প্রতিশোধ

অন্তু তার গোপন পরিকল্পনাটা নিয়ে ভাবছিল। আজ চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি। অফিসের মেয়েরা যে যার মতো সেজে অফিসে এসেছে। কেউ হলুদ শাড়ি পরেছে। আবার কেউ হলুদ থ্রিপিস পরেছে। সঙ্গে লাল ওড়না। অন্তুর আজকের দিনটি নিয়ে তেমন একটা উচ্ছ্বাস নেই। তাই সে অন্যান্য দিনের মতো স্যুট টাই পরে অফিসে এসেছে। সে বসে বসে ভাবছিল আর অফিসের কাজ করছিল। এমন সময় পায়েল তার কামড়ায় ঢুকল। হাতে দুটি লাল গোলাপ আর একটা ছোট বক্স। পায়েল তার সহকর্মী। বছর খানেক হলো চাকরিতে ঢুকেছে। এখনো ছাত্রী ছাত্রী গন্ধ গায়ে রয়ে গেছে। পায়েল বলল, অন্তু ভাইয়া, আপনার জন্য। বলে একটা গোলাপ অন্তুর দিকে এগিয়ে দিল। পায়েল একটা হলুদ থ্রিপিস আর লাল ওড়না পরেছে। ওড়নাটা বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক। কপালে ছোট্ট একটা টিপ। তাকে অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছিল। সে যখন হেসে গোলাপটা অন্তুকে দিল তখন তাকে আরও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছিল। অন্তু ধন্যবাদ বলে গোলাপটা হাতে নিল। এরপর পায়েল ছোট বক্সটি খুলে অন্তুর সামনে রেখে বলল, বুটের ডালের হালুয়া। মা বানিয়েছে। খান। বলে বক্সটি অন্তুর সামনে রেখে দিল। অন্তু বলল, অনেক ধন্যবাদ। পায়েল অন্তুকে পছন্দ করে। এটা একটা ওপেন সিক্রেট। কেউ কেউ এনিয়ে হাসি ঠাট্টাও করে। কিন্তু অন্তু নির্বিকার থাকে এসব কথা উঠলে। সে পায়েলকে পছন্দ করে কিনা সেটা জানা যায় নি। তবে অপছন্দও করে না। অন্তু একটু গম্ভীর স্বভাবের। কথাবার্তা কম বলে।

ছ’টায় অফিস ছুটি হলে অন্তু নিজে ড্রাইভ করে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরে। গাড়িটি সে কিনেছে গত বছর পদোন্নতি পাওয়ার পর। অবশ্য এজন্য অফিস থেকে কিছু লোনও করতে হয়েছে। সিগারেট ধরিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে সে ভাবতে থাকে তার অনেক আগের করে রাখা পরিকল্পনার কথা। কিভাবে সেটা বাস্তবায়ন করা যায়। অবসর হলেই সে এই পরিকল্পনার কথা ভাবে। কিন্তু বাস্তবায়নের সহজ কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না। কিন্তু তাকে যে সেটা বাস্তবায়ন করতেই হবে। সেটা বাস্তবায়ন করার আগ পর্যন্ত সে স্বস্তিতে থাকতে পারবে না। শান্তিতে থাকতে পারবে না। সে নিজেকে বোঝায় ধৈর্য ধরো। সুযোগ অবশ্যই একদিন হাতের মুঠোয় চলে আসবে। সে চিন্তা করতে করতে কখন যে বাসার সামনে চলে এসেছে টেরই পায় নি। সে গাড়ি পার্ক করে লিফট দিয়ে উপরে উঠে গেল।


আমি আপনার পরিকল্পনার কথা সব জানি। মূলত আপনার আর আমাদের শত্রু অভিন্ন।


সে বাসায় ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে প্রথমেই গোসল সারে। তারপর তার মা চা বিস্কুট দিলে সে ওগুলো নিয়ে ঝুলবারান্দায় চলে যায়। ওখানে বসেই চা আর সিগারেট একসাথে খায়। চা খাওয়া শেষ হলে হয় টিভি দেখে না হয় বই পড়ে। দশটার দিকে সে যখন ভাত খেতে বসে তখন ওর মা ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। তুই আর না করিস না। অন্তু তখন ওর মাকে বলে, আহ মা, আর কটা দিন যাক না। ভাত খাওয়া শেষে আর এক কাপ চা সে খায়। এই ফ্ল্যাটে ওর মা মিসেস লিলি আর অন্তু এই দু’জনেই থাকে। ওর ছোট বোন তৃণার বিয়ে হয়ে গেছে। তৃণা মগবাজারে থাকে।

আজ ভাত খাওয়া শেষে অন্তু ওর রুমে এসে চা সিগারেট খাচ্ছে। ওর মা থালা প্লেট গুছিয়ে রেখে নিজের রুমে চলে গেছেন। মিসেস লিলি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন। আবার উঠেন ফজরের আজানের সময়। অন্তু ঠিক করেছে আজকে একটা বই পড়বে। তাই বুকসেলফ থেকে একটা বই বের করল। বইটা অনেক আগের কেনা। কিন্তু পড়া হয় নি। সে ঠিক করেছে আজকে সেই বইটা পড়া শুরু করবে। বইটা হচ্ছে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট। সে বইটা বিছানার উপর রাখল। এমন সময় তার মাথা ব্যথা শুরু হলো। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। সেই সাথে চিনচিন একটা অনবরত আওয়াজ সে শুনতে পাচ্ছে। আওয়াজটা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। ধুকপুক-ধুকপুক শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে।  একটা ভীষণ ভয়ের স্রোত তার মেরুদণ্ড বেয়ে নিচের দিকে নেমে যেতে থাকল। এখন সে শুনতে পাচ্ছে তার শিক্ষকদের কণ্ঠস্বর। স্পষ্ট। কেউ বলছে Life is a tale told by an idiot full of sound and fury signifying nothing... আরেকজন বলছে  Life is dream within dream... আরেকজন বলছে Paris opted for physical pleasure. So he gave the golden apple to Aphrodite and that is why the Trojan War took place... আরেকজন  So Anna Karenina committed suicide...

অন্তু দু’হাতে কান চেপে ধরে রাখল।  চোখে সে অন্ধকার দেখছিল। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল।  সে কোনোমতে ওয়ারড্রবে রাখা ওষুধের বাক্সটা থেকে ওষুধ বের করে একসাথে দু’টো টেবলেট খেয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পর তার হার্ট-বিট স্বাভাবিক হলো। ভয়ের ভাবটাও চলে গেল। সবকিছুই আবার আগের মতো হয়ে গেল। সে দেখল তার মোবাইলে একটা কল আসছে অপরিচিত নাম্বার থেকে। সে চিন্তা করছে কলটা রিসিভ করবে কিনা। সে একটু ভাবল। তারপর কলটা ধরে ফেলল। ওপর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠস্বর বলল, অন্তু সাহেব। আমাকে চিনবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আমি আপনার পরিকল্পনার কথা সব জানি। মূলত আপনার আর আমাদের শত্রু অভিন্ন। তাই আমি আপনাকে হেল্প করতে চাই। কাল আমার লোক আপনাকে সাক্ষাতে সব কথা বুঝিয়ে দিবে। রাখি। খোদা হাফেজ। অন্তু কোনো কথা বলল না। সে ভাবতে লাগল তার পরিকল্পনার কথা সে ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ জানে না। সে কখনো কাউকে এই বিষয়ে কিছুই বলে নি। তাহলে এই লোক জানল কিভাবে? দেখা যাক কাল কী ঘটে। এই বলে সে নিয়মিত যে ওষুধগুলো খায় সেগুলো খেয়ে শুয়ে পড়ল। আজ আর বই পড়া হলো না।

পরদিন সন্ধ্যায় অফিস ছুটি হয়েছে। অন্তু গাড়ি স্টার্ট দিতে যাবে এমন সময় বাম পাশের জানালায় কে যেন টোকা দিল। সে চেয়ে দেখে এক ভদ্রলোক তার সাথে কথা বলতে চাইছে। এটা দেখে সে দরজার গ্লাস নামাল। লোকটা বলল, গতকাল রাতে স্যারের সাথে বোধহয় আপনার কথা হয়েছে। স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি কি গাড়ির ভিতরে একটু বসতে পারি? বসে কথা বলতে অনেক সুবিধা হবে। লোকটা পরে আছে স্যুট টাই। নিখুঁতভাবে সেইভ করা। লোশন এবং ক্রিম মাখা মুখ চকচক করছে। চুল ছোট করে ছাঁটা। চেহারা গোলগাল। লোকটাকে দেখলে অনেকটা খুবই বিশ্বস্ত কুকুরের কথা মনে হয়। দরজা খুলে দিতেই একটি ব্রিফকেসসহ লোকটা অন্তুর পাশের সিটে বসল। এরপর বলল, আপনি কী করতে চান সেটা আমরা জানি। আর জানি বলেই আপনাকে আমরা হেল্প করতে চাই। অন্তু বলল, আপনারা কী জানেন? লোকটি তখন বলল, যেমন আপনি আবু তাহের সাহেবকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চান। কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে বের করতে পারছেন না। সেজন্যই আমরা আছি আপনার পাশে।

আমার পরিকল্পনার কথা আপনারা জানলেন কিভাবে?

জানি। আমরা সব জানি। এই বলে লোকটা ব্রিফকেসটা খুলে অন্তুর সামনে তুলে ধরল। ব্রিফকেসে সাইলেন্সার লাগানো একটি পিস্তল আর এক জোড়া হ্যান্ড গ্ল্যাভস আছে।

নিন । এটা আপনার জন্য।

অন্তু একটু বিস্মিত হলেও এরকম একটি জিনিস যে সে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সেকথা ভাবল। এই জিনিসটা এত সহজে হাতের নাগালে চলে আসাতে তার ভালোই লাগল। সে ব্রিফকেসটা নিয়ে পিছনের সীটে রেখে দিল।


ড্যাসবোর্ডের দরজা খুলে দেখে নিল পিস্তলটা ঠিকমতো আছে কিনা। হ্যাঁ পিস্তল ঠিকমতোই আছে।


এরপর লোকটা আবার বলল, আবু তাহের সাহেব প্রতি বৃহস্পতিবার উত্তরার এক সুন্দরী মহিলার বাসায় যায় এবং ওই রাতটা ওখানেই কাটায়। ভোরে আজান দিলে উত্তরার ওই বাসা থেকে নিজে ড্রাইভ করে বাসায় ফিরে। ড্রাইভারকে আগের দিন রাতে ছুটি দিয়ে দেয়। তাহের সাহেবের এসব কাজকর্মের কথা তার বাসার এবং অফিসের সবাই জানে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। শোনা যায় যে ওই মহিলাকে তিনি বিয়ে করতে চাচ্ছেন কিন্তু তার স্ত্রীর আপত্তি থাকার কারণে করতে পারছেন না। তার স্ত্রী তার বিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেও তাকে ওই বাসায় যাওয়া ও রাত কাটানো থেকে বিরত রাখতে পারছেন না। উনাকে ফিনিশ করার উত্তম জায়গা হচ্ছে উত্তরা। ব্রিফকেসে বাসার ঠিকানা আছে। আমি এখন চলি। একথা বলে লোকটা দরজা খুলে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে গেল।

অন্তু গাড়ি চালাচ্ছে আর ভাবছে লোকটা দেখি সব কিছুই জানে। আবু তাহের সম্পর্কে লোকটা যে তথ্য দিয়েছে তা অন্তুর সংগ্রহ করা তথ্যের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। সে একবার তাহের সাহেবের দারোয়ানকে চা খাইয়েছিল। চা খেতে খেতে দারোয়ান যে তথ্য দিয়েছিল তা হুবহু এরকমই। আসার সময় দারোয়ানের হাতে দু’শো টাকা গুঁজে দিয়ে এসেছিল অন্তু। দারোয়ান খুশি হয়েছিল। বাসা চেনার জন্য অন্তু একদিন অফিস থেকে আগে বেরিয়ে গিয়ে তাহের সাহেবের প্রাডোকে অনুসরণ করতে করতে উত্তরার বাসা পর্যন্ত গিয়েছিল। ব্রিফকেসে তাহের সাহেবের বাসার যে ঠিকানা দেয়া আছে সেটাও হুবহু একই। সেক্টর ৫ রোড নং ৬...। অন্তু ভাবে তাহলে তো পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করা যায় কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই।

কয়েকদিন পর অন্তু অফিসে বসে কাজ করছিল। এমন সময় ভয় তাকে আবার পেয়ে বসল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের স্রোত নিচের দিকে নামতে থাকল। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হলো। সে চোখে অন্ধকার দেখছিল। সে চোখ খুলতেই তার চোখ সোনালি আলোর তীব্রতায় ধাঁধিয়ে গেল। সে দেখতে পাচ্ছে দূরে সোনালি আলোর মধ্যে ক্যাম্পাসে সে মিনতি করছে শারমিনের কাছে। সে বলছে, প্লিজ শারমিন, আমাকে ছেড়ে যেও না। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তার কণ্ঠ কান্না ভেজা। চোখে জল। কিন্তু শারমিন অটল। শারমিন বলছে, সরি অন্তু। আমি আমার বাবা-মাকে কষ্ট দিতে পারব না। পারলে ক্ষমা করে দিও। এই বলে শারমিন অন্তুর হাত থেকে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল। আর চোখে জল নিয়ে অন্তু শারমিনের চলে যাওয়া পথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। অন্তু টেবিলের ড্রয়ারে রাখা তার ওষুধের পাতাটা বের করে দুটো টেবলেট পানি দিয়ে খেয়ে ফেলল। দূর থেকে আরেকটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে তার কানে। কণ্ঠস্বরটি আরও কাছে চলে এসেছে। সে এবার স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। চোখ খুলতেই দেখে পায়েল বলছে, এই অন্তু ভাইয়া। শরীর খারাপ নাকি? ঘুমুচ্ছেন? অন্তু এতক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হতে পেরেছে। সে বলল, না। ঘুমাচ্ছি না। মাথা ব্যথা করছে।

পায়েল বলল, নতুন থ্রিপিস। আমাকে কেমন লাগছে?

অন্তুর কথা বলতে ভালো লাগছিলো না। তবুও সে বলল, সুন্দর লাগছে।

থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া বলে পায়েল চলে গেল।

অন্তু রাতের খাওয়া শেষে চা সিগারেট খাচ্ছিল বিছানায় শুয়ে। সে ভাবছিল, তার জীবনে কোনো কিছুই পরিকল্পনা মাফিক ঘটে নি। সে পরিকল্পনা করেছিল এক রকম আর বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখেছে পরিস্থিতি অন্য রকম। সে তাহের সাহেবকে নিয়ে করা পরিকল্পনার কথা নিয়ে ভাবতে থাকে। সব কিছুই ঠিক আছে। কিন্তু তাহের সাহেব যে ফজরের আজান দিলে উত্তরা থেকে তার নিজের  বাসার দিকে রওয়ানা হন এটার সত্যতা যাচাই সে করতে পারে নি। কিন্তু বাকি সব তথ্য ঠিক আছে । তার যাচাই করা হয়ে গেছে। যদি অন্তু অত ভোরে গিয়ে দেখে যে তাহের সাহেব বেরুচ্ছেন না তাহলে সে কাজ না সেরেই বাড়ি ফিরবে। তার এক দিনের পরিশ্রম হয়তো জলে যাবে। কিন্তু তাতে কী? সে ঠিক করল আগামী শুক্রবার ভোরে সে ঘর থেকে বেরুবে তাহের সাহেবকে শেষ করে দেয়ার জন্য।

সে বৃহস্পতিবার অফিস ছুটি হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে বাসায় চলে এল। মাকে বলল কাল সকালে রমনা পার্কে হাঁটতে যাবে। চারটার সময় ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজতে থাকলে সে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। একটা স্পোর্টস ট্রাউজার আর একটা মোটা ফুলহাতা গেঞ্জি আর কেডস পরে সে রেডি হলো। গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। মা তখনো ঘুমাচ্ছিল । সে গাড়িতে উঠে ড্যাসবোর্ডের দরজা খুলে দেখে নিল পিস্তলটা ঠিকমতো আছে কিনা। হ্যাঁ পিস্তল ঠিকমতোই আছে। সে গ্ল্যাভস পড়ে নিল। তারপর গাড়ি চালানো শুরু করল। গাড়িটা মেইন রোডে আসতেই একটা বিল্ডিংয়ের উপর দণ্ডায়মান একটা বিজ্ঞাপনের দিকে তার চোখ গেল। সাবানের বিজ্ঞাপন। একটা রূপসী নারীর ছবি চলে গিয়ে সেখানে একটি লেখা উঠল ইংরেজিতে। লেখাটি ছিল ‘Please don’t do it.’ পর্দায় অনেকক্ষণ লেখাটি ছিল। তারপর আবার লাস্যময়ী নারীর ছবি এল। সে গাড়ি চালাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখে একটা গাড়ির পিছনে লেখা ‘Don’t do it.’ সে গাড়ি চালিয়েই যাচ্ছে। প্রগতি সরণীর কাছে চলে আসার পর একটা সিএনজির পেছনে একটা লেখার দিকে তার দৃষ্টি গেল। সিএনজির পেছনে লেখা ‘মাইরেন না’। এতগুলো এরকম লেখা দেখার পর অন্তু ভাবতে থাকে এগুলো কি তার জন্য কোনো সংকেত নাকি নিছক অর্থহীন কোনো লেখা। সে ভাবতে ভাবতে উত্তরা পৌঁছে গেল। ৫নং সেক্টরে ঢুকতে যাবে এমন সময় আরেকটা গাড়ির পিছনের লেখার দিকে ওর দৃষ্টি গেল। ওখানে লেখা ছিল ‘Bye Bye.’


অন্তু তখন তাহের সাহেবের কপাল লক্ষ করে একটা গুলি চালাল। গুলিটা কপালের বাম দিকে লাগল।


সে যখন ৬ নং রোডে ঢুকে তখন পৌনে পাঁচটা বেজে গেছে। যে বিল্ডিং থেকে তাহের সাহেব বের হবেন সে-বিল্ডিং থেকে কিছুটা দূরে একটা ইউক্যালিপটাস গাছের পাশে গাড়ি পার্ক করল অন্তু। ওখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় গেইটটা। ওই তো ছাই রঙের গেইট। অন্তু দুই ঢোক পানি খেয়ে একটা সিগারেট ধরাল। আজান দিতে এখনো পনেরো বিশ মিনিট বাকি আছে। সে রাস্তার দুপাশের বিল্ডিংগুলোকে দেখছে। কোনোটা ছয় তলা আবার কোনোটা নয় তলা। কোনো কোনো বাসায় ডিম লাইট জ্বলছে। হলুদ নীল আলোর আভা বাইরে থেকেও বোঝা যায়। কেউ কেউ ঝুলবারান্দায় ফুলের গাছ রেখেছেন। ঝুলবারান্দায় জ্বলে থাকা লাইটের আলোতে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটা বাসা থেকে মানি প্লান্ট গাছ নিচে অনেকদূর পর্যন্ত ঝুলে আছে। আজান দিয়ে দিল। সে আরেকটা সিগারেট ধরাল। অমাবস্যা বোধ হয়। তাই আকাশে চাঁদের কোনো দেখা নেই। রাস্তার বাতিগুলো না জ্বললে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকত সবখানে। আজান শেষ হয়েছে পাঁচ মিনিট হলো। এখনো তাহের সাহেবের কোনো দেখা নেই। আরও পাঁচ মিনিট গেল। সেই ছাইরঙা গেইটটা খুলে গেল। একটা নীল রঙের প্রাডো বের হলো গেইট দিয়ে। অন্তু মনে মনে বলল তার ভাগ্য আজ সুপ্রসন্ন। প্রাডোটা ধীর গতিতে চলতে থাকল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অন্তুও গাড়ি চালাতে শুরু করল প্রাডোর পিছু পিছু। কিছু দূর যাওয়ার পর অন্তু একটু জোরে গাড়িটা চালিয়ে ওটাকে ওভারটেক করতে যাবে এমন সময় সে ইচ্ছে করেই প্রাডোটাকে তার গাড়ি দিয়ে একটু ঘষা দেয়ার চেষ্টা করল। এতে করে জিপগাড়িটার বাঁপাশের লুকিং গ্লাসটা ভেঙে গেল। অন্তু গাড়ি আস্তে আস্তে চালাচ্ছে আর লুকিং গ্লাসে নজর রাখছে জিপটার দিকে। হঠাৎ জিপটা দ্রুত গতিতে চলে অন্তুর গাড়িকে ওভারটেক করে অন্তুর গাড়ির সামনে কঠিনভাবে ব্রেক কষল। অন্তুও ব্রেক করে গাড়ি থামাল। সে দেখল জিপটা থেকে তাহের সাহেব গালাগালি করতে করতে বেরিয়ে আসছে তার গাড়ির দিকে। অন্তু দরজার গ্লাস নামাল। তাহের সাহেব অন্তুর গাড়িতে কে বসে আছে সেটা দেখার জন্য জানালা দিয়ে উঁকি দিল। অন্তু তখন তাহের সাহেবের কপাল লক্ষ করে একটা গুলি চালাল। গুলিটা কপালের বাম দিকে লাগল। কোনো শব্দ হলো না। তাহের সাহেব মাটিতে পড়ে গেলেন। অন্তু তখন গাড়ির দরজাটা খুলে তাহের সাহেবের মাথা লক্ষ করে আরেকটা গুলি চালাল। এতে করে তাহের সাহেবের মগজ বেরিয়ে রাস্তায় পড়ে গেল। অন্তু ভালোভাবে খুঁজতে লাগল রক্ত বা মগজের ছিটাফোঁটা তার গাড়িতে লেগেছে কিনা। না তার গাড়িতে কোনো কিছুই লাগে নি। সে দরজা বন্ধ করে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি চলতে লাগল। সে ধীরস্থিরভাবেই গাড়ি চালাতে লাগল। কোনো রকম তাড়াহুড়ো করল না।

সে যখন জসিমুদ্দিনের কাছাকাছি চলে এসেছিল তখন সে চোখে অন্ধকার দেখছিল। প্রচণ্ড ভয় তার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। সে গাড়িটাকে একটু সাইড করে রাস্তার একপাশে থামাল। ড্যাসবোর্ডের দরজা খুলে ওষুধের পাতাটা খুঁজতে লাগল এবং পেয়েও গেল। ওখান থেকে দু’টো টেবলেট বের করে পানি দিয়ে খেয়ে ফেলল। চোখ বন্ধ করল।  চোখ খুলতেই তার চোখ উজ্জ্বল আলোয় ধাঁধিয়ে গেল। সে দেখতে পাচ্ছে আলোর মধ্যে তার মা তার বাবার গুলিবিদ্ধ লাশের পাশে বসে কাঁদছে আর বলছে, ‘ওই তাহের ওকে খুন করেছে। ওই তাহের।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তু জিজ্ঞেস করছে, ‘মা, কোন তাহের?’ তার মা কাঁদছে আর বলছে, ‘তোর বাবার পার্টনার তাহের।’ অন্তু আবার চোখ বন্ধ করল। চোখ খুলতেই আরেকটা দৃশ্য সে দেখতে পাচ্ছে উজ্জ্বল আলোর মধ্যে। অন্তুর গাড়িতে তার বন্ধু রহমানসহ বসে আছে। রহমান বলছে, ‘এই নে তোর সাইলেন্সারওয়ালা বিদেশি পিস্তল। এই নে হ্যান্ড গ্ল্যাভস’ বলে অন্তুর হাতে পিস্তলটা দিল। রহমান আরও বলল, ‘দোস্ত, খরচ একটু বেশি পড়েছে। তাই হাজার বিশেক টাকা বাড়িয়ে দিস।’ অন্তু আবার চোখ বন্ধ করে পুনরায় চোখ খুলল। এখন সে রাস্তাঘাট দেখতে পাচ্ছে। সে ভাবছে যে এখন সে গাড়ি চালাতে পারবে । তাই সে গাড়ি চালাতে শুরু করল। কিন্তু তার কানে তার শিক্ষকের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। তার শিক্ষক বলছেন, ‘evening is spread out against the sky like a patient etherized upon a table...’ তার ডাক্তারের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে, ‘আমি চাই আপনি জীবনের সমস্যা-গুলোর মুখোমুখি হোন। সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করুন।

কায়সার আহমদ

কায়সার আহমদ

জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭; ঢাকা। বিএ (সম্মান), এমএ, ইংরেজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।...বিস্তারিত