শঙ্খের মৌন তর্জনী ছুঁয়ে

কলকাতায় 'অল ইন্ডিয়া লীগ ফর রেভোলিউশনারি কালচারে’র বিশাল মিছিল ও জনসভায় উপস্থিত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বহু বিশিষ্ট খ্যাতনামা লেখক কবি ও শিল্পীরা। ওই সাংস্কৃতিক সমাবেশ উপলক্ষ্যে 'সংহতি' পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার জন্য ছবি এঁকে দিয়েছেন 'আদ্যিকালের শিল্পী' দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। সেই সমাবেশ আর মিছিলে  গিয়েছেন মা আর বাবা। আমি অবশ্য মাসিমার বাড়িতে। মা ফিরে এসে বললেন নানা গল্প, সমাবেশের প্রচারপত্র হাতে পেয়ে পড়লাম। সে কি আর বোঝার মতো বয়স তখন! তবু এসব পড়তে ভালোই লাগে।


তুমি যে শঙ্খবাবুকে তোমাদের কবি ভাবছ, এটা কিন্তু ঠিক নয়। উনি সরকারি বামেদের দেওয়া সুবিধা বেশ উপভোগ করেন।


কলকাতায় জরুরি অবস্থার পর এই অভূতপূর্ব প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সমাবেশের খবর বের হলো কাগজে। প্রচারপত্রে যারা সই করেছেন এবং সভায় হাজির থেকেছেন, তাঁদের কয়েকজনের নাম কাগজে ছাপা হয়েছে। তাঁরা হলেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, পরেশ ধর, কে জি কান্নাবীরাণ, ভারভারা রাও, মহাশ্বেতা দেবী, শঙ্খ ঘোষ।

তারপর থেকে বহু প্রতিবাদপত্রেই শঙ্খ ঘোষ, এই নামটি পাচ্ছি। মনের ভেতর ছবি তৈরি হচ্ছে এই কবির। আমার বোধ ও বুদ্ধি অনুযায়ী তাঁর কবিতা সেভাবে না পড়েও বুঝতে পারছি এই গুটিকয় নামের ভেতর এই শঙ্খ কবিটিও এক অনন্য স্বর।

বাবার কোনো বন্ধু বাবার কাছে রেখে গিয়েছিলেন কিছু কীটদষ্ট বই। তার মধ্যে পেলাম 'বাবরের প্রার্থনা' আর 'ধুম লেগেছে হৃৎকমলে'। সেই প্রথম, দুটি কীটপাঠ্য কবিতার বই দিয়ে আমার শঙ্খযাত্রা শুরু হলো। কিছুদিন পর হাতে এল চেরাবান্দারাজুর কবিতার অনুবাদ, 'ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলোয়ার'।

আমার একজন বন্ধু-মাস্টার ছিল। সামান্য সিনিয়র। আমাকে ইংরেজি পড়াত। কবিতা লিখত, খ্যাত কবিদের বাড়িতে তার হাজিরাও ছিল নিয়মিত। শিল্প আর প্রতিবাদের সখ্য নিয়ে তার মৃদু আপত্তি ছিল। প্রাসঙ্গিক তর্কে একদিন সে বলল, তুমি যে শঙ্খবাবুকে তোমাদের কবি ভাবছ, এটা কিন্তু ঠিক নয়। উনি সরকারি বামেদের দেওয়া সুবিধা বেশ উপভোগ করেন। কিছু উদাহরণ ছিল তার হাতে। পুরস্কার কমিটি পদ ইত্যাদির অতিকথা ও কথন। কাঁচা আমি, কিছুটা ম্রিয়মাণ হলাম বইকি। যদিও তর্ক করে বললাম, এই দেখো, বিহারের উচ্চবর্ণের ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে যে আট বিদ্রোহী কৃষক নেতার ফাঁসির আদেশ দিয়েছে বিহার সরকার, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ফাঁসি রদ চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন যে বিশিষ্টরা তাদের মধ্যে শঙ্খবাবুও আছেন। দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর 'অন্ধবিলাপ' কবিতাটির উল্লেখ করে তাকে বলার চেষ্টা করলাম, তুমি ভ্রান্ত।


মহামিছিলের পুরোভাগে তাঁকে পাওয়া গেল, তাঁর তথাকথিত বাম বন্ধুদের বিরুদ্ধে রাস্তায়।


তারপর বহুদিন কেটে গেছে। আমি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছি কবিতার সত্য আসলে যেমন ক্ষমতার সখ্য নয়, তেমনই দলীয় সত্যও নয়। এই উপলব্ধি ক্রমশ জমে উঠছে আমার অজান্তেই। কবি যেমন শাসকের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন 'পেটের কাছে উঁচিয়ে আছ ছুরি/ কাজেই এখন স্বাধীন মতো ঘুরি'। এবং যাদের পছন্দ করেছেন, ভরসা করেছেন, যারা স্বাধীনতার অর্থ বদলে দেবে, তাদের ভেতর ভাঙন ও সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে শ্লেষোক্তি করে বলেছেন এসো 'বন্ধুরা মাতি তরজায়', তাই 'পিছনদিকে এগিয়ে চলুন'।

আমার বন্ধু শিক্ষক ভুল প্রমাণিত হলো আরেকবার। নন্দীগ্রামে গণহত্যার পর তিনি লিখলেন, 'আমি তো আমার শপথ রেখেছি অক্ষরে অক্ষরে/ যারা প্রতিবাদী তাদের জীবন দিয়েছি নরক করে'। আয়োজিত মহামিছিলের পুরোভাগে তাঁকে পাওয়া গেল, তাঁর তথাকথিত বাম বন্ধুদের বিরুদ্ধে রাস্তায়। আমি তাঁর নেতৃত্বে হাঁটলাম দলহীন বিবেকের প্রথম মিছিলে।

পরিবর্তনের পর অনেক পদ তৈরি হলো, কমিটিতে কমিটিতে এল অনেক মুখ। গতিশীলদের প্রকাশ্য ও চোরা যোগাযোগ তৈরি হলো ক্ষমতার সাথে। কিন্তু তিনি সবিনয়ে সরে থাকলেন। ক্ষমতার সঙ্গে কবির ধ্রুব বিরোধ, এটা জানিয়ে স্পষ্ট করে লিখলেন নতুন সরকারের উন্নয়নও রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস শতবর্ষ অনুষ্ঠান হলো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহু মিছিলে তাঁর সঙ্গে, পাশাপাশি হেঁটেছি কিন্তু সরাসরি, মুখোমুখি এই প্রথম দেখা। আমার অকিঞ্চিৎকর কাব্যগ্রন্থ এই মৃগয়া এই মানচিত্র তাঁর হাতে তুলে দিতে পারলাম। তিনি নিলেন। প্রণামের অভ্যেস নেই, তাই সেদিন প্রণাম না করে হাত স্পর্শ করলাম। কিন্তু স্পর্শের আনন্দ, পুলক কিছুদিন পর ম্লান হয়ে গেল। তাঁকে ফোন করব কি করব না, এই দ্বিধা কাটিয়ে একদিন বুথ থেকে দূরভাষে সরাসরি পেলাম তাঁরই জলদকণ্ঠ। জিজ্ঞাসা করলাম আমার স্বভাবকে সজোরে অতিক্রম করে। তিনি বললেন, 'আমার কিছু বলার নেই'। আমার এক কবিবন্ধু সঙ্গে ছিলেন, শুনে খুব মর্মাহত হলেন। তীব্র ভাষায় নিন্দাই করলেন তাঁকে। আহত আমিও, তবু তাঁকে বোঝালাম। কতজন তাঁকে বিরক্ত করে, কত কবি দুই বাংলায়, তাঁর কাছে আসে। তাঁর পক্ষে কী করে সম্ভব সবকিছুরই প্রতিক্রিয়া জানানো!


শুনেছি, কেউ কেউ আমার কবিতা, অনুবাদ নাকি তাঁকে পড়ে শুনিয়েছেন। তিনি তাঁর ভালোলাগাও জানিয়েছেন।


তাঁর বাড়ি কখনও যাওয়া হয় নি আগে। কবিদের দরবারে যাওয়া আমার বড়ো একটা হয় না। তবু শঙ্খবাবু আলাদা। অন্তত একবার তো যেতেই হয়। তিনটে কবিতা লিখেছি তাঁকে উৎসর্গ করে, তাঁর হাতে দেওয়া দরকার। গেলাম। তাঁকে দিতে তিনি পড়লেন মনোযোগ দিয়ে। তারপর রেখে দিলেন সযত্নে। কথা বললেন, যেন কত দিনের চেনা। যদিও তাঁর কথা সহজে বোঝা যায় না। গলায় একটা সমস্যা। মাইক লাগে। তাও স্পষ্ট হয় না তেমন। তবু তাঁর সহজ রসিকতা বুঝতে চেষ্টা করি। উঠে আসবার সময় জোর করে বসান। চা মিষ্টি না খেয়ে তাঁর বাড়ি থেকে যাওয়ার উপায় নেই। অভিমান কোথায় খসে পড়ে!

পরে দু-একজনের কাছে শুনেছি, কেউ কেউ আমার কবিতা, অনুবাদ নাকি তাঁকে পড়ে শুনিয়েছেন। তিনি তাঁর ভালোলাগাও জানিয়েছেন। আমার নামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে। এসবের সত্যমিথ্যা জানা নেই। কবি সব্যসাচী দেব, কমলেশ চৌধুরী বলতে পারবেন।

আসলে তিনি সবাইকে ভালোবাসতেন, সবার কবিতাই ছুঁয়ে দেখতেন, তেমনই হয়তো আমাকেও...  আমি তো তেমন কেউ নই। আকাদেমিক নই, তেমন কোনো যোগাযোগও নেই আমার। যৎসামান্য শব্দকারিগর। অল্প পথখরচেই দিন চলে যায়। শুধু আমার আক্ষেপ এই তাঁকে আমার সর্বশেষ বইটি দেওয়া হলো না। যদিও শঙ্খের মৌন তর্জনীটুকুই আমার অভিপ্রায়। এর বেশি কী-ই বা চাওয়ার!

আমরা ততটা দেখে খুশি থাকি যতটুকু দেখে এ সময় তার বেশি নয়। ভালোবাসা শেখায় গণিত সে শুধু বিশ্বাস করে অবিশ্বাস ছাড়া কিছু নেই সকলেরই মাঝখানে বসে খুব অনায়াসে সকলকে গ্রাস করা চলে—

...মনে পড়ে অলৌকিক তারারা জমেছে কোণে কোণে বাজনা উঠেছে বেজে— কে কোথায় শোনে বা না-শোনে— সত্য আর মিথ্যা এসে বিবাহে বসেছে একাসনে আকাশপাতালজোড়া ঘরে। [জলই পাষাণ হয়ে আছে

মৃন্ময় চক্রবর্তী

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :...বিস্তারিত