আরমানের মাথা থেকে কিছুতেই ব্যাপারটা দূর হচ্ছে না। সে যখন ঘরে ফেরে তখন প্রায়ই পথের একটি দালানের তিন তলায় এক রমণীকে বিমর্ষচিত্তে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সেই নারী কখনো উদাসচিত্তে দূরের কোনো কিছুর দিকে একাগ্র মনে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে থাকে। আরমান তাকে দেখেছে মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে। সেই নারীর শান্ত, স্নিগ্ধ, সমাহিত সুন্দর কিন্তু বিষণ্ন চেহারাটা আরমানের মন থেকে কিছুতেই যেতে চাচ্ছে না। হঠাৎ হঠাৎই সেই মলিন চেহারাটা আনাহূত আগন্তুকের মতো তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। আরমানের খুব জানতে ইচ্ছে করে কী দুঃখ সেই রমণীর, কী কষ্ট সে লুকিয়ে রেখেছে বুকে, যার জন্য সে প্রায়ই চোখের জল ফেলে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তিন তলার সেই ঝুলবারান্দায়। সেই নারীকে দেখতে পেলে আরমানের ভালো লাগে। যেদিন সেই নারী ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে না সেদিন আরমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। যদি সেই নারীর সাথে তার সামনাসামনি কখনো দেখা হয় তবে আরমান অবশ্যই জানতে চাইবে সেই নারীর কষ্টের কথা।
তিন তলায় সেই রমণীর বাসা। আরমান ভাবছে আজ সেই নারীর দেখা পাবে কিনা।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অফিসেরও ছুটির ঘণ্টা বেজে গেছে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলতে আরম্ভ করে দিয়েছে। কোথাও হলুদ কোথাও সাদা আলো। বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাট দালান-কোঠা ভেজা ভেজা। কোনো কোনো রাস্তায় কিছুটা পানি জমে গেছে। আরমানের গাড়ি ছুটছে মতিঝিল থেকে দৈনিক বাংলা হয়ে রাজারবাগ শাজাহানপুর তারপর খিলগাঁ মোড়। এরপর খিলগাঁ রোড ধরে সোজা তালতলা মোড়। তালতলা মোড় থেকে ভিতরে একটা রাস্তা গিয়ে সমান্তরাল আরেকটা রাস্তার সাথে মিশেছে। সেই সমান্তরাল রাস্তাটা যেই বিন্দুতে তালতলা মোড়ের রাস্তার সাথে মিশেছে সেই বিন্দুতে যেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটা আছে তার নাম্বার হচ্ছে ১৫/সি, তারই তিন তলায় সেই রমণীর বাসা।
আরমান ভাবছে আজ সেই নারীর দেখা পাবে কিনা। ভাবতে ভাবতে সে গাড়ি চালাচ্ছে। তার গাড়ি তালতলা মোড়ে এসে গেছে। এখন ডানে ঢুকলেই সেই নারীকে হয়তো দেখা যাবে। হ্যাঁ সত্যিই। আজও সেই নারী সেই ঝুলবারান্দায় মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে আছে একটা হলুদ সাদা প্রিন্টের সুতি শাড়ি। আরমানের মনটা খুশিতে ভরে উঠল। তার মনে হলো সারা আকাশ যেন অন্ধকারের মধ্যে হলুদ আলো বিলাচ্ছে। যেন সে বিশাল হলুদ সরিষা ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছে।
আরমানের গাড়ি বাসার কাছে চলে এসেছে। সে গাড়ি পার্ক করে লিফট দিয়ে ছয়তলায় উঠল। কলিং বেল টিপল। মা দরজা খুলল। এই ফ্ল্যাটে সে আর তার মা-বাবা এই তিনজন থাকে। সে যখন চাকরি পায় তখন তার বাবা-মাকে গ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং এই ফ্ল্যাটে ওঠে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে তার বড় ভাই আনিসের বাসায় থেকে। আনিস শ্যামলী থাকে। সে জামা-কাপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে এলে মা চা-নাস্তা দিল। ড্রইং রুমে বসে চা খাচ্ছে। মা বললেন,
—আজ বুয়া আসে নি। কালও আসবে না। বাইরে গেলে পাউরুটি নিয়ে আসিস। আর তোর বাবার ওষুধও লাগবে।
—তোমার খুব কষ্ট হয় তাই না মা?
—তোকে তো কত করে বলি একটা বিয়েথা কর। কিন্তু তুই তো কথা শুনিস না।
—আর একটু গুছিয়ে নেই মা। একটু সবুর করো। তারপর করব।
—তোর বাবার তো ডাক্তার দেখাবার সময় এসে গেছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দে। তোর বাবাকে ডাক্তার দেখিয়ে আনি।
—আচ্ছা মা করব।
সাড়ে নয়টার দিকে আরমান বাইরে গিয়ে পাউরুটি ওষুধ আর সিগারেট নিয়ে এল। দশটায় মা ভাত খেতে ডাকলে সে বাবার সাথে ভাত খেল। খেতে খেতে বাবার হাঁটুর ব্যথার খোঁজখবর নিল। মা সবার শেষে একাই ভাত খায়। আরমান ঠিক করেছে আজকে টিভি দেখবে না। আজ বই পড়বে। কয়েকদিন আগে বইটা কিনেছে কিন্তু পড়া হয় নি। বইটা হচ্ছে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট। বই পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে সে টেরও পেল না। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্নে দেখছে। সে দাঁড়িয়ে আছে একটা লাশের কাছে। লাশটা গ্রামের প্রধান সড়কের পাশে ঝোপের মধ্যে পড়ে রয়েছে।
একটা নারীর গলিত লাশ। লাশটার এক চোখ চিল শকুনে খেয়ে ফেলেছে। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। মুখের মধ্যে মাছি ভন ভন করছে। ডান স্তনের জায়গায় অসংখ্য কীট কিলবিল কিলবিল করছে। এসব দেখে তার বমি করতে ইচ্ছে হলো এবং একটু দূরে গিয়ে সে বমি করতে লাগল। সে আক আক করে বমি করছে। সে আক আক করতে করতে ঘুম থেকে জেগে উঠল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে ঘেমে গেছে যদিও এসি চলছে। তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়েছে । একটা ভয়, শঙ্কা তাকে পেয়ে বসল। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। চারটা আটান্ন মিনিট বাজে। সে ঝুলবারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরাল। সেই লাশটাকে সে চেনে। ওর নাম শেফালী। আরমান আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে শবের মতো শীতল একফালি চাঁদ থেকে আলো আসছিল। শোকার্ত তারারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে জ্বলছিল আকাশে। বাতাসের ভুতুড়ে স্পর্শে কাঁপছিল গলির শেষ মাথায় যে কাঁঠাল গাছটা আছে তার সবুজ পাতাগুলো। আজান দিল।
আমার মৃত্যু না হলে ওই পশুটার হাত থেকে মুক্তি পাব না। বাঁচতে হলে আত্মহত্যা করতে হবে।
এক ছুটির দিনে সে বসুন্ধরা সিটিতে গেল কিছু কেনাকাটা করতে। সে দু’টো টি-শার্ট আর একটা বেল্ট কিনল। তার খুব কফি খেতে ইচ্ছে করল। সে আটতলায় গেল। একটা দোকানের বাইরে সাজানো একটা টেবিলে বসে কফির অর্ডার দিল। কফি এলে সে কাপে চুমুক দিচ্ছে। এমন সময় এক রমণীর দিকে তার দৃষ্টি আটকে গেল। সেই রমণীটি দেখতে অবিকল সেই তিন তলার তার দেখা রমণীর মতো। না এ তো তার দেখা সেই রমণীই। সে নিশ্চিত যে ইনিই সেই নারী অফিস থেকে ফেরার পথে যাকে সে প্রায়ই দেখে। সে কফি শেষ করে সেই নারী যেখানে বসেছিল সেখানে গেল। সেই নারীর পরনে ছিল একটি হালকা নীল রঙের সিল্কের শাড়ি। চুল খোঁপা করা। ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক। কানে দুল। হাতে এক জোড়া চুড়ি। ভারী বুক। প্রশস্ত নিতম্ভ। রূপসী বলা যাবে। অনেক মেয়েই তার মতো সুন্দরী হতে চাইবে। সেই রমণীও কফি খাচ্ছিল। আরমান বলল,
—মাফ করবেন। আপনি ১৫/সি বিল্ডিংয়ে থাকেন না?
—হ্যাঁ। কেন বলুন তো?
—আমিও খিলগাঁ থাকি। আমি আপনাকে চিনি।
—চেনেন? কিভাবে চেনেন?
—বসে বলি? বসব?
—হ্যাঁ নিশ্চয়ই।
আরমান বিপরীত দিকের খালি চেয়ারটায় বসল। তারপর বলল,
—আমি যখন অফিস থেকে ঘরে ফিরি তখন আপনাকে দেখি। আপনি বিমর্ষ মনে ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—কী কথা?
—আপনার কি অনেক কষ্ট? আমি আপনাকে দেখি যে আপনি প্রায়ই আঁচল দিয়ে চোখ মুছেন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে।
—আমার কষ্টের কথা জেনে আপনি কী করবেন? আপনি কি কিছু করতে পারবেন?
—কিছু করতে পারতেও তো পারি।
—সত্যিই শুনতে চান?
—হ্যাঁ, অবশ্যই শুনতে চাই।
—তাহলে শুনুন। চার বছর আগে আমার বিয়ে হয়েছে একটা পশুর সাথে। ওর নাম শফিক। ও আমাকে জোর করে বিয়ে করেছে। বিয়েতে আমার বা আমার পরিবারের কারো মত ছিল না। শেষে একদিন ও আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। উপায়ন্তর না দেখে আমি তখন বিয়েতে রাজি হই। ও দু’টো খুনের মামলার আসামি। ওর সাথে সবসময় একটা রিভলবার থাকে। ও ছিল আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী। বিয়ে করার পর যদি ও আমাকে একটু সুখ দিত? আমাকে কথায় কথায় মারে। ফোন ধরতে দেরি করলেও মারে, তরকারিতে লবণ বেশি হলেও মারে আবার রান্নায় দেরি হলেও মারে। এই দেখুন গত পরশু আমাকে মেরেছে বেল্ট দিয়ে।
রমণী তার গলার পাশের অংশ দেখালেন। কণ্ঠস্বরে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা। চোখে জল এসে গেছে। গলার পাশে বেল্টের দাগ বসে আছে। আরমান দেখল। রমণী আবার বলতে শুরু করল,
—আমার মৃত্যু না হলে ওই পশুটার হাত থেকে মুক্তি পাব না। বাঁচতে হলে আত্মহত্যা করতে হবে।
আরমান বলল—আত্মহত্যা করতে হবে কেন?
—তাহলে কিভাবে বাঁচব ওর হাত থেকে?
—আপনি কখনো থানায় গিয়েছিলেন?
—হ্যাঁ একবার গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা মামলা নেয় নি। ওর নামে মামলা নিবে না। আমাকে এখন উঠতে হবে।
—যদি কিছু মনে না করেন। আমি কি আপনার ফোন নাম্বরটা রাখতে পারি।
—হ্যাঁ ০১...। আমাকে ফোন করলে সকাল দশটার পর দিনের বেলা ফোন করতে হবে।
—আপনার সাথে এতক্ষণ কথা বললাম। কিন্তু আপনার নামটাই তো এখন পর্যন্ত জানা হলো না।
—আমার নাম শর্মি। আচ্ছা চলি তাহলে আজ।
আরমান ফোন নাম্বারটা যত্ন করে মোবাইলে সেইভ করে রাখল। শর্মি হেঁটে চলে গেল। আরমান তার হেঁটে যাওয়ায় পথের দিকে চেয়ে রইল। তারপর নিজেও উঠল।
শর্মির ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াতেই আরমানের দৃষ্টি থেকে সমস্ত কিছু অদৃশ্য হয়ে গেল।
শর্মির জন্য আরমানের মায়া লেগে গেল। শর্মির কাঁদো কাঁদো মলিন চেহারাটা আরমানের বেশি করে মনে হতে লাগল। শর্মির জন্য কী করা যায় সেটা নিয়ে সে ভাবতে লাগল। সে কি শর্মিকে ভালোবেসে ফেলেছে? ভালো বেসেছে কিনা সেটা সে জানে না। কিন্তু শর্মিকে আরমানের ভীষণ ভালো লেগেছে। শর্মির বর্তমান অবস্থার কথা বিবেচনা করে শর্মির জন্য আরমানের মনে গভীর সহানুভূতির ভাব সৃষ্টি হলো। শর্মির জন্য অপরিসীম মমত্ববোধের সৃষ্টি হলো। রাতে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল আরমান। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎই শর্মির ম্লান মুখ তার মানসপটে ভেসে উঠছিল।
রাত বারোটা বাজে। তার সিগারেটের নেশা চেপেছে। সে ঝুলবারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরাল। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে জ্বলছিল। তার আলোয় সমস্ত পাড়া প্লাবিত হয়ে যাচ্ছিল। নক্ষত্রেরা ঝিকিমিকি করছিল মায়াবী রাতে। মৃদু বাতাস আরমানের চুল ছুঁয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল গলির মোড়ের লাইটপোস্টের নিচে দাঁড়ানো ছায়ামূর্তির উপর। ছায়ামূর্তির মুখের উপর লাইটপোস্টের বাতির আলো পড়ছিল। সে ভালোমতো খেয়াল করল। এতক্ষণে মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল। আরে শেফালী দাঁড়িয়ে আছে । তার দিকে চেয়ে আছে একদৃষ্টিতে। ওই তো শেফালীর এক চোখের কোটর খালি। অন্য চোখ দিয়ে ক্রুদ্ধভাবে চেয়ে আছে তার দিকে।
আরমানের সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। শ্বাস-প্রশ্বাস তো হলো। হার্টবিট বেড়ে গেল। একধরনের ভয়, আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসল। সে টের পেল তার বগল ঘেমে গেছে। তার কপালেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগল। সে তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতরে এসে ঝুলবারান্দায় যাওয়ার দরজাটা বন্ধ করে দিল। ঘড়িটা শব্দ করে ঘুরছিল। টিক টিক টিক। তার কানে আসছিল। বাথরুমের কল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছিল। সে শুনতে পাচ্ছিল। টপ টপ টপ। সে তাড়াতাড়ি ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ল।
আরমান অফিসে বসে কাজ করছে। চারটার পর সে একটু ফুরসত পায়। গতকাল ভালো ঘুম হয় নি। তাই আজ সারাদিন মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। সে একটু চোখ বন্ধ করে রাখল। তন্দ্রা মতো ভাব চলে এসেছে। সে চোখ বন্ধ করেই রাখল। সে দেখতে পেল, হাসপাতালের পোশাক পরা। শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। সে ভীষণ ভীত সন্ত্রস্ত। নার্স এসে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু সে নার্সের হাত চেপে মিনতি করছে—প্লিজ যাবেন না। আমাকে একা ফেলে যাবেন না। আজ রাতেও শেফালী আসবে।
নার্স বলছে—আপনাকে ঘুমের ওষুধ দেয়া হয়েছে। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। কেউ আসবে না। তাছাড়া আমরা তো আশেপাশেই থাকব। অনেক দূর থেকে মোবাইল বাজার শব্দ তার কনে আসছে। শব্দটা আরো তীব্র হলো। সে চোখ খুলে দেখে তার মোবাইল বাজছে। শাওন ফোন দিয়েছে। শাওন তার সাবেক প্রেমিকা। সে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে শাওন বলল—এই আগামী শুক্রবার আমরা ম্যারিজ ডে পালন করব। তোমাকে কিন্তু আসতেই হবে। আরমান বলল—আচ্ছা আসব।
শর্মির কথা ভাবতে ভাবতে আরমান শর্মিকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করল—আমি কি আপনার সাথে দেখা করতে পারি। শর্মি জানাল যে দেখা করতে চাইলে আগামী পরশু দেখা হতে পারে। সেদিন তিনটায় সে বসুন্ধরা সিটিতে থাকবে। আর আরমান ওই দিন অর্ধেক বেলা অফিস করে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মার্কেটের কফি শপে শর্মিকে খুঁজে পেল। কিন্তু শর্মিকে দেখে সে চমকে উঠল। শর্মির নিচের ঠোঁট ফুলে আছে। বাঁ চোখের চারিদিক নীল হয়ে আছে। আরমান জিজ্ঞেস করল আপনার মুখ এরকম হলো কিভাবে?
—গতকাল ও আমার মুখে আর চোখে ঘুসি মেরেছে।
আরমানের খুব রাগ হলো শর্মির স্বামীর উপর। আর শর্মির জন্য মায়া আরো বেড়ে গেল। সে ডান হাতের বুড়ো আঙুল শর্মির ফোলা ঠোঁটের উপর রাখল। শর্মি আপত্তি করল না। শর্মির ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াতেই আরমানের দৃষ্টি থেকে সমস্ত কিছু অদৃশ্য হয়ে গেল। সমস্ত দৃশ্য শূন্যতায় হারিয়ে গেল। সে শুনতে পাচ্ছে তার আর শাওনের ফোনালাপ। শাওন বলছে—এতদিন কোথায় ছিলে?
—অসুস্থ ছিলাম
—তোমাকে অনেক খুঁজেছি। তোমাকে মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে তোমার ভাইয়ের বাসা মানে তুমি যেখানে থাকতে সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি তোমরা বাসা বদল করে অন্যত্র চলে গেছ। তোমাদের নতুন বাসার ঠিকানা কেউ দিতে পারল না। তোমাকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু পাই নি। শেষমেশ তাই বাবার পছন্দের বিয়েতে রাজি হয়ে গেলাম। আমার বিয়ে হয়ে গেল।
আরমান শুনতে পাচ্ছে দূরে কোথায় যেন কফির কাপে চিনি নাড়ার টুংটাং টুংটাং শব্দ। মানুষের কোলাহল শুনতে পাচ্ছে কোথায় যেন। হাই হিলের খটখট খটখট শব্দ। তারপর একটা নারীর কণ্ঠস্বর। কণ্ঠস্বর বলছে—শুনছেন। আরমান চেয়ে দেখে শর্মি কথা বলছে। আরমান শর্মির ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে নিল।
তারপর আরমান বলল—আপনি কত সুন্দর। দু’জনে কফি খেয়ে দু’জনে আলাদাভাবে বাসায় চলে এল।
প্রথমে সে চমকে গিয়েছিল। আরো ভালোভাবে দেখল। দেখে যে জীবিত শেফালী তার জীবন্ত সুন্দর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজ শুক্রবার। আরমান ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেল বাজার করতে। রাত আটটা বাজে। সে লিস্ট দেখে দেখে সমস্ত জিনিসই নিল। তিনটে বড় ব্যাগ হয়ে গেল। সে গাড়িতে মালামালগুলো রাখল। দেখে গাড়ির কাছেই এক মহিলা ঘোমটা দিয়ে কোরান শরিফ পড়ছে। তার ইচ্ছে হলো মহিলাকে বিশ টাকা দিতে। সে মহিলার কাছে গিয়ে টাকাটা কোরান শরিফের উপর রাখল। মহিলা মুখ তুলে ঘোমটার ভেতর থেকে আরমানের দিকে চাইল। আরমান চেয়ে দেখে শেফালী তার দিকে চেয়ে আছে। শেফালীর এক চোখের কোটরে কোনো চোখ নেই। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাসায় চলে এল।
রাতে টিভিতে সংবাদ দেখছে। একটা খবরে বলল আজ রাতে খিলগাঁও এলাকায় শফিক নামে এক ঠিকাদার প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছেন। খবরে আরো বলল যে উক্ত ঠিকাদারের নামে গাজীপুরে দু’টো খুনের মামলা আছে।
রাতে খাওয়-দাওয়া শেষে আরমান শুয়েছিল বিছানায়। তন্দ্রার মতো ভাব চলে এসেছে। ঘড়িটা শব্দ করছে টিক টিক টিক । কলের পানি পড়ছে টপ টপ টপ । সে শুনতে পাচ্ছে সে আর তার দুই বন্ধু রফিক আর রায়হানের কথাবার্তা যেটা হয়েছিল অনেকদিন আগে তার গ্রামের বাড়িতে।। রফিক বলছে—আমরা তো মারি নি। আমরা তো শুধু...
আরমান বলছে—তাহলে মারল কারা?
রায়হান বলছে—মনে হয় কুদ্দুসদের হাতে পড়েছিল। ওরাই এটা করেছে।
পনেরো দিন পর এক ছুটির দিনে আরমান শর্মিকে ফোন দিল। শর্মি বলল—আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই।
—অসুবিধে না থাকলে বাসায় চলে আসতে পারেন।
—আচ্ছা আজকেই আসব।
মাগরিবের নামাজের একটু পর কে যেন কলিং বেল টিপল। আরমান দরজা খুলতে গেল। লুকিং গ্লাস দিয়ে দেখল কে এসেছে। চেয়ে দেখে শেফালী দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে সে চমকে গিয়েছিল। আরো ভালোভাবে দেখল। দেখে যে জীবিত শেফালী তার জীবন্ত সুন্দর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে দরজা খুলল। দেখে শর্মি দাঁড়িয়ে আছে হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে।