পর্ব-৪৬
পর্ব-৪৭
গৌতম অধিকারী আমাকে খুঁজে নিয়েছিল দমদম এয়ারপোর্টের জনাকীর্ণ প্ল্যাটফর্ম থেকে। তখন আমি সদ্য বোর্ডিং সেরে লক্ষ্ণৌ অভিমুখে। সে-এক দৃশ্য বটে! সুচিত্রা-উত্তমের ভয়াবহ ট্র্যাজিক-সিনেমার দৃশ্যের চাইতেও অধিক ট্র্যাজিক যাকে বলে! নিরাপত্তার ঘেরের মাঝে বন্দিনী আমি গৌতমের হাতও ছুঁইতে পারলাম না, সেও আমার হাত ছুঁইতে পারল না! আমরা শুধু একে অপরের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইলাম! এবং হাত না ছুঁইয়া, কোনো কথা না-বলিয়া, কিছুমাত্র কথা না-দিয়া আমি দিলাম উড়াল! উড়াল মানে অবিশ্রাম উড়াল! মেঘের শরীর ছুঁয়ে-ছেনে আদিগন্ত এক উড়াল! মুহূর্তে গৌতম হারিয়ে গেল আমার চোখের দৃষ্টি থেকে! এবং আমাদের বিচ্ছেদ ঘটিল। যদিও তা সাময়িক, চিরবিচ্ছেদ কিছুতেই নহে!
গৌতম চিনেছে লেখক পাপড়ি রহমানকে। চিনেছে পাপড়ি রহমানের লেখাকে, শামসুজ্জামান খানের লেখা রিভিউ পড়ে।
দিন সাতেক বাদে ফের আমি কলকাতায় ফিরে এলাম তেমনিভাবে। অতি দ্রুততায় উড়তে উড়তে। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে। মেঘরাজ্য এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে। ফলত কিছুটা মেঘজল গায়ে মেখে। কিছুটা ভিজে, স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে। কিছুটা অবসাদে ভালোরকম বিধ্বস্ত হয়ে। [ভ্রমণসঙ্গীরা অনুদার আর হিংসুক হলে কিভাবেই-বা সতেজ থাকা যায়? তখন গৌতমের সাথে আমার ফের মোলাকাত হলো। কিন্তু আমরা যথারীতি একে অপরের হাত ছুঁইলাম না। [আদতে আমরা কোনোদিন হাত ছুঁইবার কথা মনের ভুলেও ভাবি নাই! ছুঁইলাম কিনা কথা! একান্ত যত কথা! আমরা কথার পৃষ্ঠে কথা বলিলাম। বহু কথা, শত কথা, অযুত-নিযুত কথা! হোটেল রুমে বসে নানান কথা। [সেসব কথার সবই সাহিত্য-রিলেটেড। তারপরেও রুমমেটদের হিংসা ও সপ্রশ্ন চাহনি। ইনারা জানেন খালি প্রেম, খোঁজেন খালি প্রেম ও দেহ, হিসেব করেন লাভ আর ক্ষতির। যার ফলে ভুখা-নাঙা থাকেন জনমভর!
তা গৌতম আমাকে চিনিল কিভাবে? আমি তো তাহাকে চিনি নাই। জানি নাই। আমাদের চেনাজানা কিচ্ছুটি নাই। তাই কোনো বাসনাও জন্মলাভ করে নাই! সত্য-সত্যই কোনোরূপ বাসনা আমাদের নাই! কারণ গৌতম চিনেছে লেখক পাপড়ি রহমানকে। চিনেছে পাপড়ি রহমানের লেখাকে, শামসুজ্জামান খানের লেখা রিভিউ পড়ে। ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস বয়নের রিভিউ পড়ে বইটি ও বইয়ের লেখকের প্রতি সে মনোযোগী হয়েছে অতি। এখন কী করা?
অযুত-নিযুত কথা দিয়ে বিনিসুতার মালা গাঁথা ছাড়া আমাদের আর কিই-বা করার আছে? করার থাকে?
তাই কথাই চলতে লাগল। এদিকে আমি তো নাদানের নাদান। এক বোকা কিসিমের আনস্মার্ট-লেখক—যে কিনা নিজের বই ঝুলিতে পুরে বিলাবার জন্য বয়ে নিয়ে বেড়ায় না! এ-যুগে যখন প্রচারেই প্রসার, তখন কিনা এরকম হাবলাগোবলা এক লেখক—নিজের রচিত কিতাবগুলিরও প্রচার-প্রসার কল্পে নির্বিকার থাকে! ফলত বয়ন দেয়া গেল না আমার বিজ্ঞ-বন্ধু গৌতম অধিকারীর করকমলে! অবশ্য তাতে কিই-বা এল-গেল আমার আর গৌতমের? কিংবা কিই-বা থেমে থাকল?
লক্ষ্ণৌ থেকে ফেরার পথে সার্ক-লিটফেস্টের ভ্রমণসঙ্গী আমাকে বিদেশ-বিভূঁইয়ের হোটেল-কক্ষে একা ফেলে চলে গেল এক বিদেশি-কবির [বাংলাভাষী কবি, আদতে ক্ষণিকের প্রেমিক এরা! ডেরায় রাত্রিযাপন করতে! কী সব কাণ্ড দেকো দেকি নি! সেই কালো-রাত্তিরে হোটেলের রুমে আমি একা একা ভয়ে মরছি! কী-না কী ঘটে—এই উদ্বেগ নিয়ে ভোর হওয়ার অপেক্ষা করছি! এবং আলো ফুটতে-না-ফুটতেই ভয়ে-দুর্ভাবনায়-আতঙ্কে ফোন করেছি বন্ধু আইজ্যাক সাহা ওরফে মাল্যবানকে! ফোন করছি গৌতম অধিকারীকে। কিন্তু কিছুতেই কিছু বলি নাই তাঁদেরকে! [আমার ভ্রমণসঙ্গী আমায় বলেছিল যে, তারা পরদিন বিহান-বিহান রেলগাড়ি চেপে শান্তিনিকেতনে যাবে, তাই তাকে থাকতে হবে ওই কবির বাড়িতে! কবির স্ত্রী তখন বাপের বাড়িতে অবস্থানরত! শুনে আমি আপত্তি কিছু করি নাই। আমি আপত্তি করলেও সে কি তা শুনত? ভ্রমণসঙ্গী হয়ে দেশের বাইরে গিয়ে অন্য সঙ্গীকে একা ফেলে রেখে কিভাবে কেউ আলাদা প্রোগ্রাম করে—তাদের সাথে না-গেলে এসব আমার অজানাই থেকে যেত! হায়! কত বিচিত্র যে মানুষ! মুখোশে মুখ ঢেকে রেখে কী দিব্যিই না এই সমাজ-সংসারে ভালো মানুষটি সেজে থাকে! নিজেদের ঘরসংসার সামলে লয়্যাল পার্টনারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকে তারা!
সকাল দশটার দিকে গৌতম হোটেলের রুমে এসে আমায় বলল, আমি চাইলে তার সাথে বেড়াতে যেতে পারি। একা একা সারাদিন হোটেল রুমে বসে থেকে কী করব—ভেবে আমিও ত্বরিত সম্মত হলাম। অতঃপর গৌতম আমায় নিয়ে গেল লেখক শরৎচন্দ্রের বাড়ি দেখাতে। নিয়ে গেল লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মভিটায়! আমরা সারাদিন হেঁটে হেঁটে ইছামতি নদীর প্রায় মরে যাওয়া শীর্ণদেহটি দেখলাম। সরু এক জলধারায় একথোক-কচুরির-দঙ্গল ভেসে চলেছে নিরুদ্দেশের পানে! দুই পাড়ে কিছু কচি-কলমির-ডগায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে একঝাঁক লালফড়িং। দুই মহান-লেখকের জন্মকুটির দেখলাম আমি দুই নয়নে রাজ্যির তৃষ্ণা নিয়ে। আহা! এখানেই বুঝি দাঁড়িয়েছিল কপালকুণ্ডলা? রোহিণী নাকি অচলা? কিংবা ললিতা? সুরেশ, মহিম কিংবা শেখরের গায়ের উত্তরীয় বুঝিবা হাওয়ার টানে এইখানেই খসে পড়েছিল? আর হীরাকে দেখে কুন্দনন্দিনীর ভয়ার্ত আঁখির ছায়া পড়েছিল বুঝি-বা এই সিঁড়ির সীমান্তে?
চৈত্রের খরতাপে পুড়তে পুড়তে লালমাটি চষে বেড়ালাম আমরা। পথের-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টিউবলের বিশুদ্ধ জল খেলাম আঁজলা ভরে। খিদে পেলে টং দোকানের কলা-বিস্কুট। দুপুরে থালির ভাত-মাছ-সবজি-পাপড় ইত্যাদি।
খাওয়া শেষ হলেই ফের পথচলা! ফিরতি-পথে ফের রেলগাড়ি। আমি হঠাৎ বললাম যে, আমি মেট্রোরেলে কোনোদিন চড়ি নাই!
