জয়নগরের চাঁদ 

ইতিহাস

এদিক-ওদিক বেড়াতে গেলে রাজাদের বাড়ি দেখা যায়। দেখা যায়, দেয়ালে টাঙানো আছে ঢাল-তলোয়ার শ্যামচাঁদ, হরিণের শিং, বাঘের হাঁও কিছু কম নয়। এখনও রাজারা আছে। প্রজাদের কোনো খোঁজ নেই। রোদের চাবুক খেতে নদীর ভেতর মাঝেমাঝে পাথরেরা পিঠ উঁচু করে।

আলোয় গন্ধপোকা

ছুঁয়েছে আঙুল এসে, ঘাস নয় রাত, রেখাহীন পার্থেনিয়াম ফুলে টুনি জ্বালে জোনাকির আলো, সন্ধ্যাতারার টিপ আলেয়ার মতো যেন চেনা। আলোকবর্ষ দাগে একপাল হাঁস এইবার উড়ে যাবে, পালকের ক্ষতমুখে ছেঁড়াছুটো দেনা ফেলে যাবে চুপিসারে, জানবে না বাতাসগহিন; আলোয় গন্ধপোকা ছুটে এসে আঁধার জাগাল।

বসন্ত মালাই

আর তো কটা মাত্র দিন তারপর মালাই বরফ কাঁধে বসন্ত আসবে ফুলের হাওয়া নিয়ে ঘুরবে মাতাল দুপুর। শুকিয়ে যাওয়া মাঠের ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে শালিকের নতুন শাবক বেনারসি পেয়ারার ডালে। মাঠের আকাশে এখন একটা মেঘ চাঁদকে মুখোশ পরিয়েছে আর আমি বেমালুম ভুলে গেছি জ্যোৎস্নার শয়তানি।

এমন বেলাটি পেলে

মাঠের ভেতরে আজ কেউ নেই আর শুধু এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে দিন গাছের ডাল ধরে বাতাসের ছেলেপুলে হুটোপুটি খেলছে নদীটাও কেমন তিরতির কাঁপাচ্ছে সোনারুপো জল। অফুরন্ত এমন বেলাটি পেলে আর কী চাই গো আমার! শহুরে কাকের মতো উড়ে আসব মাঠের আসরে নীরস খেজুর গাছে দেখা দেবে রস ধানের গুচ্ছে গুচ্ছে বাজাব নবান্নের গাঢ় সংকীর্তন।

জয়নগরের চাঁদ

শিবনাথ শাস্ত্রীর পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে দেখি আকাশের ঠোঙা খুলে বেরিয়ে এসেছে জয়নগরের মোয়া। আহা চাঁদ, আজ আর আহ্লাদ নেই, ফোন নেই কে আর গাল পেতে বাতাস খ্যাপায়! বহড়ু পেরিয়ে গেছি ভুলে শক্তির কুয়োতলা-বাড়ির দুয়োর আলোহীন। ঝিক ঝিক ট্রেন চলে কুড়ুলে কুয়াশা মাঠ ফুঁড়ে তোমাকে ছুঁতে চেয়ে ফিরে গেছি আহত, বারান্দায়। এখন মজিলপুর, কনকচূড়ের সাথে নলেনের সুবল মিলন আর স্বাদ।

অন্ধকার, স্তব

অন্ধকারের খাদে ঝাঁপ দিল, মরণ খামার দীর্ঘ ঘৃণার পথে সীমান্ত পড়ে আছে, আর বুকের ভেতরে শুধু পোড়াবার প্রণয়বাগান, শুধু ছাই একাই প্রমাণ দাও প্রণম্য স্বদেশ তুমি, ভিখিরি আমার এসো হে বিশ্বাস ছুরির মতন জুটে যাই।

জাতক

এবাঁকে ওবাঁকে দিকনির্দেশ পড়তে পড়তে নেমে পড়লাম মাঠে এখানে ভোলা গিরির মঠ হয়েছে একখানা চারপাশে ছিন্নমূল লোকজন যেন তিরিশ বছর আগেকার। পুকুরে চরছে হাঁস, বাঁশগাছে হাওয়া ঢুকেছে ফাল্গুনের মাঠে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে কয়েকটি কিশোর, আমিও ওহে, শুনতে পাচ্ছ? তিরিশ বছর পেরিয়ে এসেছি মুখোমুখি! মাঠের ঝমঝম কুয়াশার ভেতর লাজুক সন্ধ্যা নামছে শিরীষ গাছের ডালে আটকে আছে চাঁদের কুঠার।
মৃন্ময় চক্রবর্তী

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :...বিস্তারিত