৫ম পর্ব
সাফেদরের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল স্নেল পরিবারের এক সময়ের গৃহপরিচারিকা পরী। অনেক ছোটবেলায় পরী এসেছিল স্নেলদের বাড়ি। নিজের হাতে যত্ন করে তাকে বড় করেছিল কেলি। ইচ্ছে ছিল, নিজেদের ভৃত্যদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং সৎ কারো সাথে পরীর বিয়ে দিবে একদিন। কিন্তু বিয়ের পূর্বেই কোনো একদিন গর্ভবতী হয়ে পড়ে পরী। গর্ভবতী হবার পক্ষে পরীর বয়স এতটা কম ছিল যে প্রথমবার গর্ভবতী হওয়ায় পরীর তা বুঝে ওঠতে বেশ সময় লেগেছিল। বিষয়টি স্নেল পরিবারের ভেতরে জানাজানি হবার পর পরী চেয়েছিল, যে কোনো উপায়ে সন্তানটিকে নষ্ট করতে। সে সাহায্য চেয়েছিল তার ত্রাণকর্তা কেলির কাছে। কিন্তু গর্ভের সন্তান নষ্ট করার বিপক্ষে অবস্থান নেয় কেলি। কারণ, ততদিনে পরীর গর্ভে একটা মানবশিশুর অস্তিত্ব বড়ই প্রকট আকার ধারণ করেছে। যদিও কেলির মনে হয়েছিল, এই সন্তানকে ‘খালাশ’ করতে যাওয়া আর একটা মানবশিশুকে খুন করার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না—তারপরও কেলি তাকে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জনের কাছে নিয়ে যায়। ইংরেজ ডাক্তার বলেছিল, গর্ভে এত বড় হয়ে যাওয়া একটা ভ্রূণকে হত্যা করার যে প্রচলিত পদ্ধতি তা পরীকে হয়তো সাময়িক মুক্তি দিবে, কিন্তু পরীর মাতৃত্বের স্বপ্ন চিরকালের জন্য নষ্ট করে দিতে পারে। পরীর শারীরিক ক্ষতি হবার ঝুঁকিও কম নয়। সুতরাং, পরীর গর্ভের সন্তানকে নষ্ট না করে কি করে তাকে বৈধতা দেয়া যায় তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে কেলি।
পরী তার সন্তানের পিতা কে—এই প্রশ্নের জবাবটি বরাবর এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। সে দিনের পর দিন নিশ্চুপ থেকেছে। একবার গাছের ডালে ঝুলে পড়ার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু সব আয়োজন করেও গলায় ফাঁস লাগানোর সাহস করে উঠতে পারে নি পরী। এক সকালে কেলি ঘুম থেকে ওঠে দেখে, তাদের বাড়ির বিশাল আঙিনার একটা বয়সী কাঁঠাল গাছের ডালে পরীর লম্বা লাল দোপাট্টাটি ঝুলছে। আর গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ার সাহস করতে না-পারা পরী একটু দূরে মাটিতে শুয়ে কাঁদছে। পরীকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে চাপাচাপি এবং ভয়-ভীতি প্রদর্শন করতে শুরু করে কেলি। একটার পর একটা প্রশ্ন করে কেলি আর পরিচারিকা হরিবালা যখন পরীকে কোনঠাসা করে ফেলে, ঠিক তখনই পরী আচমকা সাফেদরের নাম মুখে তোলে।
সাফেদরের একটা ভয়ংকর অতীত ছিল। সে আর তার বড়ভাই তাবেদর মিলে এক সময় হত্যা, গুম, জবরদখল, হামলা, মানুষের সম্পদ কেড়ে নেয়া, নারীর শ্লীলতাহানী—এমন কোনো কুকর্ম নেই যা এই ঢাকা শহরে করে নি। কৃতজ্ঞতাবশত হয়তো সাফেদরকে নিজ বাড়িতে স্থান দিয়েছে স্নেল পরিবার, কিন্তু তার ভয়ংকর অতীতকে ভুলে যায় নি। সুতরাং পরী সাফেদরের নাম বলার পর রিচার্ড স্নেল বা কেলি কেউই আর অবিশ্বাস করে নি। তাদের মনে হয়েছিল, এই ধরনের কুকর্ম সাফেদরের পক্ষে খুবই সম্ভব।
কিন্তু সাফেদর স্বীকার করে নি। সাফেদর সবসময়ই বিশ্বাস করে, সে কোনোদিনই কোনো খারাপ কাজের সাথে জড়িত ছিল না। আপন বড়ভাই তাকে ভুল পথে চালিত করেছে মাত্র। সাফেদরের বড়ভাই তাবেদর ছোট্ট ঢাকা শহরে এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি করে রেখে গেছে যে, তা থেকে সাফেদর আর কখনোই বের হয়ে আসতে পারে নি। সাফেদর নিরুপায় হয়ে মাটিতে শুয়ে কেলি আর স্নেল সাহেবের পা ধরেছে। মাটিতে মাথা ঠুকে বার বার কেঁদেছে। কখনো কোরান শরিফ নিয়ে এসেছে, কখনো ইমামবাড়া ছুঁয়ে হোসেন (রাঃ)-র কসম খেতে চেয়েছে, কিন্তু তাকে স্নেল পরিবার বিশ্বাস করে নি। সাফেদরের তখন মনে পড়েছিল তার বড়ভাই তাবেদরের কথা। তাবেদর একসময় অনেক বড় বড় অপরাধ করেও শাস্তি পায় নি। কিন্তু যেবার শাস্তি পেয়েছিল, সেবার সে ছিল প্রকৃতই নির্দোষ। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে সাফেদরের জীবনেও ঘটতে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরে সাফেদর একবার ভেবেছিল, রাতের অন্ধকারে সে পালিয়ে যাবে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয় নি। কেলি ছিল কঠোর এবং সুচতুর। সে পরীর কাছে সাফেদরের নাম শোনার পর তাকে কার্যত গৃহবন্দি করে ফেলে। এবং সাফেদরের চূড়ান্ত অনিচ্ছায়, অনেকটা জোর খাটিয়ে, পরীকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। যে বিয়ের কথা মনে করে কেলি সারাজীবন ব্যথিত হয়েছে।
পরী এবং তার অনাগত সন্তানের একটা ব্যবস্থা করার পর, ধীরে ধীরে কেলি জানতে পারে, পরীর বহু জনের সাথেই শারীরিক সম্পর্ক ছিল। এত ছোট একটা মেয়ে, তখনও সেভাবে বালিকা হয়ে ওঠে নি। সারাদিনই থাকত কেলির চোখে চোখে। অথচ সে যৌবনের সামান্য হাতছানিকে উপেক্ষা না-করে এভাবে সাড়া দিতে শুরু করেছিল—ভেবে কেলি খুব মনক্ষুণ্ন হয়েছিল। কেলি বোঝে, পরীর সাথে সাফেদরের শারীরিক সম্পর্ক হলেও, সাফেদরকে তার হবু সন্তানের পিতা হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। আর যদি তাই হয়ে থাকে, তবে অন্য কারো বা পরীর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার দায়িত্বটি সাফেদরের ওপর চাপিয়ে দেয়া একটি অন্যায়। এইসব নানামুখী ভাবনায়, এক সময় বিরক্ত হয়ে, পরীকে নিজের বাড়ি থেকে সরিয়ে দেয় স্নেল পরিবার।
পরীর আশ্রয় হয় সাফেদরদের একসময় দখল করে নেয়া শাঁখারিপট্টির বাড়িতে। সেই বাড়িতে যেয়ে পরীর অনুভূতি হয়েছিল স্বর্গচ্যুত ইভের মতো। সাফেদরের দিনের পর দিন বাড়ি না ফেরা, সাফেদরের প্রথম স্ত্রী এবং তার সন্তানদের অত্যাচার তাকে জীবনের প্রতি হয়তো বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। সে শুধু আফসোস করেছে, কেন সে হঠাৎ করে খেয়ালের বশে সাফেদরের নাম উচ্চারণ করেছে। কিন্তু ছোড়া গুলি ফেরত আনা সম্ভব হয় না। পরীও আর তার কথা ফেরত নিতে পারে নি। সে বুঝত, তার মুক্তি সাময়িক। সাফেদর বা সাফেদরের পরিবার তাকে বা তার সন্তানকে কোনোদিনই মেনে নিবে না। আবার পরী অন্তত জানত, সাফেদরের কাছে সন্তানের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করাটাও শুধু অন্যায় হবে না, তা হবে জুলুম। পরী একটা অচল মুদ্রার মতো কিছুদিন পড়ে রইল সাফেদরের বাড়ি। তারপর সন্তান জন্ম দেবার কিছুদিন পর, সন্তানকে রেখে নিখোঁজ হয়ে গেল।
সেই ঘটনা কেলি এবং রিচার্ড স্নেলকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছিল। তাদের মনে হতে থাকে, পরীর ফেলে যাওয়া নবজাতকের দুর্ভাগ্যের জন্য তারাই দায়ী। নিজেদের অপরাধবোধ লাঘবের জন্যই পরীর সন্তানকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে আসে স্নেল পরিবার। নতুন অতিথি আসায় আনন্দের ঢেউ উঠে কেলি এবং রিচার্ড স্নেলের বাড়িতে। কিন্তু সেই ঢেউ বেশিদিন স্থায়ী হয় নি। হঠাৎ করে এক সকালে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পরীর সন্তানটি মৃত্যুবরণ করে। পরীর সন্তান মারা যাবার ঘটনায় সাফেদর নির্ভার হয়ে উঠেছিল। কবর খোঁড়া, লাশ টানার সময় তার চোখে-মুখে যে আনন্দের আভা ফুটে উঠেছিল তা কেলির চোখ এড়ায় নি। দেরিতে হলেও কেলি বুঝতে পেরেছিল, সাফেদর অন্তত এই ঘটনায় নির্দোষ।
নিজেদের অপরাধবোধ থেকে মুক্তির জন্য যে সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছিল স্নেল পরিবার, সেই অপরাধবোধ থেকে তাদের মুক্তি তো ঘটলই না, উল্টো নতুন এক অপরাধবোধ তাদের চেপে ধরল। সেই সময়টায় কেলি প্রায়ই রিচার্ড স্নেলকে প্রশ্ন করত, কোনো একদিন পরী ফিরে এসে সন্তানের খোঁজ জানতে চাইলে সে কী জবাব দিবে? তার এই প্রশ্নের উত্তরে রিচার্ড স্নেল অনিশ্চিতভাবে মাথাটা দুই পাশে নাড়ত শুধু। কারণ রিচার্ড স্নেল মনে করত, সব প্রশ্নের আগাম উত্তর ঠিক করে রাখা যায় না। এটা তেমনই এক প্রশ্ন।
সেই কঠিন মানসিক যাতনার কালে, সাফেদর রুকুবিবিকে নিয়ে ঘাটে নামলে কেলি বিস্মিত না হয়ে পারে নি। ভারতের মুসলমান সমাজে পুরুষের বহুবিবাহ নতুন কিছু নয়। কেউ এতে বিস্মিত হয় না। কিন্তু সাফেদর যখন কোলে শিশুসহ রুকুবিবিকে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় তখন কেলির মনে হয়, স্রষ্টা যেন প্রতিস্থাপনের ভার নিয়েছেন।
তবে পরীর সাথে রুকুবিবির তফাৎ ছিল অনেক। রুকুবিবির চোখ-মুখ জুড়ে একই সাথে বিস্ময় আর ভয় খেলা করছিল। মনে হচ্ছিল, অজানা কোনো গ্রহে তার ঘুম ভেঙেছে। এই চোখ কেলির অজানা নয়। বঙ্গদেশ কতটা দুর্গম তা কেলি জানে। দুর্গম বলেই হয়তো, ঢাকা শহরে যারা প্রথম আসে, তাদের চোখে এই ভয় আর বিস্ময়ের ছাপটা লেগেই থাকে। তবে রুকুবিবির কোলে থাকা শিবু তখনও বিস্মিত বা ভয়ার্ত হতে শেখে নি। সাফেদরের শিখিয়ে দেয়া নিয়মে, রুকুবিবি অল্প সময়ের জন্য মাথায়-কপালে দুই হাত তুলে, বাঁকা হয়ে, কুর্ণিশ করতে গেলে, মায়ের কোল থেকে ছাড়া পাওয়া শিবু খুব সাবলীলভাবে, অবিন্যস্ত পদক্ষেপে, কেলির কাছে যেয়ে কোলে ওঠার জন্য দুহাত বাড়িয়ে দেয়। যদিও সাফেদর রৈ-রৈ করে ছুটে এসেছিল—কালো, ময়লা শিবুকে আটকাতে; কিন্তু শিবু কাজটি এত দ্রুত এবং সাবলীলভাবে করেছিল যে, সাফেদরের পক্ষে শিবুকে আটকানো সম্ভব হয় নি। কুর্নিশ শেষ করে, দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে রুকুবিবি দেখে, অপুষ্টিতে ভোগা, কালো, রুগ্ণ শিবুকে গভীর মমতায় কোলে তুলে নিয়েছে কেলি।
সেই মমতা এত গভীর ছিল যে, রুকুবিবি আর শিবুকে সাফেদরের শাঁখারিপট্টির বাড়িতে যেতে দেয় নি কেলি। কেলি জানত, সেখানে গেলে শিবু এবং রুকুবিবি উভয়েরই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। অপরিণামদর্শী সাফেদর যে বছরের পর বছর রুকুবিবিকে গর্ভবতী করে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য করবে তা কেলি অনুমান করতে পেরেছিল। ফলে সাফেদরের চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুকুবিবি আর শিবু রিচার্ড স্নেলের প্রাসাদোপম বাড়িতেই স্থান পেয়ে যায়। তাদেরকে আর সাফেদরের শাঁখারিপট্টির বাড়িতে যেতে হয় না।
তিন বেলা নিশ্চিত আহার আর বছরে দুই প্রস্থ পোশাক যার একমাত্র চাহিদা ছিল, সেই মানুষটি রিচার্ড স্নেলের বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন এক জীবনের সন্ধান পেয়ে যায়।
[চলবে]