গার্সিয়া মার্কেসের সন্ধানে কলম্বিয়া 

২য় পর্বের লিংক


বাররাঙ্কিয়ার দিকে 

এবার আমাদের আরাকাতাকা ছেড়ে যাওয়ার পালা। এই বিকেলেই আমাদের রওয়ানা হতে হবে বাররাঙ্কিয়ার উদ্দেশে তরুণ কথাসাহিত্যিক পাউল ব্রিতোর সাথে দেখা করার জন্য। পাউলের সাথে আগেই আমরা কথা বলে রেখেছি। বাররাঙ্কিয়া যাওয়ার আরও একটি কারণ, এখানটায় মার্কেস গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় কাটিয়েছেন। পাউলকে আমি চিনি কলম্বিয়ার আরেক তরুণ লেখক আন্দ্রেস মাউরিসিওর মাধ্যমে, আর মাউরিসিওকে চিনেছিলাম ঢাকাস্থ কলম্বীয় বন্ধু কাইয়ো বেতাঙ্কুর-এর মাধ্যমে। পাউলের ওখানে যেহেতু যাচ্ছি তাহলে পরিচয়ের এই কাহিনি বয়ান করলে আাশা করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 

আন্দ্রেস ও কাইয়ো

কাইয়োর সাথে পরিচয় ঢাকায়। তার দেশ থেকে সে এই প্রান্তে এসেছিল একটি বিদেশি কোম্পানিতে কাজের সূত্রে। বেশ কয়েক বছর এই ঢাকা শহরে ছিল। আমার বাসায় সে অতিথি হয়ে এসেছে বহুবার। বলতে গেলে আমাদের খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন ছুটিতে নিজের দেশে যেত, ফেরার সময় আমার জন্য বইপত্র কিছু না কিছু নিয়ে আসতই, যেহেতু সে জানে বইয়ের প্রতি আমার আকর্ষণের কথা। আমার লেখালেখির কথা জানে বলেই একবার সে বলল যে তার পরিচিত কয়েকজন কলম্বীয় বন্ধুর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেবে। করলও তাই। ফেসবুকের মাধ্যমে সে আন্দ্রেস-এর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। পরের বছর যখন সে বোগোতায় গেল, সঙ্গে করে নিয়ে এল আন্দ্রেসের স্বাক্ষর করা তার একটি উপন্যাস। বাংলা একাডেমির আয়োজনে যখন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হলো তখন তৎকালীন মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানতে চাইলেন লাতিন আমেরিকা থেকে কাকে এই অনুষ্ঠানের জন্য ডাকা যায়, আমি তখন আন্দ্রেস-এর নাম প্রস্তাব করেছিলাম। আন্দ্রেস এই আমন্ত্রণের সূত্রে ঢাকায় এসেছিল। ঘটনাক্রমে সেই সময় আনিসও ঢাকায়। আনিস ও আমি দুজনে মিলে আন্দ্রেস-এর বক্তৃতাটি অনুবাদ করেছিলাম আমার বাসায় বসে মূল লেখকের উপস্থিতিতে। আমরা একসাথে বেশ কয়েকটা আনন্দময় দিন কাটিয়েছিলাম। আন্দ্রেস যখন ঢাকা এসেছিল, তখন কলম্বিয়া থেকে আমার জন্য বেশ কিছু উপহার নিয়ে এসেছিল, অমূল্য সেই সব উপহারের মধ্যে ছিল পাউল ব্রিতোর El Ideal De Achiles, যা পড়ে  আমি অনুবাদ করতে প্রলুব্ধ হই। অনুবাদে করতে গিয়ে কিছু কিছু জায়গায় হোঁচট খাওয়ায় পাউলকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে সেগুলোর সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লষণ জেনে এগুতে থাকি। ওটার অনুবাদ শেষ হওয়ার আগেই ডাক এল কলম্বিয়া ভ্রমণের। কলম্বিয়া যাচ্ছি শুনে পাউল আমাদেরকে বাররাঙ্কিয়ায় তার আতিথেয়তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সেই আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য আমাদের বাররাঙ্কিয়া যাওয়া।

আরাকাতাকা থেকে বাররাঙ্কিয়া বাসে মোটামুটি দুই ঘণ্টার রাস্তা। রাফায়েল আমাদেরকে বাস ধরিয়ে দেয়ার জন্য কাছাকাছি একটি বাস স্টেশনে নিয়ে গেল। বাসের অন্যান্য যাত্রীরা চলে এলে বাস ধীরে ধীরে বাররাঙ্কিয়ার দিকে এগুতে শুরু করে। আরাকাতাকা যেমন মার্কেসের নামে বিখ্যাত, তেমনি বাররাঙ্কিয়াও আরেক কলম্বীয় প্রতিভার জন্য বিখ্যাত। যারা স্প্যানিশ গান শুনে অভ্যস্ত তারা শাকিরার কথা নিশ্চয়ই জানেন। এই শাকিরার জন্মস্থান বাররাঙ্কিয়া। সুতরাং সাহিত্যের এক মহাজনের জন্মস্থান ছেড়ে সঙ্গীতের সুপারস্টার শাকিরার জন্মস্থান দেখতে যাচ্ছি। শাকিরার জন্মস্থান হলেও মহর্ষি মার্কেসের বেশ কিছু বছর এই বাররাঙ্কিয়ায় কেটেছে। এই বাররাঙ্কিয়ার অনেক বড় বড় লেখকের সঙ্গে কেটেছে তার যৌবনের উত্তাল সময়।

