মাতাল

আপনার কি কখনো আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে? করে না? না? কিন্তু আমার করে। মনে হয় প্রাচীন রোমানদের মতো পার্টি শেষে হাতের রগ কেটে আত্মহত্যা করি। রোমানরা কেন আত্মহত্যা করত জানেন? জানেন না? ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে শাসকদের কাছ থেকে আত্মহত্যা করার নির্দেশ আসত প্রতিপক্ষের কাছে চিরকুটের মাধ্যমে। যারা নির্দেশ মানত না তাদেরকে সপরিবারে হত্যা করা হতো। তাই যারা বিচক্ষণ তারা পরিবারকে বাঁচাবার জন্য আদেশ পালন করত। রাতে বিশাল করে একটা পার্টি দিত। পার্টির শেষের দিকে অতি সন্তর্পণে গোসলখানায় ঢুকে বাথটাবে শুয়ে হাতের রগ কেটে আত্মহত্যা করত। কী নির্মম, তাই না? আপনি কি এই ‘বার’-এ প্রায়ই আসেন? আসেন না? আমি কিন্তু প্রায়ই আসি। এই যে মৃদু স্বরে গান বাজছে, হালকা আলোয় টুংটাং আওয়াজের মধ্যে লোকজনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, হঠাৎ হঠাৎ কেউ বেশি মাতাল হয়ে গিয়ে বেসামাল কথাবার্তা বলছে, এত কিছুর মধ্যে কোনার একটা টেবিলে বসে হান্ড্রেড পাইপার্স খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। ভালো লাগে বিশেষ করে এখানে ঢুকলেই অ্যালকোহলের যে মৌ মৌ ঘ্রাণটা পাই সেটা।

আপনার মাংস পরোটা তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেয়ে যান। ‘বার’-এ ঢোকার সময় দেখলাম আকাশে বিশাল একটা চাঁদ উঠেছে। আপনি দেখেছেন? লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মেয়েদের গালের মতো বিরাট গোলাকার রক্তিম চাঁদ। শহরের ঝলমলে আলোর বর্ণিল ছটায় চাঁদের ম্লান আলো মানুষের হৃদয়ের অলিতেগলিতে পৌঁছুতে পারে না। কিন্তু সারি সারি ভবন, রাশি রাশি ইমারত, বাসগৃহ, প্রেক্ষাগৃহ, এতিমখানা, জেলখানা, গণিকালয়, সচিবালয় সমস্ত কিছুর শীর্ষদেশ চাঁদের অকৃপণ আলোয় আলোকিত। শহরের মানুষ চাঁদের মতোই নিঃসঙ্গ। একাকিত্ব এই নগরের বাসিন্দাদের নিত্য সঙ্গী। নিঃসঙ্গতা আমি সইতে পারি না। তাই তো আপনার সাথে বসে এত কথা বলছি। আমার একাকিত্ব মাঝরাতের ছাইরঙা আকাশের মতো সীমাহীন। আমার একাকিত্ব গভীর সমুদ্রে দল থেকে ছিটকে পড়া বিচ্ছিন্ন তিমি শাবকের মতো অন্তহীন। আমার নিঃসঙ্গতা গোধূলিলগ্নে মায়াবী আলোকে সাথি করে ডুবন্ত সূর্যের অভিমুখে উড়ে চলা সাথিহারা শঙ্খচিল।


আজকে আমার চেয়ে দুঃখী মনে হয় পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আজ আমার পৃথিবীর আকাশে দোজখের বিভীষিকাময় আগুন।


আপনি গোল্ডলিফ সিগারেট খান? বেনসন খান না কেন? দাম বেশি এই জন্য? জানেন, এক সময় আমি স্টার সিগারেট খেতাম। খুব খেতাম। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ছাত্রাবস্থায় অত টাকা পাব কোত্থেকে যে বেনসন খাব। সিগারেট কিভাবে এল তা আমরা জানি। কিন্তু অ্যালকোহল কিভাবে এল তা কি আমরা জানি? সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে মানুষ এই পানীয় খেয়ে আসছে। আমাদের ধর্ম এই পানীয়কে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু মানুষ কি তা কখনো মেনেছে? ওমর খৈয়াম, হাফিজ এরা সবাই সরাব পান করেছে। কবি হাফিজ তো আরো এক ডিগ্রি সরস। তিনি সরাবকে ষোড়শীর চুম্বনের চেয়েও মিষ্টি বলেছেন। আপনার কয় প্যাক লাগে? চার প্যাক? আমার কিন্তু ছয় প্যাক না হলে হয় না। আজ আপনার সমস্ত বিল আমার। আপনি নিশ্চিন্তে খেয়ে যান। আপনি চাইলে আজ ছয় প্যাক খেতে পারেন। জীবনকে বেঁচে থাকতেই উপভোগ করুন। মানুষ বাঁচেইবা কয় দিন। Drink life to the lees.

আপনার সাথে আমি এত কথা বলছি তার কারণ কি জানেন? স্কুলের বইতে পড়েছিলাম এক গ্রিক দার্শনিকের কথা। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কে? উত্তরে বলেছিলেন এই মুহূর্তে তুমি যার সাথে আছ সে-ই তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কারণ এই মুহূর্তে যদি তুমি বিপদে পড় তাহলে তোমার বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কেউ তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না। কেবলমাত্র এই ক্ষণটিতে তুমি যার সান্নিধ্যে আছ সে-ই তোমার সবচেয়ে বেশি উপকার করতে পারবে। তার মতো আমিও মনে করি যেহেতু আপনি ঠিক এই সময়টিতে আমার সাথে আছেন তাই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আপনি। হাসছেন? না, হাসবেন না প্লিজ। আমি সত্যি বলছি। বিয়ে করেছেন? কী, এখনো ব্যাচেলর? আমি বিবাহিত। বিয়ে করেছিলাম আজ সাত বছর হলো। কিন্তু আজকে আমার চেয়ে দুঃখী মনে হয় পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আজ আমার পৃথিবীর আকাশে দোজখের বিভীষিকাময় আগুন। আমার এত টাকা তারপরও আমি সহায় সম্বলহীন নিঃস্ব। আমি চাঁদ-তারাবিহীন মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো শূন্য। আমি শেয়ার বাজারে শেষ পুঁজিটুকুও হারিয়ে ফেলা ব্যক্তির মতো রিক্ত।

শূন্যতা আমার ঘরে লক্ষকোটি কণ্ঠস্বর একত্রিত করে বিদ্রূপের অট্টহাসিতে তছনছ করে দেয় আমার প্রশান্তির নৈশব্দকে। রিক্ততা উন্মত্ত ক্যানেস্তারা বাজায় আমার জলছায়া নীড়ে। আমার হৃদয় আজ পায়ে হাঁটা পথে মাড়িয়ে দেয়া হলুদ বিবর্ণ ঘাস। সেখানেই নেই কোনো উত্তাপ। নেই কোনো আনন্দের বর্ণিল স্ফুলিঙ্গ। আমি আশাবাদী হতে চেষ্টা করি। কিন্তু হতাশার বিস্তীর্ণ ধু-ধু বালুচরে আশারা মরীচিকা হয়ে প্রতারণার প্রতিলিপি আঁকে। আমার দুঃখগুলোকে আমি ডুবিয়ে দেই মদের গ্লাসে, ভাসিয়ে দেই খরস্রোতা নদীর ঘোলা জলে, উড়িয়ে দেই কালবৈশাখীর উলঙ্গ বাতাসের উন্মত্ত হাওয়ায়। আমি আমার কষ্টগুলোকে জ্বালিয়ে দিতে চাই, পুড়িয়ে দিতে চাই, ছারখার করে দিতে চাই যেমন করে শত্রু সৈন্যরা নিশ্চিহ্ন করে দেয় কোনো সমৃদ্ধ শহর। কিন্তু দুঃখরা ফিরে আসে। কষ্টরা লেগে থাকে নাছোড়বান্দা আঠার মতো অস্তিত্বের চৌকাঠে। আমি ঘুমাতে পারি না। ঘুমাতে গেলে সহস্র কণ্ঠস্বর একসাথে চিৎকার করে উঠে আমার করোটির ভেতর। দাঁড়ান, দাঁড়ান একটা সিগারেট ধরিয়ে নেই। মুখের ভিতর ধোঁয়া না থাকলে অ্যালকোহলের স্বাদ পাওয়া যায় না। এভাবে সিগারেট খেতে খেতে মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে কথা বলতে আমার ভালো লাগে।

ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছিলাম। সেটা একটা গল্পই বটে। প্রথম যেদিন ওকে দেখি সেদিন থেকেই ওকে ভালো লেগে গিয়েছিল। সে আমার সহপাঠিনী ছিল। নাম জেরিন। অপরূপা সুন্দরী ছিল না। তবে সুশ্রী বলা যাবে। সে হাসলে ভালো লাগত। কথা বললে ভালো লাগত। রেগে গেলেও ভালো লাগত। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত ওর নাকের ডগার উপর বসে থাকা ছোট্ট তিলটা। হ্যাঁ, ওর নাকের ঠিক মাথায় একটা ছোট্ট তিল ছিল। ভালোবাসি। কিন্তু কথাটা বলা হয়ে ওঠে নি। তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। এদিকে কাসেম নামে আমার আরেক সহপাঠীও ওর প্রেমে পড়েছিল। সেও তার ভালোবাসার কথা তখনও জানায় নি। শিক্ষা সফরে কক্সবাজার যাব ঠিক হলো। কাসেমের জন্ডিস ধরা পড়ায় সে শিক্ষা সফরে যেতে পারল না। সে যেতে না পারায় আমার ভালোই লাগল। কারণ আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে ওখানে গিয়ে জেরিনকে আমার ভালোবাসার কথা জানাব।

নির্দিষ্ট দিনে আমরা বাসে করে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। দিন কেটে গেল গান শুনে, গান গেয়ে, হৈহুল্লোড় করতে করতে। জেরিন বসে ছিল ওর বান্ধবীর পাশে। আমি দ্রুত অপস্রিয়মাণ প্রাকৃতিক দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখি। তারপর জেরিনকে দেখি। পথে যাত্রা বিরতি দিয়ে আমাদের বাস যখন হোটেলে পৌঁছুল তখন রাত আটটা বেজে গেছে। আমারা রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজ নিজ কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম নিলাম। গল্প-গুজব করে রাত বারোটা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে নাস্তা সেরে অনেকে ছুটল সমুদ্রে স্নান করবে বলে। আমার ওখানে স্নান করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তবু বারোটার দিকে জামা-কাপড় পরে চিন্তা করলাম সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটব। এই ফাঁকে যদি জেরিনকে একা পেয়ে যাই। কিন্তু ওকে একা পেলাম না। সে সাগরে স্নান সেরে বান্ধবীদের সাথে হোটেলে ফিরে গেছে। তাই আমি সাগরের বাতাসে কিছুক্ষণ বেড়িয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিজের কক্ষে ফিরলাম। বিকেলে আবার বেরুলাম। শীতকাল বলে গরম জামা গায়ে থাকার পরও ঠান্ডা বাতাস তার শীতল হাত চোখে-মুখে বুলিয়ে দিচ্ছিল। হিমেল বাতাসে চুল উড়ছিল। বিকেলের ম্লান আলো খুনসুটি করছিল সাগরের জলের সাথে। আকাশ মেঘমুক্ত ছিল বলে তার সর্বত্রই নীল বং ছড়ানো রয়েছে। যেন শিল্পীর প্রিয় নীল রঙে আঁকা আকাশ। বিশাল গোলাকার সূর্যটা ক্রমান্বয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করছিল।

সমুদ্রের স্রোত পাড়ে এসে আছড়ে পড়ে আবার ফিরে ফিরে যাচ্ছিল সাগরের বুকে। তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীরা সাগরের নোনা জলে শরীর ভেজাচ্ছিল। তীরে মানুষেরা কেউবা হাঁটছিল, কেউবা সারি করে বিছানো চেয়ারে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। আমার চোখ খুঁজে ফিরছিল জেরিনকে। হঠাৎ বেশ কিছুটা দূরে যেখানে লোক সমাগম তেমন একটা নেই এমন একটি স্থানে ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সে একাই ছিল। মনটা খুশিতে ভরে গেল। আমি হেঁটে হেঁটে ওর কাছে গেলাম। সে-অস্তাচলগামী সূর্যটার দিকে তাকিয়ে ছিল। সূর্যের গোলাপি আলোয় ওর ফর্সা মুখটাকে মায়াবী করে তুলছিল। আমি কাছে গিয়ে বললাম, ‘তোমাকে কিছু কথা বলব। শোনার সময় হবে?’ সে বলল, ‘আমি জানি তুমি কী বলতে চাও। একটা মেয়ে একটা ছেলের চোখ দেখেই বলে দিতে পারে ছেলেটা কী চায়।’ আমি বললাম, ‘আমার সাথে হাঁটবে কিছুক্ষণ?’ সে বলল, ‘কেন নয়?


আজ আমার পাঁচটি ফ্ল্যাট, গাড়ি এবং ব্যাংকে অনেক টাকা। কিন্তু থাকলে কী হবে, জেরিন আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে।


আমরা হাঁটলাম বেশ কিছুক্ষণ। আমি তার হাত ধরলাম। সে বাঁধা দিল না। তারপর বিরাট সূর্যটা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে গেলে সন্ধ্যা নেমে এল। আমরা ছাইরঙা সন্ধ্যায় আরো কিছুক্ষণ হাঁটলাম। কিন্তু দুজনেই কোনো কথা বললাম না। আমি তার মুখের অভিব্যক্তি পাঠ করে পেয়ে গিয়েছিলাম আমার উত্তর। সেই থেকে একসাথে পথ চলা। বিশ্ববিদ্যালয় থাকে বের হওয়ার পর বেকার অবস্থাতেই আমরা বিয়ে করে ফেললাম। বিয়ে করার পর টাকা রোজগারের চিন্তা মাথায় এল। ভাবলাম চাকরি করব না। ব্যবসা করব। টাকার জোগাড় করতে হবে। তাই মায়ের কাছ থেকে কিছু নিলাম। কারণ বাবা গত হয়েছেন সেই আমি যখন কলেজে পড়ি তখন। সংসার চালাত আমেরিকা প্রবাসী ভাইয়া। তার কাছ থেকেও কিছু নিলাম। এভাবে পাঁচ লাখ টাকার ব্যবস্থা করে আমার এক বন্ধুর সাথে ইলেকট্রনিক্সের খুচরা যন্ত্রাংশ আনতে চীনে গেলাম। তার পরামর্শে মাল কিনে তাকেই বিক্রির ব্যবস্থা করতে বললাম। মাল তার কাছেই রাখলাম। কিন্তু সে বলা শুরু করে দিল মালের দাম পড়ে গেছে। অল্প দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কিছুদিন পর অল্প কিছু টাকা দিয়ে আর টাকা দেয় না।

এভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লাখ খানেক টাকা ফেরত পেলাম। তারপর সে বলল আর টাকা দিতে পারবে না। মাল বিক্রি করে ওই টাকাই পাওয়া গেছে। বুঝতে পারলাম যে আমি টাকাটা হারিয়ে ফেলেছি। ওর সাথে জোরে পারব না। তাই ওকে আর কিছু বললাম না। এরপর আমি গ্রামের বাড়িতে আমার অংশের যে জমিটুকু ছিল সেটা বিক্রি করে দিলাম। বড় আপার কাছ থেকেও কিছু নিলাম। এভাবে দশ লাখ টাকা জোগাড় করে এবার একাই চীনে গিয়ে মাল আনলাম। নিজের বাসায় মাল রেখে ক্রেতাদের কাছে নিজেই মাল বিক্রি করতে লাগলাম। কিন্তু বেশিভাগ মাল বাকিতে দিতে হলো। আস্তে আস্তে টাকা উঠতে লাগল। কিন্তু টাকা বেশ কিছু লাভসহ ফেরত এল। তিন মাস পর আবার চীনে গিয়ে মাল এনে বিক্রি করে দিলাম। এভাবে লাভ হতে থাকল। সেই থেকে শুরু। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। আজ আমার পাঁচটি ফ্ল্যাট, গাড়ি এবং ব্যাংকে অনেক টাকা। কিন্তু থাকলে কী হবে, জেরিন আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে।

সে তিন মাস আগে আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে। জানেন, আমাদের ছেলেটা যখন হলো বিয়ের দুবছর পর তখন নিজেকে মনে হতো বিল গেটস-এর চেয়েও ধনী আর গৌতম বুদ্ধের চেয়েও সুখী। সে কাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে জানেন? সেই কাসেমকে। সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আমেরিকা চলে যায়। ওখানে সে এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে। তিন বছর পর ওদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমি কখনোই জানতাম না যে জেরিন কাসেমের সাথে যোগাযোগ রাখছে। কিন্তু ওদের যোগাযোগ ছিল। আমার বিরুদ্ধে জেরিনের অভিযোগ ছিল এই যে, আমি ওকে সময় দেই না, ওকে মূল্যায়ন করি না, ওকে অবহেলা করি। আরো অভিযোগ ছিল যে, আমি মদ্যপ, আমি মেয়ে-মানুষ নিয়ে বিদেশে ফুর্তি করে বেড়াই। ক্রেতা পেতে গেলে, ক্রেতাকে খুশি করতে গেলে সে যদি মদ খায় তাহলে আপনাকেও তার সাথে বসে মদ খেতে হবে। আমিও তো সারাদিনই ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকি। তো কিভাবে জেরিনকে দিনে পাঁচবার ফোন করা সম্ভব? আর মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তি করাটা ওর একটা মিথ্যে সন্দেহ। বিশ্বাস করুন আমি বিদেশে যাই ঠিকই কিন্তু কখনো অন্য কোনো মেয়ে মানুষ ছুঁয়েও দেখি না।

একটা লেখায় পড়েছিলাম। এক চীনা লেখক লিখছেন পতিতা, রক্ষিতা আর স্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য। পতিতা হলো পাবলিক টয়লেটের মতো। পরিবেশ নোংরা এবং যে কেউ ব্যবহার করতে পারে। রক্ষিতা হলো ব্যক্তিগত টয়লেটের মতো। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং কেবলমাত্র আপনি অথবা আপনার অনুমতি নিয়ে অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবে। আর স্ত্রী কোনো টয়লেট নয়। সে আপনার অর্ধাঙ্গিনী। এই লেখকের লেখা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি। আমি মদ খেয়ে ঘরে ফিরলেই জেরিন প্রায়ই আমার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিত। বছরখানেক আগে একদিন রাতে আমি বাসায় ফিরেছি এমন সময় সে আমার সাথে রাগারাগি শুরু করে দিল। এক পর্যায়ে আমাকে বলল মাতাল, মদ্যপ, চরিত্রহীন, লম্পট। সেদিন আমার যে কী হলো। আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। আমি ওকে কষে দুটো চড় দিয়ে দিলাম। পরদিন সে আমার চার বছরের ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেল। আমি অনেক চেষ্টা করেছি ওকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু কিছুতেই ফিরে এল না। তিন মাস আগে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল।

আগামীকাল সে কাসেমকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। এখন আমার কাছে জীবনটা তো তিক্ত স্বাদযুক্ত মনে হচ্ছে। ওটা থেকে দুঃসহ দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। বেঁচে থাকাটা মনে হচ্ছে অর্থহীন। কোনো তাৎপর্য নেই এর। আমি বাঁচব কী নিয়ে? কার জন্যে? আপনিই বলুন আমি কেনো বাঁচব? বলুন না। প্লিজ, বলুন না। জীবনটাকে ঊষর ভূমির মতো মনে হচ্ছে। জানেন, আজকাল সকালে ঘুম ভাঙলেই মনে হয় মা আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন। পরক্ষণেই মনে হয় মা তো নেই। মা তো মারা গেছে দুবছর আগে। আপনি উঠবেন? আমিও উঠব। দাঁড়ান বিলটা চুকিয়ে নেই। আপনি চাইলে আপনাকে আমার গাড়ি করে আপনার বাসায় পৌঁছে দিতে পারি। লাগবে না? ঠিক আছে। খোদা হাফেজ। গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। আমার পছন্দের গানটাও চালিয়ে দিল। Owmer of a lonely heart। অনেক পুরনো গান। কিন্তু মদ খেয়ে বাসায় ফেরার সময় ইদানীং এই গানটা শুনতে আমার খুবই ভালো লাগে।


অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই মাথায় এল না। আমার মাথায় অসীম শূন্যতা ছাড়া আর কিছু ছিল না।


রাস্তায় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, বেগুনি আলো দেখতে পাচ্ছি। আর কিচ্ছু না। জানালা খুলে দিতেই গাড়ির হর্ন, রিকশার টুংটাং, সংগীতের সুর সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। কখন যে বাসার কাছে এসে গেছি তা বলতে পারব না। ড্রাইভার লিফটে আমার সাথে সাথে এসে আমার কাছ থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বিদায় নিল। আমি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে গিয়ে জামা কাপড় বদল করলাম। তারপর পর পর দুটো সিগারেট খেয়ে একটা ব্লেড নিয়ে গোসলখানায় ঢুকলাম। বাথটাবে শুয়ে পড়লাম। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই মাথায় এল না। আমার মাথায় অসীম শূন্যতা ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমি মোড়কটা ছিঁড়ে ব্লেডটা বের করলাম। বাঁ হাতের কব্জির একটু নিচে একপাশ থেকে আরেকপাশ চিড়ে ফেললাম। কোনো ব্যথা অনুভূত হলো না। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।

হাত থেকে গলগল করে রক্ত বেরুতে লাগল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। বেহুঁশের মতো শুয়ে রইলাম। এভাবে কতক্ষণ পার হলো আমি জানি না। হঠাৎ মায়ের গলার আওয়াজে হুঁশ ফিরল। দেখি বাথটাবের পাশে মা দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে বলছেন, ‘ছি! এসব কী করছিস? শিগগির উঠে আয়।’ আমি মায়ের কথা অমান্য করতে পারলাম না। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাথটাব থেকে উঠে মায়ের সাথে সাথে বাথরুম থেকে বেরুলাম। দরজা দিয়ে বের হবার পর আমি পিছন ফিরে একবার চাইলাম। দেখি আমি রক্তাক্ত অবস্থায় বাথটাবে শুয়ে আছি। মা-কে অনুসরণ করে আমি শোবার ঘরে ঢুকলাম। মা বললেন, ‘এক টুকরা কাপড় দিয়ে হাতটা শক্ত করে বেঁধে ফেল।’ আমি আলমিরা থেকে ব্যান্ডেজ বের করে শক্ত করে আমার কাটা অংশটা বেঁধে ফেললাম। তারপর মা দরজা দিয়ে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

কায়সার আহমদ

কায়সার আহমদ

জন্ম ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭; ঢাকা। বিএ (সম্মান), এমএ, ইংরেজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।...বিস্তারিত