আর দেখতে পাব না। এই যে দেখ। এই যে আম্মার ছবি। তুই তো আম্মার আদরের হীরা ছিলি। আম্মাকে ডাকতে পারিস না কখনো। বল তো হীরা, আম্মা, আম্ মা... আ...ম...মা
: আল্লা, আল্লা...
: কী আশ্চর্য পাখি তুই! আল্লা বলতে পারিস আর আম্মা বলতে পারিস না। আরে বোকা পাখি, আল্লা আর আম্মা যেন দুটি বিছানা, যেখানে খুশি শুয়ে পড়া যায়। আরাম। আরামের বিছানা। আম্মা নাই। আল্লা আছে। আল্লার বিছানা কই? আম্মা নাকি আল্লাহর কাছে গেছে। আচ্ছা, আব্বা কই? ঘুম ভেঙেছে তার? নাক থেকে নল খুলে দিয়েছে? আব্বা কি নিজে নিজে শ্বাস নিতে পারে? আব্বাও কি আল্লার কাছে চলে যাবে? তখন কি এই পৃথিবীতে শুধু তুই আর আমি থাকব? আব্বাকে একটা ফোন করতে হবে। ওরা কি ভিডিও কল করতে দেবে? সিস্টার জ্যোতি কি একটু ভিডিও কলে আব্বাকে দেখাবে?
: শিস।
: আচ্ছা, আজ তুইও দেখিস আব্বাকে। কাল কিন্তু ডাক্তার চাচু বলেছিল, অক্সিজেন খুলে দিয়ে দেখবে, আব্বা শ্বাস নিতে পারে কি না। চাচু বলেছে, আব্বা ভালো হয়ে যাবে। আম্মার সময়ও তাই বলেছিল।
: চা, চা, চা।
: আরে! তুই খুব চা-খোর হয়েছিস নাকি! নে। পানি খা একটু। চা আসুক। ঠান্ডা করে ঢেলে দেব তোর জলের পাত্রে। এখন চা চা করে চেঁচাবি না। ওকে?
: শিস।
: লক্ষ্মী পাখি! আচ্ছা, হীরা, আম্মা তো নাই। ধর, আমি বেঁচে গেলাম, ২০৭১ দেখলাম, এমনকি ২১২১, সেই জাদুকরি সংখ্যাটাও দেখলাম, তুই থাকবি আমার সঙ্গে? পাখিরা বাঁচে কতদিন? তুই কী জাতের পাখি? তোতা? টিয়া? হীরামন? দাঁড়া এক মিনিট। এই তো এখানে লেখা কাকাতুয়া বাঁচে ৪০ থেকে ৬০ বছর, টিয়া পাখিও তাই। টিয়া পাখি মানে প্যারট। বুঝলি তুই, কাকাতুয়া, ম্যাকাও সব এক জাতের। টিয়া মানে প্যারট...
: পরট...
: আরে সাবাশ, নতুন একটা শব্দ শিখে ফেললি তো তুই! সাবাশ! দেখলি তো, চাইলেই স্মার্ট হওয়া যায়। আবার বল তো হীরা, বল...
: পরট...
: পরট না, প্যারট, বল, প্যারট...
: পরট
: থাক। অনেক বলেছিস। এবার বল আম্মা। বল না হীরা, আম্মা। আম্মা বল। তোরও আম্মা নেই। আমারও আম্মা নেই। বল, আম্মা। আম্মা। আম্মা।
: শিস।
: আচ্ছা তোর বয়স কত হীরা? আম্মা তোকে এনেছিল ২০১৯-এ। তখনও এদেশে কোভিড আসে নি। তখন তোর বয়স কত ছিল? তুই কি খাঁচায় জন্মেছিলি? তুই কি ডিম আকারেই খাঁচায় ছিলি? বনে ছিলি? তোকে ধরে এনেছে ওরা? কত দিয়ে কিনেছিল আম্মা তোকে? তখন তোর বয়স কত ছিল? আমি যতদিন বাঁচব ততদিন তুই বাঁচবি হীরা? বল না হীরা, বল, বল, বল....
স্যরি হীরা, স্যরি সোনা পাখি, এভাবে খাঁচা ঝাঁকানো ঠিক হয়নি। আমার আইসোলেশন শেষ হোক। আব্বা সুস্থ হোক। তোকে আমি ছেড়ে দিব। আমাদের বাসায়ই থাকবি তুই। ইচ্ছা হলে বাইরে যাবি। ঘুরে ফিরে আসবি। আসবি তো ফিরে?
: পরট, পরট, পরট...
: পাজি। পাজি পাখি, আমি তোকে ভালোবাসি। তুই থাকিস আমার কাছে। ওই যে, খাবার নিয়ে এল মনে হয়। দরজায় রেখে গেছে। দাঁড়া নাস্তা নিয়ে আসি। শান্ত হয়ে বোস। চা দিব তোকে।
এক মিনিট।
: শিস।