যাওয়ার পথে যতটুকু জানালা দিয়ে দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল আমাদের বাংলাদেশের গ্রাম এবং ছোট ছোট হাটবাজারের মতোই। একই রকম প্রাকৃতিক দৃশ্য, দারিদ্র্যের ছাপও প্রায় একই রকম। সেদিন রাতের বেলা এসেছিলাম বলে সিয়েনাগার অনেক কিছুই দেয়া হয়নি, এবার বাররাঙ্কিয়া যেতে এই সিয়েনাগা হয়ে যেতে হচ্ছে বলে সেই অদেখা পুষিয়ে নিতে পারছি। আরাকাতাকা থেকে আমরা যাচ্ছি উত্তর দিকে, সিয়েনাগা পর্যন্ত আমাদেরকে এভাবে যেতে হবে। সিয়েনাগা পৌঁছে আমরা যাব পশ্চিম দিকে। এই পশ্চিম দিকে যাওয়ার সময় হাতের ডান দিকে নীল জলের ক্যারিবীয় সমুদ্র আর ডান দিকে বিশাল জলাশয়, আমাদের বর্ষার হাওড়ের মতোই অনেকটা। আমি সমুদ্রের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম বেশির ভাগ সময়। যেখানেই সমুদ্রতীর খানিকটা প্রশস্ত, অর্থাৎ সৈকত বলতে আমরা যা বুঝি, সেখানেই রংবেরঙের পোশাকে মানুষের হুল্লোড়, যেন 'জগৎ-পারাবারের তীরে শিশুরা করিছে খেলা'। প্রেমিক তার প্রেমিকা নিয়ে, পুরুষ তার দয়িতাকে নিয়ে, স্বামী তার স্ত্রীকে নিয়ে; সন্তান থাকলে দারাপুত্রপরিবারসহ সমুদ্রের ঢেউয়ে তারা লুটোপুটি খাচ্ছে। মানুষ যেন সর্বত্রই অদম্য প্রাণশক্তিতে বলীয়ন আর সেটা অনেক বেশি প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে জনসমাগমে। দারিদ্র্য এদেরকে কাবু করে না, যেন আরও বেশি লড়াকু করে তোলে। 

সমুদ্রতীর ধরে আমরা যখন বাররাঙ্কিয়ায় প্রবেশ করেছি ততক্ষণে সূর্য ডুবে সন্ধ্যা হওয়ার উপক্রম। বাস আমাদেরকে যেখানে নামিয়ে দিল সেটা শহরের ভেতরে হলেও পাউলের বাসা থেকে তখনও বেশ খানিকটা দূরে। 

এখন কোন দিকে যাব? আনিস ওর  ফোন থেকে পাউলকে কল দিয়ে ঠিকানাটা জেনে নিলে আমরা একটা ট্যাক্সি ধরে এবার পাউলের ঠিকানায় দিকে ছুটতে শুরু করলাম। সম্ভবত মিনিট পনের পরেই আমরা পাউলের আবাসস্থলে এসে পৌঁছে গেলাম। রাত তখন মোটামুটি সাড়ে ৭টার মতো বেজে গেছে। পাউল ছয়সাত-তলা এক ফ্ল্যাটবাড়ির একটিতে বউ আর একটি মেয়ে নিয়ে থাকে। পাউলের পিছু পিছু ওর ফ্ল্যাটে ঢুকতেই ওর সুন্দরী বউ আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানাল। ড্রয়িংরুমে বসার আগেই পাউলকে আলিঙ্গন দিয়ে বললাম, অবশেষে দেখা তোমার সাথে। কী আনন্দ, পৃথিবীর ঠিক অপর প্রান্ত থেকে এই সুদূর বাররাঙ্কিয়ায়! পাউল আমাদের আগমনে যে খুবই খুশি হলো তা ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। ওর বউয়ের সাথে আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিল, 'এ হচ্ছে আমার স্ত্রী জয়েস?'  'জয়েস?'—আমি ভ্রু কুঁচকে উচ্চারণটা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়ার চেষ্টা করলাম। জয়েস তো কোনো স্প্যানিশ নাম নয়। এ নাম কী করে হলো! পাউল বোধহয় আমার সন্দেহ বুঝতে পেরে বলল, 'হ্যাঁ, জয়েস, যেমন জেমস জয়েস। তবে জেমসটা বাদ দিতে হবে। হা হা হা।' 'বাহ, চমৎকার নাম তো!' জয়েস যেমন সুন্দরী, তেমনি মিষ্টি স্বভাবের। আমাদের সাথে পরিচিত হয়ে জয়েস ডাইনিং টেবিলের পাশে ফ্রিজ থেকে আমাদের জন্য ঠান্ডা বিয়ার নিয়ে এল। বিয়ারে চুমুক দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমার মেয়েকে দেখছি না যে!'

পাউল ও তার স্ত্রী জেমসের সঙ্গে লেখক

'ও, এম্মা বোধহয় ওর রুমে খেলাধুলা করছে।' জয়েস নিজেই গিয়ে মেয়েকে নিয়ে এলো আমাদের সামনে। ছোট্ট মেয়ে, বয়স বোধহয় তখন তিন কি চার হবে। মায়ের মতোই ফর্সা আর সুন্দর চেহারার। কিন্তু এই বয়সের মেয়েরা যা হয়, বয়স্কদের মাঝে থাকার চেয়ে ওর খেলনার দিকে বেশি টান অনুভব করে, ফলে পরিচয়ের জন্য ধরে বেধে আনলেও একটু পরেই দৌড়ে ওর ঘরে চলে গেল।  

জয়েস আমাদের জন্য হাল্কা কিছু খাবার নিয়ে এল। চাইছিল আমরা যেন নৈশভোজ ওদের ওখানেই করি। কিন্তু আনিস বাইরে খাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বেশি কোনো আয়োজন না করার অনুরোধ করল।

পাউলের সাথে আনিস পরামর্শ করে জানালো, হাতে আমাদের এখন অনেক সময়। প্রথমে আমরা একটা হোটেলে উঠব, সেখানে আমাদের লাগেজগুলো রেখে তারপর শহরের কোনো এক রেস্তোরাঁয় খাবো আর আনিসের ইচ্ছায় কলম্বিয়ার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গান বাইয়্যেনাতো শুনব।  

আনিসের অনুরোধে পাউল অল্পসময়ের মধ্যেই বাইয়্যেনাতো গানের এক দল জোগাড় করে ফেলল প্রদীপের জিনের মতো। কাছাকাছি একটা মাঝারি মানের হোটেলে আমাদের লাগেজ রেখে পাউলের নেতৃত্বে আমরা কাছের একটা রোস্তোরাঁয় পৌঁছোলাম, যার নাম লাস রোকাস (Las Rocas)। দেখতে বেশ সুন্দর রংচঙে এক রোস্তোরাঁ। লোকসমাগম তেমন একটা নেই। আমরা ভেতরের দিকে লম্বা একটা টেবিল নিয়ে বসেছি। আনিসই আমাদের জন্য খাবার পছন্দ করে দিল। আর সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী কলম্বীয় বিয়ার। আমরা খাওয়া শেষ করতে না করতেই বাইয়্যেনাতোর দল এসে হাজির। এ গান আমি আগে কখনো শুনি নি। কিংবা মেহিকোতে থাকার সময় শুনে থাকলেও এই ধারার গানকে আমি আলাদা করে কখনো চিনতেও শিখি নি।  

কিন্তু আনিসের বদৌলতে আর পাউলের সহযোগিতায় সরাসরি শোনার সৌভাগ্য হলো কলম্বিয়ার নিজস্ব ধরনের সংগীত বাইয়্যেনাতো। স্প্যানিশ Vallenato মানে হলো উপত্যকায় (Valle) যার জন্ম (Nato)—এই দুয়ের সম্মিলন হচ্ছে বাইয়্যেনাতো। কলম্বিয়ার কুম্বিয়া (Cumbia) যেমন, তেমনি এই বাইয়্যেনাতোও মূলত লোকসংগীত। বাইয়্যেনাতো লোকসংগীত, ফলে স্বাভাবিকভাবেই এটির উৎপত্তি হয়েছে কৃষকদের মধ্যে। কিন্তু নিম্নবর্গের এই সংগীত ধারাটি বিশ শতকে এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে তা এখন কলম্বিয়ার এক ব্র্যান্ডিং সংগীত হয়ে উঠেছে। কলম্বিয়ায় শুধু নয়, গোটা লাতিন আমেরিকায় এটি এখন সংগীতের জনপ্রিয় এক ধারা।

প্রথমদিকে এই গানের সাথে শুধুমাত্র আদিবাসীদের উদ্ভাবিত যন্ত্র ব্যবহৃত হলেও পরে ইউরোপীয় বাদ্যযন্ত্রও অন্তর্ভুক্ত হয়—একোর্ডিয়ন, গিটার ইত্যাদি। তবে এসব যুক্ত হলেও, আদি বাদ্যযন্ত্রগুলো তাদের ভূমিকা হারায় নি, বিশেষ করে বাঁশি ও গুয়াচারাকা বা কাররাস্কা। কাররাস্কা হচ্ছে বাঁশের মতো একটা কাঠের টুকরো, যার নিকটতম দূরত্বে অসংখ্য খাঁজ কাটা শক্ত একটা ধাতব তার দিয়ে খাঁজগুলোতে টেনে আনলে ওটা থেকে একটা ধ্বনি বের হয়। যেমন বেহালা বাজাতে একটা ছড়ের ব্যবহার হয়, একই রকম ব্যবহার আমরা এই গুয়াচারাকায়  দেখতে পাব। এই বাদ্যযন্ত্রটি ছাড়াও আরেকটি বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে তাম্বোর (Tambor), অর্থাৎ ঢোল। আর আছে ঝুমঝুমির মতো একটা যন্ত্র। মোটামুটি এগুলোই হচ্ছে বাইয়্যেনাতোর প্রধান যন্ত্র।

৪ জনের একটি দল জোগাড় করে নিয়ে এল পাউল। একজন গায়ক, একজন একোর্ডিয়ন-বাদক, একজন ঢোল-বাদক, আরেকজন গুয়াচারাকা-বাদক। যিনি গায়ক, তিনি বেশ সুরেলা কণ্ঠের। পর পর তিনটি গান শুনিয়েছিলেন। গানগুলো ছিল দ্রুতলয়ের। এই প্রথম আমি সামনাসামনি শুনলাম। বলা উচিত খুব শিহরিত হয়েছি এই গান শোনার অভিজ্ঞতায়। পাউল আর আনিসকে ধন্যবাদ জানালাম মনে মনে। মাঝেমধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে, আড়চোখে তাপসের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম এই গানের অভিঘাত বুঝবার জন্য। তাপস স্প্যানিশ ভাষা না-জানলেও স্প্যানিশ সাহিত্য ইংরেজি অনুবাদে সম্ভবত আমাদের দুজনের চেয়ে বেশিই পড়েছে। সাহিত্যের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতি সে অনেকটাই জানে। আর সে যেহেতু সৃজনশীল ও সংবেদনশীল মানুষ, তার পক্ষে ভাষার প্রাচীর ডিঙানো অনেকটাই সহজ। সেই সহজিয়া পথে তাপস এই গানের মাধুর্য ঠিকই অনুধাবন করছে, এর রসে সে প্লাবিত হচ্ছে—তার চেহারায় প্রসন্নতা দেখেই সেটা অনুমান করা যায়। তাপস স্বভাবে মুখচোরা, তার বর্ণ আর গন্ধকে সে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে, কিন্তু যখন তা প্রাণকে উদ্বেলিত করে তখন লুকিয়ে রাখার পরেও আইসবার্গের মতো শিখরের দৃশ্যমানতায় আভাসিত হয়ে থাকে। তাপস হচ্ছে সেই ধরনের ব্যক্তিত্ব। আমার ভালো লাগছে যে তাপস ভাষিক দূরত্বকে অতিক্রম করে গেছে।

রাত বোধহয় ততক্ষণে ১১টার মতো হয়ে গেছে। আমাদের তখন হোটেলে ফেরার তাড়া। পাউলকেও নিশ্চয়ই ফিরতে হবে। পাউলই আমাদেরকে তার গাড়িতে করে হোটেলে পৌঁছে দিয়েছিল। 

কন্টিনেন্টাল হোটেলে এসে আমরা আরও কিছুক্ষণ গেজিয়ে যে যার বিছানায় লম্বা ঘুমে নিজেদেরকে সমর্পণ করে দিয়েছি। পরদিন জেগে উঠেছি সকালে বেশ দেরিতেই। আনিস অবশ্য তার স্বভাবসুলভ প্রভাতপিপাসায় আমাদের আগেই উঠে পড়েছে। তার নিজস্ব কিছু ব্যায়াম, কিছুটা কণ্ঠশীলন, আরও কী কী করে যখন ক্ষুধার্ত বোধ করেছে, তখন এসে আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগাতে এসেছে। ঘুম থেকে উঠে এটা সেটা করে ক্লান্ত হলে ক্ষুধা তৈরি হয়, কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের তো ক্ষুধা নেই। ফলে ওর তাড়নাতেই ঘুম থেকে উঠতে হলো। অবশ্য উঠতে হতো এমনিতেও, কারণ পাউল আমাদেরকে মার্কেসের এমন এক আড্ডার জায়গায় নিয়ে যাবে যা না দেখলে বাররাঙ্কিয়া আসার মূল উদ্দেশ্যই মাঠে মারা যাবে।

হোটেলের নিজস্ব রেস্তোরাঁতেই আমরা সকালের নাস্তা সেরে প্রস্তুত হয়ে আছি। পাউল সকাল ১০টায় এসে আমাদেরকে নিয়ে যাবে মার্কেসের আড্ডার সেই রেস্তোরাঁয় যার নাম La Cueva, বাংলায় যার অর্থ গুহা। রেস্তোরাঁ যদিও বললাম, আসলে এটি রেস্তোরাঁ ও বার। পাউল আমাদেরকে সেই গুহায় নিয়ে যাওয়ার জন্য হাজির।

সকালের রোদ এখনও সহনীয় বলে হেঁটে বেড়াচ্ছে লোকজন, ছুটছে যে যার গন্তব্যে। পাউল আমাদেরকে ওর গাড়িতে তুলে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহাসিক গুহার দিকে যেটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল Grupo de Barranquilla নামের এক সাহিত্যিক গোষ্ঠী। কলম্বীয় যতগুলো সাহিত্যিক আন্দোলন ছিল তার মধ্যে এই 'গ্রুপো দে বাররাঙ্কিয়া' ছিল সবচেয়ে ফলপ্রসূ, সবচেয়ে বর্ণিল। এই গোষ্ঠী থেকেই বেরিয়ে এসেছিল এক ঝাঁক প্রতিভাবান লেখক। বিদেশি ভাষায় অনুবাদ ও খ্যাতির সূত্রে আমরা কেবল গার্সিয়া মার্কেসের নামই জানি, কিন্তু এই দলের অন্তর্ভুক্ত আরও যারা ছিলেন তারাও প্রতিভায় গৌণ ছিলেন না, যেমন আলবারো সেপেদা সামুদিও, আলফনসো ফুয়েনমাইয়োর, হেরমান বার্গাস, রামোন বিনইয়েস, রাফায়েল এস্কালোনা, আলেহান্দ্রো অব্রেগন, হোসে ফেলিক্স প্রমুখ। নিজের দেশে তারা সবাই প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব। 

লেখক-প্রতিকৃতির সঙ্গে ফটোসেশন

বাররাঙ্কিয়ার সাথে মার্কেসের ঘনিষ্ঠতার ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যাবে তার বয়স যখন মাত্রই ২ বছর আট মাস তখন তিনি ছোট বোন মার্গত-এর জন্ম উপলক্ষে প্রথমবারের মতো এখানে আসেন। এরপর আবারও পরের বছর ডিসেম্বরে আরেক বোন আইদা রোসাকে দেখার জন্য এসেছিলেন। তারপর কৈশোরে ও যৌবনে পড়াশোনা করার জন্যও এই অঞ্চল তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যিক জীবনের জন্য বাররাঙ্কিয়া, বিশেষ করে এই লা কুয়েবা’র Grupo de Barranquilla নামের সাহিত্যিক গোষ্ঠীর ভূমিকা বিশাল। 

হোটেল থেকে খুব বেশি দূরে নয় লা কুয়েবা। গাড়ি নিয়ে আমরা যখন এই ঐতিহাসিক রেস্তোরাঁ ও বার-এর সামনে এলাম তখন দেখলাম ওটা বন্ধ। পাউলসহ সবাই গাড়ি থেকে লা কুয়েবার সামনে দাঁড়ালাম। পাউল একপাশে লোহার গেটে টোকা দিতেই গার্ড এসে দরজা খুলে দিল। জিজ্ঞেস করল হেফে (কর্তা) এসেছেন কিনা। 'হ্যাঁ, আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন ভেতরে।' পাউলের ইশারায় কুয়েবার পাশের এই গেট দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম লা কুয়েবায়। ঢুকতে গিয়ে এক শিহরন অনুভব করছিলাম আর ভাবছিলাম কত গুণী ও প্রতিভাবান এই গুহায় প্রবেশ করেছেন। গ্রুপো দে বাররাঙ্কিয়ার যে-লেখক শিল্পীদের কথা আগেই  উল্লেখ করেছি তারাই ছিল এই গুহার মূল নায়ক। ভাবা যায়, কী গমগম করত তাদের পদভারে আর উচ্চনাদে, কলহাস্যে আর বিতর্কের স্ফুলিঙ্গে। গোটা কুয়েবা যেন সেই আদিম উল্লাসে ফেটে পড়ত। কল্পনা করুন, মার্কেস তার সদ্যরচিত গল্পটি নিয়ে উত্তেজনায় পাঠ করে শোনাচ্ছেন তার বন্ধুদের , কিংবা অন্য বন্ধুরা শোনাচ্ছেন তাদের লেখা মার্কেস কিংবা একে অপরকে। আর সেসব লেখা নিয়ে হচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, টিপ্পনি, সমালোচনা। কেউ কেউ ধরিয়ে দিচ্ছেন লেখার ত্রুটি, কেউবা সোল্লাসে বরণ করে নিচ্ছেন লেখার নতুন ধরন। কিংবা ফকনার, বোর্হেস, কার্পেন্তিয়ের প্রমুখ পাঠের গনগনে অভিজ্ঞতা ঢেলে দিচ্ছেন বন্ধুদের পানপাত্রে। তাদের নানান রকম মত ও মতান্তরের আগুনে, পঠিত লেখকরা কামার ঘরের লোহার মতো লাল হয়ে উঠছেন। 

ভেতরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রবীণ এক ভদ্রলোক, পাউল আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে জানালেন তিনি এরিবের্তো ফিওরিইয়্যো, বর্তমানে এই কুয়েবার কর্তা। মাঝারি আয়তনের ভরাট শরীরের সুদর্শন এরিবের্তো সৌজন্যের সাথে আমাদেরকে বরণ করে নিলেন। লা কুয়েবার প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে সেই সময়কার লেখক-শিল্পীদের ছবি আর কোনো কোনো ব্যবহার্য জিনিস সুরক্ষিত অবস্থায় আছে। একটি শেলফে ওই গোষ্ঠীর লেখকদের বিভিন্ন বইয়ের প্রথম সংস্করণ, মার্কেসের বই-ই বেশি। আছে বিভিন্ন ভাষায় মার্কেসের কিছু কিছু বই। আনিস তার অনূদিত শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল এদেরকে উপহার দেয়ার জন্য। আনিস তার বইটি এরিবের্তোর হাতে তুলে দিলেন। বইটির বাংলা অনুবাদ দেখে যে বেশ খুশি হয়েছেন তা ওনার চেহারার প্রসন্ন অভিব্যক্তি থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। আমিও খুব গৌরববোধ করছিলাম এই ভেবে যে আমার বন্ধুর বহু পরিশ্রমে ও অভিনিবেশে অনুবাদ করা বইটি উৎস ভাষায়ই কেবল নয়, যে-পরিমণ্ডল এই উপন্যাসটিকে পরোক্ষে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে, সেখানেই এটি ফিরে এসেছে অন্য জবানে। এটি অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদের কোন ধরন অবলম্বন করা হয়েছিল সেগুলো আমি এবং আনিস তার কাছে ব্যাখ্যা করছিলাম। তিনি ধরনটির সাথে পুরোপুরি সহমত হলেন। আনিসকে তিনি ধন্যবাদ জানালেন তার এই অসামান্য কাজটির জন্য। এরিবের্তো বইটি নেড়েচেড়ে দেখে এর প্রোডাকশনের খুব প্রশংসা করলেন আর বললেন বাংলায় অনূদিত এই বইটিও তিনি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত মার্কেসের অন্যান্য বইয়ের সাথে রাখবেন। 

মার্কেসের একটি চিত্রকর্ম

এরিবের্তোসহ আমরা লম্বা একটি টেবিলে বসে গল্প করছি। এরই মধ্যে তিনি আগুয়া আর্দিয়েন্তের (কলম্বীয় মদ, আমাদের যেমন বাংলা মদ ঠিক তেমন কিছু। কারণ আমরা ওরকমটাই চেয়েছিলাম।) একটি বোতল খুলে আমাদের সামনে রাখলেন। আমাদের সবার গ্লাসে তিনি নিজেই পরিবেশন করলেন অত্যন্ত যত্নের সাথে। পরিবেশনের সাথে জুড়ে দিচ্ছিলেন এর যত গুণাগুণ আর নানান সব গল্পগুজব। ভদ্রলোক আলাপী ও রসিক। রসিক হবেনই-বা না কেন! নিজে লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত ছিলেন একসময়। মার্কেস, বোর্হেস, রুলফো প্রমুখ বাঘা বাঘা লেখকদের সাথে চেনা পরিচয় তো ছিলই, এমনকি তাদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন তিনি। বয়স এখন ৭০-এর ঊর্ধ্বে, তবে এখনও খুব শক্তসমর্থ। বেশ কিছুদিন মার্কিন মুল্লুকে কাটিয়েছেন। চমৎকার ইংরেজি বলেন। ওনার সঙ্গে কখা বলে সত্যিই খুব ভালো লাগছিল। নিচু স্বরে কথা বললেও, কথাগুলো বলছেন খুব গুরুত্ব দিয়ে আর যত্নের সাথে। তার সাথে কথার সূত্রেই জানতে পারলাম এই লা কুয়েবা এখন কেবল শুধুই স্মৃতিশালা নয়, এটি একই সঙ্গে বার ও রেস্তোরাঁ, এবং প্রকশনাসংস্থাও। ইতিমধ্যেই এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বই তো বের হয়েছেই, তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে (তৃতীয় সংস্করণ ২০০৬) La Cueva: Cronica del Grupo de Barranquilla নামের এক অসাধারণ তথ্যচিত্রময় গ্রন্থ। বইটি দ্বিভাষিক হলেও, স্প্যানিশ কয়েকটি লেখার ইংরেজি সংস্করণ নেই। তবু, যা আছে তা এক মহামূল্য সম্পদ। এই বইটিরই এক জায়গায় দেখা যাচ্ছে মার্কেস বলেছেন, 'Sin ustedes no seria Premio Nobel', ha dicho Garcia Marquez a sus amigos de Barranquilla. ( P 295) অর্থাৎ 'তোমাদেরকে ছাড়া নোবেল পুরস্কার সম্ভব হতো না।' বাররাঙ্কিয়ার বন্ধুদেরকে বলেছিলেন গার্সিয়া মার্কেস। তার জীবনী ঘাঁটলে আমরা তার এই কথার আবহমূলক এক সত্যের কাছে পৌঁছে যাবো। যারা তার শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারবেন বইটির শেষের দিকে (পেছন থেকে তৃতীয় অধ্যায়ে) সেই যে জ্ঞানী কাতালান (Sabio Catalan)-এর কথা আছে: Un sabia Catalan tenia una tienda de libros donde habia un Sanskrit Primer que sera devorado por las polillas seis años despues si el no se apresuraba a comprarlo. (Cien Años de Soledad, Edicion commerorativa, 2007, España, P 404,)। এই জ্ঞানী কাতালান হচ্ছেন গ্রুপো দে বাররাঙ্কিয়ার পুস্তকবিক্রেতা ও প্রকাশক রামোন বিনইয়েস, যার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এই সাহিত্যিক গোষ্ঠী। আর এই গোষ্ঠীরই আলবারো সেপেদা সামুদিও, আলফনসো ফুয়েনমাইয়োর, হেরমান বার্গাস, হোসে ফেলিক্স—এই চারজনও শতবর্ষে `চার তার্কিক' (Los Cuatro discutidores) নামে আবির্ভূত হয়েছেন যারা  আউরেলিয়ানো বাবিলনিয়ার বন্ধু হিসেবে উপস্থিত। এইখানটায় আউরেলিয়ানো মানে মার্কেস নিজে। এই বন্ধুরা যেমনটা উপন্যাসে বলা হয়েছে, তারা ছিল গোগ্রাসী পাঠক, তর্ক-বিতর্ক হতো সাহিত্য, দর্শন আর ইতিহাস নিয়ে। এই বন্ধুদের সাথে মার্কেসের প্রথম পরিচয় হয় ১৯৪৮ সালে। আর এদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটল ২০১৮ সালে। সত্যি বলতে কি মার্কেস ছাড়া আর কাউকেই তো আমি চিনতাম না। চেনার সুযোগই হয় নি। জানি না, কথাটা কে বলেছিল—পাউল নাকি আন্দ্রেস—কথাটা হচ্ছে এই যে, মার্কেস আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও প্রতিপত্তির কারণে এমনই এক বিশাল বৃক্ষ হয়ে উঠেছেন যে একসময় যারা ছিল প্রতিভায় প্রায় একই উচ্চতার, তারা চলে গেছে মনোযোগের বাইরে। আমরা যেমনটা বলে থাকি: বড় গাছের নিচে অন্য গাছ জন্মাতে পারে না। কথাটাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যা না। যদিবা জন্মায়ও, অন্যরা তখন গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আড়ালে পড়ে যায়। মার্কেসের সহযাত্রীদের অবস্থা হয়েছে তাই। অথচ এই মার্কেসই কিনা একসময় স্বপ্ন দেখতেন আলবারো সেপেদার মতো লেখক হওয়ার। এবং ওই দলের অনেকেই মনে করতেন আলবারো সেপেদা তার শৈলী ও বিষয়বস্তুর জন্য এতটাই আকর্ষণীয় ছিলেন যে সবারই ধারণা ছিল তিনি বহুদূর যাবেন। একই ধারণা পোষণ করতেন আলফনসো ফুয়েনমাইয়র সম্পর্কেও। কিংবা হোসে ফেলিক্স। তবে এরা মার্কেসের মতো অত দূর যদি না-ও গিয়ে থাকেন, মার্কেস এদের কাছ থেকে বহু কিছু শিখেছেন, এদের অনেকের গুণ তিনি আত্মস্থ করে নিয়ে বড় হয়ে উঠেছেন। এক অর্থে মার্কেস এদেরই যোগফল। কিন্তু এই কথা বলার অর্থ এই নয় যে মার্কেসের কিছুই ছিল না। মার্কেসের নিজের একটা শক্ত ভিত্তি ছিল বলেই এদের কাছ থেকে নিয়ে তার সাহিত্যিক মন ও মননকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছেন। এদের মধ্যে মার্কেস যে সবচেয়ে প্রতিভাবান ছিলেন তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। মার্কেস কেবল এদের কাছ থেকেই নেন নি, যে-লেখককেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন তার কাছ থেকেই নিয়েছেন—তা সে নিজ ভাষারই হোক, আর অন্য ভাষারই হোক।

প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে সেইসব আড্ডাবাজ লেখকদের ছবি সুন্দরভাবে সাজানো ও সুরক্ষিত এই লা কুয়েবায়। মাঝে মাঝে মেঝের কোনায় কোনো কোনো লেখকের লাইভসাইজ ছবি দাঁড়ানো। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে সত্যিই বুঝি জীবন্ত কেউ। এই ছবিগুলোর কোনো কোনোটির সাথে দাঁড়িয়ে আমরা বেশ কিছু ছবি তুললাম। বহু প্রতিভার আনাগোনায় যে-জায়গা একসময় গমগম করত, আজ তা তাদেরই স্মৃতিশালায় রূপান্তরিত। 'আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি/ এমন ছিল না আষাঢ়-শেষের বেলা/ উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল/ আনন্দ ভৈরবী।'

এরিবের্তোর সঙ্গে আড্ডার টেবিলে

এরিবের্তো আমাদেরকে পানের জন্য টেবিলে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। যদিও দুপুর, পানের সময় হয়তো নয়, কিন্তু যথার্থ সঙ্গী থাকলে অসময়ও সময় হয়ে ওঠে। আমাদের উচ্চাঙ্গ সংগীতে রাগগুলো দিন ও রাতের ভিন্ন ভিন্ন মেজাজকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাই বলে মেঘমল্লার কেবল মেঘলা দিনেই শুনতে হবে আর তা না হলে শুনবার কোনো অর্থ নেই—এমন তো নয়। বরং খড়খড়া দুপুরে শুনে যদি মেঘমল্লার আমাদের মনে সেই অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে, তবেই না সার্থক সেই সৃষ্টি। আর এই এরিবের্তোসহ জ্ঞানী বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপান তো উপাসনার মতো। ওমর খৈয়ামের সেই রুবাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল:

যোগ্য হাতে জ্ঞানীর কাছে ন্যস্ত করো এই জীবন,
নির্বোধদের কাছ থেকে ভাই থাকবে তফাত দশ যোজন!
জ্ঞানী হামিক বিষ যদি দেয় বরং তাহাই করবে পান,
সুধাও যদি দেয় আনাড়ি—করবে তাহা বিসর্জন!

জ্ঞানী হাকিম এরিবের্তোর এই আমন্ত্রণে সাড়া না দেয়াটা নিতান্তই বোকামি। এছাড়া খৈয়াম তো এও বলেছেন:

প্রিয়ার প্রেম যাচ্ঞা করো, থেমো না এক মুহূর্তও,
থাকবে হৃদয় মগজ তাজা, মদ দিয়ে তায় ভিজিয়ে থোও!

হৃদয় মগজ তাজা হতে হতেই মনে পড়ল আমি তো পাউলের একিলিস নামক বইটির অনুবাদ শুরু করে বেশ কিছু দূর এগিয়েছি। সেই অনুবাদ খানিকটা শুনিয়ে দিলে কেমন হয়? এই প্রস্তাব করতেই সবাই রাজির হয়ে গেল। পাউল আর এরিবের্তোর উৎসাহের কারণ বাংলায় শুনতে কেমন লাগে তা দেখা। বাংলা ভাষা তারা আগে কখনোই শোনে নি। আনিস ও তাপসের আগ্রহের কারণ পাউল কী লিখেছে তা জানা। ল্যাপটপ আমি সঙ্গেই নিয়ে এসেছিলাম। ওটা আনার কারণ আমার অফিসের কাজ করার জন্য। এই ল্যাপটপেই রয়েছে একিলিসের অসমাপ্ত কাজটি।

পাউলের একিলিস-হাতে বন্ধুদের সঙ্গে লেখক

আমার অনুবাদটি পাঠ করার আগে, প্রতিটি প্যারাবল-এর স্প্যানিশ বাক্যটি আগে পাঠ করব, তারপর আমার তর্জমা। এখানে আনিসকে বিচারক নির্ধারণ করা হলো। আনিসকে আমি স্প্যানিশেই বললাম (স্প্যানিশে বলার কারণ যাতে করে পাউল এবং এরিবের্তোও ব্যাপারটা জানতে পারে। তাছাড়া তারা যেহেতু বাংলা জানে না, ফলে তাদের সামনে বাংলায় নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালানোটাও অভব্যতা), আমার তর্জমায় গোলমাল বা অবিশ্বস্ততা লক্ষ করলে যেন আমাকে বলা হয়। আমি জানি, আনিস বন্ধু বলেই হয়তো আমার ভুল ধরতে চাইবে না, কিন্তু আমি বলেই দিয়েছি, ভুল থাকলে যেন অবশ্যই উল্লেখ করে। আর বন্ধু তাপসকে বলেছিলাম—যেহেতু সে স্প্যানিশ জানে না—কিন্তু বাংলা তো আমাদের যে-কারোর চেয়ে ভালো জানে, ফলে তাকে অনুরোধ করেছিলাম, বাংলাটা শুনতে কেমন শোনায় সে সম্পর্কে যেন তার অভিমত জানায়।  প্রথমে স্প্যানিশ আর পরে বাংলা—এভাবে আমি প্রায় পাঁচটির মতো প্যারাবল পাঠ করেছিলাম। আমি বাংলা পড়ার পর আনিসের কাছ থেকে দুএকটা সমালোচনা শুনতে পাব—এমনটা আমি ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে সে আমার সমালোচনা তো দূরের কথা, আমার ভূয়সী প্রশংসা শুরু করে দিল। আমি আনিসকে বললাম, আনিস, ভুল থাকলেও তুই যে আমার প্রশংসা করবি—এটা তারা সাধারণ জ্ঞান দিয়েই অনুমান করে নেবেন। আনিস নিজে খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাওয়ায়, তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তাপসকে সাক্ষী মেনে স্প্যানিশটার কাজ চালানোর মতো একটা তর্জমা করে শুনিয়ে এরপর আমার তর্জমার মান সম্পর্কে অভিমত জানতে চাইল। এরিবের্তোও ইংরেজি বেশ ভালো জানেন বলে তাপস ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করে আনিসের মতোই আমার অনুবাদের মান ও গুণের পক্ষে রায় দিয়েছিল। আমি জানি, পাঠকের মন থেকে তারপরও বন্ধুত্বের পক্ষপাত সম্পর্কে সন্দেহ ঘুচবে না। এবার আসল ঘটনায় আসি। এই অনুবাদগুলো যখন করছিলাম, তখন যে-সব অংশ আমার কাছে অস্পষ্ট মনে হয়েছে কিংবা সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে  ব্যবহৃত যে-সব অভিব্যক্তি বা শব্দ বা শব্দবন্ধ আমি বুঝতে পারি নি, সেসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত ফেসবুকে ম্যাসেঞ্জারে কথা চালাচালির মাধ্যমে আমি মূল লেখক পাউলের কাছ থেকে জেনে নিয়ে সঠিক শব্দ বা বাক্যটি তর্জমায় ধরতে চেষ্টা করেছি। সুতরাং, আমার তর্জমায় যদি ভুল না থেকে থাকে, তাতে আমার কৃতিত্ব খুব একটা নেই। মুল কৃতিত্ব মূল লেখকের। আমার কৃতিত্ব সঠিক শব্দগুলো নির্বাচন যা লক্ষ্য-ভাষার সন্তান বলে আনুকূল্য পেয়েছি। 

সত্যি বলতে কি আরাকাতাকার চেয়ে বাররাঙ্কিয়ার সময়টা বেশি উপভোগ করেছি এই অর্থে যে এখানে পাউল, এরিবের্তো, এবং জীবন্ত বাইয়্যোনাতো শোনার অভিজ্ঞতা। আরাকাতাকাকে কেবল সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাস্তবের অবলোকন দিয়ে আমরা শিহরিত হয়েছি বটে, কিন্তু ওখানটায় যখন ছিলাম তখন পঠিত অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে অলক্ষ্যে আড্ডা দিয়েছে। কিন্তু বাররাঙ্কিয়ায় সত্যিকার অর্থে দুই লেখকের সঙ্গে আড্ডার অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক বেশি আনন্দিত করেছে। আসলে রক্তমাংশের স্পর্শ ও অভিজ্ঞতার কোনো তুলনা হয় না। বহুদিন আগে ডেরেক ওয়ালকটের একটা কবিতার লাইন ছিল এরকম: Fragrance of woman is better than hundreds of library.  আমরা যা কিছুই পড়ি না কেন বাস্তবের ইন্দ্রিয়ঘন অভিজ্ঞতার চেয়ে ‘নহে কিছু বড়, নহে কিছু মহীয়ান।’ বোর্হেস অবশ্য এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে গিয়ে বলবেন, আমরা আমাদের অধীত—তা দেখার মাধ্যমেই হোক আর পাঠের মাধ্যমেই হোক, বোর্হেসের ক্ষেত্রে পাঠের মাধ্যমেই প্রধান—জ্ঞানের মাধ্যমে বাস্তবের স্বাদ নেই। আমি জ্ঞানচর্চায় বোর্হেসের অনুসারী হলেও, জীবনের উপভোগের ক্ষেত্রে একেবারে—বোর্হেসেরই বিপরীত মেরু—নেরুদার অনুসারী। ভোজ, পান, গান, রতি—সব রকম ইন্দ্রিয় আমার প্রাণের দেবতা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আজকেই, মানে এই মধ্যাহ্নভোজ ও আড্ডা শেষে আমরা মার্কেসের আরেকটি আবাস ও কর্মস্থল কার্তাহেনার উদ্দেশে এখান থেকে বাসে রওয়ানা হবো। কার্তাহেনা এখান থেকে পোনে দুই ঘণ্টা থেকে বড় জোর দুই ঘণ্টার পথ। ভালো হয় যদি ওখানে সূর্যের আলো থাকতে থাকতে আমরা পৌঁছাতে পারি, তাহলে ওই এলাকাটা খানিকটা দেখার সুযোগ পাবো। অতএব এখনই সময় বাস ধরার। 

লা কুয়েবা থেকে বিদায় নেয়ার আগে আমরা এই ঐতিহাসিক রেস্তোরাঁর সামনে সবাই মিলে একটা গ্রুপ ছবি তুলে পাউলের গাড়িতে উঠলাম। পাউল আমাদেরকে বের্লিনাস বাসস্ট্যান্ডে (Estacion Berlinas) পৌঁছে দিয়ে তার বাসায় ফিরে যাবে।


৪র্থ পর্বের লিংক

রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা