‘সকলেই’ কবি হওয়ার এই কালে, আপাতগভীর পঠনের পর মনে হয়, মাজুল হাসান বরং ‘কেউ কেউ’র-ই একজন হয়ে উঠছেন। তাঁর ইরাশা ভাষার জলমুক-এর পর দেখা হলো এই ‘লালপীড়িত’। কবিতার কাছে পোশাকি প্রত্যাশা বর্জন করলেও, জগতে কবিতা ‘নানা রকম’; প্রকাশোন্মুখ এই কাব্যের কবিতাগুলোতেও ‘নানা রকমে’র থেকে অন্তত কিছু রকম কবিতা রয়েছে—ঠিক প্রথাগত প্রকরণে না হলেও বলবার ভঙ্গিতে এবং বলবার এষণায়। কেননা, এখনও আমরা, এমনকি মাজুলও বোধ করি বিশ্বাস করেন : কবিতার অবশ্যই বলবার কিছু আছে।
মাজুলের কবিতায় তাই বলা, না-বলা, ইঙ্গিত ও উহ্য—এসবের মধ্য দিয়েই আস্বাদনের অন্দরে যেতে হয় পাঠককে। কিছু স্তবক আছে নির্জলা বিবৃতির মতো। যেমন :
বটের ঝুরিতে মেরুন অক্ষর, প্রীতিখণ্ড—প্রণাম জেনো
দাও তীব্র মেরুন নক্ষত্র; আরও আরও মরচে পড়া কম্পাস
গভীর করি সমুদ্র মন্থন... (‘মন্থন’)
—অথচ বিবৃতিরও অধিক কিছু এসব। তারও আগে এই সব পঙ্ক্তি নিতান্তই কবিতা। শব্দিত সাংগীতিক সংবেদনার প্রায় পুরোভাগেই ব্যঞ্জনা জড়িয়ে থাকে :
নারী, আমাকে দ্যাখো। দীর্ঘ ঈ-কার, আমাকে মহাপ্রাণ দাও
দ্যাখো, দীর্ঘ পয়ারের মতো গাছে গাছে উড়ছে পালকের সেমিজ (‘জলপিপে’)
স্পষ্ট বার্তাও যে নেই, তা নয় ; স্পষ্ট বার্তাই-বা আর খুঁজতে হবে কেন, কবিতায়ই যখন বলা হয়ে যায় : “রূপ ও শৃঙ্খলের মানে আমি জানি—হে শস্যকারাগার” (‘দেহকাণ্ডবীণ’)। যখন বলা হয় : “অধিক চিৎকারে প্রেমের পেখম খসে পড়ে; জ্ঞাপনে আত্মার ধ্যান” (‘অগ্নিসোম’), তখন আপ্তবাক্যের ধাঁচেই দাঁড়িয়ে যায় পঙ্ক্তি। কোথাও-বা আপ্ত আর মিথ মগ্ন থাকে অধীর মৈথুনে :
পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞানগ্রন্থ আদতে একেকটি চোখের মালা
সেথায় লেখা : চাহনিতে পাহাড় সুরমা হওয়ার রোমাঞ্চ (‘নূর’)
উপমা আসে চেনা জগত থেকেই; কোথাও-বা নিসর্গ-অতিক্রান্ত উপমা : “... ট্রাজেডির মতো ছেঁড়া বুট নিয়ে কতো আর আকাশগঙ্গা বলো?” (‘বেলাতট’), আবার রূপকাবদ্ধ নিসর্গেও বিচ্ছুরিত হয় বিদগ্ধ দৃষ্টি :
নিমিষ ও জ্যোতিবিম্বের মাঝে দোলাও গুল্ম
পুঁইদানাতে জমাট হোক রক্ত-লকেট। (‘পূর্বমেঘ’)
মানবভোগান্তির মতোই অসমাপ্তও থেকে যায় কখনও কবিতা—বালুবিন্দুর পর অপার জলবিন্দু—অনিঃশেষ, জীবনের মতোই পুনরুক্তিপ্রবণতায় আবারও উচ্চারিত হতে দেখি :
ফিরে আসে বেলাতট। ট্রাজেডির মতো ছেঁড়া বুট নিয়ে
কতো আর আকাশগঙ্গা বলো?
নিভে গেছে চিবুকে অঙ্কুরিত আলো। পলাতক কাঠবিড়াল (‘বেলাতট’)
—কবিতা এভাবেই ফুরোতে চায় না আর। কবিতাকে ছাপিয়ে অনেক দূরে সরে যেতে থাকে মন—জটিল উপদ্রবময় দিন ঘুচে যেতে থাকে। আবার, কোনো কোনো কবিতা শেষ হবার পর শুরুর বাক্যে ফিরে আসতে পাঠকের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ‘মুকুট’ কবিতাটির সেই রকম একটি কবিতা। শাস্ত্রীয় সংগীতে আমরা লক্ষ করি, বিশেষ কিছু স্বর গাইবার মধ্য দিয়ে এক ধরনের সংকট তৈরি করা হয় শ্রোতার মনে, বিশেষ কোনো স্বর শুনবার বাসনা জাগাতে। কবিতার শেষ তাই শেষ হয় না আর, আবার শুরুর বাসনা জাগে।
যৌনতার নিয়ন্ত্রিত সম্পাদিত উন্মাদনা লক্ষ করা যায় কোনো কোনো কবিতায়—“উহ্য থাকে যবের শীষের ওপর শিশিরের অপভ্রংশ...” ('উহ্য')। তাঁর প্রশ্নাকুলতা কখনোবা পাঠকের মনকে অন্বেষণের অপেক্ষায় রাখতে পারে—“আমি কি ফারাক করতে পারব ৩ রঙের চুমু?” (‘চুম্বন’)।
প্রকৃতপক্ষে, তাঁর শব্দের অন্বয় আর পঙ্ক্তিগুলোর দাঁড়াবার ভঙ্গির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় এক ধরনের স্বকীয় পক্ষাবলম্বন। এই স্বকীয় স্বাবলম্বনের মধ্যেই আবার স্যাচুরেটেড হয়ে থাকে অভিনবত্ব-প্রয়াস। তা থাকুক। এই অভিনবত্ব-প্রয়াস আত্মঘাতপ্রতিম হয়ে ওঠে না কখনো। বরং ইমাজিনেশন ও অনুশীলনের চিহ্নে পাঠক হিসেবে আমরা বশ্য হয়ে থাকি, পাঠকের আত্মজীবনীরই প্রতিকল্প হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা। বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না— “প্রেম কখনো রোগ হয় না; না হয় কমজোরী চুম্বন” (‘উহ্য’)। ফলে, তাঁর কবিতা ব্যবহারিক প্রয়োজনে লেখা না হলেও আমাদের জ্ঞানের গণ্ডিও বাড়ায়। আমরা জেনে যাই—“দূরত্বই সৌন্দর্যের আত্মা, কাছে গেলে ফুটে ওঠে সকল দীনতা” (‘স্তন’) কিংবা, “আজীবন জলের পানে ছোটা মানুষ সমুদ্রের সামনে বিহ্বল বসে পড়ে/ প্রথম বারের মতো তাকায় নিজেরই পানে” (‘সলীল’)—এভাবেও কবিতাগুলি বিচ্ছিন্ন মানুষের (কবির) সামাজিক কর্ম হয়ে ওঠে।
তাঁর একাধিক কবিতায় ব্যবহৃত ‘পানে’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়—যা ‘মরা শব্দ’ হয়েও জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতায়, শুদ্ধতম দৃশ্যে, কবিতার মিতকথনে। কবিতার ইতিহাসে অলঙ্ঘনীয় সময়-স্মারক হয়ে থাকবে এমন কবিতা আমরা পড়তে চাই। মাজুল হাসানের কবিতা পড়ে পাঠকের মনে তেমন উচ্চাশা জেগে উঠতে পারে।
পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা
ভূমিকা
ঘুমাতে পারছি না, চোখ বুজলেই কে যেন কলার চেপে ধরছে!
আমি তো এক হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম আকাশে, বিদ্যুৎলতায়
দ্যাখো এখনও মাদুলি, কোমরে তাগা, মেঘলিখন শরীরে আমার
রংধনুতে কোনো কালো নেই, তবু ক্যানো এই ব্ল্যাকাউট? নির্মম?
আমি তো আরেক হাত প্রথিত করেছিলাম পাতালে, পদ্মঘুমে, চূড়ায়
এই শহর আমার এভারেস্ট, ডেড সি, ক্ষীণহরিৎ, প্রিয় লেভেরিন্থ
লোমওঠা নেড়ি কুকুরটাসহ আমি ওকে ভালো পেতাম, ভালো পাই
রানওয়ে সমেত শুয়ে থাকেন এয়ারপোর্ট, নাভির মতো শকটজট
সন্নিকটে কৃষ্ণকায় লঞ্চঘাট; তবু কখনও আমি তো পালিয়ে যাই নি
নীলের অপারে...
এখন চোখ খুলতে ভয় পাই, তাকালেই কেউ যদি কলার চেপে ধরে!
সলীল
সমুদ্রের সামনে মানুষ হতবিহ্বল বসে পড়ে। তারা কী ভাবে তখন?
পুরনো প্রেম, জলাকাশের বক্ষবন্ধন, নাকি নিজের ক্ষুদ্রতা; মৃত্যুচেতনা?
বলা হয় : একবার সমুদ্রে নামলে সেই মানুষ আর বাড়ি ফেরে না
অস্থিচর্ম-কেশ-কাঠামোতে ফেরে অন্য কেউ।
বুকসমান পানিতে ডুবে প্রেমিকাকে চুমু খেলে
সেও একটা জলকন্যা হয়ে যায়, অনেক খুঁজেঢুঁড়ে যদিবা
ফেরানো যায় তাকে তবু ওর ত্বকে খেলা করে লবণ ও লাবণ্যের রহস্য
কেন যায় মানুষ সমুদ্রে? কোনো অতল প্রাসাদ, হৈহৈ বিয়ার?
হাওয়াই চপ্পল? তারপর কেনইবা বসে পড়ে?
দ্যাখে তৃষ্ণার পেছনে ছোটা কতটা বর্ণাঢ্য ছিল?
অথচ ঢেউ কত সরল, গাম্ভীর্যময়, তৃষ্ণা মেটানোর দায় তার নেই।
আজীবন জলের পানে ছোটা মানুষ সমুদ্রের সামনে বিহ্বল বসে পড়ে
প্রথমবারের মতো তাকায় নিজেরই পানে
বোধি
ভারিপূর্ণিমা অথবা জোছনা নিজেই এক জলাধার
তাই জোর প্রস্তুতি প্রয়োজন। দেখা গ্যালো—গুলুইয়ে বসে
আপনি উঁকি দিলেন নদীতে, অমনি টুকরো টুকরো হয়ে
ভেসে উঠল অন্য একটি মুখ! হতে পারে এই সেই মেয়ে
যে পুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো কৈশোরে ছুড়েছিল উড়ন্ত চুমু
অথবা হতে পারে মুখটা নিজেরই
ঝড়বিধ্বস্ত, নিরাশ, কঠিনতার আড়ে অপ্রাপ্তিতে হতোদ্যম
ভর-জোছনায় ঠিক কি খোঁজে মানুষ?
একলা নিরালা জলধি, ভগ্নপ্রেম?
কব্জিতে প্রায় বুজে আসা ব্লেডে লেখা নাম; নাকি স্রেফ স্নান?
কেনইবা বলি জোছনাবিলাস?
হেতু যা-ই হোক, প্রস্তুতি ছাড়া জোছনায় নামা ভয়ঙ্কর।
ভেতরে বাইরে এত জোছনা, তবু এত আলোহীন জীবন!
মলিনতা-বিস্মৃতি ধুয়ে বেরিয়ে আসতে পারে গোপন মারী
ছোবলে গলে যেতে পারে সালমাজরির কাজ, অস্থি-মজ্জা-শরীর।
তখন জোছনামাতাল হয়ে আপনাকে কাঁদতে হবে কালোপক্ষ পর্যন্ত...
স্তন
পাহাড়ে কি চুম্বক থাকে লুকানো? নাকি স্মৃতিলেখ মেঘমক্তব?
অসম গীত থেকে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচা? কেন এই পাহাড়যাপন?
নিশিলগ্ন হাওয়াইশার্ট, হাতে শাদাছড়ি, মায়োপিয়া নিয়ে
মায়াপিদিম বরাবর ছেঁচড়ে-পাঁচড়ে চলা? কী আছে ওতে?
দূরত্বই সৌন্দর্যের আত্মা, কাছে গেলে ফুটে ওঠে সকল দীনতা—
আমাদের কদাকার মুখ, ব্রণের দাগ, ষষ্ঠ প্রহরে ঝগড়া তুমুল।
তাহলে কেন ধরি মুঠিতে প্রাণ? উঠি পাহাড়ে?
অর্জন বলতে খুব ভালো নীল মাখা হলো ক’দিন
নিয়ম ভেঙে সেক্স হলো খাড়িকাদায়
উঁচু থেকে চরাচরে পাঠানো গেল ঝাপসা হাতনাড়া।
আর আমি, দেখলাম, চেনামানুষীর ভেতরে কেমন রয়ে গেছে
চির-অচেনা পাহাড়; বেগুনি উপত্যকায় হাসছে চির অধরাফুল…
স্ফটিক
মানুষ তো সাইকেল ঠেলে আগুনও দেখতে যায়
দেখতে যায় বন্যা, মারী, অত্যাশ্চর্য ফুল
হুহুরাত ও ফাঁকা রাস্তা মাড়িয়ে পৌঁছায় আরও হুহু নির্জনে
একলা কী ভাবে তখন?
অতীত ঈগল, যবের ছড়ার 'পরে তুমুল স্ফটিক?
নিজের ভেতরে নির্জনকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে সে
সেই সাথে পুলকিত। যেমন : সাইকেল ঠেলে আগুন দেখতে গিয়ে
মানুষ পোড়া গেরস্তের আর্তনাদে হতচকিত হয়ে পড়ে
নিজেকে ভাবে সৌভাগ্যবান; জলভাসীর কান্নায় কাঁদে
উঁকি দেয় জ্বালামুখে, জলে খোঁজে নিজেরই আবক্ষমূর্তি
বিপদে দুদ্দাড় চালায় কাঠের পা।
কতদূর যেতে পারে ধুলো? কত দূর ধূলিধূসর?
কে ঈর্ষাকে বাঁচিয়ে রাখে—নির্জন প্রেম?
হুহু দ্রোহ নাকি টলটলে জ্বলন্ত বিহবলতা?
বিহ্বলতা—খরা, বন্যা, মারী ছাড়িয়ে এক অত্যাশ্চার্য ফুল
মানুষ তার খড়ি ওঠা চিবুকে একমাত্র মালি...
চিরগন্তব্য
নেহাত একটা গমের শীষের পেছনেও ডুবে যায় সূর্য
নদী তখনও ওয়াই আকৃতি নিয়ে বহমান
বিচ্ছিন্ন হলো; তিন মাইল ভাটিতে মিলিত হলো আবার
সে কি সিংড়া ফরেস্টকে আলিঙ্গনের নিমিত্তে?
পাতকুয়ার পাড়ে উদোম স্নান হলো ঢের, জানা হলো মেঘবল্লর
সূর্যাস্তেই কেন চেপে বসে প্রস্থানভাবনা?
তীব্রতর হয় শালপুষ্পঘ্রাণ?
বলা হয় : এমন আলোয় জীবন বদল করা যায়
দিগন্ত ছোঁয়ার সাধ্য নেই মানুষের, দৃষ্টি খানিকটা পারে
সেই অন্যজীবনে কোথায় যায় মানুষ?
দিনান্তে একলা হিজল-করবী, রাতে শসীকলা
জোনাকরঙ্গন—তবু সূর্যাস্তে বিমর্ষ, বিপন্ন ও স্থৈর্য বোধ করে সে
ততদিনে জানা হয়ে যায় : হোক খরগোশ অথবা কচ্ছপ
চিরগন্তব্যে পৌঁছানোর সাধ্য কারো নেই
শুধু গমের শীষের পেছনে ডুবে যায় সূর্য। আলগোছ…
উহ্য
পরিশেষে জলসিক্ত পাকুড়ের মতো একা
কাম, ক্রোধ, মোহ, মাৎসর্য
—দৃশ্যত নেই, তবু আছে সর্বত্র
শুধু কিছুতেই পিঞ্জর পেরুতে পারছে না আকাশ
সাঁকোর বিপরীতে সাঁকো। ঝাপটা। তৃণাঙ্কুশ
ভুল আলিঙ্গনের পাশে কাঁদছে আকুলিবিকুলি
সান্ত্বনাফল। বোঁটাসমেত। সুপক্ব।
কী ভয়ানক শীষটান!
প্রেম কখনও রোগা হয় না; না হয় কমজোরী চুম্বন