কার্তাহেনা
বাস যদিও বলেছি, আসলে ওটা ভ্যান-এর আয়তনের এক যাত্রীবাহী বাস। বলা যাক ছোট আকৃতির বাস। এটা বাররাঙ্কিয়া থেকে ছাড়ে, মাঝে কোথায়ও না থেমে একেবারে সরাসরি কার্তাহেনা গিয়ে পৌঁছায়। যাওয়ার পুরো রাস্তাটাই একেবারে ক্যারিবীয় সমুদ্রতীর ঘেঁষে। আমরা যে-সময় গিয়েছি সেসময় এই অঞ্চলে তাপমাত্রা মোটামুটি ৮০ থেকে ৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকে। তার মানে মোটামুটি আমাদের গরমকালের মতোই। সামান্য হেরফের হতে পারে, কিন্তু সেটা বড় কিছু নয়।
তাপস বোধহয় সারাটা পথ চোখ খুলে রেখেছিল সমুদ্রতীরবর্তী নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার জন্য। আনিস তো প্রায়ই আসে, বাসের জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ দেখার পরই সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেবল আমি আর তাপসই ছিলাম দৃশ্যভুক বাঙালযাত্রী। বাসের অন্য যাত্রীদেরকে মনে হলো কলম্বীয়ই হবে। অন্তত টুকটাক কথাবার্তা যা শুনেছি তার সবটাই স্প্যানিশ। অবশ্য হতে পারে স্প্যানিশভাষী অন্য দেশেরও লোকজনও ছিল। কিন্তু বুঝে ওঠার উপায় তেমন নেই।
কার্তাহেনায় যখন পৌঁছেছি রৌদ্র ততক্ষণে নরম হয়ে এসেছে। খুব সম্ভবত বিকেল চারটার দিকে পৌঁছেছিলাম। আকাশে মেঘের কোনো চিহ্ন নেই। আরাকাতাকা কিংবা বাররাঙ্কিয়া থেকে একেবারেই ভিন্ন চেহারা এই কার্তাহেনার।
১৫৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বন্দরটি। ঔপনিবেশিক যুগে গোটা কলম্বিয়ায় এটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর একটি। নানান ধরনের পণ্য আনা-নেয়ার পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল দাস বেচাকেনার রমরমে ব্যবসা। এই বন্দরটির যিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা, সেই পেদ্রো দে এরেদিয়ায়ই এখানে দাস-ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ইউরোপীয় দাস-বণিকরা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দাস এনে এই বন্দরে ফেলত। আর এইসব দাসদের, প্রথম দিকে, ব্যবহার করা হয়েছিল বন কেটে বসতি স্থাপনের জন্য। দাস-ব্যবসা এতটাই রমরমা হয়ে উঠল যে সতের শতকে গোটা নয়া বিশ্বে (New World) এই বন্দরটিই হয়ে উঠল প্রধান কেন্দ্র। ইতিহাসের এই পৃষ্ঠাগুলো উল্টে দেখার কারণটা এবার বলি। এখানে এসেই শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি কালোদের পরিমাণ বেশ চোখে পড়ার মতোই মনে হলো। এমন নয় যে কলম্বিয়ার অন্য অঞ্চলে কালোদের বংশধরদের দেখা পাওয়া যাবে না। সেই আরাকাতাকাতেই দেখেছি। এমনকি, মার্কেসের কুঞ্চিত চুলও কি কালো পূর্বপুরুষদের রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না? তবে ওই আরাকাতাকা, বোগোতা ও বাররাঙ্কিয়ার চেয়ে এখানে মিশ্রণটা অনেক বেশি চোখে পড়বে। বন্দরনগরী হওয়ার কারণেই যে এটা ঘটেছে তার সূত্রটি স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য ইতিহাসকে ছুঁয়ে আসা।
শহরের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে আমরা একটা ছোট্ট পার্কের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এটি পার্কে বলিবার হিসেবে পরিচিত। বলিবার মানে সেই স্বাপ্নিক সিমন বলিবার যিনি গোটা আমেরিকাকেই স্পানঞলদের হাত থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বহু দেশ মুক্ত করেও ছিলেন। কলম্বিয়াও তার স্বাধীন করা দেশগুলোর একটি। তারই স্মরণে পার্কের কেন্দ্রে পাথর বা ধাতব একটি শিল্পকর্ম রয়েছে, যেখানে সিমন বলিবার অশ্বারোহী অবস্থায় দৃশ্যমান।
কার্তাহেনায় পা দেয়া মাত্রই তাপসকে অনেক বেশি উৎফুল্ল দেখালো। মনে হচ্ছে এই ঔপনিবেশিক রীতির শহরটি তার মনকে ছুঁয়ে গেছে। চারপাশকে কৌতূহলের সাথে শুষে নিচ্ছে তার কুহকী দুচোখ। এই শহরটির আসলেই এক ভিন্ন রকম আকর্ষণ আছে। বাড়িঘরগুলোর স্থাপত্যরীতিতে আছে ঔপনিবেশিক শৈলী। আছে ক্যারিবিয় বহু বর্ণের স্বাধীন প্রকাশ। কমলা, মেলন, নীল, সবুজ, লাল আর মার্কেসের প্রজাপতির সেই প্রিয় রং হলুদ বর্ণের বাড়িঘর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষের মনের স্ফূর্তি, আনন্দ আর সহাবস্থানের সম্প্রীতি। যাদের মন বহুত্বের প্রতিনিধি তারা যে মিশুক প্রকৃতির হবে—এ তো এমনিতেই অনুমান করা যায়। শুধু মানুষও নয়, এমনকি এখানকার পশুপাখিও ওরকম স্বভাবই অর্জন করেছে। বলিবার পার্কে ঢুকতেই উন্মুক্ত স্থানে এক ঝাঁক কবুতর তাপসের আশপাশে জড়ো হয়ে আছে। বিনয় মজুমদারের সেই পঙ্ক্তিটি এই পাখিগুলো মিথ্যে প্রমাণ করছে: মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়। এরা হয়তো সারস নয়, কিন্তু পাখি-গোত্রেরই তো। মানুষের সাথে দিব্যি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন দৃশ্য ইউরোপের অন্যান্য শহরেও আমি ছবিতে দেখেছি, সেসবও যে সম্প্রীতির নমুনা তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।
পার্কের একপাশে তিন রমণী ফল বিক্রি করছে দেখে আমি ‘নাড়ীর’ টানে ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম। কালো বর্ণের এই নারীগুলো অলক্ষ্যে আমাকে ঔপনিবেশিক সেই নিষ্ঠুর যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু কী আশ্চর্য—তাদের অদম্য প্রাণশক্তি দেখিয়ে দেয় যে জীবনের আনন্দকে ইতিহাস তার হিংস্র থাবা দিয়ে সবটা নিতে চাইলেও, পুরোপুরি লুট করে নিতে পারে নি। তা যে পারে নি 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা রে আলোর নাচন’। ওদের সঙ্গে রঙ্গরসে যে-কোনো আজনবি ওদের স্বজন হয়ে উঠতে পারে অনায়াসে। আমি যখন ওদের সঙ্গে হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছিলাম ভাষার ছাড়পত্রের সুবাদে, তখনই এসে হাজির হলেন এক ভদ্রলোক। তিনি আনিসের সাথে এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন তিনি আনিসের অনেক আগে থেকেই চেনা। আমি এবং তাপস খানিকটা মুখ চাওযাচাওয়ি করে বিস্ময় আর কৌতূহলী চোখে অপেক্ষা করছি ভদ্রলোক চলে গেলে আনিসের কাছে তার পরিচয় জানতে চাইব বলে। কিন্তু যা ভাবছি, ঘটতে যাচ্ছে তার উল্টোটাই—আনিসের সঙ্গে ভদ্রলোক এদিকেই এগিয়ে আসছেন। 'রাজু , তাপস, ইনি মার্কেসের ভাতিজা গাব্রিয়েল এলহিও গার্সিয়া। এখানেই থাকেন।'তার সঙ্গে করমর্দনসহ সৌজন্য বিনিময়ের পরপরই তিনি আমাদেরকে হাতবাহী লাগেজ তার তত্ত্বাবধানে রাখার প্রস্তাব দিয়ে শহরটা ঘুরে দেখার প্রস্তাব দেন। আমি ভাবছি এই ভদ্রলোক কিভাবে উদয় হলেন। ব্যাপারটা যে মোটেই কাকতালীয় নয়, সেটা সহজবুদ্ধিতেই অনুমান করা যায়। আমরা দুজনই যেহেতু তার সাথে আগে থেকে পরিচিত নই, দেখতে পাচ্ছি আনিসই তার সাথে প্রথম কথা বলতে শুরু করেছেন, তার মানে আনিস তাকে আগে থেকেই জানত। আনিস বোধহয় আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিল যে আমরা আসছি। তিনি সেই তথ্য-অনুযায়ীই আবির্ভূত হয়েছেন। অলক্ষ্যে আনিসই হচ্ছে নাটের গুরু। 'চল, আমরা হাতের বোঝাগুলো তার জিম্মায় রেখে কার্তাহেনা শহরটা একটু দেখে আসি।'—কথাগুলো আনিস এমনই নির্বিকারভাবে বলল যেন সংযোগের এই ঘটনাটা সম্পর্কে ওর কোনোই ভূমিকা নেই। গেরিলা কায়দায় যে এত কিছু করতে পারে তার প্রস্তাবকে উপেক্ষা করা অনুচিত ভেবে আমরা মার্কেসের ভাতিজাকে ইমাম ভেবে অনুসরণ করতে থাকি। কাছাকাছিই অবস্থিত মিউনিসিপাল অফিসের তৃতীয় তলায় ওঠার পর গাব্রিয়েল এলহিও এক গার্ডকে বললেন আমাদের ব্যাগগুলো নিরাপদ স্থানে রাখার জন্য। সম্ভবত তিনি এই অফিসের বড় কোনো কর্মকর্তাই হবেন—তবে আমি নিশ্চিত নই। আনিসও এ ব্যাপারে জানে বলে মনে হয় না। যাই হোক, নিরাপত্তার সব রকম নিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমি কাল্পনিক ভয়ে ল্যাপটপটিকে নিজের সঙ্গেই রাখলাম। রাখার কারণ, যদি কোনো কারণে, ধরা যাক, একেবারে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় অন্য সবকিছুর সাথে আমার ল্যাপটপটি হারিয়ে যায় তাহলে আমার অফিসের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এটার মধ্যে আমার নিজের অনেক তথ্যভাণ্ডার তো আছেই—সেগুলোর গুরুত্বও কম নয়। কিন্তু আমার প্রধান মাথাব্যথা আমার অফিস, কারণ আমি অফিসের কাজ এই দূর দেশ থেকেই অব্যাহত রাখব—এই শর্তেই এসেছি। এবং কোনো অজুহাতেই এই শর্ত ভঙ্গ করা যাবে না। প্রথম কথা হলো, আমার ল্যাপটপটি না থাকলে কি কাজ করতে কোনো অসুবিধা হতো, আমি কি অন্য কোনো ল্যাপটপ থেকে কাজ করতে পারতাম না? না, আসলেই পারতাম না বলেই আমি নিজের ল্যাপটপটিকে নিজের কাছেই রাখার পক্ষপাতী ছিলাম। কারণ, এটাতে কাজের অনুকূল এমন সব ফন্ট আর প্রোগ্রাম ইন্সটল করা আছে যা আমি অন্য কারো ল্যাপটপে পাবো না—তা সে যত দামি আর দক্ষই হোক না কেন। আমার কাজের সাথে সম্পর্কিত আরও কিছু বিষয় আছে যেগুলো অন্যদের কাছে তুচ্ছ কিংবা গুরুত্বহীন বলে মনে হবে, কিন্তু আমার কাছে ওগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। গাব্রিয়েল এলহিও আমাকে এটিও রেখে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও আমি এমনভাবে জবাব দিলাম যাতে করে বুঝতে পারে এটি এমন কোনো ভারি বিষয় নয়, সুতরাং এনিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ভদ্রলোক পীড়াপীড়ি না করায় আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
আমাদেরকে তিনি ঘণ্টাখানেকের জন্য কার্তাহেনা দেখাবার জন্য সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হলেন। পার্কের কাছেই একটা নৌ-স্মৃতিশালা ছিল, কিন্তু সেদিন বন্ধ থাকায় তিনি আমাদেরকে ওটা দেখাতে না পেরে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। দেখতে পারলে মন্দ হতো না। কিন্তু বিধি বাম। অতএব হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে তিনি নিয়ে গেলেন। মার্কেস যে পত্রিকা-অফিসে কাজ করতেন সেটাও দেখালেন তিনি, তবে বাইরে থেকেই কেবল। আর শহরের যেসব প্লাজা আছে, অন্তত এই বন্দরের নিকটবর্তী, সেগুলো প্রশস্ত চত্বরসম্পন্ন হলেও পুরোনো বাড়ির গলিগুলো বেশ সরু। মনে হয় না গাড়ির চলাচলের জন্য তা যথাযথ। অবশ্য গাড়ি তেমন চোখেও পড়ে না। বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ই বেশি এই অলিগলিতে। গলির দুপাশে রেস্তোরাঁ আর নানান রকম উপহারসামগ্রীর দোকানই বেশি। এ না হয়ে উপায়ই-বা কী! এ যে পর্যটন এলাকা। শুধু এই অলিগলির দোকানগুলোই নয়, গোটা এলাকটিকেই আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য এখানকার কর্তৃপক্ষ সবই করেছে বলে মনে হয়। কেবল ভবনের ঔপনিবেশিক নির্মাণের সৌন্দর্যকেই একমাত্র পুঁজি করে বসে থাকে নি কর্তৃপক্ষ, যুক্ত করেছে নানান ধরনের শিল্পকর্ম যা এখানকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যসম্মত।
তাপস এই শহরের সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গেল যে প্রায় স্বগত ভঙ্গিতে বলে উঠল, 'আগামী বছরই এখানে আসতে হবে বউকে নিয়ে।' আমার নিজের কাছেও এই শহরটিকে খুব সুন্দর বলে মনে হয়েছে। ইতিহাসের স্মৃতিকাতরতা ও দীর্ঘশ্বাস যেখানে মিলেমিশে থাকে সেখানে আমার এক প্রগাঢ় আকর্ষণ কাজ করে। তাপসের ক্ষেত্রে কী কাজ করেছে জানি না, আমার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটাকেই মুখ্য মনে হয়েছে। কিন্তু আনিস? আনিস এমনই নির্বিকার ভঙ্গিতে সব কিছু অবলোকন করছে—প্রায় উচ্ছ্বাসহীন অবস্থায়—দেখলে মনে হবে ও বুঝিবা আমাদেরকে সঙ্গ দেয়ার জন্যই এখানে এসেছে। আমি ওর সত্যিকারের উচ্ছ্বাস লক্ষ করেছি সেই আরাকাতাকায়। কথায় আর শারীরিক অভিব্যক্তিতে আনিস তার মুগ্ধতাকে যেনবা পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশ করেছে।
এক-একজনের ভালো লাগা যে কোন জায়গায় ন্যস্ত হয় তা এক রহস্যময় ব্যাপার। এমন নয় যে এই কার্তাহেনা তার অপছন্দের। কিন্তু ব্যাপার হলো এই যে কখনো কখনো সবকিছু একই সমতলে এসে মিলিত হয় বলেই—সেও নানান রকম শর্তপূরণের সাক্ষেপে বলেই—আমরা একটি মাহেন্দ্রক্ষণকে পেয়ে যাই। আনিসের ক্ষেত্রে সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি ছিল আরাকাতাকা, তাপসের ক্ষেত্রে এই কার্তাহেনা।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পায়ে হেঁটে ঘোরাঘুরি যে বেশ ক্লান্তিকর সেটা ওরা টের পাওয়ার আগে আমিই টের পেয়েছিলাম প্রথম, কারণ আমি সিন্দাবাদের বুড়োর মতো এই ল্যাপটপ বয়ে বেড়াচ্ছি। অতএব, এবার এমন কোথায়ও গিয়ে বসতে হবে যেখানে ক্লান্তিমোচন হবে। আনিস আমাদেরকে সমুদ্রতীরবর্তী নাউতিলুস (Nautilus) নামক এক অভিজাত হোটেলে নিয়ে গেল। মার্কেসের ভাতিজার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার আগে এক নৈশভোজের পরিকল্পনা হয়তো সে আগেই করে রেখেছিল, তারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে আমাদের বিশ্রাম ও ভোজের মাধ্যমে। ওয়াইন আর সুখাদ্যের পরিবেশন শুধু ক্লান্তিমোচনের জন্যই নয়, তা যেন শক্তিসঞ্চয়েরও উপায় হয়ে উঠল। কয়েক ঘণ্টা পরেই তো আবার আমাদেরকে উড়তে হবে বোগোতার উদ্দেশ্যে।
মার্কেসের ভাতিজার সাথে মূলত আনিসেরই কথা হয়েছিল বেশি, আমি আর তাপস ছিলাম নিছকই শ্রোতা মাত্র। আমার কোনোই অংশগ্রহণ ছিল না। ভদ্রলোক গার্সিয়া মার্কেস সম্পর্কে এমন অনেক কথা বললেন যা মার্কেসের জীবনীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না; আর সেগুলোর অনেকটাই একান্ত পারিবারিক বিষয়।
কার্তাহেনার যে-বিমানবন্দর সেটার কেতাবি নাম El Aeropuerto Internacional Rafael Núñez হলেও, এটি Aeropuerto Cartagena de Indias নামেও পরিচিত। মার্কেসের ভাতিজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছেছিলাম রাত ৯টা সাড়ে ৯টার দিকে। ছোট্ট এয়ারপোর্ট, কিন্তু সেটাও আমাদের ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চেয়ে বড়। চেকআপ, বোর্ডিং পাস-এ কোনো ঝামেলা তো হয়নি, বরং সবকিছুই হয়েছে দ্রুততার সাথে। আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি সেই উৎসে যেখান থেকে কলম্বিয়া ভ্রমণের শুরু। বোগোতায় ফেরা আমাদের সবার জন্যই ছিল উত্তেজনাকর। আমার জন্য একটু বেশিই বলা যায়, কারণ ওখানে এবার ফিরে দেখা হবে আমার বন্ধু কাইয়োর সাথে, যে বেশ কয়েক বছর চাকরিসূত্রে ঢাকায় ছিল। দেখা হবে আমাদের বন্ধু আন্দ্রেসের সাথে, যে বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে আমাদের ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেছিল। আর দেখা হবে আমার আরেক বন্ধু কবি ফের্নান্দো দেনিসের সাথে, যাকে আমি এখনও পর্যন্ত দেখি নি, কিন্তু কথা হয়েছে ফেসবুকে ম্যাসেঞ্জারে।
দেনিসের সাথে পরিচয় হয়েছিল একেবারেই আকস্মিকভাবে। আমি তাকে আগে থেকে চিনতাম না। কলম্বিয়া যাওয়ার জন্য প্রথমে এসেছিলাম নিউইয়র্কে তাপসের বাসায়। নিউইয়র্ক আসার কারণ তাপসকে নিয়ে একসাথে কলম্বিয়া অভিযানে বের হওয়া। পরিকল্পনা আগেই ঠিক করা হয়েছিল, সেভাবেই কাটা হয়েছিল আমাদের টিকেট। আমি যখন তাপসের বাসায় অবস্থান করছি, তখন হঠাৎ করেই দেনিসের একটা ম্যাসেজ এল আমার কাছে। বলল, সে আমার কিছু কবিতা পড়েছে, আমার কবিতা তার পছন্দ। এছাড়া শ্রদ্ধাভাজন স্প্যানিশ সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শ্যামাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে নাকি আমার অনেক প্রশংসা শুনেছে। স্প্যানিশ সাহিত্য সম্পর্কে আমার আগ্রহ ও চর্চার কথা শামুদার কাছ থেকে শুনে বোগোতার প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র Casa de poesia Silva নামক একাডেমিতে ঘণ্টাব্যাপী আমার একক কবিতাপাঠ ও আলোচনার আয়োজন করতে চায়। আমি যেন এই আমন্ত্রণ গ্রহণে সম্মতি জানাই। আমি সানন্দে সম্মতি জানানোর পর দেনিস পাঠের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করে আমার প্রতিকৃতি, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও একটি কবিতাসহ পোস্টারও তৈরি করে প্রচার কাজ শুরু করে দিয়েছিল।
কাসা সিলভা সম্পর্কে আমার আসলেই কোনো ধারণা ছিল না। আমি সঙ্গে সঙ্গে শামুদাকে ফোন করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম আমার সম্পর্কে দেনিসকে শংসাপূর্ণ প্রত্যয়নের জন্য। শামুদা তার স্বভাবসুলভ প্রশ্রয় ও উদারতা থেকে বললেন, 'তুমি তো এটা ডিজার্ভ করো। তুমি এত কাজ করেছ লাতিন আমেরিকান সাহিত্য নিয়ে—এটা তো ওদের জানা উচিত। তাছাড়া, তুমি তো খুব ভালো কবিতাও লেখ।' আমি কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, 'আমিও আমন্ত্রিত হয়ে একবার গিয়েছিলাম ওখানটায়। ভারতীয় এবং লাতিন আমেরিকান সাহিত্য নিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক বক্তৃতা দিয়েছিলাম। বোগোতার আরও প্রায় দশটা বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তৃতা করেছি। জানো তো, এই কাসা সিলভা কিন্তু খুব বড় একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ওখানে তোমার প্রিয় অনেক বড় বড় লেখকদেরকে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছে ওরা।' শামুদা সেই বড় বড় লেখকদের কয়েকজনের নাম বললেন। এদের নাম বলার সঙ্গে সঙ্গেই আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ওরা তো তাহলে মারাত্মক ভুল করে বসে আছে আমাকে দাওয়াত দিয়ে। আর শামুদা, যিনি জানেনই যে ওখানে এত বড় বড় লেখকদেরকে নিয়ে অনুষ্ঠান করেছে, সেখানে আমার নাম তিনি প্রস্তাব করলেন সজ্ঞানে? আমার প্রতি তার আবেগ ও স্নেহই কি তাকে এমন প্রস্তাবে উদ্বুদ্ধ করেছে? এছাড়া আর কী হতে পারে! আমি ভয়ে ভয়েই বললাম, 'শামুদা, আপনি করেছেন কী! আমি তো এই কাসা সিলভা সম্পর্কে সত্যিই কিছু জানতাম না। তার উপরে, সাহিত্যের এমন সব মহাজনদের যেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেখানে আমার উপস্থিতি কি হাস্যকর হয়ে উঠবে না?'
শামুদা অভয় দিয়ে বললেন, 'আরে না, কী যে বলো! তুমি যাও না সেখানে, দেখবে সব তোমার কাছে সহজ হয়ে যাবে।' হাসতে হাসতে বললেন, 'তুমি তো স্প্যানিশ জানো, ওদের সাহিত্য সম্পর্কেও তোমার ধারণা আছে। তাছাড়া, দেনিস তো আছেই।' সত্যি বলতে কি, শামুদার এই অভয়-উক্তিকে সঞ্চয় করে আমি খানিকটা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলাম। দেনিসকে অবশ্য আমি সেই ভয়ের কোনো আভাসই জানতে দেই নি। দিয়েইবা কী হবে? আমি তো না জেনে রাজি হয়ে তাকে সম্মতি জানিয়েই দিয়েছি। এখন তা সফল করার পালা।
[চলবে]