তীব্র ৩০ : আবদুল মান্নান সৈয়দের বাছাই কবিতা

আবদুল মান্নান সৈয়দ (৩ আগস্ট ১৯৪৩—৫ সেপ্টেম্বর ২০১০) বাংলাদেশের, বাংলা ভাষারই গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি। তবে কথাসাহিত্য, বিশেষ করে সমালোচনা-সাহিত্যে তার নিষ্ঠা কখনোবা কবি-খ্যাতিকে আড়াল করে ফেলেছে অনেক পাঠকের কাছে। যদিও আমাদের বিবেচনায় কবি হিশেবেই তিনি অনন্য।

ষাটের দশকে আবির্ভাবমাত্র 'পরাবাস্তব কবি' এই অভিনাম কবির জন্য শ্লেষ ও শ্লাঘা উভয়েরই এক গোপন সূত্র রচনা করেছে। সেই সূত্র ছিন্ন করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। অনলাইনে তার কবিতা প্রায় দুষ্প্রাপ্য। সে কারণে পরস্পরের পক্ষ থেকে এই বাছাইয়ের উদ্যোগ।

তীব্র ৩০-এর সিরিজে মান্নান সৈয়দের কবিতা নির্বাচন ও মুদ্রণের কাজে সবিশেষ কষ্ট স্বীকার করেছেন কবি রাশেদুজ্জামান ও কবি হাসান রোবায়েত। পাঠকরা নিশ্চয়ই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হবেন। কোনো না কোনোভাবে তারা আমাদের পরিবারেরই অংশ। আসুন তবে পাঠ শুরু করা যাক—

চোখ বুঁজে ফুঁ দিচ্ছেন অন্তর্গত, নিবিড় মৌলবি : সৈয়দ, গভীরতম, আমার অন্বিষ্টা পেনেলোপি ॥

[অনাম কবিতা/ আবদুল মান্নান সৈয়দ

জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশকাল : ১৯৬৭


অশোককানন


জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়, সব দরোজায়, আমার চারিদিকে যতগুলি দরজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের; জ্বলছে গাছসকল সবুজ মশাল; বাস একটি নক্ষত্র, পুলিশ একটি নক্ষত্র, দোকান একটি নক্ষত্র: আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছে।—এরকম দৃশ্যে আহত হয়ে আমি শুয়ে আছি পথের উপর, আমার পাপের দুচোখ চাদ ও সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেল, আর যে আমার জন্ম হলো তোমাদের করতলে মনোজ সে অশোক সে: জ্যোৎস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপর, দরজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর, মৃত্যু তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর ॥

 

গাধা এবং আমি


পানি ফুরোলেও অভ্যস্ত ঝরনার দিকে ছোটে গাধা, আপন যৌবন থেকে কুমারীর মতো ঘট ভ’রে নিতে মূর্খ লাভ তার; আর আমি নগ্ন ও অসহায়—একটা কুকুরের মতো, শাদা রাস্তার মতো, বেয়াড়া বৃক্ষের মতো,—তোমার কাছে নগ্ন এবং সমর্পিত, অথচ অক্ষম নিঃসরণে; নিতম্বে নিচ্ছে যে আলো ভ’রে, সুমুখে অপ্রকাশ : আ, এই কি চেয়েছিলুম?

আমার অক্ষম গা থেকে ফুটে বেরোচ্ছে প্রতিভা, প্রতিভার জানালা থেকে কাঁচুলি ফেলে রক্তে ডাক দিচ্ছে শ্রীমতি সঙ্কেত, দোতলা, শাহ সাহেবের বাজার, মঙ্গলগ্রহ; আর আমি তৎপর শার্টের প্যান্টের মধ্যে নিজেকে গলিয়ে ফেলতে, রক্তভয়ের বাঁকাস্বপ্নের কালো ঢেউয়ের হাত থেকে রাত থেকে চোখের সুমুখে একটি মাত্র মেয়েমানুষ, ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-পিছনে ব্যেপে উঠছে বারবার, তিনটি স্তনের।

দুপাশে তোমরা কাতার বানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, চোখের মণিকে জিভ ফলিয়ে চাখো মজা, বাজাও আমিষাশী করতালি, আমার দিকে তাকিয়ে যে-আমি একটা মাছির মতো অসহায়, যে-আমাকে তিনটি স্তনের একজন মেয়েমানুষ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সমুদ্র অবধি, যেখানে একটিমাত্র গাছে সমস্ত ফল ঝোলে আত্মহত্যা ভেবে।

জনৈক বৃদ্ধ বৃক্ষ শাদা এবড়োখেবড়ো ডালপালার দাঁত বের ক’রে খুব পরিষ্কার হাসচেন, দ্যাখো। আমি ছুট দেবো ঐ গাছের কোটর লক্ষ করে করতলে মন্ত্র-পড়া আমলকী নিয়ে কাঠবিড়ালির মতো; আমি দৌড় দেবো তামসীআম্মার গর্ভ লক্ষ করে, সেঁধিয়ে যাব, মিশে যাব অবেদ্য অন্ধকারে, ছিটকে যাব এই সরলররেখা থেকে মাতাল ট্রেনের মতো;—এই আকাঙ্ক্ষার সমাধি লক্ষ ক’রে ফ্যালো, ছুঁড়ে ফ্যালো একেকটি দর্পণ, যা অনায়াসে বেঁকেচুরে দিতে পারে আমার কাউন্টেনান্স, জন্ম দেয় হাজার-হাজার আমাকে; দাও, আমার দুহাত ভ’রে পাঠিয়ে দাও রোদন, কেননা ইতিমধ্যে অতীত—অতীতই ভবিষ্যৎ—আমাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে একের পর এক লাল-নীল-সবুজ শার্টের ভিতর।

আমার চেয়ে সৎ শহরতলির সরোবর লক্ষ ক’রে নদীর তীরের মতো অলস সেই গাধা—অবিকল নগ্ন, উন্মোচিত; আর আমি জানোয়ারশোভন শার্টের তলায় জনাব সৈয়দ, মানবেন্দ্রসংবৃত ত্বকের তলায় জনাব কুকুর : পল্লবের পর পল্লবের সংবরণ ভেদ ক’রে আমার প্রতিভা অর্থাৎ শয়তান কোনোদিন তোমাকে ছুঁয়ে যেতে পারবে না, মহিলা হে ॥

 

পাগল এই রাত্রিরা


এই রাত্রিরা বেথেলহেম-কে ব্রথেলে পরিণত করে, করুণ কবাটের মতো ঝোলানো বাড়ির দেয়াল থেকে লুটিয়ে থাকে যেন বর্ম কিংবা বিরুদ্ধ পদ্ধতি হাওয়ার—রুপালি চাবির অভাবে। এই রাত্রিরা সেই লাল আলোর ভালো যা তোমাকে প্রশস্ত স্ট্রিট থেকে নিয়ে যাবে কঙ্কালের সরু-সরু পথে, অনাব্য স্ত্রীর মতো কেবলি অন্যদিকে;—যখন জানালায় ছিন্নপত্র ঝরে অবিচ্ছিন্ন, লোকালোক পুড়ে যায় বরফে। এই রাত্রিরা জিরাফের গলা বেয়ে লতিয়ে উঠতে দেয় আগুন, যেটা আমাদের আকাঙ্ক্ষা, অবশ্য যদি তার মাংস হতে রাজি হই তুমি আর আমি; ঈশ্বর নামক গৃহপালিত মিস্তিরি ভুল সিঁড়ি বানাচ্ছে আমাদের উঠোনে বসে—আগুনের, যে-অসম্ভবের সিঁড়িতে উঠতে-উঠতে আমরা সবাই পাতালে নেমে যাব হঠাৎ।

সিংহের খাঁচায় বসে আমি গল্প লিখছি মনে-মনে।

শোনো—এই-যে পুরোনো একটা বাড়ি যেখানে অনেককাল মানুষ বাস করে না, আমরা কয়েক ঘণ্টার খাদ্য, এই বারান্দা এই চৌকাঠ এই মেঘ : সমস্ত এই বাড়িটাকে ইচ্ছে ছিল বদল করব আমার শরীরের সঙ্গে, এখন যেখানে গোধূলি আসন্ন বিশ্বাস তথা কৃষ্ণগোলাপ। দ্যাখো—আস্তাবলে বাঁধা তিনটি স্তনের এক মাতাল রূপসী এমন এক ঘোড়ামানুষের জন্ম দিচ্ছে, যে-সন্তান দুপুরবেলার অলৌকিক অন্ধকারে বসে শেলাই করবে গভীরতর দরোজা, মাতৃহননের। ফ্যালো—তোমার হাতের ভিতর হাসি ফেলে বিক্রি করো আমাকে; বললাম : যখন যেটা যাবে, পরিদের ঝাঁকে একটি কুকুর তো থাকবেই; দাও আমাকে সুযোগ বিশুদ্ধ পাগল কি বিশুদ্ধ মাতাল কি বিশুদ্ধ চরিত্রহীন কিংবা বিশুদ্ধ ভালোমানুষের; অর্থাৎ, আমি মানুষ হতে চাই না, মানুষ নামের ফানুশ, আমাকে ঈশ্বর বানাও কিংবা শয়তান, আমাকে এই পুরোনো বাড়ির জানালা থেকে ঝুলিয়ে রেখো না, আমাকে সুযোগ দাও।

খটখটে মাটির ভিতর উনিশ বছর আমি ছিপ ফেলে বসে আছি আত্মার সন্ধানে।

পায়ের তলায় দয়া চিবিয়ে একটিমাত্র চোখের একজন ভদ্রলোক খুলে দিচ্ছেন আমাকে: ঘৃণা-যন্ত্রণা-আক্রোশ ছোট-ছোট নুড়ির মতো আমার কালো-হয়ে-আসা মুখের মণ্ডলে এসে পড়ছে, আমি ভূতের মতো উল্টো-পায়ে পুরোনো এই বাড়িতে উঠছি, নামছি, চাবিহীন হাসছি—কতদিন আমি কাঁদি নি, মনে হলো : আমার একটিমাত্র কান্নার ফোঁটার উপর বিরাট একটি জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে, নোঙর নেমে গেছে মাটি ভেদ করে পাতালের দিকে, মাল্লারা দড়িদড়া ছুড়ে দিচ্ছে চারদিক থেকে, যে-মমতার দড়ি আমাকে ফেলছে বেঁধে; আমার প্রণয়িনীরা পরপারে ইজিচেয়ারে বসে আলো ফেলছে মুখ দিয়ে, একটিমাত্র হাতে ভীষণ-সুন্দর তালি দিচ্ছে, আমাকে ঘিরে-ঘিরে নাচছেন সাত-আটজন তিনকোনা চারকোনা পাঁচকোনা আয়না।

দর্পণই সেই দেয়াল, যার পরপারে বিরাজ করেন আরেকজন ‘আমি’।

আমার প্রতিভা সেই শয়তান, যিনি আমার কাঁধ থেকে আলগা করে ফেললেন হাড়, খুবলে নিলেন চোখ, তারপর নগ্ন করে ছেড়ে দিলেন পুরোনো এই বাড়িতে, যেখানে আমার মধ্য থেকে ডাক দিল মৃত সব নিরিন্দ্রিয় কবি; অথচ কী সাধারণ আমি, মুখে যা-ই বলি আমি জানি আমি কী; প্রতিভা, বেয়াড়া মেয়েমানুষের মতো, আমাকে টান করে ধরে পুরোনো এই বাড়ি অসংখ্যবার ঘুরিয়ে চলেছেন কেবলি, দ্যাখো, আমি তাঁর ক্রীতদাস : জীবন, আমার বোন, কেন আমার চাবি আমার বোনের ভিতর প্রতিশ্রুত হতে পারবে না? আমার এক হাত ধরে টান দিয়েছেন শয়তান, আরেক হাত ঈশ্বর—কী উল্লাস আমাকে নিয়ে! আমি ঐ দুজনের ভোজ, মাঝখান থেকে আমার দুহাত দুদিকে ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল, থামছে না, স্বগতের মতো উল্টোদিকে হাত দুটো চলে যাচ্ছে সম্পূর্ণ।

আমি, হ্যাঁ আমিই, অ্যানাক্সাগোরাসের কালো বরফ।

এই যে উচ্ছিষ্টের ভিতর বেড়ে উঠছে আঙুরলতা পুরোনো এই বাড়িতে রাত্রিতে, অর্থাৎ যাকে বলা যায় সুখ, দুঃখই আমার সুখ, পণ্ডিতকে বলব, ‘দাও হে অভিধান ফেলে, তোমরা যাকে দুঃখ বলো তাতেই যদি আমি আনন্দ পাই, কী তাহলে উপায় তোমাদের? ছিঁড়ে ফ্যালো ব্যাকরণ, বিধান চাই না বলেই তো কবি, আমি এক নতুন ব্যাকরণ সৃষ্টি করব যা আসলে ব্যাকরণই নয়।’—কিন্তু এই কথা হাওয়ায় ছিটিয়ে দেবার সঙ্গে-সঙ্গে হেসে ফেলল মুশকিল; অসীম যে-মেয়ে অলিতে-গলিতে, ঝিমন্ত ফোয়ারায়, বিচ্ছুরিত আঙুরঅলার গাড়ির পাশে, ইঁদুরের মতো ধাবমান ট্যাক্সিতে, রাস্তায় ও জোচ্চোরের প্রশংসিত আস্তানায় সারারাত্রি সর্বত্র ফেরি করে বেড়িয়েছে শরীর, মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ায় মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল তার সতের লক্ষ চার হাজার একশো তেইশটি তারা, আর তার ত্বকের ভিতরকার উচ্ছল দোকানগুলি মরে যেতে থাকল একে-একে; আর আমার শক্তি তার কোল থেকে আমাকে ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে যখন আমি কামুক স্বামীর মতো আছি আরামের তল্লাশে, যে-আরাম কাৎ করে ফেলে দেয় পণ্ডিতকে; আর্থাৎ, শাদা ভাষায়, যা আরামই নয়, যা প্রচলিত দুঃখ দেয় আমাকে : কবি ও পাগল, ইন্দ্রিয়ের বৈকল্যে যারা ভোগেন, এই পুরোনো বাড়িতে পাগল রাত্রিতে তাদের জন্যে আগুন লেগেছে, যে-আগুন সর্বাঙ্গ জুড়োয় নিঃশব্দে।

পাপের ভিতর গোলাপ থাকে, এমনকি শব্দের পাপে, ও কবিরা যেমন ॥

 

জ্যোৎস্না


জ্যোৎস্না কী?—না, জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ডু, জোড়া-জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের একমুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার ॥

 

সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল : ৩


এই বাতাস-নেই তারা-নেই ভোরবেলা—যখন মিসেস রহমান ষাঁড়ের মতো কাঁধের নাবিকের উপর চ’ড়ে বেরিয়ে আসে না আর, চীনে বাসনের উপর আপনাপন মুণ্ডু কেটে প্রেয়সীকে ক্লেশনাশন উপহার দেয়া শেষ হ’লো যখন,—আমি বাসের মধ্যেকার মানুষের মতো বোকা, ঠান্ডা, নামহীন থাকলুম ব’সে।

মনে করো সেইসব রাত, যদি মনে থাকে: সাইরেনের মতো টঙ্কার দিয়ে উঠছে মেয়েরা একেকটি কটিতলের পুরুষ উচ্ছ্রিত দেখে, রক্তাক্ত ধর্মযাজিকা, শিল্পী এককোণে তন্ময় নিজেকে তিনটি পায়ের আঁকতে—প্রতিটি শিল্পীর তিনটি পা থাকে, অথচ আবার বেশ্যার ছড়ায়ও যথেষ্ট আশবাব, রাত-শহরের উদ্ভাবিত নীল গলির মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে গান ধরলে যারা নদীতীরে, যেন আমরা সর্বদাই পরপারে থাকি। সেইসব মেয়ে ফানুশের অধিক মেয়ে মানুষেরা গড়ায়, ছড়ায়, ছড়াকাটে শপিং ব্যাগের মতো বিরাট একেক জোড়া ঠোঁট খুলে :

‘ইকড়ি মিকড়ি চামচিকড়ি কেমন আছে মধ্যিখানের পা! ইকড়ি মিকড়ি চামচিকড়ি আমার কিন্তু ভীষণ বড়ো হা!’

উধাও রেনোয়াঁ, শুধু তোমারই নয়, প্রতিটি শিল্পই তৃতীয় পায়ের অপরাধে বিরচিত, এবং বেশ্যারা, একমাত্র বেশ্যারাই প্রতিটি শিল্পের দাম দিতে জানে।

কিন্তু এই বাঁকাশিঙ চায়ের কাপের ভোরবেলা, ভুলে-যাওয়া পয়সার মতো পুরোনো পোশাক থেকে বেরিয়ে এল ছিটকে, আমি ভালোবাসলুম এই ভোরবেলা—যে-ভালোবাসা এই শহরে কাউকে বাসি নি। মনে-মনে, ঝিনুকের মতো ফাঁপা ও কণ্ঠস্বর-ভরা স্টমাকে, বললুম : দিলুম, আমি সমস্ত ভাসান দিলুম—মেয়েমানুষ, যারা ল্যাম্পোস্টের মতো হাঁটছে এখন; আর খ্যাতি, সাততলা খ্যাতি; আর টাকা, তদবিরবাহিত টাকা; এই আমার দেশ—সারল্য আর পিচ্ছিলতায় ভরা; ভাসিয়ে দিলুম মদ আর গোলাপের সন্ধেগুলি; আর অনাব্য আত্মাগুলি—যা আমি জোগাড় করেছিলুম ভাঙা জানালার উঁচু পরোক্ষের বাড়ি থেকে পালকভর্তি কৈশোরিক অ্যাডভেঞ্চারে চ’ড়ে। ভাসান দিলুম হাতে-বানানো নৌকোর মতো; আর উড়াল দিল সাততলা খ্যাতির পিঠ থেকে, টাকার সন্ধের পিঠ থেকে আমার হায় ভালোবাসা, মানুষবিরহিত ভালোবাসা, উড়িয়ে দিলুম আমার গলাকাটা কবিতা, ধর্মাত্ম গল্প, আর অহেতুপ্রভব প্রবন্ধমালা—সমস্ত ভাসান দিলুম সমস্ত উড়াল! আমার শরীরের ভিতরকার এইসব দীপ্ত দোকানগুলি মেরে ফেলে আমি শিল্পহীন ভালোবাসা সাধারণে দিতে পারতুম যদি!

 

চাঁদে পাওয়া : ৩


হাতে বানানো রুটির মতো চ্যাপ্টা, রোগা, পাৎলা চাঁদ ; রেডিয়াম-দেয়া চাঁদ ; হলুদ সূর্যমুখী, একমাত্র সূর্যমুখী আমার; একমাত্র তুমিই কি অসূর্যম্পশ্যা? কিশোরীর নতুন স্তন নাকি তুমি, অতল থেকে ফোয়ারার মতো উঠে এসেছ, সব সোনালি শিকড়গুলি উপড়ে ফেলে? ফশফরাশের কুয়ো, মেয়েমানুষের উজ্জ্বল-লাল বিদ্যুৎ-ঝরা কুয়ো? যেন বেলুন, বেলুন তুমি ; কিন্তু অদৃশ্য শিশুটি সুতো ধরে লুকিয়ে আছে কোথায়? নাকি তুমি হৃৎপিণ্ড আমার?

 

চাঁদে পাওয়া : ৪


একদিন রাত্রিবেলা স্বপ্ন দেখেছিলাম : নিষ্ঠুর ড্রামের মতো প্রচন্ড বেজে চলেছে চাঁদ—অবিশ্বাস্য সব হিরের পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে, ধনীদের অনির্বচনীয় পুঁজি চোখ তুলে তাকায়—যখন ভীষণ উল্লাসে নাচছে চাঁদ ধাতুর নেপচুনের মতো ফাঁপা সব অহঙ্কারের বুকের উপর?  

টুকরো-টুকরো মৃত্যু


২. কবিতাকে নোংরা থাকতে দাও, ব্লেডে ছেঁটে দিয়ো না তার আকীর্ণ চোয়াল : সংশোধনে স্বর্গ পায় একমাত্র মেয়েরাই—ব্যয়ের বাইরে আর ছিপের অতীত।

 

৩. আমার কবিতা : দরোজায় অক্টোপাশ, চাবিছিদ্রে নিমন্ত্রণকারী বিজোড় পতিতা ॥

 

জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা প্রকাশকাল : ১৯৬৯


লন্ঠন


সূর্যাস্ত ফেলেছে নিঃশব্দে ফেরেশতাদের রঙচঙে কাপড়-চোপড়। উচ্চণ্ড দোকানাবীথি ফুলে-ওঠে ভিড়ে কোলাহলে বাল্বে বাতাসে             এত খুশি, যেন চাঁদে যাবে; জুতোর ফিতের প্রজাপতি উড়িয়ে লোকেরা যাচ্ছে লেকে-পার্কে-সিনেমায়             সূর্যাস্তের মতো রাঙা বেশ্যা      নীল জানালার পাটতনে ব’সে আয়না ধরেছে, যেন মুখের সম্মুখে থাবা ধ’রে আছে নিবিড় বাঘিনী;     সারি-সারি আমগাছ মেহগনি-বৃক্ষ হ’য়ে যায়,             তার ফাঁকে-ফাঁকে জাফরান রোদ সন্ধ্যার চিকুরে আঁচড়ায় সোনার চিরুনি। সন্ধ্যেবেলা সময়ের নাভি ট’লে ওঠে ধর্ম যেন পাটকিলে সিংহিনী শোভাবাজারের তেতলায়;      তীব্র আলো-জ্বলা সরু করিডোরে      পাশা-আঁকা নীরক্ত মোজেকে আদর্শ, নগ্ন রূপসী, তার নাভিমূলে টুংটাং ঘণ্টা বেঁধে      কুক্কুরীর মতো চারি পায়ে ঘোরার চত্বরে জুড়ে             শতকের রাঙা অভিশাপ; চায়ের কাপের মতো লঘু হাত ফশকে প’ড়ে গিয়ে             চুরমার প্রত্যেকের ভিতরে বিশ্বাস। বৃহৎ জগৎ থেকে মার খেয়ে ফিরে এসে, দেখি আমি : কমলালেবুর একখানি কোয়া, নড়ছে তারার চাকা, আর পারা      থার্মোমিটারের, বালিশের অড়, আংটির মতো ঠোঁট-গোল-করা এতটুকু মেয়ে, কুকি রমণীর নৃত্যে খুলে-দেয় হিরণ দরোজা, কাঁচা আমের মাংস, নিসর্গ, আব্বার হাত, আলস্যের ডালপালা :             কিন্তু এইসব পাখি-চোখ গণনায় কী ক’রে চিহ্নিত করি এই শতাব্দীতের ভুল-ক’রে-আসা আমি-টিকে?      বলা যায় : পরেছে কাচের জুতো ঝড়। তাই ঘরে ব’সে শুনি : থেকে-থেকে বারা-বার টিয়ের ক্রেঙ্কার,      আর আসকালসন্ধ্যা ব’সে-ব’সে মেজে-ঘ’ষে তুলেছি লন্ঠন, একমাত্র লন্ঠন আমার।             তারই সন্ধ্যালোকে টালির উপর থেকে রঙচঙে একটি মোরগ লাফিয়ে নামলে,             মনে হয় : কোনো শিল্পী বর্ণস্নাত করেছে মোরগটিকে,      অতিযত্নে, লাল পরিশ্রমে।      —কোন শিল্পী? কে ক’রেছে? —ফাজিল আলোয় ব’সে নিদ্রার অপার জামা প’রে আমার আল্লার ধ্রুবা! কিন্তু পরক্ষণে আমূল শিউরে উঠে পাই টের : হায় পৃষ্ঠদেশে বিঁধে আছে চোখা, বাঁকা অবিশ্বাস! বিশ্ববাংলার ঘরে-ঘরে ক্রমে আলো জ্ব’লে ওঠে;      আমি দীপহীন অন্ধকার ঘরে একা এরি মাঝখানে নিজের আগুনে জ্বালিয়েছে লণ্ঠন আমার,      এই শতাব্দীর সন্ধ্যাকালে। সমসাময়িক কুক্কুর-সভ্যতা রুখে চোখে জ্বলে একি নিষ্পলক ব্যক্তিগত পরকলা, দেখি : রাত্রিআকাশের গাঢ় ফেজ্ টুপি-পরা কালো খোজা      আর সোনার-ফরশা সুলতানা শুয়ে আছে মেঘে আর চাঁদে আকাশের সুনীল পালঙে।      আকাশে বাসেছে মুশায়রা, —ফিরোজার অত্যাচারে পোড়ে মধ্যরাত—      তুলে ধরি বান্দার রেকাব,      কবিতা : হা কবিতা আমার, তুলে ধরি স্ফিংসের মতন দুর্বোধ্য কবিতা আমার।      মেঘ ক’রে এলে, তবু রাতভোর শেফালির বিছানানির্মাণ চলে।             তাই ভাবি : এ আঁধারে দু-হাত পেয়ালা ক’রে তারা-জ্বলা পানি খাবো ব’লে নেমে যাবো ভীষণ জীবনে। আমার নিজের তৈরি, নিজের আগুনে জ্বালা লন্ঠন কি সঙ্গে যাবে? লন্ঠন কি সঙ্গে-সঙ্গে যাবে?
০২.০৯.৬৯

চল্ , উদ্বাস্তুরা ! চল্ !


ঝরছে বাংলাদেশ : রূপসীর আননের ছাঁচে কাঠ-ফাটা তৃষ্ণা, রোগ, ক্ষুধা, জরা, বলিরেখা।— মন্দিরে, আত্মার ঘণ্টা, কুয়াশার মধ্যে খ’সে পড়ে : আঁধারে, সবুজ পাতা। একা নাচে দীর্ণ মসজিদে বেলোয়ারি দিন, রাত্রি; চ’লে গেছে নামাজির দল, প্রশান্ত ইমাম; টুংটাং ঝাড়বাতি নড়ে; ধূসরতা আর পাণ্ডু মুখ-চাওয়াচাওয়ি ক’রে ব’সে থাকে শূন্য পুরোনো বাড়িতে; মসজিদে, মৃদু, শান্ত জলে কৃষ্ণ-দিন রক্ত-রাত ব্যেপে খেলে লাল-নীল মাছ। হটাৎ রাত্তিরে ঘুম ভেঙে, দেখি, পরগাছা জামা শরীর লেপটে আছে—মুসলমানের; বাঙালির নয়;—কারা-সে নিসর্গচ্ছিন্ন খেলে দীর্ঘ তলোয়ার আমাদের বাড়ি ঘিরে, নেচে ওঠে হিংসা-অগ্নি-ক্ষুধা : এই কি পাবক, চৈতন্যের নীল দেশলাই নয়? ক্ষুধা এই, পূর্ণিমা পলায় যার প্রত্ন গ্রাস থেকে? এই কি হিংসা, ঈশ্বরে যে দ্বন্দ্বিতা হেঁকেছে জোরে? শিরার ভিতর থেকে ছিটকে বেরোয় লাল ফিতে, একরাশ, খুলে যায়, ভাঁজ খুলে ইচ্ছে-মতো যায়; মাথায় পিঞ্জর থেকে লোহিত-হরিৎ টিয়েপাখি, চ্রিক-শব্দে বের হ’য়ে মানচিত্র ছিঁড়েখুঁড়ে ফ্যালে। চিৎকারে ছুটেছি একটি কালো ঘোড়া, প’রে নিয়ে মানুষের ছদ্মবেশ ;—দীপ্র, সান্দ্র আত্মা বিক্রি ক’রে জীবনের লঘু-গুরু প্রত্যেকটি দোকানে ফিরেছি, শরীরে ধারণ ক’রে একমাত্র লাশের প্রচ্ছদ। ...তারপর যতবার কল্যাণে গিয়াছি, কে হেঁকেছে : “এ দেশ তোমার নয় !” ভালোবাসা-প্রবেশের কালে বেজে ওঠে তুঙ্গ নাদ : “বেরোও এখান থেকে তুমি!” ঘৃণার রেলোয়ে বেয়ে ছেড়ে যাই ভালোবাসা-লোক। বিশ্বাসের বাড়ি ঘিরে চোখ-বাঁধা ভীষণ আগুন “পালাও এখান থেকে !” বলে।—কুক্কুর-অভ্যাসে দেখি : ততবার ফেলে যায়, যতবার স্বপ্ন নিয়ে আসি দাঁতে বিঁধে, বস্তুর অজস্র চাকা অতিক্রম ক’রে।
১৯.১০.৬৭
 

রক্তের পলাশবনে কালো ফেরেশতা


সোনার বন্যার মতো গলগল করে বলি অমিতাভ আকাঙ্ক্ষার কথা : যেন উড়ে চলে যায় বালকের হাত থেকে হাওয়া-ভরা শত রঙিন ফানুশ সপ্রাণ খুশির ভরে, দূর থেকে আরো দূরে নীলিমার পারে পৃথিবীর রেস্তোরাঁ টেবিল জ্বলা সন্ধেবেলা থেকে দূর শূন্যে উড়ে যায় শব্দহীন। পরে, মনে পড়ে যায় :—বসন্ত, কলম তুলে কোনোদিন লিখেছে কবিতা স্মৃতিরেখা তাও নেই : দুঃস্বপ্নে আমার জন্ম : উগরে দিয়েছে বঙ্গদেশে পঞ্চাশের মন্বন্তর নামহীন ফুটপাতে পিলপিল ভিড়ের ভিতরে— আমার জননী, সে তো ক্ষুৎকাতর পঞ্চাশের মন্বন্তর ছাড়া কেউ নয়। আজো কি রক্তের কালোজামগাছে শিরা-উপশিরা ভরে নিরন্তর বয় তারি গুপ্ত স্রোতখানি? তারি সঙ্গে নাড়িতে-নাড়িতে বাঁধা পড়ে গেছি, হায়? বুঝি তা-ই মুঠো থেকে বারে-বারে পড়ে গেছে, যতবার তুলেছি গোলাপ! এঁকেবেঁকে সব রাস্তা—আক্রান্ত, গোধূলি-দ্বারা—চলে গেছে হাঁ-খোলা কবরে! আমার কি দোষ, বলো, যদি বেঁকে যায় যতবার অক্ষর লিখেছি? চেতনা প্রখর হয়ে ওঠে হিরের ছুরির মতো : ‘হায় নিহিত প্রতিভা! ‘হায় নিরঞ্জন পাখি! তুমি-যে আল্লার থুতু : আশরীর ধুলোয় লুটোলে! ‘বড়-জোর এ-ই হয় : ধূসর গুজব তুলে ফুৎকারে ভরবে নির্মোক! ‘আমুন্ডুনখাগ্র তুমি লোবানের ঘ্রাণে ভরা—বেঁচে থাকতে কাফন পরেছ ‘শাদা, কলঙ্ক-না-পড়া শিশুর মনের মতো, বহুব্যবহৃত দেহ আর ‘ত্যক্ত মন ঢেকে নিয়ে; কেবলি ক্রন্দন এক আত্মার ফোয়ারা থেকে উঠে ‘গ্রেফতার করে রাখে : ‘মরণের পরে পরবে জীবনের লাল জামাখানি!’ ‘ধুলো- আর স্বপ্ন-ভরা হায় নিরঞ্জন কবি! আটকা পড়েছ হরিণের ‘অনুপম শিঙ নিয়ে লুব্ধ ডালপালাময় ভুবনভাঙার কেশপাশে!’ —মানব : সে পেকে, প’চে, ভেঙে-যাওয়া ফল বাতাস করেছে কলুষিত; আর আল্লার কড়ে আঙুলে আমার কড়ে আঙুল লাগিয়ে দিয়েছি ঝট করে। ‘ওহ! কী ভুল করেছি!’ ভাবতে-ভাবতে ফের তানপুরার রাস্তায় কতবার চলে গেছি পরোক্ষ কমলালেবু হাতে করে; আর যতবার ভেবেছি একটি অর্থ-ভরা কবিতা লিখব, ততবার শব্দের প্রপাত আমাকে আড়ালে রাখে... আমাকে কেন্দ্রে রেখে ঝরে যায় নিরর্থ তারানা। রেকাব, ব্যর্থ বিড়াল, ডালিমের দানা, জুঁইফুল, পেরেক, সুসমাচার, ঝরা পাতা, প্রথম কিশোরী—যার নিতম্ব চাঁদের চেয়েও ভারি হয়ে আসে : একটি স্টিললাইফে রূপায়িত হয়ে গেলে তবু কিছু বাকি থেকে যায় : কখনো-বা ফোঁপায় অভাব, কখনো-বা কেঁদে ওঠে মুঠো-মুঠো মুগ্ধ আশরাফি। অর্থাৎ, শূন্যতা শুধু;—সবি শূন্য ?—তা-ই বটে : নাস্তির নিখিল নটরাজ নৃত্য করে চরাচারে; জন্মান্ধ রেলোয়ে ব্যেপে নিরন্তর ‘বিদায়, বিদায়!” যায় কেঁদে; সবার উড্ডীন হাত কেঁপে-কেঁপে লিখে যায় বাতাসে কেবলি : ‘মেদিনী একটি বাঁধাকপি : পাতাগুলি খুলে নিলে পাওয়া যাবে না তাকে।’ স্টেশনের অপেক্ষাগৃহের মতো এই এলোমেলো ঘরে, দুদণ্ডের ঘরে কত কাল পড়ে আছি : স্নানাহার নেই, শরীরে শ্যাওলা জমে গেছে, গান গাইতে গেলে ছিঁড়ে যেতে চায় গলা, উড়ে যেতে চায় প্রাণ, নোংরা কাপড় : বেহালার জ্ঞান নেই, গিটার ঘুমিয়ে আছে, খসে গেছে পিআনোর রিড ॥  

মরণের অভিজ্ঞান


সবুজ চাঁদের নিচে প’ড়ে আছে আমার শরীর। চেতনা, তারার নিচে। আমার চিৎকার উঠে যায় অলীক ফিটনে চ’ড়ে ঘুরে-ঘুরে আরক্ত চাকায় নীল শূন্যে। নদী : আমার জীবন; বাকি সব : তীর। প্রবেশ করছি ধীরে মরণের ধবল প্রাসাদে— মর্মর-পাথরে তৈরি মেঝে, ছাদ সময়ে বানানো। মাথা ফেটে সব স্বপ্ন চূর্ণ-চূর্ণ পড়ে আছে যেন : সবি খাবে বিশদ বিড়াল, কেবল কৃতিত্ব বাদে। লুপ্ত ঐ একতান গোধূলির তাম্র অনুতাপ ; ধ’সে পড়ে স্তনের গম্বুজ ; চৈতন্য, একটি তিল :— নিসর্গ, রমণী, সত্তা : নিরর্থ পাগল অনুলাপ। তৃণশীর্ষে শুয়ে হিশেব করব আজ, যায় কে কে?— সব নদীর উপরে ধবল-ধূসর গাঙচিল ওড়ে মরণের, নীল নৌকোর জীবনে যায় ঠেকে ॥ 14012430_1213527112025741_1615111637_o  

রাস্তা


আমি যাব, যে রাস্তা কুমারী তার প্রতি; যে-রাস্তায় সোনালি তারার মতো বাঁশপাতা-খচা শুক্লাভায়; তারার শরীর থেকে নেমে-আসা তপ্ত-লাল ধুলো; সুন্দরতম ফেরেশনা হাঁটেন যে-রাস্তায়; কুলো হয় ক্রমশ পত্রালি ; বৃষ্টি হয় সোনালি প্রভাত; রৌদ্র, নীল হরিণের দেহ থেকে রক্তসম্প্রপাত; বাতাস, গোলাপি দীর্ঘশ্বাস; তরু যেন ক্রীতদাস দাঁড় টেনে চলে যায় ছিঁড়ে শষ্পমৃত্তিকার পাশ :— স্পন্দমান যে-রাস্তার শেষে স্থির, ছোটো কুঁড়েঘর : থেকে, ঠান্ডা কুয়ো থেকে পান করব তরল ঈশ্বর ॥  

কবিতা, বিপন্ন গিঁট


কবিতা, আমার মুশকিল, কেন-যে হলে না লোকায়ত? জিভের ডগায় তুমি ধরেছ মার্বেল, তুমি কুমারীর সায়ার বিপন্ন গিঁট, পিআনোর ভিতরে সমস্যা চুরি করে চলে-যাওয়া                        তুমি কি মেঘের অগ্নি? ভাগাড়ও জ্যোৎস্না দ্যাখে, তুমি তা-ই? মোষের সুমুখে লাল? জন্মান্ধের শস্য তুমি? হায় স্বকীয়তা, মুল ঋণশোধ, তোমার সহিত দেখা হলে                         অপর লোকেরা মুখ কালো করে চলে যায়; নারী, বোঝে না কিছুই, তবু সে-ই                         প্রকৃত অগ্নির মানে নেয় বুঝে :— বেদনা, দষ্ট আপেল, বিকেলের বাথরুমে পড়ে থাকে চুপে। সুতরাং—সুতরাং কোরাসের সদস্যই হব? বরং একেলা করো—এ-প্রার্থনা : দেখি টান-জোগানের খেলা রাত্রিদিন : কিরূপে স্বয়ং মরতে চলেছে হাঁস মননের যাত্রী সাইপ্রেসের এভিন্যু সফেদ সিল্কের দ্যুতি চূর্ণ কালোজাম                        কল্পনা : আ-মি-ন ॥  

উড়ন্ত অনুভূতি


উঠেছে সুনীলশূন্যে গোল, সম্পূণ, সোনালি-ফর্শা চাঁদ। নক্ষত্রের অক্ষর। তারার নিচে ছোটে, শান্ত, ঠান্ডা কবরের সারি। চাঁদের নিচে আলোর চারটে থাম-অলা ঢাকনা-দেয়া চৌকোনো লাশ-ঘর। ল্যাম্পোস্টগুলি নিথর দাঁড়িয়ে : কোমল জ্যোতি। এখানকার চার দেয়ালের ভিতরে, কেয়ারি-করা কবরের ভিতরে মুক্তার ভিতরে মুক্তার মতো অনেক শরীর শুয়ে আছে, ঘুমিয়ে আছে। চার দেয়ালের বাইরে এক-একটি আলো-জ্বলা উঁচু-উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িতে হাসি রাগ আনন্দ প্রেম সংসারিনী : এক-একটি সরু রামধনু-ভরা ঝনার মতো ঝরে-ঝরে পড়ছে,—ঐ সরু, উচ্ছল, প্রাণবিক ধারাগুলি এখানকার সাগরে এসে মিশবে একদিন এঁকেবেঁকে। বড় দরোজার বাইরে—যেখানে ভিড় করেছে কালো ও পাটকিলে ভিখিরি ছেলেমেয়রা, গাড়ির ক্রেঙ্কার, রাজনীতি, মেয়েপুরুষের স্রোত শাওনের মেঘনার মতো উদ্দাম। এখানকার চাতাল শীতল পাথরে বাঁধানো। মৃত্যুকে আমি খুব ভয় পেতাম—লাশ, কবর, রাত্রিকে। কিন্তু আজ প্রথমবারের মতো এখানে এসে, ঐ নীল দিগন্তের স্বর্গে থির তারাটির মতো নরম হয়ে এলাম যেন :—আমার এতটুকু ভয় লাগল না। আতরে লোবানে আগরবাতিতে যে-সুগন্ধ উঠেছে তার সঙ্গে মিশেছে চিরকালের মাটির গন্ধ। সেই গন্ধের ভিতরে ছোট্ট আত্মার মতো—হয়তো কোনো শিশুর—দেখলাম : একটি আরব পাখি। আর-সবি ঘুমিয়ে আছে এখানে, কেবল জেগে আছে শান্তি ॥

 

 ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ প্রকাশকাল : ১৯৭৪


মুক্তি-যুদ্ধ


ছিল সেটা গৃহ-যুদ্ধে আমার ভিতরে রাত্রির বিরুদ্ধে চাঁদের মতো জ্বলছিলাম আমি প্রথমে ক্ষীণ শশিকলা দিগন্তের কালো খেতে ঝলসে উঠেছিল সোনার হেঁসোর মতো আশা-হতাশার দুধারী তলোয়ার দুটুকরো করে ফেলেছে আমাকে যুদ্ধ চলে দুই অংশে রীতিমতো আমন্ত্রণকারী ঘাসের ভিতরে পা ফেলতেই পুঁতে-রাখা গোপন মাইন-এ আমি টুকরো-টুকরো হয়ে যাই ঘাসের উপর বসে নিজেকে জোড়া লাগাই ফের ট্যাঙ্ক-এর বিরুদ্ধে ঠ্যালাগাড়ির ব্যারিকেড রাস্তা জুড়ে পাশবিকতার বিরুদ্ধে মানবিকতা রাত্রির বিরুদ্ধে চাঁদ কালো কামানের বিরুদ্ধে সবুজ পল্লব দক্ষিণ আকাশ জুড়ে মার্চ করে নক্ষত্রের ফৌজ উত্তর-আকাশে কালো ঢালা কালো-পিচ্ছিল জলের উপর আমার আশার আলো-জ্বলা জাহাজ দারুণ সাবমেরিন-এর আঘাতে ডুবে যায়              জলের উপরে ভেসে ফের খেলনা-জাহাজের মতো গড়তে থাকি তাকে নারকেলের সবুজ পাতার ঝালর-ঢাকা চাঁদের সোনালি কামান নিঃশব্দ ওঙ্কারে গর্জে উঠে তুমুল জ্যোৎস্না ছুড়ে মারে এই চলে সারা রাত জ্যোৎস্নায়-তমসায় বাদানুবাদ ভোরের দিকে গৃহ-যুদ্ধ মুক্তি-যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়ে যায়।  

ঘুমের ভেতরে নিদ্রাহীন প্রকাশকাল : ...


কবি


কোত্থেকে বেরিয়ে এলে? —তোমাদের ঐ সূর্য থেকে। এখন কোথায় যাবে? —অনন্তে : যেখানে অস্ত যায় না কোনা-কিছু। মাথায় কী? —স্বপ্ন-ঘেরা কালোজাম-পাতার মুকুট। হাতে? —চাঁদের খুলি মধ্যে-পাওয়া একমুঠো সোনার ছাই। দূরে কী দেখছ? —চান্দ্র-মাস বসেছে বিহারে। বটে? ও-তো শ্রোণিভারে বেদম রমণী :            কী-রকম তড়পায় দেখেছ? —যেন ডাঙায় কাৎলামাছ, সদ্য পানি থেকে তোলা। ওদিকে? —জেলের আতত জাল, ভুল করে সূর্যে পড়েছে। সঙ্গে আছে কেউ? —আছে : একটা পাগলা কুকুর, ঈশ্বর বলে ডাকি। জানো, কী মাড়িয়ে চলেছ? —হ্যাঁ জানি : বাস্তব। জানো, আমি কে? —তুমি তো আয়না। তুমি কে? —একলা কবি ॥

পরাবাস্তব কবিতা প্রকাশকাল : ১৯৮২


সৃষ্টিশীলতার প্রতি


শুধু তোমাকে সালাম—আর কাউক্কে তোয়াক্কা করি না, আর-সব-পায়ে-দলা মুথাঘাস—শুধু তুমি ঘাসে রত্নফুল, আর-সব নোংরা টাকা-পয়সার মতো : হাতে-হাতে ঘোরে-ফেরে— শুধু তুমি অমল-ধবল তুমি, তোমার আহারে শুধু ঘড়ি লাগে—আর-কিছুই রোচে না তোমার, নামো ঝরনা ফাটিয়ে পাথর—সৃষ্টি তার মুখোশ ছিঁড়েছে, বস্তুর বিরুদ্ধে শুধু অফুরান প্রজাপতি ওড়ে ॥  

লাল-নীল মাছ


আলতামিরা গুহা থেকে পাগল বেরিয়ে এসে ছুটেছে বাইসন পৃথিবী মাড়িয়ে, ভেঙে ফেলে ট্যাবু ও টোটেম, একটু আড়াল বুঝে হরিণী লুকিয়ে পড়ে             শহরের কোনো গলিপথে, মসজিদের পাশে, আয়ত নয়নে দ্যাখে : নিথর চৌবাচ্চা ব্যেপে খেলা করে লাল-নীল মাছ ॥    

কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড প্রকাশকাল : ১৯৮২


লেখক


একদিন মানুষ ছিলেন, এখন লেখক। মানুষের সমস্যা কখনো পীড়ন করে না আর তাঁকে, লেখকের সমস্যায় আপাদমস্তক জর্জরিত। অন্য লেখকের চেয়ে বড় হতে হবে তাঁকে। অন্য লেখকের চেয়ে বেশি খ্যাতিমান। অন্য লেখকের চেয়ে পেতে হবে বেশি পুরস্কার।  

আমার বন্ধু


আমার বন্ধু শাহজাহান হাফিজ ছিল জীবনানন্দের চেয়ে বেশি নির্জন। চাঁদ দেখলে সে থরথর করে কাঁপত, নদী দেখলে থরথর করে কাঁপত, নতুন কবিতাবই দেখলে তার হাত কাঁপত—             থরথর করে হাতের আঙুলগুলি কাঁপত, তার গ্রামের বর্ণনা দিতে-দিতে উত্তেজনায় তার চোখে পানি এসে যেত, কোনো মেয়ের মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারত না— হাফিজ সামান্যে ছিল অসামান্য খুশি। একবার মাধবকুন্ডের জলপ্রপাতের উৎসে যেতে গিয়ে পা হড়কে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল কয়েকশো ফুট নিচের গহ্বরে। আমি তাকে কোনো বই উৎসর্গ করলে হয়তো সে আত্মহত্যা করে বসবে আনন্দের চোটে— এই ভয়ে এখনো তাকে বই উৎসর্গ করি নি কোনো। আমাদের শাহজাহান দেখেছিল জীবনের প্রতিটি জিনিশে তাজমহল প্রতিষ্ঠিত। অধুনা সে বিবাহিত, কিন্তু এখনো তার বিস্ময় কাটে নি, নারীতে বিস্ময় আজো তার, নিসর্গে বিস্ময়, অক্ষরে বিস্ময়। সে নিজে বিস্ময়, সে কি তা জানে? আত্মমগ্ন, কবির অধিক কবি, শাহজাহান হাফিজ জানে না। জানে না, সে নিজে বিস্ময়ের অধিক বিস্ময়। চাঁদ কি জেনেছে কোনোদিন তার নিজের শরাব? ঘোড়া কি জেনেছে তার নিজের গরিমা? আমি চিন্তাই করতে পারি না, শাহজাহান হাফিজ কী করে রতিক্রিয়া সম্পাদন করে ॥  

কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড


এখানে কবিতা বানানো হয়। সব ধরনের কবিতা। রাজনীতিক কবিতা, সামাজিক কবিতা। নাগরিক কবিতা, গ্রামীণ কবিতা। প্রেমের কবিতা, শরীরের কবিতা। স্বপ্নের কবিতা, বাস্তবের কবিতা। চল্লিশের কবিতা, পঞ্চাশের কবিতা। ষাটের কবিতা, সত্তরের কবিতা। আশির কবিতাও আমরা বাজারে ছাড়ছি শিগগিরই। কবিতার হাত, পা, মাথা, ধড়, শিশ্ন, যোনি, চুল, নখ, চোখ, মুখ, নাক, কান, হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল— সব-কিছু মওজুদ আছে আমাদের এখানে। স্বদেশি ও বিদেশি উপমা ও চিত্রকল্প, শব্দ ও ছন্দ, অন্ত্যমিল ও মধ্যমিল লক্ষ লক্ষ জমা আছে আমাদের স্টকে। ব্যাঙের ছাতার মতো আরো অনেক কবিতার কোম্পানি গজিয়েছে বটে আজকাল। কিন্তু, আপনি তো জানেনই, আমাদের কোম্পানি ইতোমধ্যেই বেশ নাম করেছে। আর ফাঁকি দিয়ে কি খ্যাতি অর্জন করা সম্ভব, বলুন? হ্যাঁ, আপনার অর্ডার-দেওয়া কবিতাটি এই-তো তৈরি হয়ে এলো। চমৎকার হয়েছে। ফিনিশিং টাচ শুধু বাকি। একটু বসুন স্যার, চা খান, কবিতার কয়েকটা ইস্ক্রুপ কম পড়ে গেছে আমাদের, পাশের কারখানা থেকে একছুটে নিয়ে আসবার জন্যে এখখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি লতিফকে।  

পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি প্রকাশকাল : ১৯৮৩ 


 ভ্রামণ জার্নাল, বিশাল বাংলা


[লামবেখ

নাচো ক্রমাগত নাচো নাচো বিরতিহীন নাচো বন জুড়ে নতুন পাতার মতো নাচো ফরেস্ট রেঞ্জের মধ্যে নিষিদ্ধ অগ্নির মতো নৃত্যে-নৃত্যে জাগিয়ে তোলো বেদনার ভিতরে চেতনা সুখের ভিতরময় সুখ নৃত্যে-নৃত্যে করে তোলো নপুংসকের শিশ্নও উত্তাল হাতে-হাতে ধরে-ধরে রমণী পুরুষ তোমরা গোলাপপাশ অদিতির শান্তিবৃষ্টি আনো দাহ-ব্যাপী ধ্বংসাশী সভ্যতা রোখো কোনো বুদ্ধিজীবী মস্তিষ্কের সাধু তাড়নায় নয় শুধুমাত্র পায়ের দাপটে শুধুমাত্র কটিচালনায় শুধুমাত্র হাতের মুদ্রায় নাচো ক্রমাগত নাচো নাচো রক্তস্রোতে ঘূর্ণ্যমান মাটির আদিম প্রাণনায় ক্রমশ উত্তেজে দ্রুতচ্ছন্দে নাচো শুধু নেচে-নেচে শান্ত করো দেবতার রোষ শুধু নেচে-নেচে জ্বেলে দাও স্কাইস্ক্র্যাপারে মাটির পিদিম কঠিন পাথরে আনো বেদনা-ফটিকছড়ি আনন্দ-ফটিকছড়ি ॥

14075056_1213527118692407_693135089_o

 

মাছ সিরিজ প্রকাশকাল : ১৯৮৪


মাছ


শহর ঘুমিয়ে আছে। মধ্যরাত্রি। তারা-ভরা বিশাল আকাশ। দর্পনের মধ্য থেকে শুধু একটি উজ্জ্বল মাছ                                  বেরিয়ে এসেছে শব্দহীন। ওকে শুধু দেখছে আমার চোখ। নিঃশব্দে বলেছে চোখ : মাছ, তুমি হারুনার রশিদ, নিশিপোশাকে বেরিয়ে ঘুরেছ শহরময়―প্রাসাদে ও কুঁড়েঘরে। দেখেছ শূন্য জুড়ে তারাদের চাকা ঘুরে যায়। মাছ তুমি চলেছ কোথায়? শহর ঘুমিয়ে আছে। শুধু জেগে আছে চোর, বেশ্যা, পুলিশ এবং এক জন্মান্ধ গায়ক। আর এক আশ্চর্য নিঃশব্দ মাছ। অগ্রসরমান মাছ। ওকে শুধু দেখেছে আমার চোখ। নিঃশব্দে বলেছে চোখ: মাছ, তুমি কি আমারই চোখ? এত রাত্রে নির্ঝরের জলে ঐ প্রাকৃতিক চাকা ঘুরে যায়। মাছ, তুমি চলেছ কোথায়?  

পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ


পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ ঝর্না থেকে নেমে এসেছিল। এখন, রহস্যময় জলে, খেলা করে অবিরল। পদ্মায় গিয়েছে একটি—মেঘনায়—যমুনায়—সুরমায়— আর-একটি গোপন ইচ্ছায়। পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ ঝর্না থেকে নেমে এসে সাঁৎরে চলে বিভিন্ন নদীতে। পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ জলের রহস্য ভেদ করে এখন একাকী এক শব্দহীন সমুদ্রে চলেছে ॥  

মধ্যরাতে বৃষ্টি


অঝোর বৃষ্টিতে, রানি, ভেসে গেছে আমার আনন। ইন্দ্রিয়ের মাছগুলি খলবল বেরিয়ে পড়েছে চাঞ্চল্য, তোমার জলে। মধ্যরাতে স্বপ্নের মতন যখন বৃষ্টি এল, তালা-দেওয়া অফিসে-অফিসে তখন অজস্র মাছ কেলা করে স্বপ্নের ভিতরে। উড়ন্ত ঘোড়ার মতো মনে পড়ে তখন তোমাকে। পাথরের মধ্য দিয়ে আমি কাটি দুরন্ত সাঁতার, ছেলেবেলাকার পোলো ফেলে মাছ ধরা চলতে থাকে, ঘোড়ার অগ্নির মতো মনে পড়ে তোমাকে আমার। মেঘের রন্ধ্র থেকে তুমি জাগো চাঁদের জহরত, সোনার ঘণ্টার মতো তারামাছগুলি ওঠে বেজে, তোমার কণ্ঠ থেকে সিল্কের মতন বৃষ্টি নামে। সে বৃষ্টিতে ভেসে যায় না-দেখা আমার মুখখানি, মাথার ভিতরকার অ্যাকুরিয়াম ভেঙে ফেলে মাছগুলি বেরিয়ে পড়েছে আজ রাজপথে-পথে অসংখ্য তারার মতো। তোমাকে আমার মনে পড়ে। একর-একর পুড়ে দাঁড়িয়েছে তোমার আনন বৃষ্টিমুখর এ রাতে। সশরীরে ভেসে যাই, রানি ॥  

চতুর্দশপদী প্রকাশকাল : ...


গ্রিনরোড


একদিন কুলিরোড ছিলে। হাঁটু অব্দি ডোবানো ধুলোয় ছিলে এক নির্জন তাপস। অড়হর-খেতে একদিন দেখেছিলাম তরুণ খরগোশ যেন কোন প্রাকৃতিক নিবিড় নিখিলে বিদ্যুচ্চমক তুলে মিশে গিয়েছিল মটরশুঁটির খেতে। লাল-কালো কুঁচফল পেড়েছি একদিন সান্দ্র ঝোঁপ থেকে দেখেছি ধানখেত, কামময়, গভীর খোড়ল, কৈশোরক নিরুদ্বেগে, কৌতূহলে। তারপর সপ্তর্ষির নৈশ সংকেতে আমগাছ জামগাছ কাঁঠালগাছের শ্যাম ক্রমাগত মুছে মুছে উঠে আসছে তরুণ বিল্ডিং, নিভে যাচ্ছে ঘাস, উবে যাচ্ছে নিবিড় বৃষ্টির দিন; তবু তোমাকে কেন্দ্র রেখে একদিন ঝরেছে যে-পাতার শিকল ধরিত্রীরই কোনোখানে যে-সব রয়েছে অবিকল— অনশ্বর, অবিচ্যুত, স্বপ্নবিদ্ধ, নির্লিপ্ত, সকাম ॥

তুমি : ৮


তুমি ছিলে অরণ্যের ছুটন্ত হরিণী, আর আমি ঐ দুটি ধাবমান চোখের চাতক। কোনো দিন মুখ ফুটে তোমাকে বলি নি— পাতা পড়বারও আগে ছুটে যায় এমন শশক এ হৃদয় : তোমার অগ্নির প্রতি। ঘন পত্রপল্লবের ফাঁকে দেখেছিলাম একদিন বিদ্যুদ্দীপ্ত এক লহমায় অরণ্যের গাঢ় নীল-কালো-সবুজ নীরব তমসায় রৌদ্র কি জ্যোৎস্নার মতো জ্বলমান ছুটন্ত তোমাকে। কিন্তু রিনা, তুমি তো জানোই প্রাণী ও উদ্ভিদ নিয়ে যে অরণ্য, যে প্রকৃতি, তা বৈ আমি অন্য কোনো হ্রদে জলপান কখনো করি না। তোমারই সন্ধানে আজো সমস্ত অরণ্য ঘুরে কেটে যায় রাত্রিদিন স্বপ্নবিদ্ধ চোখ নিয়ে সুন্দরবনের হরিণ ॥    

শ্রেষ্ঠ কবিতা বই থেকে


তুমি


বিতরিত হয়ে আছ আধেক পাথরে তুমি আধেক উড্ডীন কোনো পরির পাখায় ॥  
[প্রকীর্ণ কবিতা

ঘোড়া ৩


তোমাকে বহন করে চলি, ভিতরে আমার। অনেক দুঃখের দিনে তুমি এক সূর্য হয়ে ওঠো— সুগোল, নিটোল, ধ্রুব। বাতাসের সিল্কের জামার ভিতরে তোমার অগ্নি উজ্জ্বলন্ত, শান্ত, অবিরত। গোল আস্তাবল থেকে তুমি দীর্ঘ উড়ে যাও, ঘোড়া, চাঁদের উদ্দেশে চাঁদ, তুমি যুক্ত, যৌক্তিকতাহীন, বস্তুকে আমূল ভেদ করে ঐ নীলিমায় ওড়া, বিদেশে উড়ন্ত তুমি, সিংহাসনে আকাশে আসীন। রাত্রির গর্তের সামনে হুমড়ি খেয়ে প’ড়ো না কিছুতে। দিনের খাদের ঠিক কিনারায় চলো কাছ ঘেঁষে। উড়ে-উড়ে চলো তুমি দিল-খোলা প্রান্তর, নগর। তোমার পাটকিলে সিল্ক জ্বলে ওঠে রোমশ বিদ্যুতে। তোমার কেশর অগ্নি সপ্তর্ষির গায়ে গিয়ে মেশে। তোমার খুরের শব্দে ফেটে যায় মর্মর পাথর ॥  
[প্রকীর্ণ কবিতা
 
সংযোজন :  আরো বারো : আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতাগুচ্ছ
সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা