গার্সিয়া মার্কেসের সন্ধানে কলম্বিয়া 

বোগোতা

"কলম্বিয়ার উত্তর উপকূলের অনাঘ্রাতা বনভূমি এবং জলাভূমির নিবিড়তায় ঘেরা এক গ্রামে বেড়ে উঠেছিলাম আমি। সেখানকার গাছপালার সৌরভে ভরে উঠবে আপনার মনপ্রাণ।”—বহুদিন আগে, ১৯৯১ সালের অক্টোবরে ইউনেস্কো কুরিয়ার নামক এক পত্রিকায় মার্কেসের এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তার জন্মস্থানের এমন এক প্রাকৃতিক বর্ণনা। কলম্বিয়ার আরাকাতাকাসহ সে দেশের আরও বহু অঞ্চলের আকর্ষণীয় বর্ণনাই পাওয়া যাবে তার গল্প ও উপন্যাসে। মার্কেসের বর্ণনাশক্তির গুণে ওইসব অঞ্চল এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে কালো অক্ষরের পৃষ্ঠাগুলোয় যে তা প্রকৃতি-প্রেমিক ও মার্কেসানুরাগীদের আকর্ষণ না করে পারে না। তার চেয়ে বড় কথা এত সাধারণ যে-অঞ্চল সেখানে এত জাদুকরী কাণ্ডকারখানাই-বা ঘটছে কী করে? এক শতবর্ষের নিঃসঙ্গতায় যে-সব অবাস্তব  ঘটনা ঘটে চলেছে তা কি আসলেই ওই অঞ্চলে ঘটেছে বলেই লেখক ওভাবে বর্ণনা করেছেন নাকি লেখকের নিছক কল্পনা দিয়ে ওই ঘটনাকে বর্ণময় করে তুলেছেন? ওই অঞ্চল সম্পর্কে যে-পাঠকের আদৌ কোনো ধারণা নেই তার কাছে এই প্রশ্ন দেখা দেয়া অস্বাভাবিক নয়। যদিও মার্কেস খুব দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন: “নিজেকে আমি একজন শুদ্ধ এবং সাধারণ বাস্তববাদী বলে মনে করি।” তাহলে কি ধরে নেব যে ওই অঞ্চলে এমন এক বাস্তবতা আছে যার স্বভাব পাগলাটে, যা লেখকের সূক্ষ্ণ ও অন্তর্ভেদী দৃষ্টি ঠিকই দেখতে পায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যেহেতু কোনো কিছু আবিষ্কারের দায় নেই তাই বাস্তবতার অবাস্তব আর অবাস্তবের বাস্তবতা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথাও নেই? কিন্তু কৌতূহলী পাঠকমাত্রই লেখকের হেঁসেলের খোঁজ নিতে চাইবেন আগ্রহের আতিশয্যের কারণে। আমার ওই আতিশয্যের ব্যাধি আছে বলে মনে হতো: আহা, যদি কোনোদিন দেখা যেত মার্কেসের এই জন্মভূমি! ভেবেছি যদিও, কিন্তু কখনো কল্পনায়ও ভাবি নি একদিন, ২৮ বছর পর আকস্মিকভাবে এক সুবর্ণ সুযোগ এসে দরোজায় কড়া নেড়ে বলবে, সময় হয়েছে নিকট, এখন ওইখানে যেতে হবে।

সুযোগটা বন্ধু এবং মার্কেস-অনুবাদক আনিসুজ্জামান আর কবিবন্ধু তাপস গায়েনের ওহিরূপে এসে নাজেল হলো ২০১৮ সালের মাঝামাঝি।  দুজনই আমার বন্ধুত্বের জগতে দুই মোঘল, সুতরাং মোঘলদের হাতে পড়লে খানা না-খেয়ে উপায় কী! হঠাৎ করেই আমাকে বিস্মিত করে আনিসের প্রস্তাব, জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রথমে নিউইয়র্ক, সেখান থেকে তাপসসহ যেতে হবে সান দিয়েগোতে ওর বাসায়। ওখানে দুতিন দিন থেকে আমরা যাব মেক্সিকো। মেক্সিকো শহরে দুতিন দিন থেকে আমরা যাব মার্কেসের দেশে। আমি তো কলম্বিয়া পর্যন্ত যেতে পারলেই ভাবতাম বিস্ময় ও আনন্দের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছি। কিন্তু আমার বিস্ময়কে অভিভূত করে জন্ম হলো অন্য এক দৃশ্যের: কলম্বিয়া থেকে আমরা স্বর্গের অন্য প্রান্তে অবস্থিত পেরুর কুসকো যাব। কুসকো যাব মানে সেই মাচু পিকচু যাওয়া। প্রবাদ বলে, মেঘ না চাইতেই জল। কিন্তু এ যে জলরাশি; তাও স্থির কোনো জলরাশিও নয়, কলকল্লোলিত। এই প্রস্তাব শুনে আমি তো রীতিমতো বিস্ময়ে স্তব্ধ।


লাতিন আমেরিকান গড় সৌন্দর্যের হয়তো একটু নিচেই তার অবস্থান, কিন্তু মিষ্টি ব্যবহার আর স্তনের পরিপূর্ণতা দিয়ে সেই অভাবটিকে সে পূরণ করে রেখেছে।


প্রস্তাব অনুযায়ী মিলিত হয়ে মেক্সিকো শহর থেকে কলম্বিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম ৪ আগস্ট সকাল বেলা। মোটামুটি সাড়ে চার ঘণ্টার উড়াল। এই মুহূর্তে ঠিক মনে নেই কয়টায় রওয়ানা হয়েছিলাম। তবে এটুকু মনে আছে, আমার টুকে রাখা নোটে দেখতে পাচ্ছি স্থানীয় সময় বিকেল ২টা ৪০-এ আমরা পৌঁছেছিলাম বোগোতা এয়ারপোর্টে। এয়ারপোর্টের নাম বোগোতা বললাম বটে, ওটা আসলে পরিচিত ‘এল দোরাদো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ হিসেবে। আগস্টে মেক্সিকো শহরের আবহাওয়া চমৎকার। গরমও নয়, আবার খুব ঠাণ্ডাও নয়। এল দোরাদো এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে ভেবেছিলাম গরমে ঘামতে হবে বেশ, কারণ মার্কেসের উপন্যাসে তো ওরকম বর্ণনা আছে, তাছাড়া এ অঞ্চল সম্পর্কে আমার যেটুকু পাঠ, তাও সেই কথাই বলে। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল অন্য রকম। ঘটনা হলো, গোটা কলম্বিয়ার ৮৬ শতাংশ অঞ্চল গরম আবহাওয়ায় গা ভাসালেও, মেদেইয়্যিন আর এই বোগোতা শহরটি গরমের দিনেও শীতের আমেজ উপভোগ করে। সুতরাং পূর্বপাঠ আমাকে প্রতারিত করেছে খানিকটা, প্রতারিত করেছেন মার্কেসও, কারণ তিনি কলম্বিয়ার বোগোতা অঞ্চলের এই ঠান্ডার কথা তো আমাকে বলেন নি তার কোনো লেখায়। তাহলে আমি ওই গরমের ধারণা পেলাম কোত্থেকে? ওটা এসেছে আমার অসতর্ক পাঠ থেকে: মার্কেস তো বোগোটার কথা বলেন নি, বলেছেন মাগদালেনা বা আরাকাতাকার কথা, আমি আবেগের আতিশয্যে ওটাকেই গোটা কলম্বিয়ার আবহাওয়া বলে ধরে নিয়েছি। আর তাই আমার গরম-ধারণাকে বোগোতার ঠান্ডা আবহাওয়া শীতল করে দিয়েছে।

 

মেক্সিকো থেকে কলম্বিয়ার পথে প্লেনে লেখকের সঙ্গে কবি তাপস গায়েন ও অনুবাদক, কথাসাহিত্যিক আনিসুজ্জামান

 

