মুসলমানের ছেলে ◘
নামাজে দাঁড়ালেই আমার কেবল মনে পড়ে ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ এই ছোট সুরাটা—এমন ছোট সুরা যে আর নাই তেমনও তো না—কিন্তু প্রথম রাকাতেই আমার কেন সবসময় মনে পড়ে তাকে—আমার তো কত সুরাই মুখস্থ—যেমন সুরা বাকারার প্রথম পঁচিশ আয়াত অথবা সেপারার সবগুলো সুরা—অথচ সেসব মনে পড়ে না কিছুতেই—যেমন একজন ক্লান্ত ভ্যানঅলার মনে পড়ে পানি, হাওয়ায় দুলে ওঠা ফুটিখেতের সবুজ ধূসরতা পার হয়ে একটা নির্জন পাখির মনে পড়ে যায় ঘর—তেমন—তবে কি আমি সারাক্ষণই ঘোষণা করতে চাই—আল্লাহ এক—?
যেমন কড়ই গাছের কাঁপা কাঁপা ছায়া পেরিয়ে আমি তোমার দিকেই যেতে চাই শুধু—তোমাকে লেখার পর যেন কিছুই আর বাকি থাকে না—
খালি তোমার দিকেই ফুল হয়ে ফোটে বেহেশতে আমার কৃষ্ণচূড়ার বন—
ধারদেনা ◘
যে ওয়াক্তেই নামাজে দাঁড়াই না কেন, কত যে কিছু মনে পড়ে তার ইয়ত্তা নাই—এই যেমন গত দুই মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি, বাড়িঅলার সামনে পড়লে কী বলব তাকে! মেঘনার ঢলের মতো আমার সামনে ঝুরঝুর করে বাড়তে থাকে নানান প্রশ্ন—আমার বাড়িঅলা বেশ সজ্জন লোকই বলা যায়—কিন্তু আমি তো ঋণী—সেজদায় কেবল মনে পড়ে কতদিন হলো বাড়িঅলার থেকে পালিয়ে বেড়াই আমি—! অথচ আল্লা গো তোমার কাছেও আমার কত ঋণ কত ধারদেনা মাছের অজস্র ডিমের মতো জমে আছে আমি সেসবের কথা বেমালুম ভুলে যাই—নামাজে দাঁড়ালে তোমাকে দেখার বদলে কেবল দেখতে থাকি কোথায় আমার কত ধার-দেনা-বাকি—
আল্লা গো, তোমার থেকে পালানোর কোনো কায়দাই শিখি নাই আমি—
গার্মেন্টস ফেরত মেয়েটা ◘
যে মেয়েটা রোজ রোজ রাত করে গার্মেন্টস থেকে ফিরে আসে বাড়ি, দুইটা পুরুষের ঠান্ডা চোখ দেখে আঁতকে ওঠে সে, ভাবে আর কেউ না থাকুক তার দুই কাঁধে দুই ফেরেশতা তো আছে মাবুদের রহমতে—যখন পুরুষের থাবা কামড়ে ধরে তাকে, মেঘনার ঢেউয়ের মতো তার শরীর ক্ষোভে উথলে ওঠে আর চিৎকার করে মেয়েটা বলে ওঠে, ‘আল্লা গো, আমাকে হেফাজত করার পরিবর্তে তোমার ফেরেশতা দু-জন এখনো ব্যস্ত আছে আমার পাপ-পুণ্যের হিসাব রাখার জন্যে—’
এই দৃশ্যের দূরে একটা গাছ গুমরে গুমরে কাঁপে প্রাণী হয়েও মেয়েটাকে বাঁচাতে পারে না বলে—
পপিফুলের বন ◘
আমার শ্বশুরের সাথে দেখা হলে গ্রামের একজন ইমাম প্রায়ই জিজ্ঞাসা করেন, ‘মেয়ে-জামাই কি নামাজ কালাম কিছু পড়ে? তার উপর শুনেছি জামাই নাকি কবি! কবিরা তো একটু অন্য কিসিমের হয়, আল্লা-রসুল আর আখেরাতের কোনো খবরই রাখে না তারা’—
আমার শ্বশুর কী জবাব দিয়েছেন আমি জানি না—এইসব শোনার পর, আল্লা গো, আমার খালি মনে হয় মসজিদের মাইকে তুমি আর ডাকো না যেন কতদিন, তার বদলে কোনো না কোনো হুজুর আমাকে নামাজে ডাকছে পাঁচবার—যেন নামাজে গেলে আমি তোমার দিকে যাই না বরং পাঁচ ওয়াক্ত হাজিরা দিই ইমাম সাহেবের কাছে ভালো হব বলে! যেন আমার সমস্ত ইবাদত ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে মহল্লার ইমামের চোখে—আল্লা গো, আমি কি আতাবনের মধ্যে ঢুকে একা একা খুঁজব না হরিণের সান্দ্র ডাক? আমি কবি বলে তুমিও কি নাখোশ মাবুদ! আমার সমস্ত ফুল তো তোমার পানেই বুলবুল করে ফুটে ওঠে পাখিজমা সন্ধ্যায়—আমাকে খোঁচা দিয়ে জুমার দিনে তোমার খতিব সেই আয়াতটাই বলে যা তুমি বলেছিলে কবিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে—আমি তো উদ্ভ্রান্ত নই খোদা শুধু তোমার কালামের মতো লিখতে চাই ছোট ছোট আনারের দানা—
আল্লা গো, এইসব মুসল্লি আর ইমামের থেকে আমাকে নিয়ে যাও নদীঝরা পথে যেন ওয়াইল দোজখের মধ্যে আমিও রুয়ে দিতে পারি সারামাঠ দুলে ওঠা পপিফুলের বন—
মেটাফর ◘
সেদিন এক গম্ভীর হুজুর আমাকে বললেন—‘এই যে আপনি কবিতা লেখেন, আপনি কি জানেন কবিতা লেখা মূলত শয়তানের কাজ—কারণ কবিরা যা বলে তা করে না, খালি মিথ্যা কল্পনা আর নারীদেহ নিয়ে কী সব প্রলাপ লেখে—আপনি জানতাম মাঝে মধ্যে নামাজ কালামও পড়েন কিন্তু সে-নামাজ দিয়ে কী হয়! যত ফায়েশা কথা আর মাতালের মতন বকে যান অহেতুক সব—’
আমি কোনো উত্তর দিই না—আল্লা গো, কী আর বলতে পারি আমি! এইসব উপমা ও মেটাফর, ভাষার দারুণ বাঁক সবই তো তোমার দান—আমার নিজের থেকে আমি কি পারি কিছু বলো—! সেই হুজুরের মতন তুমিও কি রেগে যাও যখন কবিতায় বলি ‘আমার সাফা ও মারওয়ার মধ্যে ফুটে আছে মাইল মাইল কৃষ্ণচূড়ার বন’—তোমার বান্দা আমি হয়তো সেজদায় ভুল করে অন্য দোয়া পড়ি, হয়তো ঈদের নামাজে রুকু থেকে তাকবির না দিয়ে সোজা চলে যাই সেজদায়—আমার পাশের মুসল্লির মতো তুমিও কি হেসে ফেল—আমি তো কবিতা লিখি মাবুদ—তোমার কোরানেও তুমি ব্যবহার কর কত কত উপমা কত কত মেটাফর!
পাতা ঝরছে বনপথে—একটা পাখি সুর করে গান গেয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছে দুপুরের হাওয়ায়—ওই পাখির গানও কি নাজায়েজ খোদা—? আমি তো সবুর করি আল্লা কবে যে লিখতে পারব কোরানের মতো অন্তত আশ্চর্য একটা মেটাফর—!