- দে একটা সিগারেট দে। তাড়াতাড়ি দে।
- এইমাত্র না একটা খাইলি।
- মেজাজ ফট্টিনাইন। আরও খামু।
- হইছেটা কী, কইবি তো?
- এইবারও মুরাকামি নোবেল পুরস্কার পায় নাই।
- তাতে তোর কী!
- ছাগলের মতো কথা কস! তাতে আমার কী মানে?
- হ, তোর কী!
- যারে খুশি তারে দিব, ফাইজলামি নাকি! চিনি না, জানি না, যে কেউরে ধইরা নোবেল পুরস্কার দিয়া দিব!
- তোর চেনা পরিচিত লোকরে পুরস্কার দিতে হবে?
- আরে আজব তো! তুই বিশ্বসাহিত্যের কী ছাতার খোঁজটা রাখোস? রুশদি পড়ছোস, মিডনাইটস চিলড্রেন? মার্গারেট এট্যুড, হেন্ডমেইড টেলস?
- না, পড়ি নাই।
- তাইলে তুই কী বুঝবি?
- তুই কী বুঝবি? ওরা পড়ছে, আমাগোর সাহিত্য? এই যে আমাগোর মামুন হুসাইন, ইমদাদুল, আনিসুল, শাহাদুজ্জামান—এইগুলা ওরা পড়ছে?
- কী কস এগুলা? কীয়ের মধ্যে কী, পান্তা ভাতে ঘি!
- হইলেইবা কী! পান্তা ভাতও আমাগোর, ঘি-ও আমাগোর। পারভেজও আমাগোর, কামালও আমাগোর, কামুও আমাগোর, শামীমও আমাগোর। তোর এত পিৎজা, চিজ, পাস্তা নিয়া মরাকান্না কিসের। বিদেশি বিদেশি করে হেদিয়ে মরিস ব্যাটা, দেশের খোঁজ নাই। আরে ব্যাটা তোর নিজের দেশের কতদূর পড়স? বাংলা একাডেমি পুরস্কারের খোঁজ রাখোস না, আর আইছস নোবেল পুরস্কার নিয়া।
- সাহিত্যের কোনো দেশ নাই গাধা। সাহিত্যে এভাবে মেরুকরণ করার কিছু নেই।
- পুরস্কারের তো আছে? রাজনীতির তো আছে?
- মানে?
- কচি খোকা, পুরস্কারের রাজনীতি বোঝো না? নোবেল পুরস্কার কোন দেশ থাইকা দেয়?
- কী কবি সেইটা ক? ছেলেমানুষি প্রশ্নের উত্তর আমি দেই না।
- কার্ল গুস্তাভ ভেরনের ফন হাইডেনস্টাম, কার্ল ফ্রিদরিখ গেওর্গ স্পিত্তেলের, এরিক আক্সল কার্লফেলৎদ, পার লেগার্কভিস্ত, আইভিণ্ড জনসন, হ্যারি এডমুণ্ড মার্টিনসন। বল, এরা কারা?
'মামা চা দেন তো, ডব্বল পাত্তি দিয়েন। পানি পানি চা দিয়েন না।—সরওয়ার হাঁক দেয়। গৌতমকে খুশি মনে হয়। এই কয়টা নাম মুখস্থ রাখতে তার কষ্ট হয়েছে। ঝুলিতে আরও কয়েকটা নাম আছে। সরওয়ারের মতো বৈদেশি সাহিত্য-প্রেমিকদের জন্য জমায়া রাখছে।
- ক, এরা কারা?
- চিনি না।
- খুব তো পক পক করতেছিলি। এরা সবাই নোবেল পুরস্কার পাইছে। সুইডেনের লেখক। সুইডিশ সাহিত্যের ডিনামাইট।
- কী কস!
- আরও কমু? ডব্বল পাত্তির চা খা, আরও সিগারেট টান। লাংস কিডনি ফুটা কইরা ফেল। তাও তুই নোবেল পুরস্কার পাবি না। তুই কেন, তোর চেনাজানা লোকেরাও নোবেল পুরস্কার পাইবো না। কারণ তোর চেনা-জানার মধ্যেই ঘাপলা আছে। দুনিয়াটা তোর চেনা-জানায় উঠ-বস করে না রে সারোয়ার।
- বেশি কইতাছোস কইলাম।
- এইবার ক দেখি তলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, মার্ক টোয়েন, লু স্যুন, ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ, কাফকা—এরা কারা?
- আরে পাগল পাইছোস নি? এরা কারা সেটা তো সাহিত্যের বাচ্চা বাচ্চা পোলাপানও জানে।
- কিন্তু এরা কেউ নোবেল পুরস্কার পায় নাই। অথচ ওই যে একটু আগে খটমটে নাম কইলাম, হেরা সবাই নোবেল পাইছে। সুইডেনের লেখক বইলাই পাইছে।
- তুই কী কইতে চাস, ওরা নিজের দেশেই খালি পুরস্কার দেয়? বিশ্বসাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের কোনো গুরুত্ব নাই?
- ধীরে বন্ধু ধীরে। করিতিছি বয়ান সবই। তিষ্ঠ ক্ষণকাল।
গৌতমও একটা সিগারেট ধরায়। আজকে সে বুঝিয়ে দিবে তার সাহিত্যজ্ঞানও কারও চেয়ে কম না। কথায় কথায় বড় বড় নাম নেয় না মানে এই না যে সে দিন-দুনিয়ার খবর রাখে না।
- তোর নোবেল পুরস্কায় দেয় কে? সুইডিশ একাডেমি। তুই জানোস, সুইডেনের সাতজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিকের মধ্যে ৬ জনই ছিল এই কমিটির সদস্য। এরা হইল সালমা লেগারলেফ, ভার্নার ভন হাইডেনস্ট্যাম, এরিক এক্সেল কার্লফিল্প, পার্ল লেগার্কভিস্ট এবং হ্যারি মার্টিসন ও ইভাইন্ড জনসন। এরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো সময় নোবেল কমিটির সদস্য ছিল।
- বুঝলাম, একটু স্বজনপ্রীতি তো সব পুরস্কারেই হয়। আমাগোর দেশে কুমিল্লা, বগুড়া, রাজশাহীতেও সাহিত্য পুরস্কার দিতে গেলে কে কোন এলাকার সেইটা একটু হিসাব-নিকাশ হয়।
- কেন, সাহিত্যের না কোনো দেশ নাই? মেরুকরণ নাই?
- আচ্ছা, অন্য দেশরে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় নাই? ১৯০১ সাল থেকে এই পুরস্কার চলতেছে, বিশ্বের কত দেশ কত ভাষারে পুরস্কার দিসে জানোস?
- দোস্ত, আমারে লাড়িস না, আইজ কিন্তু তৈরি হয়া আইছি। তোর ফালাফালি বহুত দেখছি। তোরে কিন্তু আইজ ফালাফালা কইরা ফালামু।
- দেখ গতু, ফাউল টক করবি না। পয়েন্টে আয়।
- আসি। খালি এক রুশ সাহিত্যের উদাহরণ দেই। রাশিয়ানদের মধ্যে নোবেল পাইছে কে কে, বল দেখি সারু?
- পাস্তারনক, সোলজেনিৎসিন।
- আরো আছে জোসেফ ব্রডস্কি, ইভান বুনিন, মিখাইল শলোকভ।
- হ।
- এরা নিশ্চয়ই বড় লেখক।
- নিশ্চয়ই। পাস্তারনকের জিভাগো পড়ছিস তুই? সোলজেনিৎসিনের ক্যান্সার ওয়ার্ড?
- না পড়ি নাই। তয় পুশকিন পড়ছি, শেখভ, তুর্গিনভ, গোর্কি, তলস্টয়, দস্তয়ভস্কি কমবেশি পড়ছি। এখন এরা তো কেউ নোবেল পুরস্কার পায় নাই। ক দেখি আমারে সরু, সোনা বন্ধু আমার, তলস্তয়, গোর্কি, দস্তয়ভস্কি, শেখভ, তুর্গিনভের চেয়ে পাস্তারনক, শলোকভরা কি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বসাহিত্যে?
- না। রুশ দেশের ঘটনাটা আলাদা। কোল্ড ওয়ার বইলা একটা ব্যাপার ছিল। স্নায়ুযুদ্ধ। সেই রাজনীতিটা সাহিত্যেও আইসা পড়ছে। মানে ব্রডস্কি, বুনিন এরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে লিখত। এদেরকে পুরস্কার দিয়ে রাশিয়ারে সায়েস্তা করতে চাইছে নোবেল কমিটি।
- এই তো সোনা, একটু একটু বুঝতে পারতেছ? পুরস্কারের রাজনীতি আছে, এর মধ্যে হট ওয়ার, কোল্ড ওয়ার আছে।
- তোর পয়েন্টটা এখনও ক্লিয়ার না। এইগুলা যা কইলি কমবেশি আমরা জানি। অনেক বিখ্যাত লেখকরে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় নাই। আবার অনেক অযোগ্য লেখকরেও পুরস্কার দেয়া হইছে। দুইটাই সত্য। তাই বইলা তো নোবেল পুরস্কারটা একেবারে মিথ্যা হয়ে যায় না। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুরস্কার এইটা, অন্তত টাকা আর সম্মানের দিক থেকে।
- তো বিশ্বের এই বড় পুরস্কারটা বাংলা সাহিত্যে কে পাইছে?
- আবারও পোলাপাইনা প্রশ্ন। ওয়ান এণ্ড অনলি দ্য রবিঠাকুর।
- কবে পাইছে?
- সাল তারিখ মুখস্থ নাই।
- আমার আছে। আমি মুখস্থ কইরা আসছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাইয়াছেন। এইবার ক, এইটা কত সাল। তোর কওয়া লাগব না। আমিই কই, ২০১৩ সাল। ২০২৩ মাইনাস ১৯১৩—কত হয় খোকা?
- গতু রে, বাড়াবাড়ি করতাছোস।
- সারু রে, চেতো না খোকা। একশ দশ বছর আগে বাংলা ভাষায় একটা নোবেল পুরস্কার দেয়া হইছে। তারপর? খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, নোবেল এলো না দেশে... বাংলাদেশের কথা, বাংলা সাহিত্যের কথা নোবেল কমিটি ভুইলা গেছে। সুনীল মরে গেল, তারও আগে কমলকুমার, তারও আগে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়। সতীনাথ, অমিয়ভূষণ আছে। এইদিকে আমাগোর ওয়ালিউল্লাহ মরে গেল, সৈয়দ শামসুল হকও নাই, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদও নাই। একে একে নিভেছে প্রদীপ। এইবার কহো বন্ধু, বাংলাদেশে, দুই বাংলা কি এক বঙ্গদেশে, এক বাংলা ভাষায় নোবেল পুরস্কার আবার কত বছর পরে আসব? এই ধানসিঁড়িটির তীরে নোবেল পুরস্কার কি আসিবে কভূ?
- বাংলা সাহিত্য তো ঠিক মতো অনুবাদ হয় না, হইলে দেখতি।
- কী দেখতাম! বাংলা সাহিত্য অনুবাদ হইলেই নোবেল পুরস্কার দিয়ে দিবে?
- দিবে না?
- কারে দিবে?
- মানে?
- তোর নমিনেশন ক, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোন কবি, লেখকের লেখা অনুবাদ হইলেই নোবেল পুরস্কার পাইব? রবীন্দ্রনাথের পর কারে দিবি নোবেল পুরস্কার?
সারওয়ার চিন্তিত হয়ে যায়। সে ভাবতে থাকে অনেকগুলো নাম। ইলিয়াস, হাসান স্যার প্রয়াত। দুই হুমায়ূনও নাই। মৃতদের জন্য তো নোবেল পুরস্কার না। জীবিতদের মধ্যে আছে... কিন্তু সে তো অনেকে... কবি তো কয়েকশ, চাই কি হাজারও হতে পারে... কথা সাহিত্যিকও কম না। বইমেলা এলে দেখা যায় কারো কারো দাপট, কারো কারো দাপট সারা বছর ফেসবুকেই। কিন্তু এরা নোবেল কমিটির কাছে কিভাবে পৌঁছাবে? এদের মধ্যে কার সামর্থ্য আছে গার্ডিয়ান, প্যারিস রিভিউ কিংবা নিউইয়র্কারে লেখার। এদের কার আছে বড় এজেন্ট? কে নাম মনোনয়ন করবে—আরেক নোবেল জয়ী লেখক, কবি? কে পারবে বিশ্বসাহিত্যের রাজনীতিতে নিজের কণ্ঠস্বর পৌঁছাতে। জানা কথা, আমাদের কেউ কেউ কোনো কোনো বই তো দুর্দান্ত লিখেছে। কারো কারো মধ্যে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক সব কিছু লেখার ক্ষমতাও আছে। কিন্তু কে দেবে আশা, কে দেবে ভরসা, কে অনুবাদ করবে তাদের লেখা, কে ছাপবে সেইসব লেখা নামকরা সব বিদেশি প্রকাশনী থেকে, কোন এজেন্ট এসে তাদের জন্য দেশ-বিদেশে দৌড়াদৌড়ি করবে।
সারোয়ারের মাথায় কুলায় না। তাছাড়া, নামধাম নেয়ার বিপদও আছে। গৌতম আজকে আটঘাট বেঁধে নেমেছে। কোন নাম বলে ওকে উস্কে দেয়া হবে সেটাও তো চিন্তার কথা।
অতএব, প্রিয় পাঠক, আপনারা একটু বলেন তো, কে পাবে নোবেল পুরস্কার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে—আজি হতে শত বর্ষ পরে?