তবে ঠান্ডা হলেও তা কনকনে শীতের মতো নয় অবশ্যই। আমাদের দলনেতা আনিস এখানকার আবহাওয়া সম্পর্কে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল বলে আমাকে আর তাপসকে আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছিল এই শীত মোকাবেলার জন্য। সুতরাং, এয়ারপোর্ট থেকে যখন বের হলাম, তখন কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় নি মোটেই। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে তো বের হলাম, এখন খাব কোথায়? বিকেল প্রায় ৩ টা বাজে। সবাই ক্ষুধার্ত। তাছাড়া, আবার কয়েক ঘণ্টা পরেই তো সান্তা মার্তার উদ্দেশ্যে আরেক প্লেন ধরতে হবে। অতএব, ভালো করে কিছু তো খেয়ে নিতে হবে তার আগেই। কিন্তু কী খাব? এটা যেহেতু কলম্বিয়ার রাজধানী, ফলে নানান রকম দেশি-বিদেশি খাবারের কোনো অভাব হবে না। কিন্তু আমি, আনিসও আমার মতোই, যেখানেই যাই না কেন, স্থানীয় খাবার ভক্ষণের পক্ষে। আনিস, আমাদেরকে এয়ারপোর্টে আসা এক ভাড়া টেক্সিতে তুলে ড্রাইভারের সাথে প্রাথমিক সৌজন্য সেরে নেয়ার পর জানতে চাইল, কাছাকাছি কোথায় আমরা কলম্বিয়ার নিজস্ব কিন্তু সুস্বাদু খাবার খেতে পারব। ড্রাইভার ভদ্রলোক, অল্প কিছুক্ষণ পর জানালো আধা ঘণ্টার চেয়েও কম দূরত্বে একটা জায়গা আছে, ওখানে গেলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত খাবার খেতে পারি। বেশ, তবে সেখানেই যাওয়া যাক। লক্ষ্যস্থলে যেতে যেতে আমি চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম, সম্ভবত আনিস এবং তাপসও, এই শহরের শরীরের উপর। রাস্তাঘাটে ট্রাফিক জ্যাম খুব একটা নজরে পড়ল না। আমাদের ঢাকা শহরের মতো অফিস ছুটির সময় নয় বলেই কি ট্র্যাফিক জ্যাম নেই? গাড়ি থেকে দেখে কিন্তু বেশ শান্ত একটা শহর বলেই মনে হলো। যদিও ইতিহাস বলে ভিন্ন কিছু। এর শান্ততার তলদেশে প্রবাহিত বহু নৃশংসতা ও রক্তপাতের ধারা। খুনি, মাদকব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত প্রমুখের এক স্বর্গরাজ্য কলম্বিয়া। আর বোগোতা হচ্ছে এই স্বর্গরাজ্যের অলিম্পাস: এইখানে সব অপদেবতাদের কাণ্ড ও কারখানা। তবে বহির্বিশ্ব কলম্বিয়াকে নেশাদ্রব্য সরবরাহের বড় দেশ বললেও আমি বলি, ওর চেয়ে আরও দুটি বড় মাদকেরও প্রস্তুতকারক, আর সে দুটিতে নেশা হলেও, ওই নেশার ক্ষতিকর কোনো প্রভাব নেই। সেই দুই বিখ্যাত মাদকের একজন হচ্ছেন মার্কেস আর অন্যজন শাকিরা। আমার আকর্ষণ এই দুই মাদকে। তাদেরই একজনের আকর্ষণে আজ আমরা এখানে।

আনিস গাড়িতে ওঠার পর থেকেই ড্রাইভারের সাথে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। ওসবের অনেক কিছুতে আমার আগ্রহ থাকলেও, এই মুহূর্তে আমি খাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী বেশি। ড্রাইভার আমাদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে পূর্বদিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেল যেটা ছোনা উনিবের্সিতারিয়া (বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা)-তে কাররেরা কুয়ার্তা’র কাইয়ে কুয়ার্তা’য় (চতুর্থ সড়ক) অবস্থিত এক রেস্তোরাঁয়। দেখতে আহা মরি কোনো রেস্তোরাঁ নয়, আমরাও তা চাই নি, চেয়েছি স্থানীয় খাবারের স্বাদ। বলা যায় এদেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের খাবারের দোকান। সাধারণ চেয়ারটেবিলে সজ্জিত এটি। দেয়ালে কলম্বিয়ার প্রাকৃতিক দৃশ্যের বাহার। একটু পরেই মেয়ে-ওয়েটার এসে প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময় করে মেনুটি হাতে তুলে দিলেন। যদিও—অভিজ্ঞতার অধিকারবলে—আনিসই খাবারের অর্ডার দেবে, কিন্তু আমিও কৌতূহলবশত উঁকি দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করলাম কী কী আছে মেনুতে। আর ওই মেনু দেখতে দেখতেই কলম্বিয় নাদুসনুদুস মেয়েটির সাথে ভাব জমাবার চেষ্টা করলাম। অমায়িক স্বভাবের মেয়েটিও বিদেশি খদ্দরের মনোরঞ্জনে কার্পণ্য করছে না। আবোলতাবোল, এমনকি যা খাবার সম্পর্কিত নয়, এমন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে সহাস্যে। তবে ক্ষুধাপেটে নারীসঙ্গও ফিকে হয়ে আসে। তাই আবারও মেনুতে ফিরে আসতে হলো। নাম দেখে হয়তো অনুমান করতে পারব খাবারের স্বাদ, কিন্তু প্রতারিত হওয়ার সম্ভবানাও থাকবে। কারণ আমি স্প্যানিশ খাবার বলতে ওই মেক্সিকান খাবারই বুঝি। আর এখানে খাবারের নামধাম স্প্যানিশে হলেও স্বাদে, আয়োজনে ও রান্নার প্রণালিতে ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সুতরাং উঁকি দেয়া ছাড়া আমার আর করণীয় কিছু নেই। তাছাড়া খাবারের ব্যাপারে আনিস হচ্ছে জবরদস্ত এক আলেম, যেহেতু কিছুদিন পরপরই বিদেশ সফর করা তার এক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিদেশ সফর মানে সেখানকার খাবার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া। অতএব, ওর উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করা যায়। 

কলম্বিয়ার এক রেস্তোরাঁয় নারী-ওয়েটারের সঙ্গে লেখক

মাছ ও স্যুপ জাতীয় খাবারের অর্ডার দেয়া হয়েছিল। স্বাদের দিক থেকে রসনার নিকটবর্তী হলেও কোথায়ও একটা বড় রকমের পার্থক্য আছে, সেটা আমি তখনও আন্দাজ করে উঠতে পারি নি। কিন্তু তা অত গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে ওটা ভেবে মাথার চুল ছেঁড়ার কোনো কারণ নেই। খাবারের আগে কলম্বীয় বিয়ার দিয়ে খুন্নিবৃত্তির খানিকটা মিটিয়ে নিয়েছিলাম সবাই। ক্লান্তির ক্লেদ শরীর থেকে কেবল তা উৎখাতই করে নি, বিয়ার একই সঙ্গে শরীর ও মনের তন্ত্রীগুলোকে তার তরল স্পর্শে জাগিয়ে তুলেছে: অতিসামান্য কারণেও আমাদের মাঝে তাই আনন্দের এক গুঞ্জরন, আর আশপাশের সব কিছুকেই মনে হয় উদার ও বন্ধুসুলভ, যেন স্পর্শমাত্রই সবাই কল্লোলিত হয়ে উঠবে। ওয়েটার মেয়েটির সঙ্গে মৃদু রসিকতা আর ঠাট্টায় মেতে উঠলাম আমি আর আনিস। মেয়েটা নাদুস-নুদুস, চোখমুখে হাসির একটা ফেনা ভাসমান ওর অভিব্যক্তির মাধুর্যের কারণে। এটা যে খদ্দের মুগ্ধ করার জন্য নয় তা বুঝা যায় ওর বন্ধুসুলভ আচরণে ও সম্বোধনের মধ্যে। ওর ব্যক্তিত্বটাই ওই ধাঁচের। ওর চোখের দুই পাশে হাসির একটা চিকন আভাস লেগে আছে সবসময়ই। লাতিন আমেরিকান গড় সৌন্দর্যের হয়তো একটু নিচেই তার অবস্থান, কিন্তু মিষ্টি ব্যবহার আর স্তনের পরিপূর্ণতা দিয়ে সেই অভাবটিকে সে পূরণ করে রেখেছে। মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেখার লোভে আমি ওর সাথে ছবি তোলার প্রস্তাব করতেই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। দুচারটা হাল্কা কিন্তু যৌন সুড়সুড়িমূলক রসিকতা দিয়ে ওকে খোলতাই করে নেয়ার দুষ্টুমিটা হাত ছাড়া করলাম না। মেয়েটিও বেশ আনন্দ পেল আমার রসিকতায়। আমি ওর কাঁধে ডান হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম আর মেয়েটি পেছন দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরা অবস্থায় ওর সাথে ছবি তুললাম কয়েকটা। আনিস আর তাপস আমার নৈকট্যকে উপভোগ করছে নীরব সমর্থনে। তাপস ভাষাপ্রচীরের অন্য পাশে থাকায় এই রঙ্গরসের মর্ম দেখতে না পেলেও, আমাদের কলহাস্য তার বুদ্ধিদীপ্ত মনকে ঠিকই স্পর্শ করে গেছে।

রেস্তোরাঁর টেবিলে তিন বন্ধু
রেস্তোরাঁর টেবিলে তিন বন্ধু

লাতিন আমেরিকান খাবারে আমার ও আনিসের আগ্রহ এবং অভিজ্ঞতা বহুদিনের। কিন্তু তাপসের আগ্রহ থাকলেও অভিজ্ঞতা প্রায় নেই বললেই চলে। অতএব, তাপসের জন্য এমন কোনো খাবার চাইতে হবে যা তার অপরিচিত হলেও স্বাদের কারণে যাতে খেতে পারে। আনিস সেভাবেই তার জন্য খাবার অর্ডার করেছিল। আনিস ও আমি যা-ইচ্ছা তাই খেতে পারি। উচ্চবর্গীয় থেকে নিম্নবর্গীয়, অখাদ্য থেকে সুখাদ্য, হারাম থেকে হালাল, সবই প্রায়—কেবল একটাই শর্ত : সুস্বাদু হতে হবে। 

খাবারের পাঠ চুকিয়ে আমাদের আবার ফিরতে হবে এই এয়ারপোর্ট থেকে অন্য এক প্লেনে চড়ে সান্তা মার্তায় যাওয়ার জন্য। হাতে আছে আরও ঘণ্টা দুয়েক। অন্তত এক ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে থাকতে হবে। রাস্তায় চলে যাবে আধা ঘণ্টা। সেই হিসেবে হাতে আছে মাত্র দেড় ঘণ্টা। কিন্তু আশেপাশে দেখার মতো তেমন কিছু নেই বলে আমরা একটু আগেই রওয়ানা হয়ে গেলাম। তাছাড়া ড্রাইভারকে অযথা বসিয়ে রেখে ওর সময় নষ্ট করারও কোনো মানে হয় না। যদিও সময় নষ্ট করলেও আমরা সেটা পুষিয়ে দেব অবশ্যই। 

গাড়ি থেকে শহরের দৃশ্য
গাড়ি থেকে শহরের দৃশ্য

গাড়িতে উঠতে যাব, তখন ড্রাইভার খাবারের মান ও স্বাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল আনিসকে। আনিস এবং আমি দুজনই সমস্বরে বললাম, খাবার খুবই সুস্বাদু। আচরণে ও পরিবেশনে সৌজন্যের কোনোই ঘাটতি ছিল না। ড্রাইভার খুশি হলো বলে মনে হলো। কারণ তারই কথায় আমরা এখানে এসেছি। খদ্দের হিসেবে আমরা তৃপ্ত হলে তার জন্য স্বস্তির। 

রাস্তায় কি গাড়ির আনাগোনা আগের চেয়ে একটু বেড়েছে? একথা ভাবতেই কেন জানি মনে হলো মার্কেস তো বোগোতায় বহুদিন ছিলেন, সে অবশ্য বহুকাল আগে, তখন কি তিনি এই পথেই কোনো একদিন আনাগোনা করেছিলেন? এয়ারপোর্টের দিকে যেতে যেতে মনে মনে এরকমই ভাবছিলাম। তাপসের কাছে শহরটা পরিচ্ছন্ন বলে মনে হয়েছে। অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের শহরগুলোর একটা অংশ পরিচ্ছন্ন আর অন্য একটা অংশ অপরিচ্ছন্ন। একদিকে সুরম্য অট্টালিকা, অন্যদিকে বস্তির বিস্তার। আমরা হয়তো পরিচ্ছন্ন অংশে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

এল দোরাদো এয়ারপোর্টে আমরা উড্ডয়নের অনেক আগেই চলে এসেছি। অচেনা এয়ারপোর্টে আগে এসে অনেক সময় অপেক্ষা করলেও একঘেয়ে লাগে না, কারণ নতুনত্ব। আর তাছাড়া নানান দেশের মানুষকে দেখার আনন্দও আছে। আর তাতেও যদি একঘেয়েমি না কাটে তাহলে এয়ারপোর্টের নানান ধরনের গিফটের দোকান ও ডিউটি ফ্রি শপ-এ এটা সেটা দেখে দিব্যি এক দেড় ঘণ্টা পার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এর কোনোটাই দরকার হয় নি, কারণ সঙ্গী থাকলে অপেক্ষাকেও দীর্ঘ ও একঘেয়ে মনে হয় না।

(চলবে)
রাজু আলাউদ্দিন

রাজু আলাউদ্দিন

জন্ম ১৯৬৫, শরিয়তপুরে। লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। কর্মজীবনের শুরু থেকেই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা