নরকের সহস্র তোরণ : ১৭

পর্ব-১৬

পর্ব-১৭

প্রাণের শেকড়-বাকড়

দুনিয়াটা লতা-পাতায় জড়ানো। হালাল-হারামে, জ্ঞানে-অজ্ঞানে, শোকে-দুঃখে, কামে-ক্রোধে, আবেগ-অভিমানে তোমাকে সে-আবহমান কাল থেকে জড়িয়ে রেখেছে। তোমার চাওয়া না-চাওয়ায় সংসারের কী আসে-যায়? অনেক গভীর থেকে প্রাণের সহস্র শেকড়-বাকড় তোমাকে টেনেছিল, টানছে, টানবেই। স্রষ্টা তার সৃষ্টিকে পৃথিবী নামক পরীক্ষাগারে পাঠাবার আগে ভালোবেসে নিজের অধিকাংশ সিফতগুলো দিয়ে ফেলেছিলেন। ঠিক বিদায়ের মুহূর্তে কিছুটা আবেগের বশেই নিজের নূর দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন মানুষের মুখটা। তাই বোধ করি ইতর-লম্পট হোক, খুনি-ডাকাত হোক মানুষের মুখের দিকে তাকালে এখনো কোনো কোনো মানুষ আর্দ্র হয়ে ওঠেন। তাই কিছু কিছু ভালোবাসা অবশিষ্ট আছে আমাদের এইসব মৃত নদীগুলোর পাঁজরে।

এইসব ভাবতে ভাবতে কনকের চোখ ছলছল করে ওঠে। পশ্চিমে ডুবু ডুবু সূর্যের নরম মুখ। অফিস থেকে ব্যাগ কাঁধে এক জন-দুই জন করে বেরিয়ে যাচ্ছে। আজ বিষুদবার। সবাই যার যার জীবনের শেকড় বেয়ে বেয়ে চলে যাবে প্রাণের গভীরে। তাকে আসতে দেখে শিশুপুত্র বাড়ির দেউড়ি থেকে ছুটে আসবে, আব্বা আইতাছে...।

কোলের ছোট্ট মেয়েটা মায়ের কোল থেকেই বাপের দিকে হাত বাড়াবে। ছোট বোন ছুটে এসে ভাইয়ের হাতের ভারী ব্যাগটা টেনে নিবে। ঘরে ভালো রান্না হবে। লোকটা মা-বোনের হাতের পান-পিঠা খাবে। হাসবে। রাতে বউকে নিয়ে বিছানায় তুমুল লড়াই দিবে। কামে-ঘামে-শ্বাসে কমদামি দুর্বল খাটটা মড়মড় করে ডেকে উঠলে বউ ফিসফিস করে তৃপ্ত গলায় বলবে, আস্তে!


কনক আবার ছেলেটার দিকে তাকায়, আমার লগে আপনে না গেলে আগামী বিষুদবারে আব্বা-আম্মা আপনেরে নিতে আইব।


এইসব ধানমন্ডির লেকের ধারের প্রেম নয়। বাঙালির শাশ্বত জীবন। কঠিন বৃত্তে দাঁড়িয়ে এইসব দেখতে দেখতে কনক মাঝে মাঝে লোভী হয়ে ওঠে। আজ বিষুদবারের বিকাল। আজকেও তো তাই ঘটবে। তাই ব্যালকনিতে না গিয়ে কনক ভারী একটা শ্বাস ফেলে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে দুতলায় নিজের রুমে চলে আসে। সেই দুর্ঘটনার পর থেকে কে যেন তার বুকে একটা গুগুল সার্চ ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছে। এখন যেদিকেই তার চোখ পড়ে এক নজরে অনেক কিছু দেখে ফেলে।

