কবি আলমগীর নিষাদের মোকসেদুল বাংলা কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়। প্রকাশের পর গত এক বছরে বইটি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নানান প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করেছে। এর কারণ প্রথমত বইটির নাম, দ্বিতীয়ত কন্টেন্ট। নামের মধ্যে কেউ পেয়েছেন মুসলমানির গন্ধ, কেউ কন্টেন্টে মুসলমানবিরোধী আওয়াজ—ইসলামকে মুসলমানের হাত থেকে রক্ষা করার প্রত্যয়। আছে অসংবৃত যৌনবাসনার স্বীকারোক্তি। বিচিত্র কন্ট্রাডিকশনের মধ্যে এমন এক এনার্কিস্টের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, যে নিজেই পড়েছে দমনমূলক রাষ্ট্রের গ্যাঁড়াকলে। সে রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। কবির ভাষায় : জলে বিএনপি ডাঙায় আওয়ামী লীগ/ মোরা এই দেশের নাগরিক।// জমিনে সেকুলার আসমানে ফ্যানাটিক/ আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।
আমরা এখানে মোকসেদুল বাংলা বইটি নিয়ে ছয় জন কবি-লেখকের মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ হাজির করব পরস্পরের পাঠকদের জন্য। কিন্তু তার আগে পাঠ করে নেব কবি আলমগীর নিষাদের একটি কবিতা :
প্যাসিভ রেভুলেশন
◘
পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস নয়। পৃথিবীর ইতিহাস বেহাত বিপ্লবের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বদলে মুজিববাদ। কার্ল মার্কসের চিন্তাধারার বদলে স্তালিনবাদ। হযরত মুহম্মদের ইসলামের বদলে উমাইয়্যিজম। এই ইতিহাস গোটা দুনিয়ার ইতিহাস।
------------------------------------------------
সুমন সাজ্জাদ
কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক
কবিতা ও রাজনীতি—এই দুটির সম্পর্ক নিয়ে বাঙালি কবিদের মধ্যে খানিকটা দ্বিধা আছে; প্রথমত, ভেবে নেওয়া হয় রাজনীতি বুঝি কবিতার শিল্পত্বকে গ্রাস করে ফেলে আর তাই রাজনৈতিক কবিতামাত্রই স্লোগানধর্মী; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন অনেক কবিই রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ও চেতনাবশত কবিতার ভাষাগত আবছায়াটুকু লোপাট করে দেন কবিতা থেকে। এই দ্বিপাক্ষিক দ্বিধা কাটানো নিতান্ত জটিল একটি কাজ। আলমগীর নিষাদ তাঁর ছোট বই মোকসেদুল বাংলায় জটিল পথটিই বেছে নিয়েছেন এবং তাঁর পারঙ্গমতা প্রমাণ করেছেন। বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশকেন্দ্রিক লড়াইয়ে বাংলার গন্তব্য আদতে কী? এই রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্নটিকে নিষাদ নিয়ে এসেছেন কবিতায়।
সেক্যুলার ও ধর্মবাদী, কলকাতাকেন্দ্রিকতা ও ঢাকাকেন্দ্রিকতা, রাষ্ট্র ও সমাজ, ব্যক্তি ও জনগণ, জনসংস্কৃতি ও মূলধারার সংস্কৃতি, নিম্নবর্গ ও উচ্চবর্গ, বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব—এসব বাইনারি পরিস্থিতির কাব্যিক উপস্থাপন জলবৎতরল কোনো ব্যাপার নয়। এই প্রস্তাবনায় নিষাদ বেছে নিয়েছেন অনেক কৌশল: নবুয়তি ভাষা, পোয়েটিক টোন, মেনিফেস্টোবাদী উচ্চারণ, গল্পকথন ও সিম্বলিজম। ছোট্ট একটি বইয়ে এত এত টেকনিকের ঘনীভূত আয়োজন সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু প্রশ্ন হলো: টেকনিকের তৎপরতাগুলো পাঠককে কোথায় নিয়ে যায়? নিঃসন্দেহে তা পাঠককে পৌঁছে দেয় ইতিহাসের রাজদরজায়। এই বই বাংলার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিভ্রমণের কাব্যরূপ।
ঔপনিবেশিকতা, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, উচ্চকোটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাতাবরণ বাঙালির যে মহাবয়ান তৈরি করেছে, সেই মহাবয়ানের খাদ ও সীমানাগুলো শনাক্ত করেছেন নিষাদ। শেষতক নিষাদের কবিতা হয়ে উঠেছে একটি প্রতিরোধী বয়ান বা কাউন্টার ডিসকোর্স। এই বয়ান ধর্ম, বিপ্লব, জনতা, প্রতিরোধ, নিম্নবর্গকে নিয়ে আসতে চায় রাজনীতির কেন্দ্রে। আর তাই কবিতার বইটির নাম যখন হয়ে ওঠে মোকসেদুল বাংলা, তখন আমরা বুঝে যাই বাংলার নতুন মনজিল ও মকসুদের কথা ভাবছেন তিনি, যা এখনো অস্পষ্ট, কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতির ভেতরে ভেতরে অঙ্কুরোদ্গমের অপেক্ষায় বিদ্যমান।
শিমুল মাহমুদ
কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক
ইদানীং এক্সপেরিমেন্টের ফাঁদে অর্থপরিস্ফুটনের অক্ষমতাকে ঢাকতে যারা কবিতাকে উচ্চমার্গীয় আর্ট হিসেবে ঢাক-ঢোল পেটাতে ব্যস্ত, তাদের জন্য মোকসেদুল বাংলা অবশ্য-পাঠ্য। বাংলা ভাষাকে রেপ না করেও যে ভাষার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করা সম্ভব, তা দেখিয়েছে আলমগীর নিষাদ। নিষাদ স্পষ্ট করেই জানে, সে কী বলতে চায়। কেননা তার বলার আছে বিস্তর। এ কারণে চতুর কবিদের মতো তাকে রহস্য বা দুর্বোধ্যতার আশ্রয় নিতে হয়নি। বরং নিষাদ তৈরি করে নিয়েছেন নিজের বয়ান-উপযুক্ত জায়নামাজ। যেখানে ঈশ্বর নেই বরং ঈশ্বরের পরিবর্তে তাকে শাসন করছে চিন্তামগ্ন জৈবভাষা।
জাভেদ হুসেন
লেখক, অনুবাদক ও তাত্ত্বিক
কবিতার ভাষা যে আমাদের নিজস্ব হয়ে গেছে তাতে নিঃসন্দেহ হলাম আলমগীর নিষাদের মোকসেদুল বাংলা পড়ে। নিষাদের কবিতায় ঘোরপ্যাঁচ নেই। এটা বড় সাহসের ব্যাপার।
কুদরত-ই-হুদা
লেখক, গবেষক ও শিক্ষক
ছোট জায়গার মধ্যে ঠাস করে বড় কথা বলার হিম্মতবানই কবি। এই বড় কথা বলার জন্য নিজের সাথে, চারপাশের সাথে, দেশ-জাতি-পৃথিবীর সাথে নিজের মতো করে একটা সজ্ঞান বোঝাপড়া থাকতে হয়। আলমগীর নিষাদের তা আছে। আছে বলেই মোকসেদুল বাংলা কাব্যগ্রন্থে তিনি কবিতার পর কবিতায় সার্বভৌম এবং ‘অস্বস্তিকর’ বড় বড় উচ্চারণ ছুড়ে দিতে পেরেছেন। এই বোঝাপড়া আছে বলেই, কবিতায় তাঁকে আলাদা করে আজাইরা কাব্যি করতে হয় নাই। সবচেয়ে বড় কথা, নিষাদের মোকসেদুল বাংলার প্রায় প্রতিটি কবিতার শরীরে ও রক্তে সংগ্রামী জার্নির চিহ্ন আর উন্মাদনা আছে। ওই সজ্ঞান বোঝাপড়া আর এই সংগ্রাম-উন্মাদনা অসংখ্য কবি-কোলাহলের মধ্যে নিষাদকে আলাদা করে চিনিয়ে দিয়েছে বলে মনে করি।
সোহেল হাসান গালিব
কবি ও ভাষা-রাজনীতিক
কুসংস্কারমুক্ত বাংলা কবিতা মোকসেদুল বাংলা। যেন কবিতার মধ্যে কবিতার অন্তর্ঘাত।
মৃদুল মাহবুব
কবি ও ক্রিটিক
আমাদের কবিতাবোধের যে সহনশীলতা, সেখানে অস্বস্তি তৈরি করবে আলমগীর নিষাদের মোকসেদুল বাংলা। সমগ্র বাংলা কবিতার ট্র্যাডিশনকে অস্বস্তিতে ফেলা কম কথা নয়। ফলে, মোকসেদুল বাংলা বাংলা কবিতার পাঠকের কাব্যরুচির লিটমাস পরীক্ষা বটে।