অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের বাংলা তর্জমার সুবাদে আমাদের দেশের পাঠকরা হুয়ান রুলফোর (১৯১৭-১৯৮৬) লেখার সঙ্গে কমবেশি অনেক আগে থেকেই পরিচিত। হুয়ান রুলফো শুধু মেক্সিকান সাহিত্যেই নয়, গোটা স্প্যানিশ সাহিত্যেই এক ব্যতিক্রমী লেখক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। তাঁর পেদ্রো পারামো উপন্যাস যেন দান্তের ডিভাইন কমেডি ও এলিয়টের দি ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর মিশ্র কিন্তু অভিনব এক সংস্করণ। যেন এক জীবন্ত নরক, যেখানে মেক্সিকোর বিপ্লবের ইতিহাসকে প্রচ্ছন্নভাবে মূর্ত করে তুলেছেন। তিহুয়ানার পোড়া ভূমির সঙ্গে উপন্যাসে বর্ণিত কোমালার সাজুয্য এত বেশি যে, আমি এই অঞ্চলটিকে প্লেন থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ আর চোখ ফেরাতে পারি নি। ওপর থেকে মেক্সিকো দেশটিকে প্রথমবারের মতো যারা দেখবেন তাদের কাছে মনে হবে এ অঞ্চল হুয়ান রুলফোর কোমালা বা মেদিয়া লুনা। শুষ্ক, উষরপ্রায় নিষ্প্রাণ এক ভূদৃশ্য এই কোমালা। যদিও উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন হালিস্কো রাজ্যটিকে, কিন্তু বাস্তবে কোমালা আসলে কোলিমা রাজ্যের অন্তর্গত এক এলাকা। হুয়ান রুলফো উপন্যাসে কোমালার ভূদৃশ্য বর্ণনায় কোনো কাব্য করেন নি, যদিও গোটা উপন্যাসটিকে আমার কাছে মনে হয়েছে গদ্যে লেখা একটি দীর্ঘকবিতা। এই উপন্যাসে নিজেকে তিনি বিরত রেখেছেন আবেগ আর বিশেষণের অতিরস থেকে। আতিশয্য ও অত্যুক্তি না থাকা সত্ত্বেও ‘কোমালা’ বা ‘মেদিয়া লুনা’ হয়ে উঠেছে রুলফোর বর্ণনার অসামান্য কৌশলে এক পার্থিব নরক। চরিত্রগুলোও কথা বলে অনেকটা নিরাবেগ কণ্ঠে; পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যোগাযোগ, সবই যেন অতীতের সূত্রে। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই উপন্যাসে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়ানো যে, এক পাঠে তা বুঝে ওঠা মুশকিল। স্বচ্ছ এর ভাষা, কিন্তু জটিল এর বুননকৌশল। আর এই হুয়ান রুলফোই তাঁর চিঠিপত্রে একেবারে ভিন্ন চেহারা নিয়ে হাজির।
প্রেমিকা এবং ভবিষ্যৎ স্ত্রী ক্লারার প্রতি লেখা হুয়ান রুলফোর ৮১টি চিঠির একটি অপূর্ব সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ২০০০ সালের মে মাসে। চিঠিগুলো এর আগে কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নি। মৃত্যুর ১৭ বছর পর এই প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো ক্লারা আনহেলিনা আপারিসিও রেইয়্যেস-এর কাছে তাঁর কল্পনা, প্রেমাবেগ আর কাব্যময়তার আলোয় দীপ্ত একগুচ্ছ চিঠি। ১৯৪৪ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৫০-এর ডিসেম্বরের মধ্যে লেখা ৮১টি চিঠির দর্পণে বিম্বিত এই হুয়ান রুলফো পেদ্রো পারামো কিংবা জলন্ত প্রান্তর-এর হুয়ান রুলফো নন। প্রাণময়তা ও প্রেমাবেগে পূর্ণ এক মানুষ, যিনি জীবনের বিষাদ, বঞ্চনা ও বেদনাবোধ (যেমনটা তাঁর লেখার জগতে আমরা দেখতে পাই) থেকে অনেকটাই দূরে। তবে মাঝে মধ্যে চিঠির দু-এক টুকরো পরবর্তী সময়ে প্রবেশ করেছে তার একমাত্র উপন্যাস পেদ্রো পারামোয়। যেমন ১২ নং চিঠির এক জায়গায় তিনি বলছেন, 'জীবন ছোট আর প্রচুর সময় আমরা সমাহিত অবস্থায় রয়েছি।’ একই কণ্ঠ আমরা পেদ্রো পারামোতে দোরোতেয়ার মধ্যে শুনতে পাই। হুয়ান প্রেসিয়াদোকে দোরোতেয়া একবার বলছিলেন, 'সুন্দর বিষয় নিয়ে চিন্তা করো, কারণ আমরা প্রচুর সময় কবরের মধ্যে কাটাবো।' এই ধরনের উদাহরণ কিন্তু খুব বেশি একটা নেই। সাজুয্যের চেয়ে বরং ভিন্নতাই বেশি চোখে পড়বে তাঁর এই চিঠিগুলোতে।
প্রেমিকা ক্লারাকে রুলফো প্রথম দেখেন ১৯৪১ সালে মেক্সিকোর এক প্রদেশ গুয়াদালাহারায়। ক্লারার বয়স তখন ১৩। রুলফো ২৪ বছরের যুবক। দেখা হলেও ক্লারার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় বলতে যা বোঝায় তা হয় নি। আলাপের জন্যে বছর তিনেক অপেক্ষা করেছিলেন রুলফো। ১৯৪৪ সালে গুয়াদালাহারার এক রেস্তোরাঁ 'ক্যাফে নাপোলেস'-এ তাদের প্রথম আলাপ হয়। এই আলাপ-পরিচয়ের পর থেকেই পরস্পরের মধ্যে শুরু হয় চিঠি চালাচালি। ক্লারার লেখা কোনো চিঠি এই সংকলনটিতে নেই। ফলে জানা যাচ্ছে না রুলফোকে কী ধরনের চিঠি লিখতেন ক্লারা। শুধু হুয়ান রুলফোর চিঠিগুলো নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে এই সংকলনটি। স্প্যানিশে বইটির নাম আইরে দে লাস কোলিনাস (Aire de las Colinas); বাংলায় বলা যেতে পারে ‘পাহাড়ের হাওয়া।’ এই 'পাহাড়ের হাওয়া' থেকে রুলফোর প্রেম বিষয়ক যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ক্লারার সঙ্গে চিঠি চালাচালিরও তিন বছর পর তারা পরস্পর বিয়ের সিদ্ধান্তে আসেন। ১৯৪৮ সালের ২৪ এপ্রিল তারা বিয়ে করেন।

ক্লারাকে লেখা চিঠিগুলোর কিছু নমুনা অপটু অনুবাদে হাজির করছি। এখনো (২০০১ সাল) স্প্যানিশ ভাষায় বুৎপত্তি আসে নি, ফলে ভুল হওয়া অসম্ভব নয়। ত্রুটি থাকলে পাঠক মার্জনা করবেন। প্রথম চিঠিটি শুরু হয়েছে এভাবে:
তোমাকে চেনার পর থেকেই প্রতিটি শাখায় উচ্চারিত তোমার নামের প্রতিধ্বনি শোনা যায়; দূরে ও উঁচু শাখায়, আমাদের নিকটতম শাখাগুলোয় শোনা যায় এই ধ্বনি। ভোরের স্বপ্ন থেকে আমাদের জাগরণের মতোই শোনা যায় সেই ধ্বনি। পাতায় পাতায় তার নিঃশ্বাস শোনা যায়, পানির ফোঁটার মতো সে নড়ছে।
ক্লারা : হৃদয়, গোলাপ, প্রেম...
তোমার নামের সঙ্গে যুক্ত হলে বেদনা হয়ে ওঠে অচেনা বিষয়।
বেদনা আমাদের দেখে চলে যায়, যেভাবে ক্ষত থেকে বেরিয়ে যায় রক্ত, যেভাবে জীবন থেকে চলে যায় মৃত্যু।
জীবন তোমার নামে পূর্ণ হয়ে আছে : ক্লারা, ক্লারিদাদ, এসক্লারেসিদা (এই শব্দ দুটি আসলে ‘ক্লারা’ শব্দটি নিয়ে রুলফোর খেলারই ফল, কিন্তু অর্থহীন ব্যবহার নয়। ‘ক্লারিদাদ' মানে স্বচ্ছতা, ‘এসক্লারেসিদা' মানে স্বচ্ছতর করা - অনুবাদক)।
তোমার হাতে আমি তুলে দিতে পারব আমার হৃদয়। আমার হৃদয় তাতে কোনো প্রতিবাদ জানাবে না। তাতে আমার একটুও ভয় হবে না, কারণ আমি জানি কে গ্রহণ করছে এই হৃদয়।
অন্য হৃদয় দ্বারা পরিচালিত যে-হৃদয় সে জানে কোনটা বন্ধুত্বের হাত।...
ঘুমের মধ্যে আমি তোমার নাম বলতে শিখেছি। উজ্জ্বল রাত্রিতে বলতে শিখেছি তোমার নাম।
বৃক্ষ আর বিকেল জেনেছে তোমার নাম...বাতাস এই নাম নিয়ে গেছে পাহাড় থেকে পাহাড়ে আর তা গমখেতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। আর নদীর গুঞ্জরনে এই নাম।
ক্লারা :
আজ আমি তোমার নামে বুনেছি দুরাছনোর (Durazno) বীজ।
(পৃ ২৩-২৪)
উপরের এই চিঠিটিই সম্ভবত তার প্রথম চিঠি ক্লারার প্রতি, লিখেছিলেন ১৯৪৪ সালের অক্টোবরে; গুয়াদালাহারা থাকাকালে। পরের বছর, সম্ভবত চাকরিসূত্রে স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল তাকে। গুয়াদালাহারা থেকে একেবারে রাজধানী শহরে। সেখান থেকে জানুয়ারির ১০ তারিখে হুয়ান লিখেছেন:
বালিকা,
তোমার কথা না ভেবে আমি একটি দিনও কাটাতে পারি না। কালকে স্বপ্নে দেখলাম আমার হাতে তোমার মুখটি তুলে নিয়ে চুমু খাচ্ছি। স্বপ্নটি ছিল মধুর এবং পেলব। কাল মনে পড়ল তুমি এখানে জন্মেছিলে, আর এ কারণে শহরটিকে আশীর্বাদ করলাম আমি। কেননা এ শহর তোমাকে জন্ম নিতে দেখেছে।
জানি না কী ঘটছে আমার মধ্যে; তবে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি বিশাল, মহৎ কিছু একটা যার জন্য সংগ্রাম করা যায়, বেঁচে থাকা যায়। আমার জন্য এটা বিশাল কিছু... তুমি সেই বিশাল। অনেক আগে থেকেই আমি এটা জানত, এখন দূর থেকে তা আরো নিশ্চিত বোঝা গেল।
কিছুক্ষণ আগে ওয়াল্ট হুইটম্যান পড়ছিলাম। এক জায়গায় তিনি বলেছেন: ‘প্রেমহীন যারা হাঁটে মিনিট খানেক, নিজের অন্ত্যেষ্টি-পানে হাঁটে তারা কাফনে মোড়ানো।’
ক্লারা, ১৫ বছর আগে আমার মা মারা গেছে। তখন থেকে আমি যার সঙ্গে তার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছি সে ক্লারা আপারিসিও, যাকে তুমি চেনো।”
( পৃ ৩১-৩২)
হুয়ান রুলফো নিজেই এই চিঠির শেষে তার মায়ের নাম মারিয়া বিসকাইনো বলে জানিয়েছেন। সম্ভবত মার ভালোবাসা, আদর-স্নেহের কথা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তার প্রেমিকা ক্লারাকে। একই মাসে লেখা অন্য আরেক চিঠিতে (তারিখ উল্লেখ নেই) ক্লারাকে লিখেছেন:
ছোট্ট সোনা,
জানো কি? অনেক ঘোরার পর আমি জানতে পারলাম, তোমার চোখ দুটি মিষ্টতায় ভরা। গতকাল স্বপ্নে দেখলাম আমি কেবল তোমার চোখ দুটিতে চুমু খাচ্ছি, চোখের পাপড়ির উপরটাতে আমার মুখ মিষ্টি স্বাদ পেল; যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে রান্না ঘর থেকে চুরি করে এই চিনি খেতাম।
ছোট গাল দুটির স্বাদ নেওয়ার মাধ্যমে স্বপ্নের শেষ হয়েছিল, ডান এবং বাম, দুগালের স্বাদ দুরাছনোর মতো। মনে হয় হৃদয়ের স্বাদ এই ফলের মতো ।
(পৃ ৩৩)
এই চিঠিটা খুব বড় নয়। লেখক চিঠির শেষে লিখেছেন : 'I am hurry because finished me the ink.' ইংরেজিতে হুবহু তিনি এই বাক্যটাই লিখেছেন। তার মানে কালি শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি আর কিছু লিখতে পারেন নি। প্রেমিকা ক্লারা কি তবে ইংরেজি জানতেন? রুলফো তো নিশ্চিতভাবেই জানতেন। স্প্যানিশ ভিন্ন তার পাঠের একটা বড় অংশই ইংরেজি ভাষার আশ্রয়ে। ইংরেজি ভাষার এমন অনেক লেখকের লেখা তিনি সেসময় পড়ছেন যেগুলোর স্প্যানিশ অনুবাদ তখনও হয় নি।
হুয়ান রুলফোর কোনো জীবনীগ্রন্থ আমি স্প্যানিশে এখনো দেখতে পাই নি। হয়তো আছে, কিন্তু চোখে পড়ে নি। পেলে অনেক কিছুর হদিস পাওয়া যেত। অথবা চিঠিগুলোর সঙ্গে তাঁর জীবনের অনেক তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ হতো।
১৯৪৭ সালের ২৯ এপ্রিল মেক্সিকো সিটি থেকে এক চিঠিতে রুলফো লিখেছেন :
প্রিয়তমা,
ভালো করে তাকাও আমার দিকে। গুরুত্বের সঙ্গে তোমার দুচোখ দিয়ে আমার দিকে তাকাও। না, চোখ বন্ধ কোরো না। তোমার দুচোখ ভালোভাবে খুলে আমার দিকে তাকাও। বেশ, ঠিক আছে চোখ দুটি খুব খোলা না হলেও ক্ষতি নেই। এখন আমাকে বলো, কেন তুমি আমাকে ছোট চিঠি লেখো? তোমার চিঠি পড়তে শুরু করতে না করতেই শেষ হয়ে যায়। তোমার প্রিয় কোনো জিনিসের যদি সামান্য একটু খেতে দেওয়া হয় তখন তোমার কেমন লাগবে? তোমার চিঠিতে ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটছে। যেই ভালো লাগতে শুরু করেছে তখনই দেখি শেষ হয়ে গেছে। প্রায় সব সময়ই এই 'শেষ’টা একেবারে শুরুর নিকটবর্তী। প্রায় সব সময়ই প্রচণ্ড আবেগের জায়গায় এসে শেষ হয়ে যায়।
ছোট্ট রমণী এখন তোমাকে একটু বকে দেব। হ্যাঁ, ভাবছি এখান থেকেই তোমাকে বকাঝকা শুরু করবো: কারণ যদি এখন তা না করি তাহলে পরে তোমাকে ঠিক করা আরো মুশকিল হয়ে যাবে।
মাঝে মধ্যে ভাবি, আমাকে দ্রুত জবাব দেওয়ার তাড়াহুড়ার কারণেই বোধ হয় তোমার চিঠিগুলো ছোট হয়ে যায়। ধারাবাহিকতা রক্ষার বাধ্যবাধকতার কারণেই বোধ হয় তুমি এ কাজ করছো। কিন্তু আমি তোমাকে বাধ্য করতে চাই না। তুমি ভালো করেই জানো আমি যা চাই তাহলো তোমার সম্পর্কে জানা এবং এর মানে এই নয় যে, আমার হতশ্রী নথি পাওয়ার পরপরই উত্তর দিতে বাধ্য হওয়া। ছোট্ট সোনা, যখন সময় হয় তখন আমাকে উত্তর দিও। আর আমি চাই তোমার সময় নষ্ট না করে আমার সঙ্গে তোমার কথা বলার যেন কিছু থাকে। ক্ষতি নেই যদি তিন দিন দেরি করে দিনে আট ঘণ্টা লেখো।
(পৃ ৮২-৮৩)
বেশ লম্বা এই চিঠি। পুরোটা অনুবাদ করে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে চাচ্ছি না। কেবল চিঠির শেষ বাক্যটি তুলে দিচ্ছি 'তোমার জন্যে আমার ভালোবাসা হৃদয়, ভাষা আর ভাবনায় সব সময় পূর্ণ হয়ে থাকবে। (নির্বোধ) হুয়ান।'(পৃ ৮৫)
১৯৪৭ সালের মে মাসের ৯ তারিখে লেখা একটি চিঠির অংশবিশেষ তুলে দিয়ে শেষ করতে চাই এই লেখা:
ঘৃণিতা প্রিয় রমণী,
বলো এই সৌন্দর্যের সঙ্গে কে তোমাকে এত ভালো এক হৃদয় দিয়েছে? ঈশ্বর কখনোই এই দুই জিনিস এক সঙ্গে কাউকে দান করে না। শয়তানের এসব নেই। প্রিয়তমা মিষ্টি মেয়ে, বলো একই সঙ্গে এত কিছু কোত্থেকে পেলে? ফেরেশতাদের ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়ে তাদের কাছ থেকে এসব তসরুপ করেছ?
(পৃ ৮৬)
চিঠিতে হুয়ান রুলফো তার প্রেমিকাকে ‘ঘৃণিতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। এই শব্দে যেন বিভ্রান্ত বোধ না করেন তার একটা ছোট্ট ব্যাখ্যা পাঠককে দেয়া উচিত। এই শব্দটি দিয়ে ঠিক উল্টোটাই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। স্প্যানিশ সংস্কৃতিতে প্রিয়জনকে এরকম সম্বোধন বিরল নয়, বরং স্বাভাবিক। ভালোবাসার আতিশয্য থেকে ব্যবহৃত গুণবাচক শব্দগুলো যখন ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যায় প্রেমিক/প্রেমিকা তখন অনুভূতি প্রকাশের নতুনত্বের জন্য বিপরীত মেরুতে অবস্থিত শব্দের সাহায্যে নিজেকে উন্মোচিত করেন। এর ফলে অভিব্যক্তির নতুন অভিঘাত ভালোবাসা বা প্রেমবোধকে ক্ষুন্ন তো করেই না, বরং আরও ঘনীভূত করে। রুলফোর ব্যবহৃত এই ‘ঘৃণিত’ শব্দের ব্যবহারে ঠিক সেটাই ঘটেছে। শব্দটি প্রেমের ঘনত্ব নিয়ে আভিধানিক অর্থের বিপরীত গিয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদের সংস্কৃতিতেও এরকম অভিব্যক্তি বিরল নয়।
প্রেমিকা, পরে যিনি তার স্ত্রী হিসেবে বৃত হয়েছেন, তাকে লেখা এই চিঠিগুলোতে আমরা এমন এক রুলফোকে পাই যিনি তার উপন্যাস ও গল্পগুলোর স্রষ্টা থেকে একেবারেই আলাদা। প্রেমের প্রসঙ্গ তার উপন্যাস পেদ্রো পারামোয় যে একেবারেই উল্লিখিত হয় নি, তা নয়। কিন্তু প্রেমের সেই সম্পর্কগুলো এই আবেগ ও কাব্যমধুর সংরাগ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। বিপরীতে ওই সম্পর্কগুলো অনেক বেশি নিরাবেগ, স্বার্থপরতা আর কখনো কখনো আধিপত্য ও নিষ্ঠুরতায় ভরা। পেদ্রো পারামোর সাথে সুসানা সান হুয়ানের সম্পর্কটা ঠিক এই রকমভাবেই চিত্রায়িত হয়েছে। সুসানাকে তিনি এক রকম জোর করেই পেতে চেয়েছেন, তার সাথে অমানবিক আচরণও করেছেন। সুসানার পিতা বার্তোলোমে যখন পেদ্রো পারামোর বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন তখন তিনি তাকে কৌশলে হত্যা করেন। ফলে পারামোকে বিয়ে করা ছাড়া সুসানার আর কোনো বিকল্প থাকে না। কিন্তু এই উপন্যাসের স্রষ্টা বাস্তব জীবনে ছিলেন ঠিক এর উল্টো, যা স্ত্রীকে লেখা এই চিঠিগুলোতে ফুটে উঠেছে।