ময়নাটা বনে ছিল। গাছে গাছে বেশ সুখেই ছিল। মানুষের শখ হলো ময়নার কথা শুনবে। কলে-কৌশলে তাকে খাঁচায় বন্দি করা হলো। পছন্দের খাবার একটা একটা করে সামনে রেখে হাতে তুরি মেরে কথা শিখানো হলো। এখন বুনো ময়নার মুখে নিজের বুলি শুনে আমোদে গদগদ। তাকে তোমার মতো করে তোলা চাই! তাই খাঁচাটা কোলে নিয়ে দিন-রাত শেখাশিখির অন্ত নাই। বেচারারও তো একটু দম চাই। সে তোমার কোলেই হেগে দিলে তুমি কী তার গলা টেনে ছিঁড়ে ফেলা?

স্যার?

কনক চমকে ওঠে চোখ খোলে। দিনে দিনে সে কেমন বদলে যাচ্ছে! আজকাল একটু একা হলেই নিজে নিজে কথা বলতে শুরু করে! তাই কনক হকচকিয়ে বিছানায় উঠে বসে, অহ্... তুমি!

নাম তার লাবিব। বিশ-বাইশ বছর বয়স। কনকদের অফিসের পিয়ন। তাদের সাথেই নিচে, গেটের সামনের রুমটায় থাকে। তাদের সাথে ফ্রি খায়। সেই সুবাদে চা-টা-পানটা এই জাতীয় ফুট-ফরমায়েশ করে দেয়। তাই সবাই যার যার বাড়ির পথে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাকে বেরুতে হয়। কী বিধি, কী বাসনা খোদা কা মুলুম! সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি যাবার আগে লাবিব কনকের কাছে বিদায় নিতে আসে। ছোট ভাইয়ের মতো কপাটের পাশে এসে ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়ায়, স্যার আমি যাইগ্যা?

চলে যাচ্ছ?

কনক ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। স্যার একটা কতা কৈতাম?

কও।

আব্বা-আম্মা কৈছে আপনে আমার লগে আমগর বাড়িত যাইতাইন।

কনক মুচকি হাসে। তোমাকে ধন্যবাদ। সম্ভব না।

ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই থাকে। তার গায়ের টি-শার্টের বুকে চে-গুয়েভারার ভাসা ভাসা দরদি চোখ। কনক সামনের জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। চরের শেষে বিকালের নরম আলো ঝলমল করছে। তার যে আজকাল কী হয়েছে! দাড়ি কাটতে ইচ্ছা করে না, মন দিয়ে খাবারের স্বাদ নিতে নিতে পেট ভরে খেতে ইচ্ছা করে না। কোনোরকম দুই মুঠ খেয়েই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। চারপাশ দিয়ে কীসব কলকল করে চলে যাচ্ছে! তার দেখা হলো না, ধরা হলো না!

কনক আবার ছেলেটার দিকে তাকায়, আমার লগে আপনে না গেলে আগামী বিষুদবারে আব্বা-আম্মা আপনেরে নিতে আইব।

বিকারে-বিগারে ক্ষয়ে যাওয়া পৃথিবীর পাঁজর থেকে হঠাৎ উঠে আসে এক মুঠো ফুলের ঘ্রাণ! সে চমকে ওঠে, আমার বিষয়ে তাদেরকে তুমি কী বলছ?

আমি কী কইতাম। এই দেশের সবেই ত জানে সন্দ্বীপে আপনের বাড়ি আছিন। সাগরের জলোচ্ছ্বাসে আপনের পরিবারের সবাইরে ভাসায়া নিছে।


টুপি মাথায় বুড়ো মানুষটা হাত চেটে, পাত চেটে ঢকঢক করে এক গেলাস পানি খায়।


কনক হাসে। ছুটিছাটা, ঈদ-পরবে বাড়ি যায় না। দুনিয়ার কোথাও থেকে একটা ফোন আসে না। সব-ই তো মানুষ দেখে, বোঝে। তাই একা একা নিরিবিলি থাকার জন্য, দুঃখের আগুনে পোড়া মাটিতে মুখ গোঁজে বেঁচে থাকার জন্য, জীবিকার দায়ে প্রত্যেকের একটা কাহিনি লাগে। তাই কনক নিজের জন্যও একটা গল্প বানিয়েছিল। এখন এইটাই তার নিঃসঙ্গ-কঠিন জীবনের রসালো আবরণ। যে-ই শুনে কম-বেশি আবেগ তাড়িত হয়। করুণায় লতা-পাতা ধরে টান মারতে চায়!

কনক ছোট্ট একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, যাব কিন্তু এইবারই শেষ। আর যদি কোনোদিন কোমরে কাছি বেঁধেও টান তবু যাব না।

ছেলেটা হাসি হাসি মুখ করে বলে, ঠিক আছে স্যার।

তাহলে চল।

কনক বিছানা থেকে উঠে পড়ে।

ব্যাগ নিবেন না স্যার?

না। আমার এক কাপড়েই চলে। শুধু এই লুঙ্গি-গামছাটা তোমার ব্যাগে ভরে লও।

পেস্ট-ব্রাশ?

নিম-নিশিন্দার ঢাল হলেও চলবে। তোমাদের গ্রামে আছে না?

কত!

প্রথমে বাস। তারপর সিএনজি। ঘণ্টাখানেক পরে হাঁটা পথ। হাঁটতে হাঁটতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার লালিম আভায় দুনিয়াটা ঘন হয়ে আসে। আনন্দে কনকের কোনো ক্লান্তি ছিল না। চরের বালুপথে কত গ্রাম, কত মানুষ, হলুদ ফুলে ভরা ঝিঙেমাচায়, বেগুন ক্ষেতে, ঘরের চালের লাউশাকের ডগায় ডগায় কত খুশি, কত স্বপ্ন দুলছে। সন্ধ্যায় বাড়ি বাড়ি বিদ্যুতের বাতি জ্বলে ওঠে। পথে পথে সিমেন্টের খামের মাথায় মাথায় তেত্রিশ হাজার ভোল্টেজের উন্নয়নশীল বাংলাদেশ।

তারা যেতেই লাবিবদের বাড়িতে কলরব, ফিসফিসানি, হেই মানুষটা আইছে গ! যার বাপ-মা, ভাই-বোন, ঘর-সংসার এক টানে সমুদ্দুর তার পেডের ভিত্তে লইয়া গ্যাছিনগ্যা!

ভালা আছুইন বাজান?

মাথায় ময়লা টুপি, কাঁধে গামছা বুড়ো মানুষটা কনকের পিঠে হাত রাখে, আমার সাতটা পুত এই ভিটায় যুদিন ভাত খাইতারে, তে আফনেও খাইবাইন বাজান, আফনেও আমার পুত।

‘যার আল্লা আছে, তার সব আছে।’ আসছালামাইলকুম...।

এক ঘোর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কনক চেয়ে দেখে, ঠোঁটের উপর মোচড়ানো গোঁফ, কানঢাকা মস্ত বাবরি, আমোদে, আনন্দে লোকটার চোখ দুইটা জ্বলছে, আমি লাবিবের বড় ভাই। বাজানের কতা পরে হুনবাইন অহন আরাম কৈরা বিছনাত বইন। সুমাইয়া কৈরে... সুমাইয়া... স্যারের লাইগগ্যা এক বদনা পানি লইয়া।

ঢিলাঢালা পালাজ্জু-কামিজের পুঁতির দানার উপর বিদ্যুতের বাতির ঝলকানি তুলে এগিয়ে আসে সে। লকলকে শরীরের রোগা রোগা হাতে প্লাটিকের বদনা ভরা পানি। দশজনকে লুকানো হাসিটা লাজুক লাজুক হাঁটার তালে পানিভরা বদনার মুখ থেকে উপচে পড়ে।

আঙুলের মাথার মতো ছোট ছোট লাল রঙের দেশি জামআলু দিয়ে নিজের ঘরের ডিমওয়ালা মুরগি। ঘরের মেঝে চাইটাই বিছিয়ে সবাই ঝালে হাহ্-হু করে পেট ভরে ভাত খায়, আলাপ করে, হাসে। টুপি মাথায় বুড়ো মানুষটা হাত চেটে, পাত চেটে ঢকঢক করে এক গেলাস পানি খায়। তারপর কাঁধের গামছার কোনা দিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে ঢেকুর দিয়ে তৃপ্ত গলায় বলে, আলহামদুলিল্লাহ! খোদা তোমার কাছে হাজার শুকরিয়া।


পাষাণে পাষাণে বুক ভরতি, মন ভরতি কত কথার আনাগোনা! ইচ্ছা করে এইসব টুকে টুকে হাসন-লালনের মতো গান বাঁধতে।


খুব সামন্য পেয়েও মানুষ যে কত সুখী হতে পারে, শান্তিতে তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে গত চার বছরের জীবনে সে বহুবার দেখেছে। তবু আজ আবেগে কনকের চোখে প্রায় পানি এসে গেছিল তাই সে তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে উঠে পড়ে।

ঘুমাবার সময় ঘরের কোনায় তেলতেলা বাঁশের লাঠি, বালিশের নিচে তিন হাত লম্বা রামদা দেখে কনক অবাক হয়, এইসব কেন?

লাবিব হাসে, এম্মি এম্মি। বাবরিচুইল্যা আমার বড় ভাইরে দ্যাখছুইন্যা? হাতের কাছে এইসব না থাকলে তার নাকি ভালা ঘুম অয় না।

তোমরা কী খুব খুনাখুনি করো?

না।

ছেলেটা হাসে, আগে খুব চুরি-ডাকাতি হইত, মারামারি হইত। অহন সবাই ইস্কুল-কলেজে যায়, সরকারি-বেসরকারি চাকরি করে। ঘরে ঘরে বিদেশি আছে। যারা গরিব-দরিব, অশিক্ষিত সব ধোইয়া-পুইচ্ছ্যা গার্মেন্টে গ্যাছেগ্যা। বাড়ি বাড়ি দলান হইছে, পেটে ভাত আছে, বিদ্যুতের মটর দ্যায়া পাত্তালের পানি তুইল্যা খায়, গোসল করে। ত্যাও আগের অভ্যাসে এইসব রইয়া গ্যাছে।

কনক আর শুনে না। পাশ ফিরে। লাবিব রুমের লাইট নিভিয়ে চলে যায়। বুক চিরে শ্বাস পড়ে, চোখের সামনে ঝিক্ করে ভেসে ওঠে দুনিয়াদারির বালাখানা। কনক মনে মনে কাতরে উঠে, মা মা রে...।

এই যে কনক মা, মা রে বলে কাতরে উঠল এইটা কোনো নারীর মুখ মনে করে নয়। সে এখন মা বলতে বুঝায় মাটির এই সংসারকে।

পাষাণে পাষাণে বুক ভরতি, মন ভরতি কত কথার আনাগোনা! ইচ্ছা করে এইসব টুকে টুকে হাসন-লালনের মতো গান বাঁধতে। কনকের শিথানে-পৈথানে খোলা জানালা। রাতভর খোলাই থাকে। বাইরে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। মাঠের দিক থেকে লিল্লিড় করে বাতাস আসছে। বাতাসে ভাত-ছালুনের গন্ধ, পুকুরের পানির গন্ধ, গাছ-গাছালি, লতা-পাতার হরেক রকম সুবাস। সব ছাড়িয়ে দূরের অন্ধকার থেকে, বহু দূরের তারার বুক থেকে এইদিকে মিটিমিটি আলো আসিতেছে।


পরবর্তী পর্ব আগামী শুক্রবার
শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা