সলিমুল্লাহ খানের স্বাধীনতা ব্যবসায়

প্রাণিকুল বিশাল। এই মহাজগৎ বিশাল। ইতিহাস বিশাল। সময় অনন্ত। কত মানুষ, কত প্রাণ এল গেল এই অনন্ত সময়সমুদ্রে, এই বিশাল মহাজগৎ আর প্রাণিকুলের ভিড়ে, সব কি আর আমরা মনে রাখি! সবাই কি আর এই ভুবনে সমান গুরুত্ব রাখে। তবু আমার মতো গুরুত্বহীন অগণিত মানুষের মধ্যে কেউ কেউ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু ব্যক্তি আমি বা আমরা নই, আমাদের এই ভূ-গোলকের, আমাদের এই চেনা সময়রেখার মধ্যেই কেউ কেউ সভ্যতা, সংস্কৃতির জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা বদলে দেয়, অনেক পথরেখা। নির্মাণ করেন নতুন ইতিহাস। এমন অন্তত তিনজনের কথা বলি। একটু শিবের গীত হোক, ধান বানার আগে, ক্ষতি নাই তাতে। শিব বন্দনা মন্দ না।


এক আদিম যৌন আকর্ষণের তাড়নায় চলছে মানুষের জীবন আর শিল্প।


তিনজন লোক যাদের প্রভাব আমাদের লেখাপড়ার জগতে তোলপাড় এনে দেয়, তার চেয়েও বেশি তোলপাড় আনে ভাবনার পরিচিত জমিনে, তারা হলেন ডারউইন [১৮০৯-১৮৮২, মার্কস [১৮১৮-১৮৮৩, ফ্রয়েড [১৮৫৬-১৯৩৯। মোটা দাগে আমরা জানি, এই তিন মহাত্মন তিনটি আলাদা আলাদা তত্ত্ব দিয়েছিলেন। যে তত্ত্বগুলো আমাদের পুরনো চেনা পরিবেশের উপর একটা বড় আঘাত হানে। সোজা করে বললে, ডারউইন মানতে হলে, আশরাফুল মাখলুকাতের বড়ই অসুবিধা হয়। যে মহান ঈশ্বর-ভাবনা আমাদের সুখে-দুঃখে আশ্বস্ত করে, যে-ভাবনা আমাদেরকে স্বর্গের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে, সেই ভাবনা আর টিকে থাকে না ডারউইন মানলে। আমরা কেমন যেন অভিভাবকহীন হয়ে যাই। সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে [যদি তার হাত থেকে থাকে আমাদের তৈরি করেছিল, আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী, স্বর্গে ছিলাম, একটি অপরাধের কারণে আমরা মর্ত্যে প্রেরিত হলাম, কিন্তু লক্ষ লক্ষ প্রাণের মধ্যে আমরা তবুও সর্বশ্রেষ্ঠ—এইসব উচ্চ ভাবনাগুলো আর অটুট থাকে না। ডারউইন আমাদের প্রাণের এই বিকাশকে একটি প্রক্রিয়া, রূপান্তর আর বিবর্তনের চক্রে ফেলে আমাদেরকেই গোলচক্করে ফেলে দেন, এমন মনে হয়। মাথা ঘোরে। আচ্ছা, তর্কের খাতিরে কিংবা বিজ্ঞানের যুক্তির কাছে নত হয়ে ধরে নেয়া যাক, আমরা অবিনশ্বর ঈশ্বরের সরাসরি কেউ নই, তবু তো আমরা এক। মানে এই মানব জাতিটা এক। সেই এক জাতিতে আঘাত হানলেন, কার্ল মার্কস। তিনি একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, জগৎ জুড়ে মানুষের সম্পর্ক বিভাজিত। শাসক আর শোষিত—এই দুই রূপে ঘুরপাক খায় মানুষ। আমি বাড়িতে যখন, গৃহকর্মীটি তখন শোষিত, আবার অফিসে গেলে বসের কাছে আমি শোষিত। ক্রমশ এমন শাসক আর শোষিতে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে মানুষ। প্রভু আর ভৃত্য এ ছাড়া মানুষের আর কোনো অবস্থা নেই। মধ্যবর্তীরা আদতে দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী। ভোগের চূড়ান্ত দিকটা যেন ফ্রয়েডে এসে আরো গেঁজিয়ে উঠল। তিনি সব কিছুকে দেখলেন লিঙ্গের বিবেচনায়। এই যে নারী আর পুরুষ, এই লিঙ্গ আর যোনি—তার সকল হিসাবের মানদণ্ড দাঁড়াল যৌনতাকেন্দ্রিক। মাকে ছেলে ভালোবাসে, বাবাকে মেয়ে ভালোবাসে—এই সব বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। এক আদিম যৌন আকর্ষণের তাড়নায় চলছে মানুষের জীবন আর শিল্প।

আমি নিজে আরাম পাই না, স্বস্তি পাই না—গড়পড়তার মানুষ বলেই এই তিনজনের তত্ত্বে হিমশিম খাই। ঘটনাক্রমে কিংবা কৌতূহলহেতু এদের সম্পর্কে সামান্য পড়াশোনা হয়ে গেছে, কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারি না। কোটি কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে কোনো কোনো মানুষ অমোচনীয়। আমার মতো দুয়েকজনের ভালো লাগুক আর না-ইবা লাগুক, তারা নিজের মতো আর ভাবনাটাকে গেঁথে দিয়ে গেছেন। এখন দল বেধে সেই সব ভাবনার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা আসতেই পারে।

এ কথা বেদনাদায়ক সত্য, আমাদের কালে, আমাদের চারপাশে তেমন মানুষ দেখি না। কিংবা কে জানে, হয়তো আছেন, আমরা চিনতে পারি না। সময় থেকে যারা এগিয়ে তাদেরকে তো সমকাল মাপতে পারে না। শিবের গীত অনেক হলো, এবার ধান বানতে বসি। এতগুলো কথা মনে পড়ল, একটি বই পড়তে গিয়ে। পড়ছিলাম সলিমুল্লাহ খানের স্বাধীনতা ব্যবসায় বইখানি। ইতিহাস কারখানা সিরিজের ৩ নম্বর বইখানিতে উল্লেখিত তিন মহাত্মনের কথা বিস্তৃত নাই, তবে আছে আরো আরো অনেক মহাত্মনের কথা। সক্রেটিস, দেরিদা, লাঁকা, ফুকো, লেভিস্ত্রস, হেগেল, কান্ট প্রমুখের কথা এইখানে আছে, আছে কার্ল মার্কসের কথাও। এক মলাটের মধ্যে এতসব চিন্তাবদলকারীর সমাবেশ দেখে সমীহই জাগে। তাঁদের সকল কথা কিংবা সলিমুল্লাহ খানের কথার সাথে সদা একমত না-হলেও অস্বীকার করা যায় না সেগুলো। এবং আমরা তো জেনেছি, মতামত মেনে নেয়ার চেয়ে প্রশ্ন করাটা, দ্বিমতের যুক্তিটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। খান সাহেব এই বইয়ের কোনো কোনো লেখা বক্তৃতা আকারে দিয়েছিলেন, তারই একটিতে তিনি বলছেন (লিখছেন) :

আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম আপনাদের প্রশ্নও শুনব। আমি এলোপাতাড়ি যে কথাবার্তা বললাম, দেখছেন তো, তার মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা নাই। এর মধ্যে শিল্প পাবেন না। আমি তো শিল্প করতে দাঁড়াই নাই। আপনারা যদি দয়া করে এখন কথাবার্তা বলেন তো আমার পরিশ্রমটা ব্যর্থ হয় না। কিছু বোঝাতে পেরেছি কিনা জানি না। আমি যদি আপনাদের প্রশ্ন এবং ক্ষোভের জন্ম দিতে পেরে থাকি তাহলে আমার আলোচনা সার্থক হয়।

আদতে এইটাই সবচেয়ে বড় কথা। একজন যদি তার বলায়, লেখায়, প্রশ্ন তুলতে পারেন, ভাবাতে পারেন, ক্ষোভ কিংবা অস্বস্তিরও জন্ম দিতে পারেন, সেই জনই সার্থক। সেই বিবেচনায়, স্বাধীনতা ব্যবসায় বইখানি নামকরণ থেকেই সার্থক। আপনার আমার মনে শুরুতেই প্রশ্ন জাগবে বইয়ের নামকরণ নিয়ে। ‘স্বাধীনতা’ কেমন একটা পবিত্র, সমীহ জাগানিয়া শব্দ, অন্যদিকে ‘ব্যবসায়’ শব্দটায় কেমন যেন একটা বাজারি গন্ধ আছে, বিকিকিনির ব্যাপার আছে। এই দুই আপাত বিপরীত জিনিসকে এক করে খান সাহেব যথার্থই আমাদের ভাবান, প্রশ্ন উস্কে দেন।

জানা কথা, সলিমুল্লাহ খান আমাদের সময়ের একজন চিন্তাশীল, পণ্ডিত ব্যক্তি। যথাবিহিত তিনি এই বইয়ের মাধ্যমে নিজের পাণ্ডিত্য ও চিন্তাশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং আমাদেরও পদে পদে উস্কে দিয়েছেন। এই বইটিতে মোট ৩১টি প্রবন্ধ আছে, যা বিগত তেত্রিশ বছরে লেখা। সোজা কথায়, এটি একটি সংকলনগ্রন্থ। আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান এই নিবন্ধ সমূহের সম্পাদনা করেছেন। সম্পাদকের ভাষ্যমতে :

এই বহির সমস্ত লেখাই পূর্বপ্রকাশিত। রচনার শুরুতে আমরা প্রথম প্রকাশ (অথবা উৎস) নির্দেশ করিয়াছি। কোন কোন প্রবন্ধের কিছু অংশ বর্জিত, আবার কোথাও কোথাও নতুন কথা যুক্ত হইয়াছে। কিছু অংশ পুনর্লিখিত কিংবা পুনর্বিন্যস্তও করা হইল। বলা বাহুল্য, প্রবন্ধগুলির বর্তমান সংস্করণই প্রমাণ্য বলিয়া গণ্য হইবে।

বলা দরকার, যে কথাটি বলা ‘বাহুল্য’ মনে করেছেন সম্পাদক মহাশয়, তাহাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে করছি। সলিমুল্লাহ খানের তেত্রিশ বছরের একত্রিশটি চিন্তা একটি সূত্রে এবং প্রামাণ্য দাখিল করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সম্পাদনার আরেকটি বড় কৃতিত্ব মনে করছি, প্রবন্ধগুলোর শ্রেণিকরণ ও বিন্যাসের দায় নেয়া। বিক্ষিপ্ত ৩১টি প্রবন্ধকে কয়েকটি অধ্যায়ে তিনি সুন্দর মালা গেঁথেছেন। এই বইয়ের অধ্যায়বিভাজনটি তুলে ধরা জরুরি মনে করি: এস্তেহার, স্বাধীনতা, ধর্ম, রাষ্ট্র, সমাজ, বিষয়, সংবর্ধনা—এই সাতটি অধ্যায়ে নিবন্ধগুলোকে সাজানো হয়েছে। নামকরণেই বোঝা যায় কোন অংশে কী বিষয়ক রচনা আছে। বইয়ের প্রতিপাদ্য বিষয় এস্তেহার আর স্বাধীনতাতে মূলত প্রস্ফুটিত হলেও বাকি অধ্যায়সমূহেও তার নির্যাস বিদ্যমান। পুরো বইটি রচনার বৈচিত্র্যে ভরপুর। সক্রেটিস, কান্ট, হেগেল, মার্কস, ফুঁকো, দেরিদা থেকে শুরু করে নাসির আলি মামুন, সাজ্জাদ শরিফ, ব্রাত্য রাইসুর—এমনি বহু মানুষের কথা তিনি বলেছেন। আফ্রিকার ওসমান সেম্বেনের চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আমলা আকবর কবিরকে নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। চার শতাধিক পৃষ্ঠার এই বইয়ের ৩১টি নিবন্ধ নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করার সুযোগ স্বল্পপরিসরে নাই। তবে দুয়েকটি প্রসঙ্গ ও প্রশ্ন নিয়ে কথা বলতে উৎসাহ পাই।