এরকম কাউকে আমি প্রথম দেখলাম, যে আদতে পুরুষ নয়, মানুষ! সত্যিকারের মানুষ!
একথা শোনামাত্রই গৌতম কিনা পলকে নেমে গিয়ে মেট্রোরেলের টিকিট কিনে আনল। মেট্রোরেল থেকে নেমে পুনরায় প্রাচীন-রেলের-বগি। হাওয়া কেটে কেটে ডানায় ভর করে ট্রেন চলতে শুরু করল। আর আমরাও মেতে উঠলাম সাহিত্য-আড্ডায়। এন্তার-কথা বলতে বলতে আমরা এতই বেভুলো হলাম যে, হঠাৎ দেখি রেলবগির সমস্ত-লোক আমাদের দুই জনের কথা হাঁ করে শুনছে! আর আমরা কিনা আপনমনে কথা বলেই যাচ্ছি। বলেই যাচ্ছি। একেবারে আজবগজব কারবার যাকে বলে!
বলাই বাহুল্য, খুব জমল আমার গৌতমের সঙ্গে। এবং সারাদিন টইটই করে ব্যাপক ঘুরে বেড়িয়ে হোটেলে ফিরলাম আমি। স্নানান্তে স্মরণ হলো, গৌতমই বোধকরি একমাত্র পুরুষ, যে আমার সাথে দিনব্যাপী একাকী ঘুরাঘুরি করার পরও প্রেমের প্রস্তাব দিল না! এই বিষয়টিতে আমি সত্যিই অবাক হইলাম ও শ্রদ্ধাভরে দূর থেকে গৌতমকে প্রণাম জানালাম। এরকম কাউকে আমি প্রথম দেখলাম, যে আদতে পুরুষ নয়, মানুষ! সত্যিকারের মানুষ!
গৌতম তখন ‘কথারূপ’ নামে অত্যন্ত উঁচু মানের এক লিটলম্যাগ সম্পাদনা করে। বয়ন উপন্যাসটি গৌতমকে দেয়া গেল না [আমার কাছে কোনো কপি ছিল না বিধায়। কিন্তু আমি গৌতমকে আমার তৃতীয় উপন্যাস পালাটিয়া দিয়ে এলাম। গৌতম আমায় তক্ষুনি বলেছিল যে, পাপড়ি, তোমার বইগুলি কলকাতা থেকে পাবলিশ হওয়া দরকার।
গৌতমের এ-কথায় আমিও সানন্দে-সায় দিয়ে এসেছিলাম।
গৌতম আমায় আরও বলেছিল, ‘কথারূপের’ ব্যানার থেকে পালাটিয়া উপন্যাসটি সে প্রকাশ করতে চায়।
গৌতমের এই প্রস্তাবেও আমি যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলাম।
ইন্টারনেটের ইজি অ্যাক্সেস তখনও শুরু হয় নাই। ফেসবুকের দখলও এত জোরাল হয় নাই। গুচ্ছের-টাকা খরচ করে ওভারসিজ ফোন-কল করতে হতো। এত এক্সপেন্সিভ ছিল ফোন করা, তবুও আমাদের যোগাযোগ ছিল। হঠাৎ একদিন গৌতমের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কেটে গেল। গৌতমের ফোনের অপেক্ষায় থেকে থেকে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। কোনো ফোন এল না। এমনকি আমি কল করলেও অন্যপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়া মিলল না!
আমি ভাবলাম, অনেকের মতোই গৌতম সেই হঠাৎ দেখার কথা হয়তো ভুলে গিয়েছে! এ জগৎ তো এমনই—চোখের আড়াল হলেই মনেরও আড়াল হয়ে পড়ে সকলই!
