পর্ব- ১০
পর্ব- ১১
দৈনিক মুক্তকণ্ঠের সাহিত্যপাতার জন্য আমরা সারা সপ্তাহ জুড়ে অপেক্ষমাণ থাকতাম। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার সম্পাদিত ওই পাতার নাম ছিল ‘খোলা জানালা’। একেবারে বসন্তকালে জানালা খুলে রাখার মতো ছিল ওই সাময়িকীটি। বসন্ত-সমীরণে প্রাণমন জুড়িয়ে দেয়ার মতো। কী তার রূপ আর গুণ! কী তার অঙ্গ-সৌষ্ঠব! আহা! মরি মরি!
‘খোলা-জানালা’ পড়ার পরে সারা হপ্তা আর কিছু না-পড়লেও চলত। কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-অনুবাদের সে-এক মন-ভালো-করে-দেয়া সম্ভার! আজও আমি যেন দিব্য চোখে দেখতে পাই। কত অচেনা লেখককে যে উনি তুলে আনলেন আমাদের চোখের সামনে! কত অচেনা কবি আর গল্পকার! কত চেনামুখ যে অচেনা করে দিয়ে ছাপলেন! গুপু ত্রিবেদীর সেই নয়ন-জুড়ানো ইলাস্ট্রেশন! আর একজন কে যেন ‘খোলা জানালার’ অলংকরণের কাজ করত, তাঁর নাম ভুলে গিয়েছি!
হাসনাত ভাইয়ের সাহিত্যপাতাটি মোটামুটি তখন প্রায় সব দৈনিকের সাহিত্যপাতার রোল-মডেল ছিল।
আজকের ‘মুক্তগদ্য’ নামক লেখার এই ফর্মটি খোলা জানালা খুললেই তখন আমাদের চোখে পড়ত। শাহরিয়ার ভাই পশ্চিম বাংলার লেখকদের লেখার সাথে ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। ‘খোলা জানালা’র প্রকাশের পূর্বে আজিজ মার্কেটই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা-স্থল। সেখানে গিয়ে নাম-শোনা লেখকদের বইপত্র কিনে আনা। বা অচেনা লেখকদের বইয়ের পাতা উলটিয়ে পালটিয়ে কয়েক পাতা পড়ার পরে সিদ্ধান্ত নেয়া তাঁকে আমরা ঘরে আনব কি আনব না?
শাহরিয়ার ভাইয়ের সহযোগী হিসেবে ‘খোলা জালানা’য় কাজ করত কবি টোকন ঠাকুর ও শহীদুল ইসলাম রিপন। কিন্তু শাহরিয়ার ভাইয়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া তাঁদের কিচ্ছুটি করার উপায় ছিল না।
পশ্চিম বাংলার লেখকদের বাইরে তিনি তাঁর পরিবারের লেখকদেরও প্রাধান্য দিতেন। ফলে আমরা ঘনঘনই তাঁদের লেখাও ‘খোলা জানালা’য় দেখতে পেতাম।
শাহরিয়ার ভাইয়ের সহধর্মিণী মনিরা কায়েস [নিজ গুণেই যিনি অত্যন্ত ভালো লেখক, আমার অতি পছন্দের লেখক, শাহরিয়ার ভাইয়ের ভায়রা ভাই মামুন হুসাইন [মনিরা আপা সম্বন্ধে যা বললাম, সেকথা মামুন ভাইয়ের জন্যও প্রযোজ্য ছাড়াও আরও অনেকের লেখাই ঘুরেফিরেই আসতে দেখতাম। [সঙ্গত কারণেই তাঁদের সকলের নাম উল্লেখ করছি না
দৈনিক সংবাদের সাহিত্যপাতার সম্পাদক ছিলেন আবুল হাসনাত। হাসনাত ভাইয়ের সাহিত্যপাতাটি মোটামুটি তখন প্রায় সব দৈনিকের সাহিত্যপাতার রোল-মডেল ছিল। তখন অনেক বড় হাউসের পত্রিকাকেও দেখেছি হাসনাত ভাইয়ের পাতাটি অনুকরণ করতে। আর হাসনাত ভাইয়ের সাহিত্যপাতা ছিল অনেক নতুন লিখিয়ে, বিশেষ করে নারী লিখিয়েদের জন্য ভরসার জায়গা। যদিও আমি তখনো সংবাদে কোনো গল্পই দিই নি। কবে, কখন দিয়েছি সেসব কথা পরে বলবার ইচ্ছে রইল।
‘খোলা জানালা’ ছিল একেবারে স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত। শাহরিয়ার ভাই সম্পূর্ণ নিজের মতো করে পাতা সাজাতেন। তাঁর পাতার যে স্ট্যান্ডার্ড ছিল—সেখানে কোনো এলেবেলে লেখা দূরে থাকুক, নিজের অত্যন্ত ভালো লেখাটি দিতেও বুক দুরুদুরু করে উঠত। ফলে ‘খোলা জানালা’য় এন্ট্রেন্স পাওয়া অত সহজ ছিল না। আমি এটা বরাবরই পছন্দ করেছি—বাছবিচার ছাড়া ধামধুম করে যার-তার লেখা ছাপিয়ে দিত যেসব পত্রিকা আমি তাঁদের কোনোদিন-ই লেখা দিই নি। দেয়ার কথাও ভাবি নি।
আমাদের সময়ে শৈলী, মুক্তকণ্ঠ, জনকণ্ঠ, সংবাদ, উত্তরাধিকার, ভোরের কাগজে লেখা ছাপা হলে আমরা অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করতাম। আজ অবাক হয়ে ভাবি, কোথায় গেল আমাদের সেইসব সোনালি দিনের সাহিত্যপাতা? আজ তেমন উচ্চতার কোনো পত্রিকা প্রায় নজরেই পড়ে না—সেরকম কোনো সম্পাদক—যাঁদের হাত দিয়ে লেখা প্রকাশিত হলে নিজেকে সম্মানিত মনে করতে পারি? তেমন পত্রিকা কোথায়—যেখানে লেখা ছাপা হলে মনে হতে পারে যে, এইবার আমি হিমালয়ের চূড়োটা ছুঁতে পেরেছি!
আমার অতি ভালোমানুষি ও সরলতার সু্যোগ নিয়ে এক ভয়ংকর রাক্ষস তখন আমার জীবনের সমস্ত আলো গিলে ফেলেছিল।
আজ বন্ধুকৃত্য, দলবাজি আর টেক অ্যান্ড গিভের কাছে আমাদের সমস্ত গৌরব মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর উপহার-সামগ্রী ছাড়া নাকি কোথাও লেখা ছাপানোই দায়! তবুও কিছু কিছু পত্রিকা, কিছু কিছু সোনার-মানুষ আজও আছেন, যাঁরা সত্যিকারের লেখকদের চিনে চিনে তাঁদের লিখতে বলেন এবং সে লেখা যত্ন করে ছেপেও দেন! কিন্তু আজ তেমন সম্পাদকেরা সংখ্যায় অত্যন্ত নগণ্য।
কবিতা বাদ দিয়ে আমি গল্পই লিখছিলাম—আমাদের গল্পের অতি চেনা ফর্মগুলো ভাঙতে চাইছিলাম। ময়মনসিংহ গীতিকা, মঙ্গলকাব্য, পুঁথিসাহিত্য থেকে নানান কিছু যুক্ত করে দিচ্ছিলাম আমার গল্পে। এর মাঝে প্যারালল-টেক্সট ফর্মের দুই-তিনটা কাজ করলাম। বিষয়টা ছিল, প্রথমে কবিতার মাধ্যমে গল্পের জিস্ট বলে দেয়া। পরে ওই জিস্ট ভেঙে গল্পে ছড়িয়ে দেয়া। মানে কবিতারই ইলাবরেশান—কবিতায় মূল বিষয় আগে বলে নিয়ে পরে তা গদ্যে সাজানো।
আমি এই ফর্মে তিন/চারটার বেশি গল্প লিখি নি। কারণ ওইভাবে লেখাটা ছিল ভয়ানক শ্রমসাধ্য। বিশেষ করে কবিতাগুলোর ছন্দ ঠিক রেখে লিখে যাওয়া। কবিতা যখন আমায় চিরতরে ছেড়ে চলে গেল, তখন ওই ফর্মের গল্প লেখা আমার জন্য প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু কবিতা তবুও আমার সন্তানের মতো পিঠের সাথে লেপ্টে থাকতেই চেয়েছিল! আমি লিখলাম ‘উৎসব’ [এই গল্পটা কমপক্ষে ২৫বার রি-প্রিন্ট হয়েছে, ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে দেশের বাইরে ছাপা হয়েছে। আমার গল্প নামগল্প করে অনুবাদক মাসরুফা আয়েশা নুসরাত তাঁর অনুবাদ গ্রন্থের নাম দিয়েছে—Celebration & Others Stories. এই বইয়ের প্রতিটা গল্পের অনুবাদ মাসরুফার করা, প্রকাশক পাঠক সমাবেশ নামের একটা গল্প। থিম ছিল, এক নারী শুধু কন্যাশিশুই জন্মদান করে—পুত্রের আকাঙ্ক্ষায় তার স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহ। এবং তীব্র অপমান ও বেদনায় ওই মায়ের নিজের চার-সন্তানসহ রেলগাড়ির নিচে জীবন বিনাশ। তখনো আমি নারীদের বাঁচিয়ে রাখার কৌশল শিখি নি—এমনকি নিজেকে বাঁচানোর কৌশলও। বা নিজেকে ভালোবাসার মতো স্বার্থপরও হয়ে উঠতে পারি নি। শিখি নি বেঁচে থেকেও কিভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায়?
আমার এই ‘উৎসব’ গল্পটি কুয়াত-উল-ইসলাম অত্যন্ত যত্ন করে ছেপে দিলেন। ‘শৈলীতে’ গল্প ছাপা হবার পরে আমি ওই ফর্মের আরেকটা গল্প লিখলাম ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’ নামে। এটা ছিল ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’--এর বিষয় নিয়ে। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলাম বেহুলা-লখিন্দরের সেই মিথ। আমি পরিচিত মিথটা সামান্য বদলে দিয়ে বেহুলাকে মৃতবৎ রেখে ভেলায় ভাসিয়ে দিলাম। আর লখিন্দরকে রাখলাম বাঁচিয়ে, ভেলা বেয়ে নেবার জন্য। ওই মিথের পুরোপুরি রিভার্স এক মিথে গল্প লেখা শেষ করে বাদামি খামে পুরে দুরু দুরু বুকে শাহরিয়ার ভাইকে দিতে ‘মুক্তকণ্ঠে’ গেলাম।
শাহরিয়ার ভাই গল্পটা হাতে নিলেন এবং তাঁর স্বভাবসুলভ দীর্ঘ লেকচার দিলেন পদ্য, গদ্য উভয় নিয়েই। আমি বাধ্যগত ছাত্রীর মতো চুপচাপ শুনে গেলাম।
দিয়ে আসার হপ্তা-তিনেক বাদে আমার গল্পটা ছাপা হলো ‘খোলা জানালা’য়। আজও আমি যেন সেই পাতাটি স্পষ্ট দেখতে পাই—
ভেতরের পাতার পুরো ডানদিকের এক পৃষ্ঠা জুড়ে ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’। আর বাম দিকের এক পৃষ্ঠা জুড়ে জাকির তালুকদারের ‘বিশ্বাসের আগুন’! জাকিরের এই গল্পটা অসম্ভব ভালো গল্প ছিল! জাকিরের প্রথম দিকের সমস্ত লেখাই অসম্ভব ভালো ছিল। পরে তাঁর লেখা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। হয়তো ‘অতি ফরমায়েশের চাপে’! [জাকির আবার ফর্মে ফিরতে শুরু করেছে, যা আমাদের জন্য সুসংবাদ!
শাহরিয়ার ভাই খুব-ই মেধাবী একজন কবি ও সম্পাদক। [শাহরিয়ার ভাই যদিও পরে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু আমি তাঁকে যেমন দেখেছি, সেটাই বলছি মনিরা আপাও খুব মেধাবী গল্পকার। এই দুইজনের অনেক স্নেহে আমি আজও ঋণী হয়ে আছি। তাঁরা আমাকে সত্যিই নির্ভেজাল স্নেহ দিয়েছিলেন। নাসির ভাই আর ভাবিও দিয়েছিলেন। আমি এই দুই-দম্পতির সেই অগাধ-স্নেহের সুতো ধরে রাখতে পারি নি। বা বিনিময়ে তাঁদের আমি কিছু দিতেও পারি নি। আমার অতি ভালোমানুষি ও সরলতার সু্যোগ নিয়ে এক ভয়ংকর রাক্ষস তখন আমার জীবনের সমস্ত আলো গিলে ফেলেছিল। গিলে ফেলে তার প্রকাণ্ড পেটের ভেতর বন্দি করে রেখেছিল। সেই সাথে আমিও ছিলাম দীর্ঘদিন গৃহবন্দি! আমার চারপাশে ছিল তীব্র অপমানের দাউ দাউ আগুন। মানুষের কুৎসিত অত্যাচার আর হিংসার ছোবলে আমি ছিলাম প্রায় অপ্রকৃতিস্থ দশায়।
আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করে সেই রাক্ষস ক্রূর হাসি হেসেছিল।
আমি তখনই দেখেছিলাম—একটা পরিবারের সমস্ত সদস্যই কতটা জঘন্য হতে পারে? শুধুমাত্র হিংসার বশবর্তী হলে তারা যে কাউকে জলন্ত পুড়িয়ে মারতেও প্রস্তুত ছিল!
কতটা হীন আর অসৎ হতে পারে মানুষের মনোবৃত্তি! দেখেছিলাম—আমার প্রতি, আমার গড গিফটেড সৌন্দর্যের প্রতি, আমার অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া অঢেল শ্রদ্ধা-ভালোবাসার প্রতি, আমার মেধার প্রতি, সদ্য অর্জন করা অতি সামান্য খ্যাতির প্রতি, আমার লেখক সত্তার প্রতি কী প্রচণ্ড আক্রোশ অন্যদের? কী পরিমাণ এনভিয়াস তারা? আর কতটা হিংস্র? কতটাই নিষ্ঠুর?
ওইরকম প্রচণ্ড অপমান-অত্যাচার-অসুস্থতার মাঝে বসবাস করে কী করে আর কারো সাথে যোগাযোগের বাসনা জাগে? কী করেই বা কারো লেখবার স্পৃহা জাগে? আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করে সেই রাক্ষস ক্রূর হাসি হেসেছিল—
এইবার, তুই মর কলঙ্কিনী! মরা ছাড়া তোর জন্য আমি আর কোনো পথ খোলা রাখি নাই।
আদতে তা ছিল ওই রাক্ষসের কৌশলে পাতা ফাঁদ বা গ্যাসলাইটিং। নিজের পূর্বাপর সমস্ত অপকর্মকে ধামাচাপা দেবার জন্য আমাকে অপরাধী বানানোর ফাঁদ—যাতে করে সে নিজের পথটা সহজেই পরিষ্কার করতে পারে। পথের জঞ্জাল সরিয়ে দিয়ে নিজের গোপন অচরিতার্থ বাসনাকে পূর্ণতা দিতে পারে।
আমি ছিলাম সেই রাজা—যে সামান্য অন্যমনস্কতায় ভুলে পথে গিয়ে অন্যপক্ষের মন্ত্রী আর ঘোড়ার চালে নাজেহাল। রাজার মুভমেণ্টের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে অন্যপক্ষের বিকৃত-আনন্দ-উল্লাস ছিল তখন দেখার মতো! আর চাতুরীর চেকে-ধরা-খাওয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় রাজার দশা তখন আমার! যাকে কিনা তৎক্ষণাৎ পতনের স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। যে পতন ছিল মৃত্যুর চাইতেও ভয়াবহ!