পর্ব-৩৪
যেন কয়েক জন্ম ধরে আমি পত্রশূন্য এক বৃক্ষের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার শাখেপত্রে কোনো সবুজের চিহ্ন মাত্র নাই। মোটকথা দেহে কোনো আচ্ছাদন-ই নাই। ছাল-বাকলহীন এক মৃত-প্রাণ! মাথার ওপর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ চৌপাশ অন্ধকারে ভরে দিয়ে তেমনি ঝুলে রইল। আমি প্রায় ভুলতে বসলাম লেখার মতো অনির্বচনীয় আনন্দের একটা জগৎ আমার ছিল। আমি লিখতে ভালোবাসতাম, পড়তে ভালোবাসতাম। নতুন বইয়ের স্তূপের মাঝে আনন্দিত মনে ঘুমিয়ে পড়ার দিনগুলিও আমার কাছে ক্রমশ ফিকে হয়ে যেতে লাগল। ফলত অপঠিত বইগুলির উপর দিনের পর দিন জমতে লাগল ধুলার আস্তরণ। আনকোরা বইগুলির নাম-সাকিন ধুলায় ধুলাকার হয়ে আমার দৃষ্টির বাইরে লুকিয়ে পড়ল। বড় সাধ করে কেনা কলমগুলির কালি শুকিয়ে যেতে লাগল। আমার লেখবার জন্য বিশেষ ধরনের রাইটিং প্যাডের পাতাগুলি [যে প্যাডগুলি বিশেষ ধরনের কাগজ কিনে ফরমাইশ দিয়ে বানাতাম বাদামি হতে হতে গাঢ়-হলুদ বর্ণ ধারণ করল। কাগজগুলি প্রাচীন হতে হতে এমন হলো যে, পাতা উল্টালেই সব ছাতু হয়ে হাওয়ায় ভাসতে লাগল।
মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার মাশুল এভাবে দিতে হবে, আমি তা কস্মিনকালেও ভাবি নি।
জীবনের সমস্ত যুদ্ধেই আমি যেন হেরে গিয়েছি। পরাজিত সৈনিকের বিষাদ ও অপমান অবয়বে স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। আর আমার পিঠের চামড়ায় চড়ক পূজার মন্ত্রপূত বড়শির আংটা তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ হয়ে আছে। সেই বড়শির দড়ি ঝুলন্ত আমাকে চারপাশে ক্রমাগত চক্কর খাওয়াচ্ছে। মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার মাশুল এভাবে দিতে হবে, আমি তা কস্মিনকালেও ভাবি নি। ভাবলে হয়তো আগেভাগেই সামান্য হলেও প্রতিরোধে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারতাম বা কিছুটা সামলে উঠতে পারতাম। আমি কোনোদিনই নিজেকে ভালোবেসে বা ভালোবাসবার মতোও সঞ্চয়ে কিছুই রাখি নি। এক্ষণে বোকামির দণ্ড আমাকে পেতেই হচ্ছে, হবে।
মনস্তাপ জুড়াব বা কোথাও গিয়ে দুদণ্ড শান্তি করব, সেরকম কোনো জিরোবার স্থানও আমার ছিল না। আমি কই বা কার কাছেই-বা যাব? কে বুঝবে আমার এই টালমাটাল অবস্থা? আমি কাকেই বা বুঝাতে পারব আমার অবস্থা কতটা সঙিন? আমার জন্য পেতে রাখা ফাঁদে আমি যে ধরাশায়ী—এই সত্যটা বোঝার মতো লোকই বা আমার কই? এবং এই ফাঁদ যে পেতেছে, সে ভয়ানক কৌশলী, চতুর আর মিথ্যেবাদী। সে জানে, তার পাতা এই ফাঁদ শুধুমাত্র তার নিজের প্রতিশোধের আগুনকে উস্কে দেবার জন্যেই। পথের কাঁটাকে কৌশলে সরিয়ে দিয়ে, নিজের স্বার্থকে পরিপূর্ণ করতে আটঘাট বেঁধেই সাজানো হয়েছে এতসব নাটক। আপদ আপসে বিদায় করার লক্ষ্যেই এত ঘনঘোর অপমানের অবতারণা।
যারা নিয়মিত বাসায় আসত—আড্ডা দিতে, আসত—মৌজ-মাস্তি করে খাওয়াদাওয়া করতে, তাদের সকলেই যেন সহসা কর্পূরের মতো উবে গেল। তাদের আর টিকিটিও আমি দেখতে পেলাম না। এতকাল ‘বন্ধু’ ‘বন্ধু’ বলে চিৎকার করে যারা গলায় রক্ত জমিয়ে ফেলেছে, সেসব বন্ধুদের দেখাও আমি আর পেলাম না!
আহা! সে এক নতুনদিন বটে! নতুন অভিজ্ঞতায় পর্যুদস্ত এক জীবন! মা হয়ে গেল বনের বায়ৈ, ভ্রাতা হইল বসন্তের-কোকিল আর বন্ধুরা সব পরিযায়ী পাখির মতো উলটা পথে উড়ে গেল। তারা নিজেদের নীড়ে ফিরল কি ফিরল-না সে-সংবাদও আমার নিকটে এল না!
আমার আত্মবিশ্বাসের সমস্ত শেকড়বাকড় উপরে নেয়া হলো। শ্বশুরকুলের করা অপমানগুলি স্মরণ হলে আজও আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। মাথার ভেতর অগণন জোনাকির জ্বলা-নেভা টের পাই। ফের পৃথিবীর সমস্ত গরল একচুমুকে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে! এত ক্ষুদ্র, এত জঘন্য আর হিংস্র কী করে হতে পারে মানুষ? কী করে কেউ পারে নিজের পাপকে সিদ্ধি দেয়ার জন্য অন্যকে এভাবে অপমান করতে?
অন্ধকার গুহাতে বন্দি করে রেখে রেখে আমাকে পঙ্গু করে দেয়া হলো। আমি হাঁটতে ভুলে গেলাম। কথা বলতেও ভুলে গেলাম। ফোন রিসিভ করতে গেলে আমার হাত আড়ষ্ট হয়ে উঠত। কথা বলতে গেলে জিভ জড়িয়ে যেত। আলো দেখলে ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। সারাক্ষণই মনে হতো কোনো হিংস্র বাজপাখি হয়তো আমাকে এর চাইতেও অধিক কোনো অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দেবে!
একটা মাত্র বই প্রকাশিত হয়েছে, এরই মাঝে টিভিতে ডাকছেন আমায়! আপনারা তো আমাকে নষ্ট করে ফেলবেন।
এরকম সঙিন অবস্থা থেকে আমি কী করে ধীরে ধীরে সেরে উঠেছিলাম, কীভাবেই-বা পরিত্রাণ জুটেছিল আমার—সেসব একান্ত-আপনকথা অন্য কোথাও বলা যাবে। একেবারে ব্যক্তিগত ক্রন্দন, ব্যক্তিগত মর্সিয়া, অলৌকিক অথচ অব্যক্ত-আনন্দরাজি বা মধুর-ক্ষণগুলির কথা অন্য কোনো পথের বাঁকে বা নদীতীরের মাটি-কাদায় বা সমুদ্দুরের বেলাভূমির বালিয়াড়িতে লিখে যাওয়ার অভীস্পা রইল। নিজের জীবন-মৌচাকের কিঞ্চিৎ মধুর-মধু সঞ্চয়ে তুলে রাখলাম। আরও কিছু তীব্র-বিষ পুনরায় মিলিলে তখন না হয় এই অমৃতের সাথে মিলিয়েমিশিয়ে বলা যাবে।
আমি হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম । পুনরায় নতুন করে হাঁটতে শিখলাম। হাত বাড়িয়ে নাগালের মাঝে থাকা কিছু গল্পের কম্পাইলেশনও করে ফেললাম। ফের সংকোচ, ফের বরাভয়ের আশায় তাকিয়ে থাকা। ফের লজ্জা আর ভয়ে এতটুকুন হয়ে থাকা, আমি একটা বই প্রকাশ করতে চাই—একথা কাকে বলব? কাকে বললে সে আমার বিন্দুমাত্র অমর্যাদা না-করেও বইটা প্রকাশের সকল বন্দোবস্ত করে দেবে? [লেখালেখির শুরু থেকেই তো আমার সেই প্রস্তরের চাইতেও শক্ত গোঁ—প্রকাশককে গুচ্ছের টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে কিছুতেই আমি বই করব না! কস্মিনকালেও না, মরে গেলেও না। ইহজীবনে আমার সমস্ত বই অপ্রকাশিত থেকে গেলেও না !
কথাসাহিত্যিক মনি হায়দারের সাথে তখন আমার কিভাবে যেন বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। মনির সরলতাকে আমি পছন্দ করেছি। মনির প্রাণখোলা হো-হো হাসিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। মনির মনের চোরাকুঠুরিতে যে বেশ কিছু দুর্লভ-মণিমাণিক্যের ভাণ্ডার রয়েছে, আমি সেসবও আবিষ্কার করছি। হিমালয়ের মতো বুকে চেপে থাকা আমার অসহ-দিনগুলির কথাও আমি সামান্য সামান্য করে মনিকে বলতে শুরু করেছি। মনি নির্বিকার থেকে সেসব শ্রবণ করছে, কিন্তু পাল্টা কোনো প্রশ্ন আমাকে করছে না। আমার ক্ষতস্থানকে আরও খানিকটা গভীর করে তোলার বা আমার এইরকম নাজুক মনোবৈকল্যর মাঝে নোনাজল হয়ে ঢুকে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে না! সর্বোপরি মনির আচরণে কিরকম যেন প্রশ্রয় না আশ্রয় কী যেন একটা আছে—ধরা মুশকিল! তবুও তাকে ‘আপন’ না ভাবলেও ‘পর’ ভাবা যায় না কিছুতেই। এবং মনির অকপটতাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। তাছাড়া অন্য পুরুষদের মতো গায়ে-পড়ে ‘কৃষ্ণ সাজার’ ছ্যাবলামিটুকুও নেই তার। এসব কারণে মনি আমার ‘সখা’ না হয়ে অনেকটাই যেন ‘সখী’ হয়ে উঠল। নির্ভার অথচ আনন্দমুখর এক বন্ধুত্ব তৈরি হলো মনির সাথে। [যা আজও বিদ্যমান।
যদিও মনি হায়দারের সাথে আমার শুরুটা একেবারে নির্ভেজাল-শুভ্র-সুবাসিত ছিল না। বরং বলা যায়, শুরুটা ছিল কিছুটা খটনটে, মনি দেখেছিল আমার ঘাড়-বাঁকানো-গোঁয়ারতুমি । আমার প্রথম উপন্যাস পোড়ানদীর স্বপ্নপুরাণ প্রকাশের পর মনি বেশ ভালো একটা অফার নিয়ে আমার কাছে এসেছিল। বলতে ভুলে গিয়েছি, মনি কিন্তু সত্যিই অনেক গুণের আধার, অনেক কাজের কাজি। লেখালেখির পাশাপাশি সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানও করে থাকে টিভির চ্যানেলগুলিতে ও বিটিভিতেও। মনির অফার ছিল, আমি যেন আমার এই উপন্যাসটা নিয়ে তার অনুষ্ঠানে কথা বলতে যাই। আমি সবিনয়ে মনির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম—দেখুন, এখনও আমি সাহিত্যের অ আ ক খ পর্যন্তও শিখতে পারি নি। সদ্য একটা মাত্র বই প্রকাশিত হয়েছে, এরই মাঝে টিভিতে ডাকছেন আমায়! আপনারা তো আমাকে নষ্ট করে ফেলবেন। আমি অত্যন্ত ভালো বোধ করতাম, যদি মফস্বল কোনো শহরে বসে চুপি চুপি লেখালেখির কাজটা আমি করে যেতে পারতাম। কিন্তু সেটা তো আর কিছুতেই সম্ভব নয়। কিছুতেই হওয়ার যো নাই!
