সওয়ারিশ রাষ্ট্রের বেওয়ারিশ গল্প

২০১৯ সালে মুক্তি পায় নাসির উদ্দিন ইউসুফের তৃতীয় ছবি ‘আলফা’। ইতিপূর্বে তাঁর নির্মিত দুটি ছবির অভিজ্ঞতায় অনেকেই ভাবতে পারেন, আলফা-ও বুঝি মুক্তিযুদ্ধেরই ছবি। আদতে তা নয়। বরং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া রাষ্ট্র ও তার নাগরিকের মধ্যকার টানাপড়েন ও বিচ্ছেদের গল্প এই আলফা।

গল্প বলতে সেরকম বোল্ড কোনো স্টোরি-লাইন এতে নেই। আপাতদৃষ্টে প্রশ্ন ও প্রতিকারহীন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যেতে থাকি বলে কোনো ন্যারেটিভই দাঁড়ায় না। কিংবা বলা যেতে পারে, কোনো গল্পই পূর্ণতা পায় না যেন। তাই অসম্পূর্ণ, টুকরো-ছিন্ন জীবনের তুচ্ছ মুহূর্তগুলি আমাদের সামনে ধরা দেয় বৈচিত্র্যপূর্ণ কিন্তু অনাকর্ষণীয় ভঙ্গিতে। গ্ল্যামারহীন একটা জগৎ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এই গ্ল্যামারহীনতাকে—কস্টিউম, মেকআপ, ক্যারেক্টার কাস্টিং—সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবলীলভাবে সাহসিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছেন পরিচালক।

সংবাদ-মাধ্যমের মতো নিরাসক্ত এক উপস্থাপন—একটি প্রসঙ্গ দ্বারা আরেকটি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে যাওয়া—ইমেজের দিক থেকে কোলাজ, ইফেক্টের বিবেচনায় ক্যাকোফোনাস—কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্যে সাইলেন্স এবং রিজেকশন। রিজেকশন আমাদের ভ্যালুজ সিস্টেমের প্রতি। তারও আছে পৌরাণিক সাক্ষ্য। মহাভারতে যেমন, সন্তানবতী হবার আকাঙ্ক্ষায় রাজপত্নী মুনি-ঋষির দ্বারস্থ হচ্ছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিতান্ত গরিবের বউ গোলেনুরকে দেখতে পাই একজন শিল্পীর ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ফিরতে। 

মানুষের প্রয়োজন ও প্রবৃত্তির বাইরে নৈতিকতার কোনো স্থান নেই। নৈতিকতা তেমন শূন্যমার্গ কোনো আদর্শ যে নয় তার প্রমাণ এই নিত্যপুরাণ—আলফা, গোলেনুর ও হেকমতুল্লাহর পারস্পরিকতা। এটাকেই আমরা বলতে চাইছি নৈতিকতার রিজেকশন। এবং একইসঙ্গে মানবিকতার নিঃশব্দ আলিঙ্গন।

যেহেতু ঘটনাপ্রবাহ প্রশ্ন ও প্রতিকারহীন, তাই আলফা চরিত্রটি অত্যন্ত মিতবাক, প্রায় মৌন। ডাঙার সমস্ত কোলাহল বর্জন করে সে আশ্রয় নিয়েছে জলের ওপর। শূন্যের ওপর ঘর বাঁধার সংকল্পে যেন। তার প্রিয় সঙ্গীও তাই একটি বোবা প্রাণী—গাধা। এই গাধাটির নাম অবশ্য প্ল্যাতেরো নয়, মনু। মনু তো এক অর্থে প্রত্নমানব।

দুটি সমান্তরাল ধারা—আলফার নীরব চিন্তাস্রোত ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সরব সচলতা—শেষাবধি দুয়ের সংঘর্ষ আর তার ফলস্বরূপ এ মরজীবন জলের প্রভু খোয়াজ খিজিরের কাছে সমর্পণ। এভাবে আমরা এ মুভির স্টোরিলাইন টানতে পারি। একটু ব্যাখ্যা করা যাক।


তাহলে প্রথম যে প্রশ্নটি করা দরকার সেটি হলো, কে এই আলফা? তার নাম আলফা কেন? কেন নয় আলফাছ?


জল-বিচ্ছিন্ন বাঁশের ঘরটিতে আমরা প্রায়ই দেখি আলফাকে ধ্যান করতে—এমনকি জনমুখর, যান-চলাচলে অস্থির শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে। ধ্যানের মধ্যে সে অরণ্যচারী, যদিও তার নিবাস নগরোপান্তে। হয়তো সে পৌঁছুতে চায় প্রকৃতির প্রশান্তির মধ্যে। কিন্তু লক্ষ্যহীন এই প্রস্থানেও স্বস্তি নেই তার। ক্লান্তিহীন পরিভ্রমণে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই। তারপর অরণ্যচারী মানুষের সেবা তাকে সুস্থ করে তোলে। এখানে দৃশ্যই যেন দৃশ্যের ব্যাখ্যা। অর্থাৎ কেউ যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, অরণ্যজীবন রোমান্টিক কল্পনার মতো অনায়াসগম্য নয়। আদিবাসীদের সঙ্গে সৌহার্দ্য ও প্রীতির সম্পর্ক ছাড়া এবং অরণ্যজীবনের রিচুয়াল নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা না করে সেই জীবনকে পাওয়া সম্ভব নয়—এমনটা অনুমান করতে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ছবির মধ্যে এ দৃশ্য অবতারণার হেতু কী?

তাহলে প্রথম যে প্রশ্নটি করা দরকার সেটি হলো, কে এই আলফা? তার নাম আলফা কেন? কেন নয় আলফাছ? মহররমের মেলায় হারিয়ে যাওয়া এক ছেলে, যে লালিত-পালিত হয় নিঃসন্তান চিত্রকরের কাছে। সেই বুঝি তার নাম রেখেছে আলফা। কিন্তু কেন? আমাদের চট করে মনে পড়ে যাবে নেইল স্ট্রসের ‘আলফা মেইল’-এর কথা। কিন্তু এ আলফা তো সেই অর্থে সাকসেসফুল, সিডাক্টিভ, ডমিন্যান্ট কোনো পুরুষ নয়। নিতান্তই নিরীহ, সরল, আদিমানবের আর্কেটাইপ। যেন সত্যিই গ্রিক বর্ণমালার প্রথম অক্ষর। হরগৌরীর যুগলমূর্তি যে আঁকে, কেবল আঁকেই না, নিজের পুরুষসত্তার মধ্যে নারীসত্তাকে অনুভবও করে—সে তো আর কেউ নয়, লালনকথিত ‘সহজ মানুষ’। সমাজপ্রবর্তিত চিহ্ন ও ভেদগুলিকে যে চাইছে অতিক্রম করতে। চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত একটি গান যেন চরিত্রটির ব্যাখ্যা হিশেবে হাজির হচ্ছে:

রাধাভাবকান্তি যার মনে উদয়
কৃষ্ণপ্রেম তাহারি হয়
কৃষ্ণ-অনুরাগ বৈরাগ্যভাব
মন মজেছে তার কৃষ্ণরসে...

লিঙ্গজ্ঞান আছে যাহার
কৃষ্ণপ্রেম দুঃসাধ্য তাহার
রহমান বলে, হলো না আমার
ব্রহ্মলিঙ্গ এল না বশে।

গানের চিত্রায়ণে লিঙ্গ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ামাত্র ক্যামেরা ক্লোজশটে আমাদের সামনে নিয়ে আসে কালী নামের এক মাতৃভাবাপন্ন হিজড়ার বিষণ্ন অথচ প্রশান্ত মুখাবয়ব। আমরা চট করে বুঝতে পারি, সমাজে নারী বা পুরুষ পরিচয়ই মানুষের শেষ কথা নয়। মানবসত্তার গভীরে যা লুকিয়ে আছে তা লিঙ্গসীমার ঊর্ধ্বে। একইভাবে, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলির পারস্পরিক বোঝাপড়ার যে লোকায়ত রূপ, সেখানে রহমান বাউলও কৃষ্ণপ্রেমে মজতে চায়, রসিক মন তাতে বিদ্রোহ করে বসে না।

‘অতএব এসো আমরা সন্ধি ক’রে/ প্রত্যুপকারে বিরোধী স্বার্থ সাধি,/ তুমি নিয়ে চলো আমাকে লোকোত্তরে,/ তোমাকে বন্ধু আমি লোকায়তে বাঁধি’—এই মর্মে পরস্পরবিরোধী স্রোতগুলিকে একটি ধারায় মেলাতে চেয়েছেন পরিচালক। তাই আলফার ধ্যানের মধ্য দিয়ে নগরজীবনে প্রবেশ করতে চায় অরণ্যচারী আদিবাসীরাও। 


নাসিরউদ্দিন ইউসুফ প্রকারান্তরে জাতীয়তাবাদী প্রকল্প থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘সহজ মানুষ’-এর প্রস্তাব হাজির করেছেন


বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রকল্পে গরহাজির কিংবা গরমিল দেবার যে চেষ্টা ছিল শুরুতে, এমনকি ৭২-এর সংবিধানে যে অসাধুতা সাধু ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়েছে, ‘এই রাষ্ট্রের সকল নাগরিক বাঙালি বলিয়া অভিহিত হইবে’—তার একটা মেরামতি প্রয়াস ‘আলফা’ ছবিতে আভাসিত। দৃশ্যত আভাস, কিন্তু খতিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারব, এর প্রবল প্রস্তুতি পরিচালকের শিল্প-অভিজ্ঞতায় শামিল।

এই মেরামতি বা মেলাবার চেষ্টায় নাসিরউদ্দিন ইউসুফ প্রকারান্তরে জাতীয়তাবাদী প্রকল্প থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘সহজ মানুষ’-এর প্রস্তাব হাজির করেছেন। এমনকি আলফা নামের ভিতর দিয়ে, কখনোবা মোজার্টের সঙ্গীত-আবহে তাকে বাংলার চৌহদ্দি থেকে টেনে নিয়ে দাঁড় করাতে চেয়েছেন বিশ্বের খোলা মঞ্চে।

কিন্তু বিশ্ব তো দূরস্থান, বাংলা নিজেই যেন প্রস্তুত নয় তার জন্য। সহজ মানুষের দীক্ষায় তো রাষ্ট্র চলছে না। স্বাধীনতার পর থেকেই পদে পদে তার পদচ্যুতি। সামরিক অভ্যুত্থান, কারফিউ, গুলিবর্ষণ—এসব কেবল সাদাকালো অতীতের কথা নয়, নয় শুধু আলফার শৈশবস্মৃতি। যৌবনে এসেও সে মুখোমুখি হয় ক্রসফায়ারের নামে নির্বিচার গুলিতে হত্যা, কারখানায় অগ্নিসংযোগে মৃত্যু—এমন সব অপঘাতের। তার চেতনার পটে কেবলই ছড়ায় রঙের আর্তচিৎকার। 

শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে আলফা—তার অন্তর্ভুবনের সঙ্গে বহির্ভুবনের দূরত্বমোচনে। সুলেমান নামের এক বেওয়ারিশ লাশের প্রতিকারের জন্য নয়, সৎকারের জন্য। সেটুকুও অসম্ভব হয়ে ওঠে। মৃতের ভাসানযাত্রায় শেষ হয় গল্প। আমরা বেহুলার মতো সঙ্গী হই তার। কিন্তু প্রশ্ন, আমরা কি পারব তাকে আর ফিরিয়ে আনতে?

সত্যিকার অর্থে, ছবিটা শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আশল সিনেমা। যেন আমরা, দর্শকেরা, প্রত্যেকে হয়ে উঠি বেওয়ারিশ। যে জীবনের আকাঙ্ক্ষা এ দেশের মাটিতে উদ্ভিন্ন, মানুষের গানে উদ্বোধিত, সে জীবন হারাল কোথায়? কিভাবে আমরা ক্রমশ খাপছাড়া, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম? কখন হাতছাড়া হয়ে গেল নিজেরই হাতে গড়া রাষ্ট্র?—সহজ মানুষের ঠাঁই আর যেখানটাতে নাই।

দৃশ্যের ভাঁজে ভাঁজে চকিত ইঙ্গিত ও ইশারা রেখে যাওয়া, তার মধ্য দিয়ে পুরাণ ও বাস্তবের সমান্তরাল গল্প বলা ছবি অত্যন্ত বিরল আমাদের দেশে। এর মধ্যে আছে মহাজীবনের বয়ান, সংলাপ-স্বল্পতায় মহাকাব্যিক দীর্ঘশ্বাস।

সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা