প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার তাঁর তালাশ উপন্যাসের জন্য 'এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড' পেয়েছেন গত বছর। ২০২০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজু শহরে অনুষ্ঠিত 'এশিয়ান লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল'-এর শেষ দিনে, ১ নভেম্বর পুরস্কারটি ঘোষণা করা হয়।
ডিসেম্বর মাসে পরস্পরের পক্ষ থেকে শাহীন আখতারের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন কবি ও গল্পকার মাজুল হাসান। আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, লেখকের জন্মদিনে তা প্রকাশিত হলো।
মাজুল হাসান
প্রথমে আপনাকে অভিনন্দন এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড অর্জনের জন্য। এই পুরস্কার আপনি পেয়েছেন আপনার তালাশ উপন্যাসের জন্য, যেটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় আগে বইটি বেরিয়েছিল বাংলায়। প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার পেয়েছিল ২০০৪ সালে। ১৬ বছর পর এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। কেমন লাগছে?
শাহীন আখতার
ধন্যবাদ। হ্যাঁ, ২০০৪ সালে তালাশ বেরিয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে। ১৬ বছর পর, প্রায় ভুলতে বসা একটা বইয়ের জন্য এ পুরস্কার—অচিন্তনীয়! ভালো লাগছে। অবাকও লাগছে খুব।
মাজুল হাসান
আপনার তালাশের বড় জায়গাজুড়ে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীরাঙ্গনাদের কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়েছে, তাদের তাড়া করা ভয়ঙ্কর স্মৃতি আর অবজ্ঞা-অবহেলার ঘটমান বর্তমান এতে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি, আছে বর্তমান প্রজন্মের কথা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি—বীরাঙ্গনাদের হলেও মূলত এটা বাংলার নারীর আত্মপরিচয় খোঁজার আখ্যান—আমরা জানি, তারপরেও যদি আরেকবার বলেন গল্পের প্লটটা কিভাবে এল?
শাহীন আখতার
আমি ৯৬-৯৭-এর দিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ওরাল হিস্ট্রি নামে মুক্তিযুদ্ধের একটি গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে ছিলাম। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল তখন। আমার কিছু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ছিল। এ প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু খুঁজে পাই। যা ছিল অকল্পনীয়। আসলে তখনকার আমার মতো অনেকেরই হয়তো ধারণা নেই ৭১ সালে কী ঘটেছিল, পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে মেয়েরা কতটা নির্যাতিত হয়েছিল, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্বাধীন দেশে হালফিল তাঁদের কী অবস্থা, কিভাবে বেঁচে আছে বা বাঁচার জন্য লড়াই করছে। তাঁদের সাক্ষাৎকারগুলি ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো। তাঁরা শুধু যুদ্ধের নয় মাসের নির্যাতনের কথা বলতেন না, বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা বেশি করে বলতেন। কখনো কখনো তাঁদের যুদ্ধ-পরবর্তী কষ্টের অভিজ্ঞতা যুদ্ধের ভয়াল অভিজ্ঞতাকে ঢেকে দিচ্ছিল। এটা ছিল সত্যিকারে আঘাত পাওয়ার মতো ব্যাপার, যা তালাশ লিখতে আমাকে অনুপ্রাণিত বা প্ররোচিত করে।
মুক্তির মধ্যে কিছুটা আমার ‘গবেষক’ সত্তা আছে—ওরাল হিস্ট্রি প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
মাজুল হাসান
মুক্তি যে ক্যারেক্টারটি যুদ্ধপরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে, যার নিজেরও টানাপোড়েন আছে, অনেক ক্ষেত্রে তাকে আমরা হরিয়ে ফেলি, বা লেখক যেন তাকে আড়ালে রাখতে চান, কিন্তু এই গল্পের যদি লেয়ার ভাবি তবে মূল চরিত্র মরিয়মসহ অপরাপর বীরাঙ্গনার প্যারালালি সে হেঁটে গেছে, তার নিজেরও তালাশ যেন, আবার পাঠকও যেন একটা লিটারারি তালাশের মধ্য দিয়ে যায়, এই মুক্তি কতটুকু আপনি আর কতটুকু লিটারারি ক্যারেক্টার? চরিত্রগুলোকে আপনি কোনো স্বাধীনতা দিয়েছেন কিনা, ওরাল হিস্ট্রি প্রজেক্টের ফিল্ড ওয়ার্কের বাইরে আপনি কোনো ‘রাইটার্স ফ্রিডম’ নিয়েছেন কি না?
শাহীন আখতার
প্রশ্নের শেষাংশ থেকে জবাবটা শুরু করি!
ফিল্ড ওয়ার্কের তথ্য দিয়ে রির্পোট লেখা হয়। সেটা আমি লিখে জমা দিয়েছি। রির্পোট লিখতে লিখতে ভেবেছি, রির্পোটের ছক থেকে আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে। ফিকশানের স্বাধীন চারণক্ষেত্র আমার সামনে।প্রথম উপন্যাস পালাবার পথ নেই লেখা হয়ে গেছে। চেষ্টা করলে নিশ্চয় পারব দ্বিতীয়টা লিখতে। যদিও উপন্যাসের শেষ পাতায় পৌঁছার আগে আমার বিশ্বাস হয় না, আমি বইটা লিখে শেষ করতে পারব কি না। যাই হোক প্রজেক্ট শেষ হওয়ার ২/৩ বছর পর আমি তালাশ লিখতে শুরু করি। ফিল্ড ওয়ার্কের অভিজ্ঞতাকে পেছনে গুটিয়ে রেখে ফিকশন লেখার স্বাধীনতা নিয়ে আগে বাড়ি।
মুক্তির মধ্যে কিছুটা আমার ‘গবেষক’ সত্তা আছে—ওরাল হিস্ট্রি প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা। কিন্তু সে আরো নবীন, আরো নাইভ।
উপন্যাসের চরিত্রদের স্বাধীনতা দেওয়া না দেওয়ার মানে কী? লেখার শুরুতে হয়তো চরিত্রগুলি কেমন হবে, তার একটা পরিকল্পনা থাকে। কিছু দূর পযর্ন্ত হয়তো সেই মাফিক চলেও তারা। তারপর স্বেচ্ছাচারী হয়ে যায়। পরিকল্পনা নসাৎ করে চরিত্ররা নিজের মতো এগিয়ে যায়। আমার তো মনে হয়, তালাশ-এর একটা চরিত্রও আমি যেভাবে ভেবেছি, শেষপযর্ন্ত সে রকম থাকে নি, উল্টাসিধা হয়ে গেছে। প্রায় তিন দশক ধরে অনুসরণ করা হয়েছে তাদের। সময়ের সাথে সাথে বা বয়সের সাথে সাথে তারা যথারীতি বদলে গেছে। যেমন আমরা বদলে যাই বা আমাদের চারপাশের মানুষ বদলে যায়। যারা অকালে মারা গেছে, তাদের কথা আলাদা।
মাজুল হাসান
তালাশ নিঃসন্দেহে বড় কাজ, এখানে আপনার ফিল্ডওয়ার্ক আছে, স্মৃতিও আছে। এই ফিল্ডওয়ার্কটা অনেক লেখকেরই থাকে না। আমি কলম ও কল্পনার জোরকে খাটো করছি না, কিন্তু ফিল্ডওয়ার্ক বা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঘাটতি ভালো লেখার অন্তরায় নয়? এই সময়ে ফিল্ডওয়ার্ক-লেখকের আইসোলেশন কতটুকু সম্ভব?
শাহীন আখতার
সেটা মনে হয় বিষয়ের ওপর র্নিভর করে বা লেখকের ওপর। ফিল্ডওর্য়াক করে আমার তালাশ লিখতে সুবিধা হয়েছে। সেটাই একমাত্র পন্থা, তা মনে হয় না। কেউ তালাশ লিখতে পারে তালাশ না ক'রে, স্রেফ ঘরে বসে। লিখতে পারা দিয়ে কথা—যে যেভাবে লিখতে চায় বা লিখতে পারে। আমাদের এখানে তো ফিল্ডওর্য়াক করাকেই খাটো করে দেখা হয়, দূর ছাই করা হয়। কল্পনাশক্তির অভাব, কলমের জোর কম—ইত্যাদি বলা হয়।
গল্পটা প্রেডিক্টেবল হলে সমস্যা কোথায়? এমনকি থ্রিলারও লেখা যেতে পারে গল্পের শেষটা আগেভাগে বলে দিয়ে।
মাজুল হাসান
অনেকে বলে, তালাশ আপনার সেরা লেখা৷ এটার বিস্তৃত পটভূমি, চরিত্রের ঘনঘটা- একটা এপিক ফিল দেয়, হয়ত এই বই তাই। কিন্তু অনেকে বলেন, এর আগে পরে আপনার উপন্যাস তেমন স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় নি। আপনার লেখায় নারীবাদী অ্যাপ্রোচ থাকে, অনেক ক্ষেত্রে সেটাই লেখার চালিকা শক্তি বা প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে, গল্পটা তখন প্রেডিক্টেবল হয়ে ওঠে। কী বলবেন? প্রেডিক্টিবিলিটি কি লেখার ‘মহান’ বা ‘ইউনিক’ হবার পথে অন্তরায়?
শাহীন আখতার
প্রশ্নটা বেশ তালগোল পাকানো, কন্ট্রাডিক্টরি।
যে ‘নারীবাদী অ্যাপ্রোচ’ আমার লেখার ‘মহান’ বা ‘ইউনিক’ হবার পথে অন্তরায়, তা মনে হয় তালাশ-এ ষোল আনা আছে। এটা আমার কথা না। দেশেও বিভিন্ন সময়ে নানা জনের মুখে শুনেছি। এবার এশিয়ান লিটারেরি অ্যাওয়ার্ডের বিচারকদেরও তালাশ সম্পর্কে এ রকম একটা ভাষ্য ছিল। তাঁরা বলছেন, ‘উপন্যাসটি আমাদের সময়ের এশীয় লেখকের অন্যতম সেরা নারীবাদী ও যুদ্ধবিরোধী ডকু-উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার। আমাদের সময়ের যন্ত্রণা ও সাহসের দলিল।’ নারীবাদী তকমাধারী এ তালাশ বইটাই আপনার জানাশোনা অনেকে মনে করেন, আমার সেরা লেখা...যা এপিক ফিল দেয়। আপনার জানাশোনারাই আবার বলছেন—নারীবাদী অ্যাপ্রোচের কারণে তালাশ-এর আগে-পরের আমার লেখাগুলি ‘স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় নি’।এখন আমার প্রশ্ন—আমার লেখা নিয়ে আপনার জানাশোনারা আসলেই কী বলতে চান? তারা কি বই পড়ে কথাগুলি বলতেছেন?
গল্পটা প্রেডিক্টেবল হলে সমস্যা কোথায়? এমনকি থ্রিলারও লেখা যেতে পারে গল্পের শেষটা আগেভাগে বলে দিয়ে। রহস্য বা কাহিনি-উন্মোচনের তরিকাটাই আমার কাছে আসল। সেটা রাশিয়ান ডল বা রূপকথার গল্পের প্রাণভোমরার কোটরার মতো, যার পরতে পরতে আবিষ্কারের আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
মাজুল হাসান
আমাদের অনেক সাহিত্যিকদের মাঝে আক্ষেপ দেখা যায়, তারা বলেন, বলতে চান, আমাদের বাংলায় অনেক ভালো লেখা হচ্ছে, কিন্তু সেটার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। আপনার কী মত? এটা কতটুকু বাস্তব, কতটুকু অন্ধ অহম?
শাহীন আখতার
বাংলায় ভালো লেখা তো আছেই। অনেক না হলেও নিশ্চয় আছে। তা ইংরেজিতে লেখা না হয়ে বাংলায় লেখা হয় বলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। ভাষান্তরটা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ঢোকার জন্য পাসপোর্টের মতোই জরুরি।
মাজুল হাসান
আমাদের সাহিত্যের ইংরেজি তর্জমা হয় না, হলেও সেটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটেনশন পায় না। গলদটা কোথায়?
শাহীন আখতার
অনুবাদ হলেই যে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটেনশন পেয়ে যাবে, এমন আশা করাটা ঠিক না। সারা দুনিয়া থেকে হাজারে হাজারে বই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়। সেই বইটা মহাসমুদ্রে এক কণা শিশিরবিন্দু। তারপরও আশার কথা, বাংলা থেকে ইংরেজিতে ভালো অনুবাদ হচ্ছে। শবনম নাদিয়া, মাহমুদ রহমান করছেন। ভারতের অরুনাভ সিনহা এখানকার কিছু কিছু বই অনুবাদ করেছেন। শবনম নাদিয়ার অনুবাদে মশিউল আলমের গল্প সাড়া জাগিয়েছে। সামনে হয়তো আমাদের জন্য আরো চমক অপেক্ষা করছে।
একজন সাহিত্যক্রিটিক তালাশকে তুলনা করেছেন সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচের দ্য আনওম্যানলি ফেইস অব দ্য ওয়ার, রুথ ক্লাগারের স্টিল অ্যালাইভ বা মার্থা হিলারের আ ওম্যান ইন বার্লিন-এর সঙ্গে।
মাজুল হাসান
আপনার তালাশ তো ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে, সেটার জন্য পুরস্কার পেলেন আপনি, আপনার অভিজ্ঞতা একটু জানতে চাই, কিভাবে এর ভাষান্তর হলো, বাজারজাত হলো, এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড কমিটির নজরে পড়ল?
শাহীন আখতার
তালাশ অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদকেরাই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁদের আমি চিনতাম না। যেমন তালাশ-এর ইংরেজি অনুবাদক ইলা দত্ত। তিনি দিল্লির বাঙালি। জুবান বুক হাউজের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি তালাশ পড়ে জুবান’কে বইটা ইংরেজি করার পর্রামশ দেন। জুবান আমাকে লেখে। কনট্রাক্ট সই করি। ভারতসহ আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাতকরণের কাজটা জুবান করে। অ্যামাজন থেকে ‘দ্য র্সাচ’ কেনা যায়। কোরিয়ান অনুবাদের ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই। ২০১৬ সালে সিং হি জন (কোরিয়ান অনুবাদক) তালাশ-এর ইংরেজি ‘দ্য র্সাচ’ পড়ে আমাকে ইমেল করেন। তারপর আমাদের স্বাধীনতা দিবসের সময়ে একবার ঘুরেও যান বাংলাদেশ থেকে। বইটা ২০১৮ সালে কোরিয়ান ভাষায় ছাপা হয়। সেই বছরই আমি এশিয়ান লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রিত হয়ে গোয়াংজু যাই। তখনো কোরিয়ান তালাশ আনকোরা। তবে বিভিন্ন প্রেস, টেলিভিশন বইটার ‘বিষয়’ সম্পর্কে শুনেছে। কয়েকটা ইন্টারভিউতে আমি তাদের আগ্রহের বিষয়টা বুঝতে পারি। অবাক হই। বাংলাদেশে এত মানুষকে তালাশ নিয়ে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি নি। তারপর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে সিং হি-র ইমেল। বইটা নিয়ে কোরিয়ায় আলোচনা হচ্ছে, রিভিউ ছাপা হচ্ছে। সিং হি থাকে বোস্টনে। একবার ও লিখে, একজন সাহিত্যক্রিটিক তালাশকে তুলনা করেছেন সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচের দ্য আনওম্যানলি ফেইস অব দ্য ওয়ার, রুথ ক্লাগারের স্টিল অ্যালাইভ বা মার্থা হিলারের আ ওম্যান ইন বার্লিন-এর সঙ্গে। এভাবেই হয়তো এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড কমিটির নজরে পড়ে বইটা।
মাজুল হাসান
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনি 'প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার' পেয়েছেন, বাংলা একাডেমি পেয়েছেন, এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পেলেন, তার মানে আপনার কাজের স্বীকৃতি কম না। তারপরেও আপনার সমসাময়িক ‘স্টার লেখক’দের মতো আপনি সরব না, হাঁকডাক কম। মনে হয় আপনি এলিট লেখকদের কাতারে নেই। আপনাকে নিয়ে উন্মাদনা নেই। এটা কি আপনার আইসোলেশন নাকি এতে কোনো ‘সাহিত্যের রাজনীতি’ আছে?
শাহীন আখতার
এখানে মনে হয় আপনি দুটি বিষয় বলছেন। আমি যত দূর বুঝেছি আর কি। এক. ‘স্টার লেখক’দের মতো আমি সরব না, হাঁকডাক ছাড়ি কম। দুই. আমারে নিয়া উন্মাদনা নাই। তাই আমি এলিট লেখকদের কাতারে পড়ি না। এ দুইয়ের কারণ কি আমার আইসোলেশন নাকি অন্যদের ‘সাহিত্যের রাজনীতি’? আপনার প্রশ্নটা আমার কাছে মনে হয় এটা।
আইসোলেশন কিনা জানি না, সাহিত্যজগতে আমার অন্তরঙ্গ দোসর নাই। যূথবদ্ধভাবে সাহিত্য করার কোনো স্মৃতি নাই। এ অঙ্গনে আসছি দেরিতে। সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে বা গলাগলি করে আমি বড় হই নাই, মানে আমার বয়স বাড়ে নাই। আমাদের এখানে ‘সাহিত্যের আড্ডা’র ওপর খুব আলোকপাত করা হয়। যেমন বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা, কফি হাউজের আড্ডা। লেখকের নিঃসঙ্গতা আড়ালের জিনিস। আমলে আনা হয় না। লেখকেরাও মনে হয় ভয় পান এই খারিজ হয়ে যাওয়াটা বা নিঃসঙ্গ থাকাটা। যাই হোক, শুরুতে আমিও দু-একবার সাহিত্যের আড্ডায় যোগ দেওয়ার কোশিশ করেছি। অভিজ্ঞতাটা ভালো হয় নাই।
‘সাহিত্যের রাজনীতি’টা কী, তা না বোঝা গেলেও দলবাজিটা খুব স্পষ্ট। সে ‘প্রতিষ্ঠান’ বা ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ ক্ষেত্র যাই হোক।
‘এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড’ একটু অন্যরকমই। বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরের একটা পুরস্কার। যা মনে হয় বাংলায় উপন্যাস লিখে আমাদের এখানে এই প্রথম অর্জিত হলো। সে খবরটা ছাপতেও পরাঙ্মুখ আমাদের দেশের পত্রিকা, পত্রিকার সাহিত্যের পাতা। বিশেষ করে যেখানে আমাদের লেখকবন্ধুরা রয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ যে, দেশের সব কটা ইংরেজি কাগজ, কিছু সংখ্যক অনলাইন পত্রিকা ‘এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড’-এর খবরটা উদযাপন করেছে।
এখন গ্রামের বাড়িতে আমার ভাইয়ের করা ‘ট্রাস্ট’ নিয়ে কাজ করছি। এটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
মাজুল হাসান
এখন কী লিখছেন? কী পড়ছেন? কী করছেন?
শাহীন আখতার
২০২০ সাল শোক আর কষ্টের মধ্যে পার হয়েছে। পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয়, আমার ছোটভাই কয়েক মাস আগে ক্যানসারে ভুগে মারা গেছে। এখনো উল্লেখ করার মতো কিছু লিখছি না। পড়াশোনাটাও মনের শান্তির জন্য। ডায়েরিতে টোকা এ সময়ের কিছু ভাবনা ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকছে। হয়তো লিখতে বসলে কাজে দেবে। এখন গ্রামের বাড়িতে আমার ভাইয়ের করা ‘ট্রাস্ট’ নিয়ে কাজ করছি। এটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। ভাই ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার কাজটা শেষ করে যেতে পারে নি। আমরা ওর অসর্ম্পূণ কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি।
মাজুল হাসান
শেষ প্রশ্ন। প্রশ্ন না বলে জানার ইচ্ছে বলা ভালো। এশিয়ান লিটারারি অ্যাওয়ার্ডের অর্থমূল্য আছে কী? কোনো সম্মাননা অনুষ্ঠান হবে কি না? হলে কোথায়?
শাহীন আখতার
অর্থমূল্য আছে। সাড়ে সতের হাজার মার্কিন ডলার।
গোয়াংজু লিটারেচার ফেস্টিভ্যালের শেষ দিন অর্থাৎ পুরস্কার ঘোষণার দিনই যথারীতি অনুষ্ঠান হয়ে গেছে। অতিমারির কারণে এবার অনলাইনে হয়েছে। টাকাটা ওরা ব্যাংক-টু-ব্যাংক পাঠিয়ে দিয়েছে। পুরস্কারের ক্রেস্ট, সনদ, সুভ্যেনির ইত্যাদি পোস্টাফিস খুললে পাঠাবে। তাছাড়া আগামী গোয়াংজু লিটারেচার ফেস্টিভ্যালে (২০২২) তালাশ নিয়ে একটা বিশেষ প্রেজেন্টেশান আছে। ভিজ্যুয়াল সম্ভবত। তখন পুরস্কারোত্তর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা আছে।