মনি হয়তো মনে মনে অবাকই হয়েছিল। এই শো-বিজের আমলে আমি কিনা এতবড় গাধা, যে কিনা পর্দার-হাতছানি, পর্দার-জৌলুস এড়িয়ে চলছি! পরবর্তীতে অবশ্য মনির স্কোপ এসেছিল আমার কথা ফিরিয়ে দেবার। যখন আমি বয়ন উপন্যাসটি লিখেছি আর হরেদরে টিভি চ্যানেলগুলিতে ইন্টারভিউ দিয়ে চলেছি বা টকশোতে অ্যাটেন্ড করছি! মনি তখন মিছরির ছুরি মেরে বলেছিল—কই গেল আপনার সেই অতি ভালোমানুষি? [মনে মনে হয়তো বলেছে আহা রে! ভাবধরা ভালোমানুষি! আহারে কতই-না নটাংকি! এখন যে কত কত অনুষ্ঠানে কথা বলে বেড়াচ্ছেন!
অষ্টরম্ভা গল্পগ্রন্থটি আমি হাসনাত ভাইকে ডেডিকেট করেছিলাম।
প্রথম দিকে খটনটে বাধিয়ে, মনির অনুষ্ঠানে না-যাওয়া আমিই একদিন জগতের সবচাইতে লজ্জার, সঙ্কোচের আর বিব্রতকর কথাটিই ভরসা করে মনিকে বলে ফেললাম।
‘মনি, আমি একটা গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করতে চাই‘।
মনি তৎক্ষণাৎ সায় দিয়ে বলেছিল—
‘নিশ্চয়ই, আমিই তোমাকে প্রকাশকের কাছে নিয়ে যাব। তুমি একদম চিন্তা কোরো না, পাপড়ি।’
এবং দিন কয়েক বাদে সে আমাকে ঠিকই বাংলাবাজারে নিয়ে গেল। শুধু নিয়েই গেল না, অত্যন্ত ভদ্র ও সজ্জন এক প্রকাশকের সঙ্গে পরিচয় করিয়েও দিল।
আমি আমার পাণ্ডুলিপি ‘মনন’ প্রকাশের কর্ণধার মামুন ভাইয়ের কাছে দিয়ে এলাম।
মনি হায়দারের সহযোগিতার কারণে, দুই হাজার এক সালে দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থের প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে দুই হাজার সাত সালে প্রকাশিত হলো আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থ অষ্টরম্ভা। আমি যেভাবে চেয়েছি, প্রকাশক মামুন ভাই সেভাবেই আমার বইটা করে দিয়েছিলেন। ওই বইয়ের প্রতিটা গল্পই ছিল আমার অত্যন্ত পছন্দের গল্প।
আমি তখন সম্পাদক আবুল হাসনাতের জন্য কিছু একটা করবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। কারণ তাঁর কাছে আমার পাহাড়-সমান ঋণের বোঝা। অবশ্য আমার মতো নগণ্য মানুষ, হাসনাত ভাইয়ের মতো মহৎ মানুষকে কীই-বা দিতে পারে? তবুও আমি বহুবার ভেবেছি—আমার কাছে আমার যা সবচাইতে মূল্যবান, সেটাই হাসনাত ভাইকে দেয়া উচিত।
অষ্টরম্ভা গল্পগ্রন্থটি আমি হাসনাত ভাইকে ডেডিকেট করেছিলাম। একজন সামান্য লেখকের সামান্য গ্রন্থের সামান্য ডেডিকেশনে অমন বড়মানুষকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া হলো—এরকম ভাবাও বাতুলতা। এবং মনের ভুলেও আমি কিন্তু তেমনটি ভাবি নি।
Who is the happy Warrior? Who is he? That every man in arms should to be? Who, if he rise to station of command, Rises by open means; and there will stand On honourable terms, or else retire, And in himself possesses his own desire; [William Wordswoth