আদর্শ কি শুধুই বিরোধী মতের বই প্রকাশ করে

অতি-সম্প্রতি অমর একুশে বইমেলায় স্টল-বরাদ্দ নিয়ে বাংলা একাডেমি ও আদর্শ প্রকাশনার মধ্যে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই জটিলতা কেবল পুস্তকব্যবসা সংক্রান্ত নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্ন। ফলে বিষয়টিকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমরা চাই এ ব্যাপারে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে খোলামেলা কথাবার্তা চলুক। চিন্তার আদানপ্রদান হোক। সে লক্ষ্যেই গত ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পরস্পর মুখোমুখি হয়েছিল আদর্শ-র স্বত্বাধিকারী মাহাবুব রাহমানের। আমরা বাংলা একাডেমিরও মুখোমুখি হতে চাই।

পরস্পরের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কবি সোহেল হাসান গালিব।


গালিব

একটা দুঃসময়ে মুখোমুখি হলাম আমরা। এবং আমি এও জানি, এরকম একটি পরিস্থিতি আপনার জন্য এই প্রথম নয়। ২০১৯ সালেও এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং এবারও সেরকম একটি ঘটনা। ঘটনায় যাবার আগে খুব সাধারণভাবে যে প্রশ্নটি প্রথমেই আসে, এবারে, ২০২৩ সালের বইমেলাকে কেন্দ্র করে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল?

মাহাবুব

এই বইমেলায় আমাদের প্রায় ৬০টির মতো বই প্রকাশ হওয়ার কথা। এখানে বিভিন্ন ধরনের বই আছে; কিছু আছে আত্মজীবনী, যেমন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খানের ‘বলা ও না-বলা কথা’, আছে অজয় দাশগুপ্তের মুক্তিযুদ্ধের বই '৭১: রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে বিশ্বের বিস্ময়', ইমরান আমিনের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। ইমরান আমিন বুয়েটের সাবেক শিক্ষক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্মার্ট সিটির নানা প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন। তিনি ‘স্মার্ট’ কনসেপ্টের প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে লিখছেন। এছাড়াও আমাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস থেকে শুরু করে হ্যাপিনেস, গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-সহ নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ বই আসার কথা। আমাদের প্রকাশনাগুলোতে সাধারণত দেখা যায় যে, ৫০টি বইয়ের মধ্যে হয়ত ২৫টি উপন্যাস, ১৫টি কবিতা আর ১০টি লিটারারি নন-ফিকশন। আমাদের দেশে বৈচিত্র্যপূর্ণ বইয়ের পরিমাণ খুবই কম।

তো মেলার জন্য আমি বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রায় ৫০-৬০ লাখ টাকা ধারদেনা করে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের বইয়ের প্রচুর কাটতি। বছরে প্রায় এক-দেড় লাখ কপি বই বিক্রি হয়। কিন্তু আমাদের স্টাবলিশমেন্ট, অপারেশন, প্রোডাকশন-খরচও প্রচুর। আমরা যেহেতু পুরোই পাঠকনির্ভর প্রতিষ্ঠান, টেন্ডার-সাপ্লাই এসবে যেহেতু জড়াই না, তাই বছরশেষে আমাদের হাতে বলতে গেলে কিছুই থাকে না। যে কারণে অনেক সময়ই ধারদেনা করে চলতে হয়।   

আপনারা জানেন, এবারে কাগজের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে; শুধু কাগজ না, ছাপা-বাঁধাইয়ের অন্যান্য উপকরণের দামও দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতসব প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমরা মানসম্পন্ন কোনো বই প্রকাশ থেকে বিরত থাকছি না।

গালিব

কাজ শেষের পর্যায়ে কয়টি বই?

মাহাবুব

প্রেসে চলে গেছে প্রায় ২০-২৫টি বই। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের পাণ্ডুলিপি এডিটিংয়েই বেশ ভালো সময় চলে যায়। তবুও আমাদের টার্গেট জানুয়ারির মধ্যেই আমরা অন্তত ৩০টি বই প্রেসে পাঠাব। বাকি বইগুলো চেষ্টা করব ফেব্রুয়ারি ১৫ তারিখের মধ্যেই প্রেসে পাঠিয়ে দিতে।

গালিব

আচ্ছা। আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নিই, এবারের বইমেলায় আদর্শর অংশগ্রহণ করা হচ্ছে না। তাহলে এই বইগুলো নিয়ে আপনার মার্কেটিং পলিসি কী?

মাহাবুব

এবারের বইমেলায় যদি আদর্শর অংশগ্রহণ নাই-ই হয়—যদিও এখনো সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় নি এবং আমি আশাবাদী বাংলা একাডেমির শুভবুদ্ধির উদয় হবে—তবে একান্তই যদি না হয় সেক্ষেত্রে আমাদের ফোকাস থাকবে কিভাবে বইগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়া যায়। প্রোডাকশন স্ট্রাটেজিতেও কিছু চেঞ্জ আসবে। এছাড়াও ডিজিটাল মার্কেটিং,কর্পোরেট মার্কেটিং, বিটুবি সেলসেও আরো ফোকাস দিতে হবে। 

গালিব

ঠিকাছে। এবারে একটু শুনি, এই যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে আদর্শ, সবাই জানতেও চাচ্ছে, ২০১৯ সালের ঘটনাটি কী ছিল?

মাহাবুব

২০১৯ সালে যেটা হয়েছিল, তার কারণ ছিল আমার ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ। যদিও আমার ব্যবসার ধরন পুরো আলাদা। আমি বাংলাবাজারমুখী প্রকাশক নই। বাংলাবাজারকেন্দ্রিক প্রকাশকদের বিজনেস ফিলোসফি, পলিসি, স্ট্রাটেজি, কালচার কোনো কিছুর সাথেই আদর্শর খুব একটা মিল নেই। তাদের টাকা কামানো ছাড়া বলতে গেলে তেমন কোনো ভিশন-মিশনই নেই। তো সেসময় তাম্রলিপি প্রকাশনীর প্রকাশক তরিকুল ইসলাম রনি আমার ফেসবুকের কিছু স্ট্যাটাস, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সম্পর্কিত, তার স্ক্রিনশট প্রিন্ট করে বাংলা একাডেমিতে অভিযোগ দাখিল করে যে, আমি জামাত-শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয়। 

গালিব

এখানে একটা প্রশ্ন করে রাখি, বাংলা একাডেমির নীতিমালায় এমন কোনো শর্ত আছে কি যে, কোনো প্রকাশক যদি বিএনপি, জামাত কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে তবে তাদের প্রকাশনী বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না?

মাহাবুব

না, এমন কোনো নীতিমালা নাই। এবং প্রতিবছর তো বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রকাশক বইমেলায় অংশ নিয়ে থাকে। আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ষড়যন্ত্রমূলক।

গালিব

আচ্ছা, ২০১৯ সালে তাহলে ফয়সালা কী হলো?

মাহাবুব

তখন মেলা কমিটির তৎকালীন সচিব জালাল আহমেদ এবং সদস্য সুভাষ সিংহ রায় আমার সাথে বসেন। আমি তখনও তাদের দৃঢ়ভাবে বলি যে, আমি ব্যক্তিমানুষের মত ও অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এবার আপনিই বুঝে নিন কোন চেতনার মানুষ মত ও অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

গালিব

তাহলে এইটা কি প্রমাণিত যে আপনি এই ধরনের রাজনীতির সাথে জড়িত নন?

মাহাবুব

দেখুন আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আসার সাথে সাথে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি বাকী বিল্লাহ বিডি নিউজে আমার পক্ষে একটি উপসম্পাদকীয় লেখেন: 'একুশের বইমেলা, আদর্শ প্রকাশনী ও যুক্তি-বুদ্ধির উল্টোরথে বাংলা একাডেমি'। এবার আরেকটু পুরোনো গল্পে যাই। আদর্শ শুরুই হয় আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন দিয়ে। এই পেশায় আসার আগেই আমার বেশ কয়েকটি পত্রিকার সাহিত্য-পাতায় কাজ করার সুযোগ হয়। সেই সুবাদে আল মাহমুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তো, আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ গল্প, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, কবির মুখ প্রভৃতি বই প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাবাজারের এক সিনিয়র প্রকাশক আমার এক নিকটাত্মীয়কে জিজ্ঞাসা করেন যে, মাহাবুব কি শিবির? পাল্টা প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে সেই প্রকাশক বলেন, না জিজ্ঞাসা করছি এই কারণে যে তার প্রকাশনী থেকে আল মাহমুদের বই বের হচ্ছে। তো সেই নিকটাত্মীয় আমাকে এসে এই গল্প বললে আমি তাকে বললাম, তোমার তো সেই প্রকাশকে বলা উচিত ছিল যে, আল মাহমুদের বই প্রকাশের কারণে মাহাবুব যদি শিবির হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তো আপনার জামায়াতের আমির হওয়ার কথা, কেননা আপনার প্রকাশনী থেকে আল মাহমুদের ২৫-৩০টা বই বের হয়েছে। এবার বুঝেন ব্যবসায়িক ঈর্ষা কী জিনিস।

আরেকটি গল্প বলি, ২০১৩-১৪ সালের দিকে রুদ্র সাইফুল নামে এক লোক আমার অফিসে আসেন একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে। পাণ্ডুলিপিটি আরজ আলী মাতুব্বরের উপর বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের লেখার সংকলন। লেখকদের নাম দেখেই আমি বুঝে যাই যে, সে তাদের অনুমতি ছাড়াই এই সংকলন করেছে। তখন আমি তাকে বলি, আমরা আপনার এই বইটি প্রকাশ করব তবে লেখকদের লিখিত অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। সে দুতিন দিন পরে আসবে বলে যে গেল আর তার দেখা নাই। তার সাথে দেখা হলো প্রায় ২-৩ বছর পর ২০১৬ সালে প্রভাষ আমিনের একটা স্ট্যাটাসের কমেন্টে। প্রভাষ আমিন স্ট্যাটাস দেন যে, আদর্শ থেকে আমার একটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে সে কমেন্ট করে যে, আপনি এত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে অবশেষে জামাত শিবিরের প্রকাশনী থেকে বই বের করতেছেন। আদর্শ সম্পর্কে সে তার দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে এটাও বলে যে, মাহাবুব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ডিপার্টমেন্টে আমার জুনিয়র। তাকে আমি পারসানালি চিনি, ক্যাম্পাসে সে ছাত্রশিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার ছিল। তখন সেই কমেন্টের প্রত্যুত্তরে আমার তৎকালীন সহকর্মী সাবিদিন ইব্রাহিম লেখে যে, আপনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়েছেন, বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষক যদি আপনাকে তার ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে তবে মাহাবুব ভাইয়ের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তিনি মেনে নিবেন। এরপর রুদ্র সাইফুল সাবিদিনকে ব্লক মেরে নিজেও আইডি ডিএকটিভেট করে ফেলে। এই হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের অবস্থা। আমাকে শুধু এরকম প্রকাশক কিংবা তথাকথিত লেখকদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয় না, অনেক রকম শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়। এবারও দেখা গেল কিছু লোক স্টল নিষিদ্ধের মূল ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন না তুলে সন্দেহ করতেছে, আমি ‘প্রোপাগাণ্ডা’ ছড়াচ্ছি। এরা কারা? এরা হচ্ছে কাঁচ কাঁচা অবাস্তব সব আর্ট-কালচার ব্যবসা নিয়ে এসে দুদিনও বাজারে টিকতে না পারা লোকজন। এইসব বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নিয়ে এরা কতদূর যাবে?

গালিব

ওয়েল, এবারে তাহলে মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। এবারের ঘটনাটি কী ঘটল আপনার মুখ থেকে শুনি।

মাহাবুব

এবারের ঘটনা হচ্ছে, ১২ জানুয়ারিতে স্টল বরাদ্দের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সাধারণত স্টলের যে তালিকা প্রকাশ করা হয় সে তালিকা থেকে পরবর্তী সময়ে লটারির মাধ্যমে স্টলের নম্বর বা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তো সেই তালিকার কোথাও 'আদর্শ'র কোনো নাম ছিল না। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, তাই আমি আর যোগাযোগ করতে পারি নি।

পরে রবিবারে আমি বাংলা একাডেমিতে যাই। সেখানে বাংলা একাডেমির মেলা কমিটির সচিব মোজাহিদুল ইসলাম আমাকে বললেন তার কাছে এ বিষয়ে কোনো কাগজপত্র নাই। তিনি আমাকে তার অধস্তন কর্মকর্তা কবিরের কাছে যেতে বললেন। কবিরও আমাকে বলল তার কাছেও কোনো কাগজপত্র নাই। তাহলে কী দাঁড়ালো ব্যাপারটা? 

গালিব

তারা জানাচ্ছে না।

মাহাবুব

জি, তারা জানাচ্ছে না ব্যাপারটা। পরবর্তীতে আমি তালিকায় কেন আদর্শর নাম নাই জানতে চেয়ে ডিজি বরাবর একটি চিঠি দিয়ে আসি। পাশাপাশি আমি নিজেও বিভিন্নভাবে খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করি। ৩১ সদস্যবিশিষ্ট মেলার কমিটিতে থাকা ৪ জন প্রকাশক-প্রতিনিধির একজন ওসমানী গনি ভাইকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানাই, তিনি বিস্মিত হন। আরও একজনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনিও জানালেন এই বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আমি তাকে প্রশ্ন করি সকালে স্টল বরাদ্দের মিটিংয়ে আপনারা ছিলেন, আর বিকালে আপনাদের অগোচরেই যদি এই তালিকা হয়ে থাকে তাহলে কি আপনাদের সেখানে থাকার কোনো দরকার আছে? তারা নিশ্চুপ হয়ে যান। যাই হোক, পরবর্তীতে ওসমান গনি ভাই আমাকে বললেন যে, কয়েকজন প্রকাশক বাংলা একাডেমিতে তোমার ৩টা বই জমা দিয়েছে যেগুলোতে সরকারবিরোধী বক্তব্য আছে। 

গালিব

এই প্রকাশকই কি সেই তাম্রলিপি? 

মাহাবুব

জি, সেই তাম্রলিপির রনি। এই ঘটনায় আমি চরম বিব্রত ও বিরক্ত হই। আমার পুরো রাগ গিয়ে পড়ে বাংলা একাডেমির উপর যে, তারা কেন নিজেদেরকে এসবে জড়ায়! আমার ক্ষোভটা এই জায়গায় যে, এর আগেও একটা অভিযোগ আসছে আমার বিরুদ্ধে। আসলে কে অভিযোগ করেছে, সেটা আমার দেখার প্রয়োজন নাই। আমি বাংলা একাডেমিকে টাকা জমা দিয়েছি, আমি বাংলা একাডেমির কাছে স্টল চাই। ফলে আমি মনে করি, সিদ্ধান্তটা বাংলা একাডেমির কাছে থেকেই আসছে। কেন বাংলা একাডেমি অন্য কারো কথায় নাচবে? তাদের নিজেদেরও তো একটা বিবেচনাবোধ আছে। তাদের সেই বিবেচনাবোধের তো পরিচয় দিতে হবে।

এরপরও আমি দু'বার ডিজি বরাবর চিঠি দিই, কেন আমাকে স্টল থেকে বঞ্চিত করা হবে, আমাকে কারণটা জানান। আজ স্টলের লটারি হয়ে গেল, অথচ আমাকে কেন স্টল দেয়া হচ্ছে না তাদের কাছ থেকে এখনো তার কোনো অফিশিয়াল চিঠি পেলাম না। আমি টাকা জমা দিয়েছি বাংলা একাডেমিতে, অথচ আমাকে বরাদ্দ যে দেয়া হচ্ছে না সেটা জানতে হচ্ছে পত্রিকার মাধ্যমে। 

গালিব

এই ব্যাখ্যাটা আমরা পড়েছি পত্রিকায়, এই ব্যাপারে আপনি কোনো অফিশিয়াল চিঠি পান নি?

মাহাবুব

না, কোনো ধরনের চিঠি এখনও পাই নি।  

গালিব

পত্রিকার মাধ্যমে আমরা যেটা জানতে পারছি, তাদের আপত্তি এখন একটা বই নিয়ে। 

মাহাবুব

তাদের আপত্তি ৩টা বই থেকে সরে এসে একটাতে ঠেকেছে। 

গালিব

এইটা জানার পরে তাদের সাথে আপনার কোনো আলাপ হয়েছে?

মাহাবুব

বাংলা একাডেমির মেলা কমিটির সচিব ফোনে কথা বলেছেন। ফোনে তার ভঙ্গিটা আমার আন্তরিক মনে হয়েছে। তিনি অনেক কথা বলেছেন। আমিও আমার ক্ষোভ প্রকাশ করেছি। যেহেতু আমি একই ঘটনায় বারবার ভিক্টিম হচ্ছি, ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছি বাংলা একাডেমি বারবার আমার সাথে ঝামেলা করছে। তারা আমাকে জানিয়েছে কিন্তু পার্সোনালি। এখানে কাজটা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির নয় কিন্তু। যেখানে আমি তাদেরকে বারবার চিঠি দিয়েছি, সেখানে তাদের অফিশিয়াল বক্তব্যটাই আমি প্রত্যাশা করি। ব্যক্তিগত ফোনালাপে কে কী বলল সেটা তো আসলে অফিশিয়াল বক্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

গালিব

হুম! ফাইনালি, আমি সংবাদ-মাধ্যমে জানতে পারলাম, মন্ত্রীর বরাতেই বলছি যে, 'তাদের জন্য দ্বার খোলা আছে। একাডেমির নীতিমালা মানলে তারা মেলায় অংশ নিতে পারবে।' সেখানে আপনার সিদ্ধান্তটা কী?

মাহাবুব

বাংলা একাডেমির নীতিমালার ব্যাপারে তো আমার কোনো ক্ষোভ বা বিদ্বেষ থাকার কথা নয়। আমার কথা হচ্ছে বাংলা একাডেমির নীতিমালা যদি কোনো একটা বইকে বইমেলায় প্রদর্শন ও বিক্রি করতে না পারার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেখানে আমার আপত্তি আছে। আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি আমার অবশ্যই শ্রদ্ধা আছে। কোনো একটা বইকে যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তবে আমি অবশ্যই সেই বই বিক্রি করব না। কিন্তু যে বই রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করে নি, সে বই বাংলা একাডেমি নিষিদ্ধ করতে পারে না। আমার কমনসেন্স বলে যে, এটা বাংলা একাডেমির কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। আমার আরও প্রত্যাশার জায়গা হচ্ছে, গণবিরোধী নুরুল আমিনের বাসভবন থেকে একুশের যে চেতনা নিয়ে বাংলা একাডেমি গঠিত হয়েছে, বাংলা একাডেমি সেই চেতনার প্রতিফলন ঘটাক। তাদের কাজ লেখকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার টুটি চেপে ধরা না, বরং কোনো পক্ষ যদি লেখকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে চায় আমার প্রত্যাশা থাকবে তারা সেই লেখকের পক্ষে দাঁড়াবে।

গালিব

এখানে একটি প্রশ্ন তুলছি, এর উত্তর আপনি দিতে না চাইলে না দিতে পারেন। বাংলা একাডেমির যে নীতিমালা আমি পড়লাম তাতে দেখলাম, যে অবলিগেশনগুলো তারা দিচ্ছে, তা হচ্ছে সংসদ-সদস্য, জাতীয় নেতা এদের প্রতি কটাক্ষ (অনেক সময় সমালোচনাও কটাক্ষ বটে) বা আপত্তিকর কথা থাকলে তারা সেই বই মেলায় প্রদর্শন বা বিক্রি করতে দেবে না। কিন্তু আমাদের সংবিধান অনুযায়ী এবং প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন সংসদ-সদস্যকে নিয়ে, এমনি প্রয়াত নেতাদের নিয়ে সমালোচনা বা তাদের কর্মকাণ্ডের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরা হয় সংসদে, গণমাধ্যমে, পাবলিক মিটিংয়ে। ফলে, বাংলা একাডেমির এই নীতিমালা সংবিধানের সাথে একটু সাংঘর্ষিক না কি?

মাহাবুব

আশলে আমি তো আর একজন সংবিধান-বিশেষজ্ঞ না। কিন্তু সাধারণ সেন্সে আমার কাছে তা সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়েছে। প্রথমত তাদের এই নীতি বাংলা একাডেমি তথা একুশের যে মূল চেতনা, তার সাথেই সাংঘর্ষিক। পত্রিকা-টেলিভিশনে এই যে অহরহ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে, যারা ক্ষমতায় থাকেন সমালোচনা তো তাদেরই হয়, বিরোধীদলের হয় নাকি—সে হিসেবে বাংলাদেশে সমালোচনার কারণে কয়টা পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে?

গালিব

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না, এই বইতে এমন কিছু আছে যা পত্রিকায় বা টেলিভিশনের টকশোতে এর আগে উচ্চারিত হয় নাই।

মাহাবুব

এমনকি ফাহাম আব্দুস সালাম নিজেও বলেছে, এই বইটা ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ার মতো এত ভালো হয় নি। 

গালিব

তাহলে এখন বইমেলার পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে… মাঝখানে আমরা আপনাদের একটা প্রেস রিলিজে জানলাম, আপনারা আইনি লড়াইয়ের কথা ভাবছেন। তাই কি?

মাহাবুব

হ্যাঁ, আইনি লড়াই তো আমার অধিকারের জন্য। আইনি লড়াই মানে তো এমন না যে কারও বিরুদ্ধে যাওয়া। যখন আপনি আপনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন, তখন আপনি আইনি লড়াইয়ে যাবেন। আমি মনে করি, আমি আমার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, সেই অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য আইনের শরণাপন্ন হচ্ছি। এর মধ্যেই আমরা কয়েকজন ব্যারিস্টারের সাথে কথা বলেছি। বাংলা একাডেমি কী কারণে আমাদের স্টল দিচ্ছে না সেটা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছি, সরাসরি নয়; আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হলে সরাসরি আমাকেই তাদের চিঠি দিতে হবে এবং সেই চিঠি আমি আদালতে দাখিল করতে পারব। আমরা কারণ জানতে চেয়ে বাংলা একাডেমিকে আবার চিঠি দিয়েছি। সেই চিঠি আসুক তারপর আমরা আগাবো। 

গালিব

আচ্ছা, আমি আরেকটা প্রশ্ন করি। এখানে যে লেখকদের বই নিয়ে আপত্তি উঠেছে সেই লেখকরা কী করছেন? তারা কি কোনো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন? বা তারা কোনো অ্যাকশনে যেতে চাচ্ছেন?

মাহাবুব

এটা আসলে লেখকের কাজ নয়, প্রকাশকের কাজ। কোনো বই যদি নিষিদ্ধও হয়, লেখক নয়, প্রকাশক আপিল করেন।

গালিব

আচ্ছা, এবারে একটা অন্য প্রসঙ্গে আসি। সেটা হচ্ছে যে, আপনার আদর্শ প্রকাশনী এবং আপনার এই তিনটি বই এবারে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা জানি আপনার প্রায় ৬০০টির মতো বই অলরেডি প্রকাশিত হয়েছে। আপনার এইসব বইয়ের যারা লেখক তারা কি কিছু বলছেন, তাদের পজিশন থেকে?

মাহাবুব

লেখকরা হয়তো একটু ডিমোটিভেটেড হবেন। তবে আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, এইরকম পরিস্থিতিতে আমি লেখকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। কারণ আমি মনে করি যে, বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্ত আসলে আদর্শর বিরুদ্ধে নয়, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’র বিরুদ্ধে। এখানে আদর্শ একটা নিয়ামক মাত্র। আমি এই পয়েন্টটাকে ঠিকঠাক মতো অ্যাড্রেস করতে পেরেছি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিতে পেরেছি। যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় তাহলে তো এই ঘটনাই ঘটে না। এই জায়গায় আমার মনে হয়, আমার অন্তত ৯৮% লেখক এখনও আমার পক্ষে আছেন এবং এখনও কোনো লেখক আমার বিরোধিতা করেন নি। আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, আমার এখানে এমনকি বলা যায় সরকারের সমর্থক, যদিও আমি লেখকদের কখনই এভাবে ভাবি না, কারণ যিনিই পাণ্ডুলিপি নিয়ে আসেন আমার কাছে তার বড় পরিচয় তিনি একজন লেখক আর আমি তার প্রকাশক, কার কী রাজনৈতিক মতাদর্শ এগুলো আমার দেখার বিষয় নয়—কিন্তু আমি কথার খাতিরে বলছি, আমার এখানে লেখকদের একটা বড় অংশ রয়েছেন যারা সরকারের সমর্থক, তারাও আমার অবস্থানের বিরোধিতা করছেন না। কারণ তাদের কাছে হয়তো মনে হচ্ছে আমি যৌক্তিক অবস্থানটাই নিচ্ছি।

গালিব

আমি তো জানি যে বাংলা একাডেমির প্রয়াত ডিজি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ভাই, তার একটি কবিতার বই আপনার এখান থেকে বেরিয়েছে এবং এটাও শুনেছি বর্তমান যে ডিজি তারও একটি কোনো বই বা সাক্ষাৎকার আপনার এখান থেকে প্রকাশ পেয়েছে…

মাহাবুব

দেখেন ভাই, আশল কথা হচ্ছে আমি সত্যিকার অর্থে সমাজে একটা কথা বলার স্পেস চাই। কথা বলার সেই স্পেসটাই আমি 'আদর্শ'র ক্ষেত্রে তৈরি করতে চাই। ফলে আমি সবসময়ই চেষ্টা করেছি আমার এখানে যত ভিন্নমতের, মতাদর্শের লোককে আমি জড় করতে পারব ততই কথা বলার একটা কমন স্পেস তৈরি হবে। সেই চিন্তা থেকেই আমি সিরাজী ভাইয়ের বই, নূরুল হুদা ভাইয়ের বই করেছি, সিআরআইয়ের (CRI) উপদেষ্টা অজয় দাশগুপ্তের বই করেছি। কোনো লেখক বলতে পারবে না তার রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের কারণে সে আলাদা কোনো কদর কিংবা অবজ্ঞার শিকার হয়েছে। আমি চাই সরকারপক্ষেও পজিটিভ গঠনমূলক আলোচনা আসুক, আমি আমার এথিকাল জায়গা থেকে কোনো ধরনের তেলবাজি, মেধাহীন, চিন্তাহীন বই প্রকাশ করতে পারি না।  

গালিব

একটা মৃদু অভিযোগ আপনাদের প্রকাশনার বিরুদ্ধে, সেটা হচ্ছে আপনাদের বেশিরভাগ বই মোটিভেশনাল টাইপের। মানে আমরা যে অর্থে পিওর লিটারেচার বলি, পিওর লিটারেচার বলতে ফিকশন, কবিতা, গল্প, সাহিত্য-প্রবন্ধ—এই ধরনের বইয়ের দিকে আপনার ঝোঁক কম। সেক্ষেত্রে আমার জানতে চাওয়া, তেমন বই কী রকম আছে?

মাহাবুব

অনুমান-নির্ভর আলোচনা হলে যা হয়। আদর্শর ছয়শোর মতো বইয়ের মধ্যে ২-৩টা মোটিভেশনাল বই, আর ৭-৮টা হচ্ছে সেল্ফহেল্প বই। আমি এখানে সেল্ফহেল্প আর মোটিভেশনাল বইয়ের পার্থক্যবিচারে যাচ্ছি না। তর্কের খাতিরে সেল্ফহেল্প বইগুলোকেও যদি আমরা মোটিভেশনাল বই ধরে থাকি তবে আদর্শর মোটিভেশনাল বই হচ্ছে সাকুল্যে ৯-১০টা। তার মানে ৬০০ বইয়ের মধ্যে ২%-ও মোটিভেশনাল বই নেই। আমার এ কথায় কারো যদি আপত্তি থাকে তবে তিনি আমাদের ক্যাটালগ ঘেঁটে দেখতে পারেন।

গালিব

আদর্শ থেকে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাহিত্যের বইয়ের কথা যদি বলতেন।

মাহাবুব

দেখেন, আমার এখানে স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা এক ধরনের শিক্ষাসহায়ক বইগুলো বেশি। কেননা এই ধরনের বইয়ের পাণ্ডুলিপি মূল্যায়ন করা অনেকটাই সহজ। কিন্তু কবিতা, গল্প, উপন্যাস এগুলো অনেক বেশি সাব্জেক্টিভ। এগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রকাশক বা সম্পাদকের রুচিও জড়িত। আপনি নিজেও কবি, বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন; এখন আপনাকে যদি আদর্শর দায়িত্ব দেয়া হয়, কয়টা নতুন সাহিত্যের বই আপনি প্রকাশ করতে পারবেন? কবিতা-গল্প-উপন্যাসের ভালো পাণ্ডুলিপি না পেলে আমরা কী করব? সাহিত্যের বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কি যা খুশি তাই প্রকাশ করব?

আমি তো এখানে বিনিয়োগ করছি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই দেখব যে, যা বিনিয়োগ করছি তার রিটার্নটা কী? এটা কি মানুষের কাছে কোনো ভ্যালু অ্যাড করছে? কোনো পাণ্ডুলিপি প্রকাশের আগে আমরা চেষ্টা করি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে, যেমন বইটি কি লাভজনক কিংবা বইটি সম্মানজনক? বইটির লাইফটাইম কত বছর? এই বইটি কি দোকানদারগণ তাদের দোকানে রাখবেন?

গালিব

হ্যাঁ… আমি আশলে শুনতে চাচ্ছি আপনার পাব্লিকেশনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাহিত্যের বইয়ের কথা, পাঠকদের জানানোর উদ্দেশ্যে আর কি।

মাহাবুব

এইখানে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের ক্ষেত্রে আমি বলব যে, যেমন ধরেন আদর্শর কাছাকাছি সময়ে যেসব প্রকাশক আত্মপ্রকাশ করেছেন, তুলনাটা দিতেই হচ্ছে, কারণ আদর্শ খুব দ্রুত বাংলাদেশের পাব্লিকেশন জগতে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। ফলে আদর্শকে নিয়ে কিছু অপপ্রচার…

গালিব

আপনাদের বয়স কত? দশ বছর? 

মাহাবুব

না, আদর্শর শুরু ২০১০ সালে। তখন আমি চাকরির পাশাপাশি এটা শুরু করি। ২০১৫ সালের পর আমি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি প্রকাশনায় আত্মনিয়োগ করি। তো আমি বলতে পারব অন্তত আদর্শর বয়সী যেসব প্রকাশনা আছে তাদের চেয়ে আদর্শ থেকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে। এখন যে ৩টি বই নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেগুলো তো আছে, তারপর ধরেন ফরিদা আখতার ও ফরহাদ মজহারের 'পুরুষতন্ত্র ও নারী', শিশির ভট্টাচার্য অনূদিত বের্নার অরি লেভির 'বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল', মোহাম্মদ আজমের 'বাংলা ভাষায় উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ'-এর মতো একাডেমিক জায়গা থেকে উচ্চ-প্রসংশিত একটি বই আদর্শ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তারপর কুদরত-ই-হুদার 'শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস: আঙ্গিক বিচার', নাসির আলী মামুনের 'শামসুর রাহমান আল মাহমুদ: তফাৎ ও সাক্ষাৎ', মাহবুব মোর্শেদের 'তোমারে চিনি না আমি', জিয়া হাসানের 'শাহবাগ থেকে হেফাজত: রাজসাক্ষীর জবানবন্দি', পারভেজ আলমের 'জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা', 'মদিনা', ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশ', 'বাংলাদেশ অর্থনীতির পঞ্চাশ বছর', ফিরোজা বহ্নির 'হাঁটি হাঁটি পা পা', রকিবুল হাসানের 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র', এম এন মুস্তফার 'আমাদের সঙ্গীত: একটি ঐতিহাসিক পাঠ', ওয়াহিদা মল্লিক ও শাহমান মৈশানের 'পোষাক পরিকল্পনার নন্দনবীক্ষণ' প্রভৃতি বই রয়েছে। এসব বইয়ের অধিকাংশই কিন্তু আবার পাঠকনন্দিত। আবার জনপ্রিয় বইয়ের কথা যদি বলেন, আশীফ এন্তাজ রবির উপন্যাসগুলো, মুনির হাসান, চমক হাসান, রাগিব হাসান, ঝংকার মাহবুবের সবগুলো বই।

গালিব

আমি একটু সাহিত্যই শুনতে চাচ্ছিলাম… আপনি নির্বাচিত কবিতার একটি সিরিজ করছিলেন…

মাহাবুব

হ্যাঁ, গতবছর নির্বাচিত কবিতার একটি সিরিজ করেছিলাম, সেখানে আছে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান (যন্ত্রস্থ), চঞ্চল আশরাফসহ কয়েকজন কবির নির্বাচিত কবিতা।  

গালিব

তরুণদের পর্যন্ত এসেছে তো। আমি যতদূর জানি...

মাহাবুব

তরুণদের বই তো আছেই, যেমন ধরেন তারেক খানের 'বান্ধাল' নামে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস, এবার প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এনামুল রেজার 'চায়ের কাপে সাঁতার' নামে প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস। এছাড়াও সালাহউদ্দিন শুভ্রের উপন্যাস, সেরিফ আল সায়ারের গল্পগ্রন্থ, পারমিতা হিমের গল্পগ্রন্থ, আলতাফ শাহনেওয়াজের 'আলাদিনের গ্রামে', রওশন আরা মুক্তার ২টি কবিতার বই, মোস্তফা হামেদীর 'ভুঁইচাঁপার ঘ্রাণ'—এরকম আরো অনেক বই।

গালিব

আবার শুরুর দিকের একটা প্রশ্নে ফিরে যাই। একাডেমির নীতিমালা অনুযায়ী জাতীয় নেতৃবৃন্দের সমালোচনা বা কটাক্ষমূলক বই ছাপার ক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্ত কী হবে?

মাহাবুব

কী সরল নিষ্পাপ নীতিমালা! আমি ভাই তাদের চেয়ে আরও সরল। জাতীয় নেতৃবৃন্দ না বলে যদি বলা হয় যে, সরকার-দলীয় মৃত অথবা জীবিত কোনো নেতৃবৃন্দের সমালোচনা বা কটাক্ষমূলক বই প্রকাশ করা যাবে না, তাহলে আমার বুঝতে সুবিধা হয়, আমি সতর্ক হতে পারি এবং তারাও সৎ থাকতে পারেন। কবি বলেছেন—

যদি ইচ্ছা কর তবে কটাক্ষে হে নারী,
কবির বিচিত্র গান নিতে পার কাড়ি...

গালিব

দ্যাটস ফাইন। আমিও একটা সফট কোশ্চেন দিয়ে শেষ করি। শেষ প্রশ্নটি হলো, আপনি তো একসময় কবিতা লিখতেন। এখনও কি লেখালেখি করেন?

মাহাবুব

আমি আশলে এখন লেখালেখি করার সময় পাই না। আর এখন কবিতা, কাব্য, জীবন এগুলো নিয়ে আশলে আমার একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমি মনে করি, মানুষের জীবনে কবি কিংবা যে কোনো পরিচয়ের চেয়েও হ্যাপিনেসটা বেশি জরুরি। অনেক সময় এমন হয় যে, কবি হয়ে উঠতে গিয়ে জীবনযাপনের মধ্যে আর ভারসাম্য রাখা সম্ভব হয় না। জোর করে কবিতা লেখার চেয়ে কাব্যিক অনুভূতির মধ্যে বাস করা বেশি জরুরি নয় কি? কবি-পরিচয়ের জন্য, একটুখানি খ্যাতির জন্য বর্তমানহীনতার মধ্যে বাস করার কোনো মানে হয় না। কেউ যদি মুহূর্তের মধ্যে বাস করে কবি হয়ে উঠতে পারে তবে ফাইন, তার গ্রেট পোয়েট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমার মনে হয় জীবন তো একটাই, এটাকে অহেতুক জটিল না করে যতটুক সহজ-সরল রাখা যায়। 

গালিব

আপনি তো সাহিত্যের সাথে, কবিতার সাথে আছেনই। আপনার জীবন আনন্দের হোক। সহজ এবং সুন্দর হোক। শুভকামনা থাকল পরস্পরের পক্ষ থেকে। আশা করি দুর্যোগের মুহূর্ত থেকে বেরিয়ে আসব আমরা। নতুন দিনের সূচনা হবে।

সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা