পর্ব-৫
মানুষের প্রাণ
তখনও সেই মাঝবয়সী লোকটা চুরমার হয়ে যাওয়া বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে হুমকি দিচ্ছে, আরেকটা মানিব্যাগে আত (হাত) দিলে আমি তগরে খুন করাম।
স্বার্থচিন্তার বাইরে গিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে হলে সাহস লাগে, যুক্তিহীন আজব কিছু আবেগ লাগে। তাই কোনো কিছু না ভেবেই শুধু একটা সাহসী গলার গর্জনে কনকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বুকের মাঝে হৃদয় নামক স্তব্ধ চেতনাটা গা-ঝাড়া দিয়ে চোখ খুলে। দিনের চকচকে আলো, বাতাসের প্রাণময় আভাস, কাদামাটির ঘ্রাণ, মাঠের সতেজ ফসলের সুবাসে কনকের অচেতন মনটাতে আচানক একটা বোধ জেগে ওঠে। এইরকম শত শত বিপরীত শব্দের মতোই আরেকটি বিপরীত চেতনা তার অবশ হাত দুইটাতে ফিরে আসে। তাই রক্তেভেজা কাঁপা কাঁপা হাতটা যতটা সম্ভব উপরে তুলে কনক ন্যাংটিকাছা লোকটাকে ইঙ্গিতে থামিয়ে দেয়। আহত-নিহতদের মাঝে অসাড়ে পড়ে থাকা কনকের রক্তাক্ত হাতটা উপরে উঠতে দেখে লোক দুইটা সাক্ষাৎ যমের ভয়ে চিৎকার দিয়ে বাইরের দিকে ছুটে যায়।
কনকের মনে হয়, মা শব্দটাই পৃথিবীর শুদ্ধতম রক্তের একবুক বিশ্বাস আর পবিত্র প্রেম।
তারপর আরো দুইজনকে সঙ্গী করে পা টিপে টিপে ফিরে এসে অন্য আরেকটা আহত-অজ্ঞান আদমের দেহ চ্যাংদোলা করে বেরিয়ে যায়। কনকের শরীর বোধহীন। মগজ ফাঁপা। মাথাটা যেন ছুটন্ত রকেটের ইঞ্জিন! ছোট ছোট অসংখ্য ক্ষত ভরা একটা হাত নিজের অজান্তেই সে মেয়েটার নাকের কাছে ধরে। একটু একটু শ্বাস পড়ছে! জীবনের সাড়া পেয়ে কনক ব্যস্ত হয়ে ওঠে। প্রায় লিকলিকে লম্বা গড়নের মেয়েটাকে সে এক পলক জরিপ করে। রক্তে ভেজা একদলা মাংসপিণ্ড। তবু তার দেহে খালের পানির মতো তিরতির করে প্রাণের আভাস বইছে আর কনকের হাতের চেটুতে লেগে থাকা মেয়েটার নিশ্বাসের গরম রেশটুকু যেন মিনতি করে বলছে, আমি বাঁচতে চাই!
মেয়েটার মাথার ফাটল দিয়ে কলকল করে রক্ত পড়ছে। কনকের মাথার ওপর একটা নীল ওড়না ঝুলছে। সে দ্রুত হাতে কাপড়টা টেনে নেয়। ফাটা মাথাটা তুলে সাবধানে একটা পট্টি বাঁধে। তারপর নিশিপাওয়া অচেতন শরীর আর নিবো নিবো চোখে মেয়েটাকে পাঁজাকোলে করে দাঁড়ায়। রোগা রোগা অজ্ঞান দেহটা একগাছা লতার মতো কনকের দুই হাতে ঝুলতে থাকে। তার পায়ের নিচে ভাঙা কাচগুলো মড়মড় করে ডেকে ওঠে। বাসের দুমড়ানো কঙ্কালটা আজব এক সন্দেহে ডানে-বাঁয়ে একটু একটু দুলছে। দরজার মুখে যারা ভেতরে ঢোকার অপেক্ষায় ছিল তারা সরে গিয়ে পথ করে দেয়। জল-কাদা মোটা বাতর পেরিয়ে সে বোধশূন্য রোবটিক পায়ে হাইওয়েতে ওঠে আসে। জ্যামে আটকাপড়া হাজার হাজার যানবাহনের মাঝ থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স ইস্রাফিলের শিঙ্গার মতো কেয়ামতের সাইরেন দিচ্ছে।
ছোট ছোট সিএনজিচালিত অটোগুলো একজন-দুইজন করে আহতদেরকে নিয়ে গোবরে পোকার মতো কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে হাসপাতালের পথ খোঁজে। কনক মেয়েটাকে কোলে নিয়ে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কড়াৎ করে ব্রেক কষে একটা অটো কনকের সামনে দাঁড়ায়, ওঠেন, ওঠেন, তাড়াতাড়ি ওঠেন। অনেক কায়দা-কানুন করেও কনক মেয়েটাকে নিরাপদভাবে কোথাও রাখতে পাড়ছে না দেখে ড্রাইভার ছেলেটা স্টিয়ারিং ছেড়ে নেমে আসে, কোলে নিয়া সিটে বসেন না ক্যা?
