প্রথম দশকের অগ্রগণ্য কবি জাকির জাফরান। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। অতি সম্প্রতি বইটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের প্রস্তুতিকালে পরস্পরের উদ্যোগে এই কাব্যের পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে বিভিন্ন লেখকের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিল।
আমাদের আবেদনে সাড়া দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান, কবি শামীম রেজা, কবি মতিন রায়হান, কবি কাজী নাসির মামুন, গল্পকার নাহিদা আশরাফী, প্রাবন্ধিক কুদরত-ই-হুদা, কবি মোস্তফা হামেদী ও কবি হাসান রোবায়েত। বইটির ব্লার্ব লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ।
এদের সবার কাছেই আমরা কৃতজ্ঞ। সেইসব পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা নিয়ে আমাদের এ আয়োজন। তবে শুরুতেই থাকছে পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু কবিতা...
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়
৬. গায়ে যদি মাখা যেত আমলকী বনের সবুজ! স্বর্ণনিদ্রা থেকে জেগে, শোনো, তোমার শরীর থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নামা আমলকী খাই আজ রাতে। জেনেছি শিকারকালে বাঘ এক আদিম রহস্যে লিপ্ত হয় হরিণের সাথে। নিদ্রিত নারীর পাশে বিষাদের দাঁত নিয়ে জেগে আছে অগ্নি যে-পুরুষ, হেলেঞ্চার রসে ডুবে আছে তার অনাঘ্রাত হাত। ধানের আড়ালে, রাতে, চুমুকেই নবান্ন ভাবে সে, চন্দ্রিমাট্রামের নিচে পিষ্ট হতে সেও তো ছুটে যায় সুপারিবাগানে। নারীর মুখই তার পানশালা— কখনও যেখান থেকে ফেরে না কোনোই চন্দ্রালোক। অনাদৃত নাভিমূলে দেখ ঝিঙে ফুলের উচ্ছ্বাস— ছায়াবতী, করতলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে এক দুরন্ত পায়রা, তাকে নখ দিয়ে কৃষিতে জাগাও।
৮. বেদনার বাঁকা পথে আমি হাঁটি এ তনাই নিয়ে মাছের পেটের নীল আঁশটে জ্যোৎস্নায় চলো যাই, ইউনুস নবি যেখানে ঘুমায়—সেই চন্দ্রিমাগহ্বরে কৃষির অনন্ত ফাঁদ পাতা আছে কি না দেখে আসি। রাতভর জেগে যারা ঘরে ঘরে নতুন ধানের কুচকাওয়াজ দেখে, আর ভোর হলে মিশে যায় জোয়ালের জলে, মৃত্যু হলেও কাফনের ফাঁক দিয়ে যারা খুঁজে ফেরে কোনো শান্ত রিক্ত সরলার মুখ, তাদের পায়ের নিচে রাখি সব নিশিন্দা-কবিতা। নিয়তির গোপন পৃষ্ঠায় ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে তাদের নিয়েই ভাবি, শীতলপাটিতে ঢেকে রাখি তাদের প্রণয়। বহু উপদ্রুত পথ হেঁটে এসে আনত হৃদয় নিয়ে কামারের পায়ের কাছে বসি— মুক্তির আকাশ দেখি ছড়িয়ে রয়েছে তার পিঠে।
২১. ফুল আর খিলি হাতে বসে আছি, অভিষেক দাও। শখের হাঁড়িতে রাখা বড়ি, সবুজ রুমাল আর আলপনা আঁকা জলচৌকি, শীতলপাটিতে রাখা লাজুক কস্তূরী কিছু—তুমি শুধু অভিষেক দাও। শরীরে ময়ূরপুচ্ছ দিনে দিনে করেছি ধারণ, ধরো আমি গিরিনাথ, উঁচা মেঘ আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে শত শত নীলাস্ত্র আমার করতলে, ধরো আমি একতিরে একুশটি ব্যাঘ্র শিকার করেছি, ধরো পটে এঁকেছি তোমার মুখ, পটুয়াগীতিতে আমি অনন্ত ওস্তাদ—এই আমাকেই তুমি, নারী, আজ অভিষেক দাও, গ্রাহ্য করো বিনীত প্রবেশ। সাধনার পুচ্ছ নাও, উঁচা উঁচা মেঘের মৈথুন সবই নাও, দাও শুধু কিছু গীতি, নিশীথ-আপেল খাওয়ার উপদেশ—দুজনে দুপাশ ফেরা রাতে কুহু বলে চিমটি কাটার আশ্চর্য কৌশল তুমি দাও।
৩১. আমার জীয়ন যায় বৃষ্টিবনে ইক্ষু দেখে দেখে। মাগুর মাছের জলে সারারাত জ্যোৎস্না পড়ে যদি, যদি কিছু পুঁইশাক অনন্ত শ্রাবণে চোখ তোলে বৃষ্টিরত পুরুষের দিকে, সবজিক্ষেতের আলো পায়ে মেখে আমি তবে তোমার দিকেই ছুটে যাব, তুমি কি প্রস্তুত? এই চোখে আবে-হায়াতের ঝরনা, কোনো-এক অন্ধকারে এক শস্যের গুহার দিকে আমি ঠিকই বাড়াব ঠোঁট, ধান্য, তুমি কি প্রস্তুত? প্রেমের কলস ভরা প্রত্যাখ্যানে আর জিভ-কাটা শিশিরছুরিতে। আজ এই দয়ার শরীর নিয়ে নিদয়া প্রহরে হাঁটি, চিটা ধানের ব্যর্থতা বুকে দেখে যাই আনমাঠে দোল খায় আমনের মন। পক্ষীমাতা জেনে রাখো বীজ যদি দুঃখ পায় তবে— আমি খনা, তোমার ভবিষ্যে দেখি কৃষির রোদন।
৪৪. জলের জিপসি তুমি রোদেলা বেদেনি; কালো টিপ, লাল আঙ্গি, উঁচা উঁচা খোঁপা, তাতে জবাফুল গুঁজা, মাছের কাঁটার মালা ঝিরিঝিরি উড়ছে বাতাসে, বাজুতে বিধ্বস্ত হয় বুঝি ধনেশ পাখিরা, ওগো, হৃদয়ে লাগাও শিঙা যত বিষ নেমে যাক আজ— মহিষের শিঙার চেয়েও কালো এই অন্তরের বিষ। শিয়ালের হাড় দিয়ে করো চিকিৎসা পৃথিবীর গোখরা সাপের তেল করো মালিশ স্বামীর ঠান্ডা অলস উরাতে, কিংবা তাকে দাও সোহাগী তাবিজ। কতটা ঝিনুক বিক্রি হলে রজঃস্বলা হবে নদী? নাগিনী স্বভাবে হোক সার্থক তোমার গাওয়াল— বানে ভাসা নদীতীরে থৈ থৈ চাঁদের মদিরা খাও, নিরলে নৌকাতে টেনে নাও নীল বেগানা পুরুষ তার ব্যথা উপশম করো পাঁজরে বাঘের থাবায়।
৬৬. হেঁটে যায় এক দিল-দরিয়া মানুষ, তার পথে সুদূরতা পড়ে থাকে, রতিক্লান্ত মহাকাল জাগে, ঘাস হয়ে জেগে থাকে আরো কিছু মানুষ-রতন। সাঁই, সুদূরের বাণী দাও, প্রিয়তম বোবা হয়ে আমি যেন কথা বলি আজ শ্রাবণজলের সাথে, প্রিয়তম অন্ধ হয়ে যেন দেখি শরতের মুখ। দেহের ভিতরে সুপ্ত কোন জায়গাটি বৃন্দাবন আর কোন অঙ্গের গভীরে আছে প্রেমের মোকাম? বলো কী প্রকারে এক ময়ূর ঘুমিয়ে আছে মনে আর ত্রিলোকের সব বেদনা বিবৃত হয়ে আছে রমণীর কটিদেশে? মনে হয় আমিই ব্রহ্মাণ্ড, এই ধান-ভানা নারী যেন খরস্রোতা মহাকাল। যেদিকে শ্যামলা নারী ধান্য পায়ে নিত্য হেঁটে যায়, ওগো সাঁই, প্রেমের মোকাম জানি সেই মথুরায়।
নির্মলেন্দু গুণ
[ব্লার্ব থেকে
কবি জাকির জাফরানের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ 'জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়' প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকাশিতব্য এই কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পাঠ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, জাকির জাফরান শুধুই কবি নন, তিনি খুবই শক্তিশালী একজন কবি। কাব্যগ্রন্থের জন্য নির্বাচিত নাম—'জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়' তাঁর কল্পনাশক্তির পারদর্শিতাকে প্রকাশ করে।
জ্যোৎস্নাকে বাংলা কবিতায় বহুবার বহুভাবে ব্যবহৃত হতে আমরা দেখেছি, কিন্তু জ্যোৎস্নাকে সপ্রাণ-সম্প্রদায় হিসেবে, তাঁর আগে কোনো কবিকে ভাবতে দেখেছি, এমনটি মনে পড়ছে না। বাংলা কবিতার ইতিহাসে ‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’ এমন একটি কবিতার বই যেখানে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, লোকজ ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাংলার রাজনৈতিক কাঠামো, বাঙালির বীরত্বগাথা ও রাষ্ট্রচিন্তা, চর্যাপদের আবহ, গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি বাংলার আলোকস্তম্ভতূল্য ব্যক্তিদের নাম ও কর্ম, বাংলার কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের আবহমান বেদনা, প্রেমের সঙ্গে কৃষি ও মিথের আশ্চর্য মিথস্ক্রিয়া, ধর্ম, সুফিবাদ ও বাউলিয়ানা, সর্বোপরি শক্তি ও সৃজনের প্রতীক এক নারী চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে নারীজাগরণের স্বপ্নের ওপর ক্রমাগত জ্যোৎস্নার প্রক্ষেপণ—এই সবকটি বিষয়ের প্রাণময় সম্মিলন ঘটেছে মাত্র একটি কবিতাগ্রন্থে।
জাকির জাফরান কৃষককুলের আনন্দ-বেদনার ছবি যে দক্ষতার সঙ্গে বাণীবদ্ধ করেছেন—যেসব স্মরণযোগ্য চিত্রকল্প তিনি রচনা করেছেন, আমার কাছে তা অভিনব এবং খুবই আনন্দময় বলে মনে হয়েছে। তার কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি—
‘যেদিকে শ্যামলা নারী ধান্য পায়ে নিত্য হেঁটে যায়, ওগো সাঁই, প্রেমের মোকাম জানি সেই মথুরায়।’
প্রায়বিলুপ্ত আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডারকে কাব্যভাষায় যেভাবে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত সংযুক্তি ঘটিয়েছেন তা রীতিমতো বিস্ময় দাবি করে। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ৪৪-৪৬, ৪৯-৫১, ৫৪, ৫৫ সংখ্যক কবিতাগুলো। সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম, ছয় দফা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এক অনিন্দ্য চিত্রকল্পও আমি খুঁজে পেলাম তার কাব্যভাষায়।
আমি জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের কবি জাকির জাফরানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আপনার জয় হোক।
১৮/১০/২০
পাপড়ি রহমান
জ্যোৎস্নাভুক কবির জার্নাল
সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-এ কবি জাকির জাফরান নিজেই যেন জোনাকির ন্যায় রহস্যময় অথচ তীক্ষ্ণ আলোর উৎস হয়ে উঠেছেন এবং তাঁর ‘সমস্ত হৃৎপিণ্ড’ দয়িতার হাতে তুলে দিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। কবির এই যাত্রাপথ সুদীর্ঘ, স্বতন্ত্র ও প্রণয়ের আর্তিতে ভরপুর। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের ৬৬ সনেটের [কিছু সনেট নির্ধারিত ফর্মের বাইরে অবস্থান নিয়েছে। এক আনন্দদায়ক পরিভ্রমণে কবি আপনাকে অলক্ষ্যেই সঙ্গী করে নেবেন।
চাঁদ ও জ্যোৎস্নাকে তুমুলভাবে দেখার ও অনুভব করবার জন্য রীতিমতো মচ্ছবের আয়োজন করে বসেছেন এক নাগরিক কৃষক-কবি। ফলে চিরচেনা বাঁকানো চাঁদটিকেই কলমের ধারে করে তুলেছেন লাঙলের ফলা!
বেদনার বাঁকা পথে হাঁটি এ তনাই নিয়ে মাছের পেটের নীল আঁশটে জ্যোৎস্নায় চল যাই, ইউনুস নবি যেখানে ঘুমায়—চন্দ্রিমাগহ্ববরে কৃষির অনন্ত ফাঁদ আছে কিনা দেখে আসি।
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কৃষিকাজ জানা এক নিপুণ কৃষকের সদা আলোর অন্বেষণ। যিনি জানেন জুম-ফসল ঘরে তোলার কায়দা, জানেন ভাত ও ভুট্টার কুহেলি এবং চিটাধানের ব্যর্থতা।
শ্রীমতি রাধিকা চলে গেলেও তার গন্ধ থেকে যায় বাঁশির ভিতরে আমি যে বাতাস হয়ে বেঁচে থাকি— জানে না বাঁশরি যদি পিনোনে বিজুরি চমকায়, গিরিকান্ত এই জুম-ফসলের আর্তরব যদি মিশে যায় দেহে, কলপাতা ভরে কিছু ফুল দিও পানিতে ভাসিয়ে [সনেট—২২
কবি জাকির জাফরান জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ে নারী আর প্রকৃতির নিবিড় সম্মিলন ঘটিয়েছেন।
জাকির জাফরানকে জানাই হার্দিক অভিনন্দন।
শামীম রেজা
ভূমিস্বর্গের কবিতার সেবাদাস আমি, স্বেচ্ছাসেবক চিত্রময়তার। জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-এর ৬৬টি কবিতা যেন ভূমিস্বর্গের হৃদয়ের অকৃত্রিম বয়ান। আর্যাবর্তের বাইরে শশাঙ্ক, বারো ভূঁইয়া আর মুজিবের হৃদপিণ্ড ধোয়া মেঠোগন্ধমাখা এই বদ্বীপের নিবিড় সংস্কৃতির একান্ত পদাবলিই যেন এই কবিতার অন্তর। ইউরোকেন্দ্রিক তথাকথিত আধুনিকতার নামে উপনিবেশিত মস্তিষ্কে মননজারিত উপনিবেশবিরোধী পদাবলি নয় এই চতুর্দশপদী; নয় অহেতু আমদানি করা বোদলেয়ারিয় ক্লেদ-কদর্য-কপটতার উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা। এখানে যেমন একাকার হয়ে আছে এই মহাজনপদের পুরাণ-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, তেমনি আছে বাইরে থেকে আসা একমাত্র সেমিটিক ধর্ম যা সুফীবাদী আধ্যাত্মিকতায় কখনো কখনো যেন হাফিজিয় দেওয়ানের মত হয়ে উঠতে চায়। কবি সাধারণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় নিজেকে দলিতের তল্পিবাহক হিসেবে নামজারি করেন তাঁর কবিতায়। তেমনি দেখি ভাটি অঞ্চলের বিশেষ করে হাওরের হৃদয়ামৃতের খোঁজ; অপরদিকে এই জনপদের চর্যাগীতি, ধামাইল নাচ, ভূমি-বাউল, ডমরু সঙ্গীত, সুফিদের সামা, পটুয়াগীতির সুর, বাজতে বাজতে কানে বাজে অসাম্প্রদায়িক সম্রাট আকবর, হিউয়েন সাঙ, কুসুমকুমারী দেবী, বেগম রোকেয়া, মজনু, ভবানী, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, শরিয়তউল্লা, মুহসিন হয়ে সমকালীন রাজনীতির কণ্ঠ একাকার জাকিরের কবিতায়। সমকালকে স্মরণে রেখে চিরকালের পথযাত্রী কবি জাকির জাফরানকে অভিবাদন।
মতিন রায়হান
‘জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়’। নামটিতেই রয়েছে এক ধরনের চমক। কবি জাকির জাফরানের প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম এটি। প্রকৃতির একটি নান্দনিক বিষয় ‘জ্যোৎস্না’। এর মধ্যে প্রাণের আরোপ কেন? পারসোনিফিকেশন বা ব্যক্তিত্ব আরোপের নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে। পাণ্ডুলিপির কবিতাগুলো পড়তে পড়তে এর অন্তর ও বহিঃসৌন্দর্য যে কোনো পাঠককেই ভাবনার অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। পুরো পাণ্ডুলিপিটি যেন একটিই দীর্ঘ কবিতা, অবশ্য নম্বর চিহ্নিত (১-৬৬) করে পাঠান্তে পাঠককে একটু দাঁড়াবার ফুরসত দেয়া হয়েছে—যেখানে দাঁড়িয়ে নিষ্ঠ পাঠক দেখবেন কবির স্বপ্নময় নির্মিতি অর্থাৎ স্বদেশ, স্বসমাজ, নিজস্ব ভুগোল, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নবরূপায়ণ। প্রিয় পাঠক, চলুন, পাণ্ডুলিপির প্রথম কবিতাটিতেই চোখ রাখি—
বেহালার ব্যথা এল, দোচালা ধানের ঘরে এসে প্রজননের সংকেত রেখে গেল দুইটি জোনাকি। দীর্ঘ হতে হতে দুই খণ্ড মেঘ মিশেছে হাওরে— এখান থেকেই গল্প শুরু হোক সেই দুহিতার, যার হাতে আমি তুলে দিয়েছি সকল হৃৎপিণ্ড, দিয়েছি উজ্জ্বল শিরস্ত্রাণ আর জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়। পৃথিবীর প্রথম সেই জ্যোৎস্নাকান্তি যারা দেখেছিল, তোমার হাতেই আমি স্বপ্নপোড়া তাদের করোটি তুলে দেবো, তুমি আজ গোত্রপ্রধান তাদের, বলো, কে ছিল প্রথম নারী খোঁপায় যে গুঁজেছিল ফুল! দিঘিজলে স্মিত মুখ দেখে নিজেকে সে ভেবেছিল অনন্তবিহারী আসমান—তার চরণে সালাম। শরীর নিয়তি নয় নারী, জাগো, চোখ তুলে দেখ— বাউরি বাতাস বয় হৃৎপিণ্ডে, বয় প্রত্নস্মৃতি।
প্রিয় পাঠক, কী পেলেন পাঠশেষে? নিশ্চয়ই অপ্রচল, অদেখা এক অভিনতুন কাব্যবিশ্ব! কী নেই এই কবিতায়? প্রেম, প্রকৃতি, পুরাণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য—যেন স্বপ্নময়তায় সব একাকার হয়ে আছে। অভিনতুন শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প, অনুপ্রাসের বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগকৌশল কবিতাগুলোতে এমন সব ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে, যার সঙ্গে পাঠক পূর্ব-পরিচিত না হলেও দীর্ঘকালের কাব্যপাঠের আলোকে খুবই চেনা, বলতে পারি, চিরচেনা।
দশক বিবেচনায় কবি জাকির জাফরানের অবস্থান একুশ শতকের প্রথম দশক অর্থাৎ বহুল উচ্চারিত শূন্যের দশক। পাঠ-অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জাকির জাফরানের কবিতা তাঁর সমকালীন কবিবন্ধুদের কবিদের কবিতা থেকে অনেকটাই আলাদা অর্থাৎ স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। জাকির কবিতায় সহজ, অন্তরঙ্গ ও হৃদয়সংবেদী। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় তো একেবারেই অন্যরকম উপস্থাপনা। জোর দিয়েই বলতে পারি, কবির দু’দশকের নিরবচ্ছিন্ন পথচলায় এ কাব্যগ্রন্থটি মাইলফলক কাব্যশস্য। আর এ কথা কবির ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে যতটা সত্য, তার চেয়েও অধিক সত্য সমকালীন বাংলা কবিতায়ও। জাকির জাফরানের কবিতার জয় অবশ্যম্ভাবী।
১৫.১১.২০২০
কাজী নাসির মামুন
জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ
আকীর্ণ জ্যোৎস্নায় দয়িতার প্রণয়প্রদীপ্ত স্মৃতির আকর জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়। দয়িতাকে ঘিরে কিছু আহ্বান, প্রস্তাবনা এবং শরীরবৃত্তীয় অনুভবের দ্বিচারিতা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই কাব্যগ্রন্থ। প্রথম দিকের সনেটগুলো পড়ে এমন ধারণা হবে পাঠকের। 'দ্বিচারিতা' বলেছি, কেননা যদিও কবি লিখেন, 'শরীর নিয়তি নয়', তবু শরীরের দিকেই তার কামজ অনুভূতি অভিমুখ তৈরি করে রাখে। 'প্রেমিকার-স্তন-খেয়ে-অন্ধ হওয়া-মাতাল মানুষ' 'যৌন আস্ফালনের মতো' নিভে যাওয়া চাঁদের আলোয় 'পাটক্ষেতে পড়ে থাকা চুমুগুলো'র স্মৃতি নিয়ে তড়পায়। তিনি লিখেন,'নিরলে নৌকাতে টেনে নাও নীল বেগানা পুরুষ/তার ব্যথা উপশম করো পাঁজরে বাঘের থাবায়'। এই টোন গীতিধর্মিতাসহ বেশ পরিচিত লাগে আমাদের। এভাবেই অগ্রজ কবিদের স্বর প্রেরণা হিসেবে নিজের ভিতরে জারিত করে তিনি দয়িতাকে হাজির করেন প্রথমত যৌনসঙ্গী হিশেবে। কিন্তু যৌনতায় তার কবিতা স্থিত হয় না। যেমন অগ্রজ কবিদের স্বরের প্রভাবের মধ্যেই সুরাহা নেই তার কাব্যের উচ্চাভিলাষী অভিব্যক্তির। নানা ব্যঞ্জনে অভিষিক্ত হতে হতে প্রেম আর মুখ্য ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় না তার কবিতায়। ফলে মনে হয় প্রেম, যৌনতা এবং প্রভাব এই ত্রিমাত্রিক প্রকল্পের সমন্বয়ে তিনি মূলত তার অভিনবত্বকে জারি রাখতে চান ইতিহাসচেতনার সম্প্রসারিত রূপের মধ্য দিয়ে। তার ইতিহাসচেতনা জাতীয়তাবোধ-তাড়িত। প্রেম ও যৌনতা একটা নান্দনিক ভণিতামাত্র। এই দুই ভাববস্তু তার কবিতার লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য। লক্ষ্য হলো জাতীয়তাবোধ-তাড়িত ইতিহাসচেতনাকে তুমুল বিস্তৃতির মধ্যে জারি রেখে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-কে মহাকাব্যিক দ্যোতনা দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই তিনি অতীতচারী পরিব্রাজকের মতো মননের পায়ে হেঁটেছেন প্রাচীন গৌরবের পথে পথে। তার কবি-হৃদয় ভেসে গেছে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত। তার এই কাব্যগ্রন্থে হিউয়েন সাঙ, ইবনে বতুতা, শরীয়তুল্লাহ, ফকির মজনু শাহ, সন্ন্যাসীবিদ্রোহ, পলাশীর যুদ্ধসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণায় বাঙালির প্রাচীন ইতিহাস যেখানে গৌরবান্বিত সেই প্রেক্ষাপট এবং এমন প্রক্ষাপটের পেছনের মহীরুহ মানুষদের কথা স্মরণে আসে আমাদের। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, হাজী মোহসিন কেউ বাদ পড়েন নি। যেন কাব্যের ভিতর দিয়ে ইতিহাসের অভিযোজন তার একটি সচেত প্রয়াস। তিনি বরেন্দ্র ভূমির কথা বলেন। সমতট, গঙ্গারিডি, হরপ্পা, বঙ্গ অববাহিকা এবং ঢেঁকিছাঁটা চালের প্রসঙ্গে বলেন। এভাবেই তুলে আনতে চান 'অতলান্ত বাংলার হারানো মুখ'। তির ছুড়তে গেলে তিরের ছিলা টেনে পেছনে আনতে হয় প্রথমত। তারপর তির সুতীব্র গতি নিয়ে লক্ষ্যস্থলের দিকে এগোয়। এই গ্রন্থে জাকির জাফরানের ইতিহাসের বয়নপ্রক্রিয়া অনেকটা সেরকম। কাজেই সোনালি কাবিন বা রূপসী বাংলা যেখানে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে, সেখানে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় বিস্তারিত। সোনালি কাবিন যেখানে শেষ সেখান থেকেই জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় নিকটেতিহাস দ্বারা অভিযোজিত। তাই তিনি বলেন : বৃক্ষতলে পড়ে আছে কাম আর দেশ-বিভাজন। চিত্রকল্পের অভিনবত্বে উঠে আসে ভাষা-আন্দোলন, যখন লিখেন :
দেখি যুক্তাক্ষর হয়ে দুটি লাশ পড়ে আছে পাশাপাশি... তারা কি সালাম ও জব্বার!! উত্তাল জমজ ফুসফুস?
কিন্তু এই চমৎকারিত্ব সব জায়গায় বজায় থাকে নি। তিনি ছয় দফার প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক মূল্যবোধ প্রাধান্য দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শ্রদ্ধার্ঘ্যে সমুন্নত তার কাব্যে। ইতিহাসের নিরেট বর্ণনায় তিনি কোথাও কোথাও কবিতাকে ছাড় দিয়েছেন। চেতনার বাহুবলে ভাবালুতায় ভরে গেছে কাব্যের শিল্পিত সজাগতা। যদিও তিনি নিজেকে চেনান 'দলিতের তল্পিবাহক' বলে, কোথাও তাকে দলিতের একজন বলে মনে হয় না। মনে হয় তুমুল ভব্যতা তাকে মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত করেছে। করেছে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ। এই দায়বোধ তাকে মাটিবর্তী করেছে। কিন্তু তিনি মাটিসংলগ্ন নন। নন কাদামাখা নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি। কিন্তু মাটিতে শরীর মেশাতে তার কোনো ছুঁৎমার্গ নেই। জীবনানন্দ, রাহমান, রুদ্র, সৈয়দ হক অবলীলায় চলে আসে তার কবিতায়। তার প্রেমিকা রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রিয়। তার নিজের 'টেবিলে রাখা পায়রার মাংস আর মদ'। কাজেই লোকজ শব্দের রগরগে, স্ফূর্ত শব্দের কাঁচামাল নয়, তার ভাষা এবং চিত্রকল্পের উপস্থাপনে একটা পরিশীলন দানা বাধে। আঙ্গিক-কৌশলে থাকে নির্মিতির দিকে ঝোঁক। এই প্রবণতা আঠারো মাত্রার এই সনেটগুলোয় তাকে ভিন্নতাও দিয়েছে বহুলাংশে। আর যারা আমাদের ইতিহাস গড়েছেন, বঙ্গীয় চেতনার বেদিমূলে অর্ঘ্য পান এখনো, তারা সবাই মিলেই যেন তার কাব্যে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়। আমরা তাদের আলো নিয়ে গৌরবে বেঁচে আছি। জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কাব্যগ্রন্থে ভাবের এই প্রতীকী ব্যঞ্জনা যেখানে যতটা পরাবাস্তব, সেখানে তত বেশি পরিতৃপ্তি আমার। তবু জাতীয়তাবোধের শিল্পিত সফলতা কতদূর গেল, তার হিশাব মহাকালে। সেখানে আমার তৃপ্তিবোধ ভূমিকা রাখবে না একটুও।
কুদরত-ই-হুদা
জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির ছন্দের গাঁথুনি থেকে শুরু করে শব্দ ও অনুষঙ্গ চয়নের ধরনের মধ্যে জায়গায় জায়গায় আল মাহমুদের স্মৃতি জাগে। কিন্তু এগুলো আল মাহমুদের কবিতার অনুবর্তন নয়, এক্সটেনশন। এক্সটেনশনই হবার কথা। আল মাহমুদের চার দশক পরের একজন কবির কণ্ঠে একই কবিতার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে চাইব কেন! জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়—সোনালি কাবিন-এর সহোদর, কিন্তু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের ছোটভাই। জাফরান আল মাহমুদের অকর্ষিত জমিনের কর্ষণদার। আল মাহমুদের সোনালি কাবিন ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী প্রজেক্টের আওতায় পূর্ব বাংলার যৌথ জীবনের ব্যাকরণ নির্মাণ করেছিল। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বসে জাফরানের আল মাহমুদের মতো ষাটের দশকীয় দাহ্য জাতীয়তাবাদী চেতনার দায় ছিল না। তবু তিনি জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের ফাঁদে পা দিয়েছেন। এজন্য তাঁকে কিছু কবিতায় কবিত্বের সাথে অপ্রয়োজনীয় আপসও কম করতে হয় নি! তবু জাফরান যখন চাঁদ দেখেন তখন তাঁর ব্যক্তিগত গোপন কান্নাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন নি। তিনি ‘ধানকলের’ মধ্যে শুনতে পেয়েছেন ‘হাহাকার’ আর ‘হলুদ খামের মধ্যে কান্না’ও তাঁর অশ্রুত থাকে নি। কবি তিনি অনুভব করেছেন একজন কবি ‘সারারাত পিষ্ট হয় চাঁদের চাকায়’। এইসব ভাষা আর বোধ জাফরানের। এখানে আল মাহমুদ তাঁর কিছু নন। কৌমের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ, কিংবদন্তি, জল-জঙ্গল-কাদামাটিলীন জীবনের কথা যখন বলেন তখনও নরম মাটির ফাঁকে ফাঁকে ধানের চারার গুচ্ছ গুঁজে দেয়ার মতো করে বলতে থাকেন এইরকম চরণ—‘গোপন কান্নার এক ঘর থেকে দেখা গেল চাঁদ’।
সমষ্টির মধ্যে ব্যক্তির রুচি, হাহাকার আর চৈতন্যের সুরটি জারি রেখেই জাফরান তাঁর ‘আধুনিক’ মনস্বিতাটা চারিয়ে দিয়ে এক ফাঁকে বলে রাখেন, ‘গায়ে যদি মাখা যেত আমলকী বনের সবুজ!/স্বর্ণনিদ্রা থেকে জেগে শোনো, তোমার শরীর থেকে/গড়িয়ে গড়িয়ে নামা আমলকীটি খাই আজ রাতে’। এখানেই জাকির জাফরান আল মাহমুদের ব্যক্তিত্ববান ছোটভাইটি। সমষ্টিকে ধরার সর্ব-ইন্দ্রিয়-সজাগিয়া বর্ণনার কথা বাদ দিয়ে শুধু এটুকুই বলা যথেষ্ট হবে যে, জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-এর কবি ‘কৃষি-বিধুনিত’ দিনযাপন, সজনীগাছ, শসাক্ষেত, তাঁতপল্লির কলরোল, বঙ্গ অববাহিকার জলমহাল থেকেই উঠে এসেছেন। হাওড়ের ঘ্রাণ আর পানির খলবল তাঁর কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কাব্যে নিজের অবস্থানকে তিনি ঘোষণা করেছেন এভাবে—‘জোয়ালের ক্ষতে জ্বলা/নিযুত নক্ষত্র দেখে দেখে আজ জেগে থাকে কারা।/আমি তো তাদেরই লোক। তাদের মাথায় দেব বলে/সোনালু ধানের শিষ ছিঁড়ে আজ বানাই মুকুট,/পায়ের পঙ্কজ ধোব বলে আনি স্বর্গের শরাব।/আমি দলিতের তল্পিবাহক, শুনছ হে ডাহুক?’ কারো প্রভাবের দোহাই পেড়ে এই কাব্যধারাকে বিচার করা ঢাকাই রোগ থেকে বের হয়ে এসে এখানেই বলা দরকার, সহজ ও প্রকৃত শক্তিশালী কবিত্ব আর একটা খাঁটি বাঙ্গাল চৈতন্য ছাড়া জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় লেখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের যৌথজীবন আর জলজঙ্গলের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসা পুববাংলার আপনভাই জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়কে স্বাগতম।
নাহিদা আশরাফী
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় : এক অলৌকিক যাত্রার বয়ান
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কত বার পড়া হয়েছে? লিখতে বসে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি। একবার? দু’বার? না, কম করে হলেও পাঁচবার। তিনবার পড়েছি প্রকাশক হিশেবে, দু'বার পড়েছি পাঠক হিশেবে। প্রশ্ন হতে পারে, পাঠক ও প্রকাশক হিশেবে পড়ার আলাদা মাজেজা কী? আছে তো। একটাতে কিঞ্চিৎ বাণিজ্যে বসতির চিন্তা। অন্যটিতে বৈরাগ্য বৈভব সাথে নিয়ে অন্তর-প্রদক্ষিণ।
জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় পড়েছি গর্ব ও হাহাকার নিয়ে। সমস্তের ব্যাখ্যা স্বল্পে অসম্ভব। ‘আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার’—কিন্তু কোথায় সে সম্ভার? কেন কবিতায় এতদিনেও মেলে নি এমন শব্দসঙ্গম? হাহাকার ছিল এ কারণেই। হঠাৎই জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের কবি যেন তার জ্যোৎস্নার তির হাতে দাঁড়ালেন কবিতার মণ্ডপে। ‘জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?’—এমন বীরত্বেই যেন কবিতার মোহনীয় আগুনে হাত বাড়িয়ে দিলেন। শুধু যে হাত বাড়ালেন এমন নয়। এরকম হাত তো অনেকেই বাড়িয়েছেন; আগুন নিয়ে খেলেছেন, ডানা পুড়িয়েছেন। কিন্তু নিজেকে আগুনে উৎসর্গ করে কাব্যের সেই আগুনের সাথেই আগুন সাক্ষী করে সাত পাকে সংসার বেঁধেছেন এই জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের কবি। আমরা পেলাম গোটা বাংলার শৌর্য, বীর্য, প্রেম, অহংকার, ঐতিহ্য ও পরম্পারার এক অনির্বচনীয় চিত্রসুধা। আঙ্গিকে এক পৌরাণিক দেহবল্লরি, অনুপ্রাসে এক শ্যামার হৃৎকম্পন, ভাব ও ভাষায় অরুণ্যের গভীরতা, চিত্রকল্পে এক মায়াহরিণী। এই তো জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়।
বাগানে হাজারো বৃক্ষের ছায়ার দিকে তাকালে ছেঁড়াছেঁড়া ছায়ায় বোঝা মুশকিল কোনটি কোন বৃক্ষের ছায়া। শুধুমাত্র সুপারি গাছের ছায়াই দীর্ঘ, একক আর স্বকীয়। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় থেকে ফিরে আমার অন্তর-উৎসজাত অনুভবটুকুই জানালাম মাত্র। কবির এই যাত্রা জারি থাক।
মোস্তফা হামেদী
সমষ্টির ময়দানে : জাকির জাফরানের জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় পাঠের ভূমিকা
‘পরিচয়’ খোঁজার রাজনীতি কবিতার এক অনন্য দিক। যেহেতু কবিতা কথা বলে সংকেত-রূপকে, শব্দের প্রিজমে ধরা হয় বৃহৎ অবয়ব, গোপন ভাব-অভিসন্ধি-অভিলাষ, সেহেতু কোনো ভাষাগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক ক্রিয়াকর্মের, ঐতিহাসিক উৎপাদনের নানা চূর্ণবিচূর্ণ জুতসইভাবে ধরা যায় কবিতায়। জাকির জাফরান এই কাজটিই করতে চেয়েছেন স্বভাবের বাইরে এসে। 'স্বভাব' শব্দটা খুব আলপটকা এখানে আসে নি। বেশ জোর আরোপ করেই শব্দটা উল্লেখ করতে চাই জাকির প্রসঙ্গে। কেননা উপর্যুপরি চারটি কবিতাগ্রন্থে কবি যে ভাবলোকের বাসিন্দা হিশাবে নিজেকে কবুল করেছেন, এই কাব্যের অবস্থান তার থেকে বেশ দূরে। ব্যক্তিগততার চৌহদ্দি ছেড়ে কবি যেন পা ফেলতে চাইছেন সমষ্টির ময়দানে।
ফর্ম হিশাবে জাকির জাফরান বেছে নিয়েছেন সনেটের চৌদ্দ পদের আঠারো মাত্রার সংহতিকে। একটা ফ্রেমের মধ্যে এঁটেছেন বহু বিস্তৃত প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ৷
এই কাব্যে এসে জাকির জাফরান একটা সিলসিলার মধ্যে এসে নিজেকে খুঁজতে চেয়েছেন। তাঁর বিষয়-বিবেচনা সেই জিনিসটা স্পষ্টভাবেই হাজির করেছে। এটা জাকিরের একটা প্রগতির দিক বলেই মনে করি। বাংলা কবিতার এই শক্তিশালী ধারা সাম্প্রতিক কালে নতুন রূপ লাভ করতে চলেছে সম্ভবত ‘মানুষ’ নামক বর্গটি পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতাচর্চার হাতিয়ারে পরিণত হওয়ায়। ফলে কবিতা ‘ইউনিফর্ম’ আইডিয়া ও বিষয়ের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে হতে চাইছে ‘লৌকিক’, ‘দেশজ’, ‘সম্প্রদায় বা জাতিগোষ্ঠী-অনুগত’। এটা এক ধরনের নতুন ‘প্রতিরক্ষা নীতি’। অনেক কবিই এই নতুন পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে চলেছেন নিজ নিজ ঢঙে। চেতনে-অবচেতনে জাকির জাফরান সেই প্রচেষ্টারই একজন অংশীদার হয়ে উঠেছেন জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় কাব্যে। বাংলাদেশীয় বাঙালির ‘বাঙালি ও মুসলমান’ সত্তার সহস্রাব্দের জার্নির একটা বিবরণী দিতে চেয়েছেন এই কাব্যে। ‘পরিচয়’ নির্মাণের নতুন আকাঙ্ক্ষার তাগিদে।
রূপশৈলীর দিক থেকে এই কাব্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে বলে মনে করি। কারণ শেষ পর্যন্ত বাংলা কবিতার পাঠক খুঁজতে চায় এক অনির্বচনীয় ভাষা ও বোধের ইশারা। পাঠকের পক্ষপাত জাকিরের দিকে পড়ার মালমশলা এখানে যথেষ্টই আছে। অন্তত সময় সেটা মীমাংসা করে নেবে, এই ভরসায় অপেক্ষা করা যায়।
হাসান রোবায়েত
প্রোজেক্ট ও পোয়েট্রির দ্বন্দ্ব
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিতায় একটা প্রবণতা খুব খেয়াল করার মতো। অনেক কবিই কলকাতামুখিনতা থেকে সরে এসে পূর্ববঙ্গের রূপরসঘন সৌন্দর্য আর ভাষাকে পুলসেরাত ধরে পার হতে চাইছেন কাব্যখাল। সেখানে পোয়েটিক বিউটির চেয়েও তীব্র হয়ে উঠছে প্রোজেক্টভিত্তিক চিন্তা। যার ফলে অধিকাংশ কবিতাই হয়ে উঠছে ক্লান্তিকর রিপোর্টের মতো। অধিকাংশ কবিরই এ ক্ষেত্রে বাহন হলো অক্ষরবৃত্তের ১৪ অথবা ১৮ মাত্রা। যদিও সে বাহন স্বরস্বতীর হংসের মতো আলাদা করে নিতে পারে না দুধ আর পানির পার্থক্যকে, আধার হিশেবে ধারণ করতে প্রায়শই ব্যর্থ হয় স্বরস্বতী-সৌন্দর্যকে, কেবল ফর্ম হয়ে ওঠাই যেন তার চূড়ান্ত খায়েশ। আর আছে জাতীয়তাবাদের জতুগৃহ—ভাবছি, কবে না তাতে আবার আগুন লাগে। যদিও শিবের গীত গাওয়া আমার লক্ষ্য নয়, তবু গীতও তো মাঝেমধ্যে প্রয়োজন হয় আলোচনার খোলশ খুলতে।
পড়ছিলাম শক্তিমান কবি জাকির জাফরান-প্রণীত জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-এর পাণ্ডুলিপি। যেখানে কবি প্রাচীন ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে বৃহৎবঙ্গের নানান উপাদান সংগ্রহ করে ধীরে ধীরে পৌঁছুতে চেয়েছেন সমকালে। তার টেক্সটের ফোকাসে ছিল মূলত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনার দিকে যাত্রা। যে যাত্রার নথি আমরা আগেই পেয়েছিলাম সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাতে, যেখানে তিনি বাংলার আলপথ ধরে হাজার বছর হেঁটে চর্যাপদের অক্ষর, কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম, পালযুগ, বৌদ্ধবিহার, সোনা মসজিদ, বারো ভূঁইয়ার সার্বভৌমত্ব, গীতাঞ্জলি-অগ্নীবীণা, ক্ষুদিরাম-সূর্যসেন, রাষ্ট্রভাষার রাজপথ থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান। জাকির জাফরানের জার্নিও তেমনি এবং অবধারিত ভাবেই তিনি বেছে নিয়েছেন নানান নামপদ, টেক্সট আর ঐতিহাসিকতা। কিন্তু এমন কাব্যের প্রধান শত্রু বোধ হয় পোয়েটিক বিউটি, কারণ কবিতার কঙ্কালে যে সৌন্দর্যচেতনা প্রবাহিত করে তাকে দিতে হয় জীবনের জীয়ন-স্পর্শ, তা মাঝে মধ্যেই হোঁচট খায় জাতীয়তাবাদ আর ইতিহাসের ক্ষমাহীন বাস্তবতায়। সেখানে কবিতা হয়ে ওঠে ঊনপ্রস্তাব মাত্র। এবং কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয় কবিতা নয় বরং প্রাচীন ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ আর বাংলা কবিতার ইতিহাস পাঠ করাতে বাধ্য করেন কবি। এমন না যে এইসব অনুষঙ্গ নিয়ে কবিতা হয় নি, হয়েছে, এবং তা শিল্পোত্তীর্ণভাবেই টিকে আছে বাংলা কবিতায়; যেমন রূপসী বাংলা, সোনালি কাবিন। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-তেও কবি প্রয়োগ করেছেন রূপসী বাংলা ও সোনালি কাবিনের টেকনিক—ঐতিহাসিক নামপদ, টেক্সট এসবের উল্লেখ যেমন আছে রূপসী বাংলায় ও সোনালি কাবিনে তেমনই আছে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়েও। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে জাকির জাফরানের নতুন কাব্যচিন্তাটা কী! এখানে উল্লেখ করা যায়, জীবনানন্দ বাংলার যে চিত্ররূপময় কুয়াশাচ্ছন্ন প্রতিবেশ তৈরি করেন তা মনে হয় ধূসরকালের কোনো বাংলা আর মাহমুদ মূলত আর্যবাংলার থেকে পৃথক করতে চান তার অনার্য বাংলাকে এবং প্রস্তাব করেন একটি মিশ্রজাতিগোষ্ঠির উপস্থিতি। সেদিক থেকে জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়কে মনে হয় হক-মাহমুদ প্রজেক্টেরই এক্সটেনশন, যেখানে সমকালীনতাও হেঁটে যায় যুগপৎ।
বাংলাদেশের মিডলক্লাসভিত্তিক যে সমাজের উত্থান বিগত বছর ধরে হয়ে আসছে সেখানে বরং কবিতায় এনজিও-চাষের কথা আসতে পারে অনায়াসে, আসতে পারে রাজনৈতিকতার দেউলিয়াপনা এবং অধুনা ক্রিটিক্যাল ফ্যাসিজমের যে দৌরাত্ম্য, রিলিজিও ফ্যাসিজমের যে উত্থান সেসবও আসতে পারে নান্দনিকভাবে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী প্রজেক্টের এইসব কাব্যে মধুরভাবে অনুপস্থিত সেসব। তাই কেন যেন এমন কাব্য কেবল দূরেরই নয়, অনাত্মীয়ও লাগে মাঝে-মধ্যে। অবশ্য এ আমার সীমাবদ্ধতাও হতে পারে, কবি তো চলবেন তার নিজস্ব মহাভারতের পথে।
কিছু কিছু কবিতা এত উজ্জ্বল যে মনে হয় যদি প্রজেক্টর পাবন্দি না করে কবি যদি কেবল কবিতার প্রতিই অভিনিবেশিত হতেন তবে অসাধারণ এক কবিতার বই পড়া হতো। এবং বেশ কিছু কবিতায় ১৮ মাত্রার যোগফল পাই শুধু; পর্ববিন্যাসে কিছুটা অসচেতনতা রয়ে গেছে। হতে পারে কবির তা ইচ্ছাকৃত, কিন্তু পাঠক হিশেবে আমার কাছে তা সুর ও রসভঙ্গেরও কারণ হয়। এ ক্ষণে আমি উল্লেখ করতে চাই জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের কিছু পঙ্ক্তি, তাতেই পাঠক বুঝে নেবেন কতটা সৌন্দর্য ধারণ করেছে এই গ্রন্থটি—
১ আমার মাথাল ছুঁয়ে বলো, তোমার মাথায় শুধু ভেসে বেড়ায় কে? দেখি, পিঁড়িতে আলপনা আঁক ফুল, লতাপাতা—কিন্তু গোপনে একটি মুখ এঁকে যাও জানি, কার মুখ বলো, আমার মাথাল ছুঁয়ে বলো কার মুখ ঘাই তোলে মনের পুকুরে। ২ আমি তো তাদেরই লোক। তাদের মাথায় দেবো বলে সোনালু ধানের শিষ ছিঁড়ে আজ বানাই মুকুট, পায়ের পঙ্কজ ধোব বলে আনি স্বর্গের শরাব। আমি দলিতের তল্পিবাহক, শুনছ হে ডাহুক? ৩ হরিণের বাড়ি কোন বৃষ্টিবনে, জানে না হরিণ। ৪. আলেকজান্ডার থামো, এই অক্ষাংশে বাংলার শুরু… বিদেশি বণিক নই, প্রেমিক পুরুষ আমি সেই কৌম-জীবনের; আজো যারা রক্তনিকষ সংগ্রামেও পক্ষীর ভাষাতে কথা বলে, যারা নারকেল পাতায় শুয়ে-থাকা জ্যোতস্নায় ধোয় প্রণয়লোভন এলোচুল। ৫. ...দেখি যুক্তাক্ষর হয়ে দুটি লাশ পড়ে আছে পাশাপাশি… ৬. বাংলার সীমান্তে এসে হতবাক, থমকে দাঁড়াল আর্যের সন্ন্যাসী—কোনো আগুনেই পোড়ে না এ মাটি। এ মাটির ললিত নিঃশ্বাসে যুগে যুগে মিশে গেছে পরিযায়ী প্রেম আর রবাহুত পাখিদের শিস, ৭. কোনো অস্ট্রিক যুবক একদিন কিছু বন্য ফুল তুলেছিল আনমনে, সে ফুলের কান্না হয়তো-বা শুনে ফেলেছিল কোনো দ্রাবিড় যুবতী; সেই থেকে, প্রণয়ের দীর্ঘশ্বাসে নিশিগন্ধা ফোটে দিকে দিকে। ৮. আমি খনা, তোমার ভবিষ্যে দেখি কৃষির রোদন। ৯. দাও কিছু বোরোধান তোমার কোমর থেকে এনে ১০ আমার দুঃখরা খায় প্রতিদিন মাছের ঠোকর। চেয়ে দেখি উজানের পানি আজ না-ছুঁই নিঠুর। কত-না শিলুক শুনি ক্ষণে ক্ষণে বাড়ির ঝিয়ের— নায়র দীঘল হলে দেহরসেও থাকে না দরদ। ১১ নিজস্ব মুদ্রার দেশে হরিণের ঘুম, কে ভাঙাবে?