তবে কথা বলতেও আজকাল ভয় হয়। স্বাধীনতা যখন একটি ব্যবসায়ী প্রপঞ্চ তখন কথা বলাও কঠিন। খান সাহেবের ভাষ্যমতে :

আপনি নিজের কথা বলার কণ্ঠস্বর গোহারা হারিয়ে ফেলেছেন। আপনার কণ্ঠস্বর অন্যের নামে বন্দোবস্ত—পেটেন্টেড—হয়ে গেছে। আপনি যার মাইকে কথা বলেন আপনাকে মনে করবে সেই মাইকের লোক। আপনি যে পত্রিকায় লেখেন আপনি ঐ পথের লোক। আপনার তো নিজের পত্রিকা নাই। [পৃষ্ঠা ৫৮

এ কথা যথার্থ যে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর আর কলিযুগ পার হয়ে আমরা এমন এক যুগে অবতীর্ণ যখন কথা বললেও, গায়ে সিল পড়ে যায়। কখনোবা কথা বলবার আগেই ঠিক করে ফেলা হয়, এটা লাল না নীল গোত্রের।


স্বাধীনতা বড় বিপদের জিনিশ। মানুষ স্বাধীন আর নিখিল জগতে তাঁর কোন সহচর নাই—এ জ্ঞান তার জন্মাবেই।


এই যে কথা আর ভাষা, এর মধ্যেই স্বাধীনতার সূত্র খুঁজেছেন খান সাহেব। শুধু নিজেই খোঁজেন নি, নানা দার্শনিক ও চিন্তাবিদের দোহাইও দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে :

ভাষা না থাকলে আপন ভাই এবং অপর মানুষের কোন পার্থক্য নাই। থাকে না। পশুদের মধ্যে দেখেন না, ভাইয়ে বোনে কোন পরিচয় নাই। ভাইয়ে বোনে পরিচয় থাকার মাধ্যমটা কি? নামকরণ। নামকরণটা আসে কোথা থেকে? ভাষা থেকেই। [পৃষ্ঠা ৫৪

পরিচয় বা পরিচয়ের মাধ্যমটা কেবল ভাষা যদি হয়, সেই ভাষার সীমারেখা কতদূর সেটুকু অবশ্য খান সাহেবের স্বাধীনতা ব্যবসায় সূত্রে নজর করতে পারি নি। মোটা দাগে যদি ধরি, চোখের ভাষাও ভাষা এবং নীরবতাও ভাষা। কাজেই ভাষাহীনতা বলতে কতটুকুকে ধরব। ভাষা তো যোগাযোগের গূঢ়তর এবং গভীরতর মাধ্যম। সেই মাধ্যম কি এত সরলীকরণ করা যায়? আমরা কী করে জানি পশুদের মধ্যে ভাই-বোনে পরিচয় নাই? আমরা কী করে জানি, একটা ভাষা [হয়তো তা আমাদের ব্যাকরণ, অভিধান ইত্যকার শক্তিশালী উপকরণে ঋদ্ধ নয় পশুদের মধ্যেও বিরাজমান নয়। আরও প্রশ্ন জাগে, নামকরণই কি পরিচয়? সলিমুল্লাহ কিংবা খান কিংবা মুম কিংবা রহমান নামে তো আরো বহু লোকের নামই থাকতে পারে। সেই নামকরণটাই কি ইউনিক? বিশেষত যখন, ‘আপনার কণ্ঠস্বর অন্যের নামে বন্দোবস্ত—পেটেন্টেড—হয়ে গেছে’—তখন নেহাত ভাষা আর নামকরণেই কি পরিচয় সম্পন্ন হয়? তাহলে এই যে রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি অধ্যায়ে বইয়ের বিভাজন এবং মানুষেরও বিভাজন সেগুলোকে ব্যাখ্যা করা কি কঠিন হয়ে যায় না?

খান সাহেব ‘সাম্রাজ্যবাদের যুগে মুক্তিযুদ্ধ’ নিবন্ধে বলছেন :

পবিত্র কোরানের এক সুরায় আছে, ‘নিশ্চয়ই ওরা নির্বংশ হবে।’ নির্বংশ হওয়া মানে কি? তাদের নাম আর জারি থাকছে না। মুক্তি পাওয়ার মানে মানুষের নাম জারি থাকা। [পৃষ্ঠা ৬৮

নিবন্ধের উপসংহার অংশে এই উদ্ধৃতি প্রদানের মাধ্যমে তিনি পুনশ্চ নামকরণ আর নাম সংরক্ষণকে বড় করে দেখছেন এবং নাম রয়ে যাওয়াই আদতে মুক্তি ওরফে স্বাধীনতা। ডারউইন, মার্কস কিংবা ফ্রয়েডের মতো তার তত্ত্ব শুনতে ভালো লাগে, মানতেও মন চায়, কিন্তু গোড়া মন আবার ভয়ও পায়। আহা, কালে কালে কত বিপ্লবী ইতিহাসের চাকা ঘুরাতে নিজেকে শেষ করে ফেলল, তাদের নাম কি আর কোনো পত্রিকার পাতায় আছে? এই যে একেকটা দেশ, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কিংবা আরো বৃহৎ কোনো পরিসরে নাম-না-জানা কত মানুষই আড়ালে আবডালে স্বাধীনতার জন্যে লড়ে যায়, মুক্তির প্রদীপ জ্বালাতে নিজেই পুড়ে ভস্ম হয়, আমরা কি তাদের নাম খোদাই করে রাখতে পারি? পারা যায় না বোধহয়। সেই বোধই বড় বেদনা জাগায়। আহা, তবে কি শেষ পর্যন্ত কোথাও স্বাধীনতা নাই। ঈশ্বর হারালাম, মানুষে মানুষের বিভাজন হলো, অর্থনীতি, যৌনতা, কত ভেদাভেদ। এখন আমরা স্বাধীনতার প্রশ্নে বিভাজিত হব!

মানুষ এখন বুঝতে পারছে এই বিরূপ বিশ্বে সে নিয়ত একা। তার কোন প্রভু নাই। যে পরিমাণে সে নিজেই নিজের প্রভু সেই পরিমাণেই সে অসহায়। স্বাধীনতা বড় বিপদের জিনিশ। মানুষ স্বাধীন আর নিখিল জগতে তাঁর কোন সহচর নাই—এ জ্ঞান তার জন্মাবেই। [পৃষ্ঠা ১৮১

সলিমুল্লাহ খানের এই উক্তি পাঠের পর বইটি বন্ধ করে ফেলি। কয়েক মুহূর্ত কিংবা একদিন পুরা স্তব্ধতায় কাটাই। বিরূপ বিশ্বে একাকিত্বে ভয়াবহতা যত না লাগে তার চেয়ে বেশি ভয় লাগে, ‘স্বাধীনতা বড় বিপদের জিনিশ’ কথাটি শুনে। এই যে আকাশ-ভরা সূর্য-তারার মাঝে আমিও একটা স্থান পেয়েছি সেই মহত্তম অনুভূতি কেমন অসাড় হয়ে আসে। হঠাৎ চারিদিকে শিকল দেখতে পাই। স্বয়ং স্বাধীনতাই যেন এক বিপদ-শৃঙ্খল।

এই শৃঙ্খল কত প্রকারের, এই শৃঙ্খল যে কত গভীর তা সলিমুল্লাহ সাহেবই আবার তুলে ধরেন :

ভারতের অপরিসীম গরিবানার বিবরণ উনিশ শতকের লেখকরাও দিয়েছেন। সে বিবরণ তখন রবীন্দ্রনাথের কতটা চোখে পড়েছিল তা এখানে স্পষ্ট নয়। কিন্তু বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে রবীন্দ্রনাথ কবুল করলেন, এই দারিদ্র্যের একটিই বড় কারণ—ভারতের পরাধীনতা। উনিশ শতকে ইংরেজ প্রশাসকরাও ভারতবর্ষে বিদ্যমান গরিবানার অস্তিত্ব স্বীকার করতেন। কিন্তু স্বাধীনতাই তার সমাধান—এ সত্যে তাঁরা আস্থা রাখতেন না। তারা মনে করতেন স্বাধীনতা বড় ঝুঁকিপূর্ণ, দায়িত্ববান কাজ। গরিবেরা তা গ্রহণে অক্ষম। [পৃষ্ঠা ১৩৪

লেখক সলিমুল্লহ খান স্বাধীনতা শব্দটিকে নানা দিক থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন এই বইতে। এই স্বাধীনতা কত রকম টালবাহানায় আমাদের ঘুরিয়ে মারে! তা মারুক। আমরা যারা দশটা-পাঁচটা রুটিন মানি, ট্রাফিক জ্যামে বসে ইনবক্সে প্রেম-পীরিতি করি তাদের জীবনে স্বাধীনতার চেয়ে নিয়মিত খানা-দানা জরুরি। আমরা রুটিনের গান গাই। আমরা রুটি-রুজির কাছে আত্মা বেঁচে দেই, যেমন ফস্টাস বেঁচেছিলেন ম্যাফিস্টোফিলিসের কাছে।

সাধারণ মানুষের অত তত্ত্ব-তথ্য না-জানলেও চলে। প্রাকৃত জীবনের একটা আলগা সুখ তো আছেই, সরলতারও কিছু নিজস্ব ফায়দা আছে। ‘ফরাসী ভাষার অদ্বিতীয় মহাশয় জ্যাঁ-জ্যাক রুসোর পথ বাহিয়াই লেবিস্ত্রোসের যাত্রা। সভ্য মানুষের তুলনায় অসভ্য মানুষ ভাল। কারণ সভ্য মানুষ সংস্কৃতি তৈয়ার করিয়াছে অথচ অসভ্য মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি বাস করে—এই ধারণা যদি সত্য হয় তাহা হইলে লেবিস্ত্রোস হক কথাই বলিয়াছেন। [পৃষ্ঠা ১৫৬

প্রকৃতির কাছে বসবাস করা মানুষ যততত্র প্রাকৃতিক কর্ম করতে পিছপা হয় না। কিন্তু স্বাধীনতা ব্যবসায় জাতীয় বইয়ের মুখোমুখি এলে কেমন জানি, অস্বস্তিই তৈরি হয়। নিজের জীবনটা ফ্লাশব্যাকে দেখতে থাকি, যেমন মৃত্যুর আগে শুনেছি, চোখের সামনে সব ভেসে ওঠে। এই কারণেই ডারউইন-মার্কস-ফ্রয়েড এই ত্রয়ীর মতো পণ্ডিত সলিমুল্লাহ পাঠেও পূর্ববর্তী ধারণা থেকে বিচ্যুত হই। বিচ্যুতি কারই বা ভালো লাগে!

স্বাধীনতা ব্যবসায় কী পরিমাণ তার কোনো সীমারেখা নেই। কর্পোরেট আর পুঁজিবাদী আর নানা বাদী-বিবাদী এই সমাজে সম্পর্ক আর আত্মীয়তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

এই নিয়ম হইতে লেবিস্ত্রোস আবিষ্কার করিলেন, যাহাকে আমরা বলি, ‘রক্ত-সম্পর্ক’ তাহা তো স্তরে স্তরে ‘ব্যবসায়-সম্পর্ক’ বা ‘বিনিময়-সম্পর্ক’। এক পরিবারের পুরুষ [ধরা যাউক ভাই অন্য পরিবারের পুরুষের হাতে নারী [ধরা যাইতেছে ভগিনী গছাইয়া দেয়। আর সেও অন্য পরিবার হইতে অন্য নারী গছাইয়া লয়। লেবিস্ত্রোস বলিয়াছেন; বিবাহ-সর্ম্পকই সমাজ গঠনের গোপন বিভাগ। এই বিভাগ এক প্রকার দমন, বিসর্জন বা গছাইয়া দিবার ব্যবসায় বৈ নহে। [পৃষ্ঠা ১৪৮


পড়তে আরাম নাই, সলিমুল্লাহ খানের বই। বিষয় আর ভাবনাগুলো ক্রমশ খোঁচায়।


এমনি প্রকাশ্য আর গোপন বিভাগ আর ভাগের মধ্যে হিমশিম খায় সাধারণ মানুষের মন।  তবে, সত্য কথা তিতাই হয় এবং রোগ যত কড়া ওষুধও তত কড়া ডোজের হয়। সলিমুল্লাহ খানের এই বই এই সময়ের জন্যে আজও কড়া ডোজ বিবেচ্য করি। তবে, সকল লেখকের জন্যে পাঠ্য বিবেচনা করি, রাজনীতি সচেতনতার প্রচলিত চিন্তাকেও সলিমুল্লাহ সাহেব নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করেন। মাথা ঘামাতে চাইলে, এই বই ভালো কাজে দেবে।

রাজনীতিও যেখানে আর দশ পেশার মতন পেশা বৈ নয়, নিছকই বৃত্তিবিশেষ, তখন লেখক আর রাজনীতি করতে পারেন না। এই কথাই সক্রাতেস শোনালেন। সক্রাতেসের ‘পেশা’ প্রশ্ন করা। একালের ভাষায় একেই বলা যায় ‘লেখা’। সক্রাতেস মৃত্যুকে পরোয়া করেন নাই। করলে লিখতে পারতেন না। ‘যে মৃত্যুকে ভয় পায় বা অন্তত মৃত্যুভয়ে অন্যায় ও অসত্যকে মেনে নেয় সে যেন ‘লেখক’ না হয়! [পৃষ্ঠা ৭৬

প্রশ্ন করার গুরুত্ব আর প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকার গুরুত্বও শেষতক খান সাহেব আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন। তবু শেষে এসে আমিও একটু ভিন্ন কথা বলি। পড়তে আরাম নাই, সলিমুল্লাহ খানের বই। বিষয় আর ভাবনাগুলো ক্রমশ খোঁচায়। কিন্তু ধানও বানা হলো, শিবের বন্দনাও হলো, এবার একটু উল্টো গীত গাই হে রাম!

ভাষা, যেই ভাষা স্বাধীনতার অন্যতম ধারক কিংবা প্রধানই, সেই ভাষার প্রশ্নে সলিমুল্লাহ খানকে আমার গুরুচণ্ডালী মনে হয়। আবার এমনও হতে পারে, বর্তমান পাঠকের সীমাবদ্ধতার কারণেই, কোথাও কোথাও অধিক জটিল মনে হয়, তার প্রকাশভঙ্গি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে ঝামেলাটা রয়ে যায়, সেটি হলো, সলিমুল্লাহ খান স্বাধীনতা ব্যবসায় বইতে খুব ঝাঁকি দেন। এত ঝাঁকাঝাঁকি মধ্যদুপুরে ভালো লাগে না। অতএব, এই আলোচনা এখানেই সমাপ্ত করি।

মুম রহমান

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।...বিস্তারিত