অগত্যা কী আর করা? বিহঙ্গের প্রসারিত ডানা দুটিও গুটিয়ে নিতে হলো।
বহুদিন বাদে গৌতম আমার সাথে ফের যোগাযোগ করল। যোগাযোগ করে তার নিরুদ্দেশের আদ্যোপ্রান্ত খুলে বলল আমায়। পারিবারিক-বিপর্যয়ে সে-নিজেই খুব বিধ্বস্ত ছিল। এজন্য সে অত্যন্ত শরমিন্দিত।
আমাদের বন্ধুত্বের বর্ণিল-ঘুড়ি ফের হল্লা-বাতাসে উড়ে বেড়াতে লাগল। এবং আমি অবাক হয়ে দেখলাম, গৌতম তার পূর্ব-প্রতিশ্রতির কথা কিছুতেই বিস্মৃত হয় নাই। সে পুনরায় উঠেপড়ে লাগল আমার বইগুলির ভারতীয় সংস্করণ করার লক্ষ্যে।
‘তবুও প্রয়াসের‘ সম্পাদক সেলিম মণ্ডলকে বলল আমার বয়ন উপন্যাসটির কথা। গৌতমের সূত্র ধরেই সেলিমের সাথে আমার যোগাযোগের সাঁকো তৈরি হলো।
২০২১-এর জানুয়ারিতে ‘বয়নের’ ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলো। মনোরম প্রচ্ছদ ও বাঁধাইয়ে অত্যন্ত মন-ভালো-করা একটা প্রোডাকশন ভারতের বাংলা-ভাষাভাষী-পাঠকের হাতে পৌঁছে দিলো ‘তবুও প্রয়াসের‘ টিম।
বয়ন শিকড়ের বেঁচে থাকার কথা বলে।
আর ফেসবুকের হাওয়াই-কাগজে আমার বন্ধু গৌতম আধিকারী লিখল নিজের অনুভূতি—
‘অবশেষে আমার টেবিলে পাপড়ি রহমানের বয়ন উপন্যাসের ভারতীয় সংস্করণ। উপন্যাসটি প্রথম পড়েছিলাম ২০১২-তে। নারায়ণগঞ্জের মুগরাকুল গ্রামের জামদানি-শিল্পী জোলা (তাঁতি) সম্প্রদায়ের জীবন এই উপন্যাসের উপজীব্য। আপাতত উপন্যাসটি নিয়ে বিশেষ কিছু বলছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত-গবেষক খুব সহজেই আঞ্চলিক উপন্যাসের গোত্রে ফেলে টিকা-ভাষ্যসহ যে সব গুরুগম্ভীর কথা বলতে পারেন, নিছক পাঠক হিসেবে আমার সেসব বলার অধিকার নেই।
বরং আমি তো মনে করি 'বিশেষ' বিশেষণে উপন্যাসের আলোচনা খণ্ডিত। বৃহৎ মানবসমাজের একটা অংশ নিয়ে লেখা হলেই উপন্যাস হয় না, উপন্যাস-সুলভ মহত্ত্বই কাহিনিকে, প্রস্তাবকে কিংবা কিসসাকে উপন্যাস করে তোলে। পাপড়ি আসলে আবহমান বাংলার কিসসা বা রূপকথার কথক। যে রূপকথার 'কথা ফুরোলেও নটে গাছটি মুড়োয় না।' সন্ধে নামলেই ঠাকুরমা-দিদিমা অথবা দাদি-নানিদের মুখে জেগে ওঠে, বেঁচে ওঠে। আপাত নটে মুড়োনোর কথা বললেও শিকড়টা তো বেঁচেই থাকে। বয়ন শিকড়ের বেঁচে থাকার কথা বলে।
অসাধারণ প্রচ্ছদ আর ঝকঝকে ছাপায় তিনশোরও বেশি পৃষ্ঠার এই উপন্যাস প্রকাশ করা একধরনের দুঃসাহসিকতা। 'তবুও প্রয়াস'-এর নবীন বন্ধুরা সেই দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন। ভারতীয় বাংলা ভাষার পাঠকরা তাঁদের সহযাত্রী হোন, ঠকবেন না।
বয়ন/ পাপড়ি রহমান প্রচ্ছদ: আমিনুল হাসান লিটু প্রকাশক: তবুও প্রয়াস ৪১, শ্রীগোপাল মল্লিক লেন কলকাতা-৭০০০১২ ফোন: 8641937356’
আমার বন্ধু এই গৌতম আধিকারীকে আমি কী বলি? কী বলে তাঁকে ধন্যবাদ-কৃতজ্ঞতা জানাই?
শুধু মনে মনে বলতে পারি—
তুমি আমার পাশে বন্ধু হে বসিয়া থাকো, একটু বসিয়া থাকো। আমি মেঘের দলে আছি, আমি ঘাসের দলে আছি—তুমিও থাকো বন্ধু হে…