পর্ব-১৬
আমাদের অন্তর্গত চেতনা
আভা যা ভাবে, বিশ্বাস করে এবং যে কাজটা করতে বিবেক তাকে বন্ধুর মতো পেছন থেকে অবিরাম ঠেলতে থাকে সেই কর্মে তার কোনো আপোস নাই। শেষ না হাওয়া পর্যন্ত জোঁকের মতো দিনের পর দিন লেগেই থাকবে। দৈব-দুর্ঘটনা আর নরকের পিচাশদের কাছে সব হারিয়েছে বলেই হয়তো তার প্রাণশক্তিটা ক্লান্তিহীন। যতই কষ্ট হোক দিন শেষে সে একবার টেবিলে বসবেই। এই সংসারে একজন মানুষের কত কিছু করার আছে। করা উচিত। দুনিয়ার তাবৎ জীবকুলের মতো মানুষও যদি শুধু উদরের চিন্তায় জীবনপাত করে তবে এক মুঠ ভাতের অপেক্ষায় উঠানে বসে থাকা কুকুরটা আর মানুষটার মঝে তফাত কী? তাই তার ব্যাগে সবসময় ছোট একটা নোট খাতা আর কলম থাকে। দরকার মতো চিন্তাটা টুকে রাখে। একটু অবসর পেলেই মিডিয়া থেকে পাওয়া কিংবা বাস্তবে দেখা সমাজের নানান অসঙ্গতির, অনাচারের ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে নোট নেয়। মানুষ হিসাবে জীবন ও পৃথিবীর সব কিছু নিয়ে চিন্তা করার, মতামত দেওয়ার অধিকার তার আছে।
রোজ রাতে ঘুমাবার আগে আভা একবার টেবিলে বসে। ফেবুতে একটা ঝটিকা সফর দিয়ে, মেসেঞ্জারে ঢুকে। প্রোজ্জ্বল মাহমুদের কাছ থেকে একটা মেসেজ এসেছিল পরশু। ছেলেটা খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সমুদ্রবিজ্ঞান ও পরিবেশ’ নিয়ে পড়ে। তার ‘বকুলতলা’ নামে একটা ওয়েবজিন আছে। আভা মাঝে মাঝে সেখানে পরিবেশ নিয়ে লিখে। তাই সে প্রোজ্জ্বল মাহমুদের কথাগুলো বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়ে : ভারসাম্যহারা পরিবেশ, বিকৃত সমাজ ও মানুষ কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া চারপাশের কথা নিয়ে এবারের সংখ্যায় আপনিও একটি ছোটগল্প লিখতে পারেন । ‘বকুলতলা’ এবার গল্পসংখ্যা হচ্ছে। এই সংখ্যায় আপনিও আমন্ত্রিত।’ সেই থেকে ‘আপনিও আমন্ত্রিত’ কথাটা একবারের জন্যও আভার মাথা থেকে নামে নি। আভার চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ ছোটগল্প লিখেছে কিনা সন্দেহ। এবং এই নিয়ে সে আস্ত একটা দিন ভেবেছে আর মনে মনে হেসেছে। মাঝে মাঝে অবশ্য সে খুব সিরিয়াসলি ভেবেছে। কিন্তু কোনো দিশা ধরতে পারে নি। তবে আজ সকাল থেকে কিছু এলোমেলো চিন্তা ও বিক্ষিপ্ত কথা তার স্কুলটাকে ঘিরে চৈত্যের ঘূর্ণিবায়ুর মতো মগজে ওড়াউড়ি করছিল।
মানব শিশু নামক মাংসপিণ্ডটি প্রথম যেদিন হঠাৎ কেঁপে ওঠে হৃৎস্পন্দনের নান্দনিক বার্তায়, সেইদিন থেকেই মানবাত্মা তার পরিবেশকে ডিএনএ’তে ধারণ করতে শুরু করে।
এখন কম্পিউটারের সামনে চোখ বন্ধ করে বসে থাকা আভার মন হঠাৎ কিছু পাওয়ার মতো কী একটা যেন খপ করে ধরে ফেলে! মায়ার অঞ্জন আঁকা টানাটানা চোখ দুইটা আপনাতেই খুলে যায়। চোখের পাতির লম্বা লম্বা পাপড়িগুলো একটু একটু কাঁপে। তারপরই হাতের লিকলিকে হলুদ আঙুলগুলো কিবোর্ডে ঠুকঠুক করে গল্পটার নাম লেখে, ‘আমাদের অন্তর্গত চেতনা’।
আড়াল থেকে কে যেন একটা দরজা খুলে দিয়েছে। একটু একটু বইছে বাতাস! সে গল্পটা লিখতে শুরু করে :
মানুষ তার নিজের মনের প্রতিবিম্ব। আদি কাল থেকে পৃথিবীর এই অগ্রযাত্রা মানুষের চিন্তা ও শ্রমের ফসল। তাই মনের চিন্তা হৃদয়ে লুকিয়ে রাখা মানব সভ্যতার জন্য ক্ষতির। এই চেতনা থেকেই আমি গল্পটা লিখছি। আমার স্কুলের একটা বাজে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রনের মতো চিন্তাটা ঘুরতে ঘুরতে এই কাহিনির ছাঁচ গড়ে তুলছে। কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবি নি জীবনে আমি ছোটগল্প লিখব । তবে রবীন্দ্রনাথের ‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথার সাথে নিজের মনের দুঃখগুলো নড়াচড়া করতে করতে আস্ত একটা কাহিনিই হঠাৎ আমার মনে ঝিলিক দিয়ে উঠেছে।
ইঞ্জিনের জীবাশ্ম জ্বালানির মতো মানুষের অন্তর্গত চেতনা তাকে জীবনের শেষ দমটি পর্যন্ত চালিত করে। এই ইন্ধনের পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ায় চারপাশের পরিবেশ। মায়ের জরায়ুর নিবিড়ে মানব শিশু নামক মাংসপিণ্ডটি প্রথম যেদিন হঠাৎ কেঁপে ওঠে হৃৎস্পন্দনের নান্দনিক বার্তায়, সেইদিন থেকেই মানবাত্মা তার পরিবেশকে ডিএনএ’তে ধারণ করতে শুরু করে। শুধু মায়ের রক্তের পুষ্টিই নয় জননীর আবেগ, সুখ-দুঃখের অনুভূতি, কল্পনা সবকিছুর ছাপচিত্র গড়ে উঠতে থাকে গর্ভের শিশুটির ডিএনএ’র ভাঁজে ভাঁজে। তাই ধর্ম বল আর বিজ্ঞান বল সবাই গর্ভবতী মায়ের শরীর-স্বাস্থ্য, মন আর পরিবেশের কথা মানুষকে সবার আগে ভাবতে বলে।
কর্মগুণেই হোক আর ভাগ্যদোষেই হোক আমি শিক্ষক। তাই আমার স্কুলের মেয়েদের নিয়েই আমার যত ভাবনা। পরের সন্তানকে নিজের সন্তান ভাবতে না পাড়লে শিক্ষকতা করা ঠিক না; এই বোধটুক মাথায় রেখে আমি সবসময় ক্লাসে ঢুকি। এইসব মেয়েরা একদিন মা হবে, পবিারের কর্তি হবে। জরায়ুতে ধারণ করবে ভবিষ্যতের বিশ্ব। আজ তারা স্কুলে যা শিখবে কাল সে তাই-ই নিজের জীবনে ফলাতে চাইবে। আমার দাঁড়াবার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন, শব্দ নির্বাচন, বাক্য বিন্যাস ও ব্যক্তিত্বের ছায়া অবচেতন মনে তারা সারাজীবন বহন করবে। কারণ আমি শিক্ষক। ক্লাসে তো একজন শিক্ষকই সর্বেসর্বা। তাই জীবনের প্রায় সবরকম অভিজ্ঞতা শূন্য, অনুসন্ধিৎসু মনের চরম কৌতূহল নিয়ে শিশুরা ক্লাসে শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রাণবান, নিবেদিত শিক্ষকের চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে শিখে। তাদের মগজের কোটি কোটি খালি কোষগহ্বর সকলের অবচেতনে উপাসীর মতো তখন সামনে যা পাবে তাই-ই ভরে নেবে। সেই হবে তার চলার সম্বল। অনেক বছর আগে হাইস্কুলে ফেলে আসা আমার প্রিয় শিক্ষক বিমল চন্দ্র ভৌমিককে কী আমি আজও মননে-মগজে ধারণ করে চলছি না?
শুক্রবার। শুক্রবারের সকালে আমি এক গ্লাস পানি ছাড়া কিচ্ছু খাই না। সপ্তাহের একদিন কিছু সময়ের জন্য পেটটাকে চেঙ্গি দেই। সারা সপ্তাহ কাজ করতে করতে পরিপাকতন্ত্রেরও তো একটা ক্লান্তি আছে। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা উপোস করলে ভোঁতা হয়ে আসা পাকস্থলির কোষগুলো কিছুটা আবেগে আলোড়িত হয়, উৎসাহে অধীর হয়ে থাকে তার নির্ধারিত কাজটির জন্য। ছুটির দিনের প্রায় অর্ধেকটাই আমার চলে যায় সংসারের ঝক্কি-ঝামেলায়। ঘরদোর সাফ, কাপড় কাচা, রান্নাবান্না শেষে গোসল করতে করতে দুপুর বারোটা পেরিয়ে যায়। আমার কোনো কষ্ট হয় না। বরং ক্ষুধার আগুনে পুড়তে থাকা পেটের প্রভাবে আমি পাতলা চনমনে শরীর নিয়ে ছুটতে ছুটতে সব কাজ দ্রুত সেরে ফেলতে পারি। তারপর খাওয়া-দাওয়া। শুক্রবারে আমার মেনু খুব সংক্ষিপ্ত। শাক-সবজি, মাছ-মাংস মাইনাস। আলু-ডাল আর ডিম দিয়ে খিচুড়ি করি। তারপর এক কাপ লিকার চা নিয়ে পত্রিকাতে মন দেই। খুব বেশি হলে তিরিশ মিনিট। প্লিজ, ব্যক্তিগত কথা বলছি বলে আপনারা খিস্তি করবেন না। ছোটগল্প হলো বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন। তাই এর প্রতিটি শব্দ, বাক্য কবিতার মতো কেলাসিত হওয়া উচিত।
কোনো দিক থেকেই আজ মনটাকে চাঙা করে তুলতে পারছি না। যখন সময়গুলো জহরের মতো লাগে তখনই আমি কিছুৃ না কিছু লেখতে চেষ্টা করি। এই দেশের স্কুলগুলো আমাদের সন্তানদেরকে কী শিক্ষা দিচ্ছে? এই জিজ্ঞাসা ও তার উত্তর খোঁজাটাই আমার গল্পের মূল থিম। লেখাটাতে একটু লেগে থাকুন গল্প পাবেন। আজ আমাদের স্কুলের ফরিদ সাহেব রকিব সাহেবের ঘণ্টার পাঁচ মিনিট খেয়ে ফেলার ওছিলা ধরে আগের রেশারেশির রেশে ক্লাসেই তারা তর্ক, তর্জন-গর্জন আর হাতাহাতি করেছেন। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রকিব সাহেব ক্লাসের শ’খানেক মেয়ের সামনেই হাতের ডাস্টার উড়িয়ে মারলেন ফরিদ সাহেবের কপালে। সাথে সাথে ফরিদ স্যারের কপাল ফুলে উঠে হয়ে গেল লড়াইবাজ ষাঁড়ের শিং! এই নিয়ে সারা স্কুলের মেয়েদের কী হাসি! এই একটি মাত্র ঘটনার সাথে শতশত সূক্ষ্ম ঘটনা মাকড়সার জালের মতো মেয়েদের মনে আজীবন জড়িয়ে থাকবে। তাদের জীবন চলার পথে কুপ্রভাব ফেলবে।
আমি খোঁজ নিয়ে যতটুকু জেনেছি, স্কুলজীবনে রিপন একটু বোকা বোকা লাজুক একটা ছেলে ছিল। লেখাপড়ায় মন ছিল না। সবাইকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে এমন কোনো কথা নাই। আমি এই গার্লস স্কুলে আসার আগে পাশের ছেলেদের হাইস্কুলে মাহমুদ আলী নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। তার কাজই ছিল ক্লাসে এসে রিপনের মতো পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদেরকে ভালোবাসা দিয়ে উৎসাহিত না করে নানাভাবে হেনস্থা করা, এই যে আমাদের রিপন গুণ্ডার খবর কী?
ভালোবাসায় ভালো ভালো কথা না শিখিয়ে রোজ রোজ একটু একটু করে তার মনে পুঁতে দিয়েছি গুণ্ডামির বীজ।
একগুঁয়ে আর বোকা বোকা চেহারার রিপন নাকি শিশুকাল থেকেই একটু মোটাসোটা ছিল। স্বভাবটাও ছিল গোঁয়ারের মতো তাই তিনি কথায় কথায় রিপনকে খোঁচাতেন। তো ক্লাস নাইনে উঠার পর রিপন উচ্চতায় স্কুলের অনেক স্যারের মাথা ছড়িয়ে যায়। মাথায় লম্বা লম্বা চুল। এখন সে আগের মতো ক্লাসের পেছনের বেঞ্চিতে বসে স্যারদের চোখের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায় না। সামনের দিকের সারিতে বসে। স্যারদের সামনেই আড়ে আড়ে মেয়েদের দেখে। পড়া শিখেছে কিনা জানতে চাইলে আগের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে না। তার বদলে পিটপিট করে বিটালের মতো হাসে। তার হাসি দেখলেই নাকি কোনো কোনো স্যারের বুক হিম হয়ে আসত। আবার কেউ কেউ রাগে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে রিপনের গায়ে চড় লাগাত। তো মাহমুদ সাহেব একদিন রিপনের পিঠে কিল মারতে যেতেই ছেলেটা মাথা ঝাঁকি মেরে স্যারের হাত শক্ত করে চেপে ধরে, খালি ত মারতে জানুইন, একদিন ভালা কৈরা ক্লাসে পড়াইছুইন?
এখন এই শহরে রিপন সত্যি সত্যিই অনেক বড় গুণ্ডা। দুরন্ত কৈশোরে তাকে আমরা স্নেহ-মমতায়-ভালোবাসায় ভালো ভালো কথা না শিখিয়ে রোজ রোজ একটু একটু করে তার মনে পুঁতে দিয়েছি গুণ্ডামির বীজ। হয়তো তাই আজ ছোট্ট এই শহরের মানুষ ঘুম থেকে উঠে সবার আগে মনে মনে বলে, আল্লাহ, তুমি রিপনের মুখ দ্যাখাইয়ো না।
বিকালে শুয়ে শুয়ে গড়াগড়ি করছিলাম, একটা কল এল। অচেনা নাম্বার দেখে চিন্তায় পড়লাম, ফোনটা ধরব কী ধরব না। ষাট বছরের বুড়ো থেকে সতেরো বছরের পোলা মেয়েদের কণ্ঠ শুনলেই মাকড়সার মতো কথার জালে জড়িয়ে ফেলতে চায়! এইসব শুনলে আমার বমি আসে। পুরুষ মানুষ যে কত নোংরা আর নির্লজ্জ হতে পারে মোবাইল না থাকলে আমি জানতাম না। তিন বারের বার কলটা আমি রিসিভ করি। ওপাশে একজন মহিলার ভারী গলা, আভা ম্যাডাম না?
জি।
তোমাকে আমাদের পূর্বাশা দেখতে চাইছে। আমাদের বাসায় একটু আসতে পারবে মা?
পূর্বাশা এই উপজেলার ইউএনও সাহেবের ময়ে। আমাদের স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। দেখতে যেমন মিষ্টি তেমনি তার ভদ্রতাজ্ঞান। লেখাপড়ায় অত্যন্ত পরিশ্রমী মেয়েটি আমার মহাভক্ত। অ্যাপেন্ডিসাইটের ব্যথার কারণে পাঁচ-ছয়দিন আগে অপারেশনের জন্য তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সম্ভবত আজ ফিরে এসেছে। আমার লজ্জা লাগছে। কী বেখায়াল আমি! নিজে থেকেই তো মেয়েটির খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। দ্বিধা-শরমে কাঁপা কাঁপা গলায় আমি কোনো মতে বলি, জি, আমি এক্ষুনি আসছি।
বাসার গেইটটা একটু ফাঁক করে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসেছিলেন চাঁদের দেশের বুড়ির মতো ফর্সা আর সাদা কেশের এক অসাধারণ বৃদ্ধা। আমি রিকশা থেকে নেমে উঁকি দিতেই তিনি কাঁপা কাঁপা মিষ্টি গলায় ডাক দিলেন, আসো মামণি আমি তোমার জন্যই বসে আছি।
বারান্দার টব থেকে আকাশের দিকে উঁকি দিয়ে আছে একটা লাল গোলাপ। খুব সাধারণ একটি বেতের চেয়ার থেকে উঠে মহিলা আমার দিকে মায়ের মতো হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি আমার হাত ধরে রেখেই ঘরে ঢুকেন। সাধারণ মধ্যবিত্তের একটি বসার ঘর। দামি দামি আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঠাসাঠাসি নাই। সবকিছুতে, ঘরের সবখানে রুচি আর আভিজাত্যের গম্ভীর পরশ। জানালা-দরজায় সাদা লংক্লথ কাপড়ের ইস্ত্রি দেওয়া পর্দাগুলো ফেনের বাতাসে উড়ে উড়ে সুন্দরের কথা, শুদ্ধতার কথা কৈছে।
ভিতরের দিকে তেমনি একটি সাধারণ বিছানায় শুয়ে আছে আমার স্কুলের রূপে-গুণে-মেধায় অনন্য কিশোরিটি। আমি তার শিথানের দিকে বিছানায় বসতেই সে দু’হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে, আপু... হাসপাতেলের বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোমারে যে আমার কত মনে পড়ছে!
কষ্টে-আনন্দে আমার চোখের পাতি ভিজে আসে। আমার স্কুলের অনেক মেয়েই আছে যারা ক্লাসের বাইরে আমাকে তুমি বলতে পছন্দ করে। আমি বাঁধা দেই না। কারণ এই কোমল বোধ থেকেই তারা আরো দশজনকে খুব সহজেই আপন করে নিতে পারার শিক্ষাটা পাবে।
আমি তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কপালে চুমু খাই, এখন তোমার কেমন লাগছে?
ভালো আছি আপু। তুমি আসছ ত, দ্যাখবা আমি কত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাই।
ডিমের ওমলেট, ফালি ফালি আপেল আর লিকার চা নিয়ে পূর্বাশার মা আসেন। শরতের আকাশের মতো মহিলার চোখে-মুখে মিষ্টি হাসি। হাতের ট্রে রেখে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, আপনার ছাত্রী কিন্তু আমারচে আপনাকেই বেশি পছন্দ করে।
উনার পেছনে পেছনে আসেন ইউএনও সাহেব, কেমন আছেন, ম্যাডাম?
আমি সালাম দিয়ে দাঁড়াই, বেশভূশায় খুব সাধারণ মানুষ। গায়ে-পায়ে, চুলে-চেহারায় আমলা আমলার নামগন্ধ নাই। সুদর্শন মানুষটার ক্লান্ত চোখ দুইটাতে ব্যক্তিত্বের ধার, বিনয় ও প্রজ্ঞার আলো।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলেন, যতসব আজে-বাজে মানুষ লম্বা লম্বা সার্টিফিকেট দেখিয়ে বছর বছর উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সনদ নিয়ে যায়। আপনার কগজপত্র পাঠিয়ে দিয়েন তো ম্যাডাম। সামনের একত্রিশ তারিখ সিলেকশন কমিটির মিটিং আছে।
বাজারে মাছ কিনতে কালো কাপড়ের ব্যাগ হাতে যায়, কত টাকা দামের কী মাছ কিনেছে কেউ যেন বুঝতে না পারে।
শ্রেষ্ঠ শিক্ষক! কথাটা কানে লাগতেই আমার মনে পড়ে কনকের গলা, এখন সব কিছুতেই রাজনীতি। ক্ষমতার কক্ষপথে আপনার গতিবিধি প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠছে দেখছি। মেসেঞ্জারে এইসব লিখে চশমা-পরা সেই ছেলেটা আমাকে যেন খুব উপহাস করছে। তাই আমি মাথা নুয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি দেখে পূর্বাশার আব্বা বলেন, জানি, যারা কাজ করে তারা স্বীকৃতি চায় না। এখানে যখন এসে যোগদান করলাম, দেখি অফিসের জানালা-দরজায় তিন হাজার টাকা দামের একেকটা পর্দা। বাসাতেও। আমি পিয়নকে দিয়ে সব খুলে অফিসের আলমারিতে রেখে দিলাম। আমার অন্তত এইসব জিনিসের দরকার নাই। আমি ষাট টাকা গজের লংক্লথ দিয়ে আমার অফিস আর বাসাটা কোনো মতে ঢেকে নিয়েছি।
উনি চলে যেতেই পূর্বাশার দাদি বললেন, মাসে মাসে মন্ত্রণালয়ে আমার ছেলের বিরুদ্ধে দশটা অভিযোগ যায়, সে নাকি উন্নয়নের কাজে মহাবাধা। অথচ শুধু ওর বেতনে আমাদের সংসার চলে। বাজারে মাছ কিনতে কালো কাপড়ের ব্যাগ হাতে যায়, কত টাকা দামের কী মাছ কিনেছে কেউ যেন বুঝতে না পারে।
দক্ষিণের জানালার পাশে একটা সেলাইয়ের কল। সম্ভবত ম্যাডাম নিজেই টুকিটাকি সেলাইগুলো করে নেন। মেশিনটার পাশেই ছোট্ট একটা টবে মানিপ্লান্টের পান্নাসবুজ পাতা জানালা দিয়ে অনেক দূরের দেশে তাকিয়ে আছে। কী রুচি! কী পবিত্রতা! এই জিনিস অর্থ দিয়ে মানুষ কি দুনিয়ার হাটে কিনতে পারে?
ফিরবার সময় বারান্দায় এসে বৃদ্ধা আমার পাশে দাঁড়ায়, বুঝলে মা ঠিক তার বাপের মতো। তিনি স্কুলশিক্ষক ছিলেন। সারাজীবন পরের ছেলেদের কথা, পরের মঙ্গলের কথা ভেবেছেন। জীবনে কোনো আপোস ছিল না।
গেটের কাছে এসে উনি আরেকবার দাঁড়ালেন, পাকিস্তানিরা যখন এই দেশ চালাত, বাঙালির পেটে ভাত ছিল না। অফিসের সব সাহেব-সুবেদার ছিল পাকিস্তানি। পিয়ন, দারোয়ান, নাইটগার্ড কিংবা কেরানি ছিল সব বাঙালি। পাটকলের শ্রমিক-কুলি আর কৃষকের এই দেশে মানুষের শরীরে এত মেদ-মাংস ছিল না। গলা উঁচু করে কথা বললেই পেটে লাথি, মাথায় ডাণ্ডা না হয় বুকে গুলি চালাত ওরা। একবার কী একটা প্রতিবাদ সভার জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাত টাকা পকেটে নিয়ে ভাসানিকে আনতে উত্তরবঙ্গে গেছিলেন। ট্রেনের দ্বিতীয় শ্রেণিতে করে এক রাতে গেলেন আর পরেরদিন মাওলানা সাহেবকে সাথে নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসলেন। ভাড়া বাদে বাড়তি কোনো পয়সা না থাকায় বঙ্গবন্ধু প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা শুধু পানি খেয়ে কাটিয়ে ছিলেন। আজ আমরা স্বাধীন। আমাদের পেট-পাছা-পিঠে কত চর্বি! কত ইগো! তাই বসতে গেলেই গদি আঁটা সিংহাসন লাগে, চলতে গেলেই পাজেরো লাগে। চারপাশে এত অপচয়! এত অনাচার! দেখতে দেখতে মনে ঘিন্না ধরে গেছে রে মা। এই বুড়ির জন্য দোয়া করো যেন মানে মানে মরে বাঁচি।