কনক নিজের চেতনাহীন অঙ্গগুলো ভাঁজ করে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে অটোর সিটে বসে। মহাসড়কে হাজার হাজার স্থবির যানবাহন। নাগরিক সভ্যতার আবিষ্কার জ্যাম নামক একটি ক্ষুদ্র শব্দের গুরুভারে অসহ্য হয়ে গাড়িগুলো ঘনঘন হর্ন বাজাচ্ছে। অটোটা বিরাট বিরাট বাস-ট্রাক আর চকচকে সব প্রাইভেট কারের ফাঁকটাক দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে। কনকের হাতের অচেতন দেহটা পথের খানা-খন্দে ঝাঁকি খেয়ে খেয়ে একান্তজনের মতো মাঝে মাঝে তার বুকের খুব কাছে চলে আসতে চাইছে!
ঝাপসা চোখে কনক দেখে মেয়েটার ডান চোখের উপর রক্ত জমে চাকা বেঁধে গেছে! প্যান্টের পকেট হাতড়ে রুমালটা বের করে আনে। তারপর সাবধানে ঘষে-ঘষে মেয়েটার চোখ-মুখ-থুতনিতে জমাট-বাঁধা রক্ত সাফ করে দেয়। কনক বুঝি কাঁদছে! আচানক একটা আবেগে সে চমকে ওঠে। নিজের কাছে বুঝি একটু শরমও পায়! তবে কি সে অই সিটের নিচে আটকা পড়া বৃদ্ধার জন্য কাঁদতে চাইছে? মহিলা একটু বেশি মোটা। তার মতো তক্তামার্কা হলে হয়তো বেঁচে যেত। ঘণ্টাখানেক আগে মা মা চেহারার এই মহিলাকে বাসে উঠতে দেখে একবুক শূন্যতার মাঝে মাথা নুয়ে কনক অনেকক্ষণ মনে মনে কিছু একটা তালাশ করেছে। কিন্তু একবারও তার নিজের মায়ের মুখ মনে পড়ে নি। হঠাৎ কনকের মনে হয়, মা শব্দটাই পৃথিবীর শুদ্ধতম রক্তের একবুক বিশ্বাস আর পবিত্র প্রেম।
সারাদিনে যার পেটে একমুঠ ভাত জোটে না তারও তো জীবন নিয়ে স্বপ্নের শেষ নাই।
অটো ছুটছে। পাশের সবুজ মাঠ থেকে আনাজের গন্ধমাখা বাতাস এসে মনকে উসকে দেয়। ধীরে ধীরে কনকের ভেতরটা যেন খুশিতে উথলে ওঠে। বুক ভরে দম লয়। আত্মার সমস্ত আবেগ গাড়ির ইঞ্জিনের মতো তার অসাড় দেহটাকে একবার থরথরিয়ে কাঁপায়! বেঁচে আছে এই বিস্ময় আধবোজা চোখ দুইটা দিয়ে লকলক করে বেরিয়ে আসছে! মানুষ তো পৃথিবীতে একবারই আসে। জীবন তো একটাই। সারাদিনে যার পেটে একমুঠ ভাত জোটে না তারও তো জীবন নিয়ে স্বপ্নের শেষ নাই। দুঃখ-বেদনা আর মৃত্যুর শীতল হাত দূর থেকে নীরবে তার দিকে এগিয়ে আসছে বলেই তো সে আরো দীর্ঘজীবী হতে চায়। আরো নিরাপদ হতে চায়। দাগা খেয়ে বুকটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলেই তো সে আরো বেশি করে ভালোবাসা খোঁজে। গায়ের জামাটা রঙচটা হয়ে গেছে বলেই তো সে পথের সব মানুষের গায়ের জামা দেখে দেখে স্থির করে, টাকা হাতে এলেই এবার সে একটা আকাশি কালারের ফুল হাতা শার্ট কিনবে। মানুষের স্বপ্নের কি শেষ আছে?
এই দুর্ঘটনায় যারা মরে গেছে, চিরতরে পঙ্গু হয়েছে কিংবা কনকের কোলে যে মেয়েটা এখন খাবি খাচ্ছে এইসব হতভাগাদের সবাই একটু আগেও ছিল তার মতোই। এখন সব রক্তাক্ত মাংস পিণ্ড। অথচ সে বেঁচে আছে! রঙিন পৃথিবীর তাজা বাতাস বুক ভরে টানছে। হয়তো কাল সকালেই আবার গরম গরম চা খাবে। সিগারেট ধরিয়ে লম্বা করে দম দিবে। তৃপ্তিতে কনকের মনটা খালের ধারের ওই বকপাখিটার মতো উড়াল দিতে চাইছে। এই মানুষ প্রাচীন পৃথিবীর অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে আসা সেই মানুষ, সেই পশু, চারপাশের সবাই মরে গেলেও নিজে বেঁচে আছে! এই আমোদ সে একা একাই প্রাণ ভরে উদ্যাপন করতে পারে।
হাসপাতালের বারান্দায় পাওয়া গেল হাত নাই, পা নাই, থেঁতলানো মাথার মরাদেরকে। ডাক্তার-নার্স-হ্যাবলা জনতা আর রক্ত-রোদনে-কুদনে চারপাশে একটা নরক! নরক! উত্তেজনা। খটাং খটাং শব্দ তুলে একটা ট্রলি আসে। চারপাশের মানুষ লেজকাটা শিয়ালের মতো খামাখা আবোল-তাবোল ভাষায় কবকব করে। হাসপাতাল নামক পাতালপুরী থেকে মানুষের কান্নার সাথে ফিনাইলের গন্ধ আসে। কনকের মাথা ঘুরছে। ঘোলা ঘোলা চোখে ঝাপসা মানুষগুলোকে লাগছে কীট-পতঙ্গের মতো! সে ট্রলিতে অচেতন দেহটা তুলে দেয়। তারপর টলতে টলতে বারান্দার কোনার দিকে সরে যায়। রক্তভেজা মরমর মানুষটাকে বুঝি কেউ দেখেও দেখল না! মানুষ কি অন্ধ? কনক ঝিমানির মাঝেই তার প্রশ্নের উত্তর পায়, মানুষ শুধু নিজেকে দেখে।
হাসপাতালের দেওয়ালে কনক হেলান দিয়ে বসে। চোখ দুইটা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। জ্বর-বিষ-বেদনায় তার দেহটা একতাল মাংসপিণ্ডের মতো ঘুমের অতলে নেতিয়ে পড়ে। ওম ওম জ্বরের ঘোরে চোখের সামনে শুধু রক্ত আর চিৎকার... আর যেন কনকের কানের কাছে মুখ রেখে একটু আগে মরে যাওয়া বাসের সেই হ্যান্ডুলম্যান ছেলেটা গলা ফাটিয়ে ডাকছে, জামালপুর..., জামালপুর..., জীবন একটা বাতাস!
কনক হকচকিয়ে ওঠে বসে। ঘোলা ঘোলা চোখে দেখে তার সামনে একজন নার্স। তাকে ঠেলে ঠেলে ঘুম থেকে উঠাতে চাইছে! সে ঝট করে উঠতে গিয়ে আহত, দরকচা শরীরের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে। তারপর ঘোরলাগা চোখে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে : মেয়েটার পোশাক-আশাকে, চোখে মুখের ভাবে-ব্যঞ্জনায়, একঘেয়ে পেশার যান্ত্রিকতায় ঠিক মেয়ে রোবট সোফিয়ার অবিকল। স্নায়ুবিক প্রেরণাহীন মেয়েটা পেশার দায়ে কিচিরমিচির করে কথা বলছে, আপনার স্ত্রী খেঁচ্ছে..., রক্ত লাগবে।
নার্স কী বলল! চারপাশে কী ঘটছে? কনকের মাথায় কিছুই ঢুকে না। শরীরের রগে রগে শীতল আগুন, মগজের কোষে কোষে দাউ দাউ শূন্যতা। এর আগেও নাই, পিছেও নাই। তাই প্রশ্নহীন, নিরাবেগ চেতনায় সে টলতে টলতে নার্সের পিছে পিছে রোগীর বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়। খিঁচুনিতে অজ্ঞান মেয়েটা মুখে ফেনা উগলাচ্ছে। তার নাজুক-নড়বড়ে শরীরটা মৃত্যুর উন্মাদ আক্ষেপে বার বার কুঁকড়ে এসে বুকের সাথে মিশে যেতে চাইছে! কনক যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, ঘোরগ্রস্ত মাতালের মতো লাল-লাল চোখে তাকিয়ে জীবন-ভিক্ষা-চাওয়ার মতো করে ডাক্তারের কাছে জানতে চায়, বাঁচবে না?
মাগিরপুত কিসিঞ্জার কই? একবার তাকায়া দেখ শালা, আমাগো জিডিপি সামনের বছর আট ছাড়াবে।
ডাক্তার টেথিস্কোপ ভাঁজ করতে করতে বলে, আগে দুই ব্যাগ রক্ত। দশ মিনিটের মধ্যে।কনকের বুকে যেন কে বল্লম দিয়ে ঘা মারে তেমনি রোখা ভঙ্গিতে সে মাথা তোলে, কেন, হাসপাতাল আছে কিসের জন্য?
ডাক্তার বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকায়, ব্লাডব্যাংকে রক্ত নাই।
কনক চোখ-মুখ খিঁচিয়ে গর্জে ওঠে, থাকবে না কেন? কলমের এক খোঁচায় ব্যাংক থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা লুটে নিতে পারো আর গরিব-দরিব মানুষের জন্য হাসপাতালে দুই ব্যাগ রক্ত রাখতে পারো না?
কনক রাগে কাঁপছিল। ডাক্তার চোখ লাল করে বেরিয়ে যায়। একটু পরেই একজন মাঝবয়সী নার্স এগিয়ে আসে, এই যে ভাই ভাষণ পরেও দিতে পারবেন কিন্তু এখন রক্ত না দিলে রোগী মরে যাবে।
অবাক! এই গলাটা কার? একটু আগে যে লোকটা চেতে উঠেছিল। যে লোকটা গরিবের কথা বলেছিল? যে দেশে দস্যু-দানবেরা সাধারণের হাড় চুষে চুষে ডিনার সারে সেই দেশে এমন করে চেঁচায় কোন শালা? এইসব এখানে বলতে নাই। দেখছ না চারপাশে কত সুখ, কত আমোদ, কত চোদন-চিৎকার, কত নির্মাণ! আমরা এখন স্বাধীন। মাগিরপুত কিসিঞ্জার কই? একবার তাকায়া দেখ শালা, আমাগো জিডিপি সামনের বছর আট ছাড়াবে। আমরা যার যার স্বাধীনতা নিয়ে এখানে সকলেই ব্যস্ত। পদে পদে সকলেই আমরা আখের গোছাই। ফ্ল্যাট কিনে নিরাপদ হই। মাসে মাসে ব্যাংকের আমানত পাগলা ঘোড়ার বেগে বাড়তেই থাকে। শহরের পথে পথে, গার্মেন্টের গেইটে গেইটে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসা মানুষের সারি দিনে দিনে দীর্ঘ হয়। বাড়তেই থাকে দুঃখী মানুষের দুঃখ।
কনকের ঘোর কেটে যায়। সে অবাক হয়ে একবার মেয়েটার দিকে তাকায়। তারপর পাগলের মতো বড়ো বড়ো চোখে চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাকে যেন তালাশ করে। একটু আগে এখানে কারা এমন চিৎকার করে করে কিসব আবোল-তাবোল বকছিল? কনক ঠান্ডা হয়ে আসে। মহিলার কাছে নিরীহ গলায় জানতে চায়, কোন গ্রুপের রক্ত লাগে?
‘ও’ নেগেটিভ।
এইবার কনক ব্যস্ত হয়ে ওঠে, আমার ‘ও’ নেগেটিভ। চলেন আমি রক্ত দেবো।
একটা অতল অন্ধকার। একটা হিম হিম মৃত্যুর ওম শরীরে নিয়ে সে হাঁটতে হাঁটতে মগজে বয়লার বিস্ফোরণের মতো গ্রুম করে ওঠা শব্দটা আবার শুনতে পায়।