চরিত্র
মিলা • ডাক্তার অনিক
: মুখোশ শব্দটা খারাপ ছিল।
বলো, ছিল না?
মুখের বিপরীতে ছিল মুখোশ।
আমরা তো মুখোশকে অপছন্দই করতাম।
মুখোশ পরার কথা আমরা কেউ বলি নি।
মুখোশ ছিঁড়ে ফ্যালো, মুখোশ পরো না,
তাই ছিল আমাদের কথা।
আমরা মুখোশধারীকে খারাপ বলতাম।
এখন মুখোশ না-পরলেই তাকে খারাপ ভাবি।
দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবি।
কে ভেবেছিল,
মুখের চেয়ে মুখোশ অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠবে!
কারো মুখটাই দেখতে পাই না।
চারিদিকে মুখোশের ভিড়।
পিপিই নামের অদ্ভুত এক পোশাকে
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।
একেকটা ডাক্তার আর নার্স
যেন বেহুলার বাসরঘর বানাতে ব্যস্ত।
করোনা নামের সুতানলি সাপ
তবু ঢুকে যায় কখনো কখনো।
কিন্তু কে আর ভাসাবে ভাসানের ভেলা
প্রিয় প্রাণরক্ষায়
সব নদীপথ
আকাশপথ
সড়কপথ
সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে
অক্সিজেন সিলিন্ডারে এসে!
মনে হয় একদল
অচেনা জগতের মানুষ
চলাফেরা করছে চেনা পৃথিবীতে।
এই এক বছরে কেমন বদলে গেল
মৃত্যু আর জীবনের সংজ্ঞা।
বদলে গেল মানুষে মানুষে সম্পর্কের ধরন!
: বদলটাই পৃথিবীর নিয়ম।
সবকিছুই তো বদলে যায়।
এক সময় আমরা বলতাম,
ডিম ভালো নয়,
দিনে সর্বোচ্চ একটা ডিম।
এখন আমরা ডিম খেতে বলি।
সেই কবে বিজ্ঞানীরাও বলেছিল
সূর্য ঘোরে,
তারপর বলল পৃথিবী ঘোরে
তাকে ঘিরে চাঁদ ঘোরে
এখন বিজ্ঞানীরা বলে
চাঁদ, পৃথিবী, সূর্য
গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র সব ঘুরপাক খায়
মহাবিশ্ব নিয়ত স্ফীতিশীল
নিয়ত গতিশীল।
বিজ্ঞান তো ধর্মগ্রন্থ নয়, তা পাল্টায়।
পৃথিবীও পাল্টে যাচ্ছে তাই।
ওরা বলছে, নিউ নরমাল,
নব্য স্বাভাবিকতা।
স্বাভাবিক,
তবে আগের দিনের মতো কিছুই স্বাভাবিক নয়।
নতুন ধারার স্বাভাবিকতা।
অস্বাভাবিক সময়কে স্বাভাবিক করার চেষ্টা।
এই অস্বাভাবিক সময়ে আরো কত বদল হবে।
জীবন বিস্ময়করভাবে বদলায়।
এখন মৃত্যু নয়,
বেঁচে থাকাটাই বিস্ময়কর মিলা।
: তা ঠিক।
এই আমার বেঁচে থাকা,
এই আমাদের দেখা হওয়াটাই ভাবো?
বিস্ময়কর।
বাঁচার কথা ছিল না আমার
তবু বেঁচে আছি
তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল না আমার
তবু দেখা হলো।
সকল অস্বভাবিক ঘটনাই এখন স্বাভাবিক।
আর সকল স্বাভাবিক ঘটনাকেও মনে হয় অস্বাভাবিক।
আহা, সময়!
অনিক,
তুমি অনেক বড় ডাক্তার হয়ে গেছ এখন!
আচ্ছা, তোমার ভয় করে না?
এই যে চারপাশে এত রোগী।
এত জীবাণু।
ভাইরাস।
মৃত্যু।
তোমার ভয় করে না?
তুমি তো বরাবরই ভীতু ছিলে।
: না। ভয় করে না।
ভয় করে কী হবে?
করোনা কেন? কাউকেই ভয় করে না আমার।
রোগ, শোক, মৃত্যুকে চিনে ফেলেছি অনেক আগেই।
ওদের সঙ্গেই তো বসবাস। সংসার।
: সংসার!
হাহ!
সংসারটা সংয়ের মতোই।
অনিক,
বিয়ে করেছ?
ছেলেমেয়ে?
: কেন জানতে চাও?
: তোমার সঙ্গে এভাবে দেখা হবে
কোনোদিন ভাবি নি।
: আফসোস হচ্ছে? অনুশোচনা?
: না।
বরং ভালোই লাগছে।
কেবল এই মুখোশটা সহ্য হয় না।
তোমার ভারী ঠোঁটগুলো দেখতে পাই না।
তোমার কি গোঁফ আছে এখনও?
সিগারেট খাও?
: খাই।
: সে কি তুমি না ডাক্তার?
সিগারেট খাওয়ার একটা উপকারিতার কথা বলতে পারবে?
কেন খাও এখনও?
: কী আসে যায়
এসব কথায়!
আমি তো জিজ্ঞেস করি নি
তুমি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে?
কী কাঙালের মতোই না আমি ঘুরেছি।
আর কী তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই না করতে!
: এই তো সুযোগ।
শোধ নাও।
এখন তো তোমারই আইসিইউতে।
এই করোনা ইউনিটে।
কেউ ঢুকতে পারবে না।
তুমি
আর গুটিকয়েক ডাক্তার,
নার্স, ওয়ার্ডবয়, খালা।
সবার মুখে মুখোশ
বিচিত্র পোশাক।
কেউ কাউকে চিনতে পারে না এখন।
আর ১৪টা বিছানা।
১৪ জন মাত্র রোগী।
কখন কী ঘটবে কেউ জানে না।
৯ নাম্বার বেডের জন কি মারা গেছে?
নাকি, কেবিনে ফেরত গেছে?
নাকি বাড়িতে ফেরত গেছে?
এত অনিশ্চয়তা
এত ভয়, দ্বিধা ঘিরে ধরছে আমাদের!
আচ্ছা অনিক,
সত্যি করে বলবে,
আমি কি ভালোর দিকে
আমি কি বাঁচব?
বলো, বাঁচব?
জানো ডাক্তার,
আমার কাছে তোমার এক কাপ কফি পাওনা আছে।
: মিলা, মনে আছে তোমার!
কত বছর আগের কথা!
দশ-এগার বছর তো হবেই।
আমি তো ভেবেছি আমাকে
তুমি একটুও মনে রাখো নি।
: মন কোথায় থাকে ডাক্তার অনিক?
বলো তো এই পুরো শরীরটার কোন জায়গাটায় মন?
মনে রাখা তো যতদূর জানি মগজের কারসাজি।
তবে কি মনই মগজ?
আম্মা বলত,
তোর মাথায় তো ঘিলু নাই
অনিকটা কী মেধাবী!
কী দায়িত্বশীল ছেলে!
আচ্ছা দায়িত্ব, মেধা এইসব কই থাকে?
হৃদয়ে, মগজে? স্নায়ুতে?
তুমি কি আমাকে এখনও ভালোবাসো ডাক্তার অনিক?
তোমার বোনটা কেমন আছে?
ওর বিয়ে হয়েছে?
: তোমার ঘুম দরকার মিলা।
অক্সিজেন লেভেলটা এখনও মাঝাসাঝে কমে যায়।
ঘুমাও।
কাল দেখা হবে।
: তুমি নিশ্চিত কাল দেখা হবে?
: ভয় পেয়ো না।
তোমাকে অত সহজে মরতে দিচ্ছি না আমি।
ভ্যান্টিলেশন থেকে ফেরত এনেছি।
: তুমি এখন গল্প করতে পারবে—
‘যে নারী আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল
অপমানে
অবহেলায়
তাকে আমি প্রাণে বাঁচিয়েছি।
আমারই হাসপাতালে আমারই চিকিৎসায় সে বেঁচে উঠেছে।’
আচ্ছা অনিক,
এই যে ডাক্তার সাহেব,
তুমি যাও।
তোমার সিস্টার উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
: ও তোমাকে একটা সিডেটিভ ইনজেকশন দেবে।
এন্টিবায়োটিকটা চেইঞ্জ করে দিয়েছি।
তোমার ক্যানোলাটাও বদল করে দিতে বলেছি।
তুমি ভেবো না
সিস্টার, ডাক্তাররা এখানে খুব আন্তরিক।
আর আলাদা করে কেউ কোনো উঁকিঝুকি দেবে না।
এ হাসপাতাল খুব ভালো।
এখানে তুমি শুধু
আমার রোগী নও,
তুমি ওদের সবার রোগী।
: আহা,
আমি শুধু তোমার কিছু নই
কত জনের কত কিছু হয়ে গেলাম আমি
কারো বউ
কারো মা
কারো ভাবী
অথচ
আমি শুধু তোমার কিছু নই।
এটাই নয়া স্বাভাবিকতা
আমি তোমার নই
অথচ তোমার সব হতে পারতাম আমি।
: কী হবে এ সব বলে!
আমার দিক থেকে তো আমি চেষ্টা কম করি নি
তুমিই কোনোদিন আমাকে গুরুত্ব দাও নি।
আমার এই ডাক্তারি পড়াটাই তুমি মেনে নিতে চাও নি।
অথচ আজ আমার ডাক্তার হওয়াটাই
তোমার খুব কাজে লেগে গেল।
: তবু তো তুমি আমার কাজে লাগলে খুব।
আমি কখনোই কোন কাজে লাগে নি তোমার।
আমার উপর তোমার রাগ হয় না অনিক?
: না।
রাগ কেন?
অভিমান?
হয়তো সেটা খানিকটা ছিল।
কিন্তু যাকে ভালোবাসি
দিনশেষে সে ভালো থাকুক
এর চেয়ে বড় চাওয়া আর কী হতে পারে!
সব সময়ই চেয়েছি তুমি যেখানেই থাকো যেভাবেই থাকো
ভালো থাকো।
আর আমার দিন তো কেটেই যাচ্ছে।
এ এক এমন পেশা
যেখানে মানুষের হাসি কান্না একাকার হয়ে থাকে।
সামান্য চেষ্টাতে কখনো হয়তো কাউকে আরাম দিতে পারি,
নিরাময় দিতে পারি,
জীবন দিতে পারি,
তখন তাদের মুখে হাসি ফোটে।
কখনো শত চেষ্টাতেও
নিরাময় এনে দিতে পারি না
অসহায় হয়ে দেখি মানুষের যন্ত্রণা
মৃত্যু।
দিন তো কেটে যায়
দুই চোখের সামনে জীবনমৃত্যুর লীলাখেলা
দেখতে দেখতে।
আচ্ছা,
একটা কথা বলবে মিলা?
এই যে এতগুলো বছর
এক দশক
কিংবা প্রায় এক যুগ
তুমি কি আমাকে দুয়েকবার ভেবেছ?
মনে পড়েছে কখনো এই অনিকের কথা?
: খুব ভালো কফিশপ কোথায় আছে?
যদি বেঁচে উঠি তোমাকে কফি খাওয়াব।
তোমার সময় হবে?
: মিলা
আজ যাই
সাহস রেখো
কাল কথা হবে।
বড় বড় করে শ্বাস নিবে
দিনে তিনবার দমের ব্যয়াম
মনে আছে তো?
: ‘ভুলে যাওয়া গন্ধের মতো কখনো তোমাকে মনে পড়ে’
বলো তো কার কবিতা?
: মনে নাই মিলা।
কবিতা, ভালোবাসা এইসব ভুলে গেছি।
আসি আজ।
কাল দেখা হবে।
: হয়তো।
কাল দেখা হবে।
কী নিশ্চিত করে বলো।
কাল কি সত্যিই আসবে?
সত্যিই কি দেখা হবে কাল।
আচ্ছা, তুমি এসো
এসো।
তোমার অনেক কাজ।
: কাল দেখা হবে।
কাল দেখা হবে—
এটুকু ভরসাতেই তো আমরা বাঁচি।
কাল আমি আসব
কাল তুমি থাকবে
এইটুকুই তো চাওয়া।
আসি মিলা।
ভালো থাকো।
মনে রেখো,
কাল দেখা হবে আমাদের।