মোহাম্মদ রফিক
সমুদ্র-অভিলাষ
. আজ রাতে বঙ্গোপসাগর তীরে এসো, বসো, শোনো, গুমগুম শব্দ ফেটে পড়ে আকাশ-মেদিনী, অন্ধকার, প্রসববেদনা বিদ্ধ জীবন-মরণ বা জনম জলরাশি একাকার, ফেনিলে-ফেনিলে মত্ত উন্মাদ অধীর; মধ্যযাম, ঘুমিয়ে নির্ঘাত তুমি নিশ্চেতন বালুর গহ্বরে মনে হবে, বালুরাশি জপমালা জলের ও শূন্যতার, ফসফরাস ফুল হয়ে ফুটে আছে পুষ্পদল গোটা ভূ-মণ্ডল হঠাৎ অগ্নির তির ফুঁড়ে যায় মেঘে-মেঘে ঢেউয়ে-ঢেউয়ে; উচ্চকিত শঙ্খচিল এই ক্ষণে বার্তাবহ যেন কার ডেকে ওঠে আশীর্বাদে, কণ্ঠে তার মথিত ক্রন্দন বিস্ময়ের, বার্ধক্যের ঘোলাভুঁঁয়ে অমরত্ব তাৎক্ষণিক প্রলাপের, বলে যায়, কেউ নেই, তবু একা বিশ্ব অভিযাত্রা মন্থনের; ভোর হলো, আলতো স্পর্শ, জেগে ওঠো, লাল চোখে খুঁজে ফেরো, সেদিনের জলে ভেজা সূর্যছোঁয়া, মুছে যাওয়া পদছাপ, শাড়ির উতলা ঘ্রাণ, দৃষ্টির অসীম সে অসীমে পিঠ বেয়ে, শিরশির হাওয়ার দাপট; ঘরে-ফেরা হবে তবে জলময়!হাবীবুল্লাহ সিরাজী
বোধ কিংবা ভেদ
. কেড়ে নিলে শ্বাস পাতাদের হাওয়া, বৃন্তের রোদ ধীর হবে বোধ মায়াজল মেশা অধম কসুর— তো, ছোঁ দেয়া ঘোর ঢলাঢলি মধু ভোঁ অন্তঃপুর দোলে যে ভোলায় অধর-আঁধারে সোহাগ-সরোদ! আশামতো যত উচাটন খুনে বাড়াবাড়ি হেলা— হারে কী বিহারে ঊনতার খাপে নাচাবে অবেলা? নেশার দ্বন্দ্বে বিস্মৃতির তল ভাঁজ খুলে কাঁপে মূল ছুট্ পেলে ভেদের কিসিম শূন্যতা মাপে!মৃদুল দাশগুপ্ত
একটি কবিতা
. চলেছো চলেছো যন্ত্র? ভুলচুক ঘটেনি তো পথে? খাটাবো কিছুটা কাল হোঁচট বা খাবো টাল সমতল পার করে নিয়ে যাবো পর্বতে পর্বতে। জিরবো দুদণ্ড যদি পুনরায় ভরা নদী একেক একেক ঢেউ সকাল- বিকাল। তুমি রক্ত ধরে রেখো সচল সচল থেকো যাবতীয় ব্যথা জ্বালা ফাটা ছেঁড়া ক্ষতে। কেবল হাঁপর, ঘানি হৃদয় ১০০ খানি আঁচড় কাটবে বলে এই বাক্যজাল।গৌতম বসু
খেলাঘরের ছায়া
. ১ দর্পণ, অত্যাশ্চর্য দর্পণ, আমরা কথা বলি তখনই, দুয়ারে যখন কোনও সংকট, তোমার, না হয় আমার; ও কিসের আবিলতা—এ প্রশ্ন কার? আমার, না তোমার? ২ গভীরতর অরণ্যে প্রবেশ তো করলাম, এইবার, ভার লাঘবের পর, বার করলাম সেই মানচিত্র। এত বহন করেছি যাকে, এত ভাঁজ তার, এত ছিদ্র? ৩ পাখি বলল, আমার শরীর আছে। মাটিতে যতক্ষণ, ততক্ষণ ছায়াও আছে বটে; আকাশে আমি ছায়াহীন; আমি বললাম, বেশ, দেখাও দেখি, খেলাঘরের ছায়া॥মাসুদ খান
সমীক্ষা
. ঘুরনসিঁড়ির ধনু-বাঁকানো উদ্বেগ, সিঁথিরেখা দুই ধারে বেসামাল ঢেউ-খেলানো উচ্ছ্বাস, রিভলভিং চেয়ারের ঘূর্ণ্যমান বিবেক এবং আসবাবের অস্ফুট অশ্রুত অট্টহাসি—এই এদের দোহাই... কী করে বোঝাই কত যে বকেয়া এখনো প্রদেয় প্রকৃতির কাছে! পেয়েছ ভূভাগ্যগুণে এতটুকু সুফলা ভূভাগ। আগুনে আলোক থাকে, তারও বেশি তাপ। গাছে উঠে তোতাকে উড়িয়ে দিয়ে বারবার আতা খেয়ে যাবে দুই ভাই সুশীল দুঃশীল, ছন্ন হাঁড়িচাচাকে উড়িয়ে পাকা পেঁপে। উত্তাপে রঙের জ্বালা, রঙেরই প্রতাপ। আর এতসবের মধ্যেই উচ্ছেদশিকার কোনো বস্তির উদ্ভ্রান্ত ছুটতে-থাকা শিশুদের ভয়ার্তি দ্রুত মিশে যেতে থাকবে গুঁড়নকলের ধোঁয়াগর্জনের সঙ্গে বেদম বেঘোর খলবৃষ্টির ভেতর।জুয়েল মাজহার
মেয়ে-শালিকের চোখ
. চিমসানো শ্রোণিদেশ নিয়ে সে এখন এসেছে নরকে নেমে। পিপাসার্ত আর বিবসন! দুধের ঝর্নাটি তার মৃত আজ; ঝরায় না শিশুমুখে টুপটাপ অমৃতের ফোঁটা— নেতিয়ে পড়েছে আর ধসে গেছে অমৃতকুম্ভের দুই চূড়া! চিরকাল সঙ্গলোভী; এখানেও হারানো আতমাকে সে খোঁজে! কিন্তু নাহ!নিজেরই মাফল্ড্ ভয়েস তার কানে ফিরে আসে; ক্যামেরার মতো দুটি চোখ ঢের জানে : নরকই পৃথিবী; তবে, পৃথিবীর চেয়ে শ্রেয়তর! পৃথিবীর মতো এখানেও উঁচুনিচু টিলা, বাড়িঘর; আবছা নারীর মুখ উঁকি দ্যায় বহু জানালায়। হাতে বসা পোষা পাখি খুঁটে খায় স্নেহের তণ্ডুল কালো কেশ ঢেউ তোলে। ঝুল বারান্দায় অলস বিকেলে কত নদী বয়ে যায়! যে কোনো স্থানের মতো নরকও আসলে এক স্থান; নিজেরই গরজে তাতে কতকিছু পাঠায় পৃথিবী! পাঠায় পেরেক, লোহা, বড়শি, আংটা, আফিম, ধুতুরা কাটা মুণ্ড, চুতরাপাতা, কাউয়ালুলি, তুঁত ও তেঁতুল বল্লম, কৃপাণ, গদা, আতাফল সদৃশ গ্রেনেড স্তনের বোঁটার মতো বুলেট-ফুলেট কত, আর, নির্দিষ্ট মাপের চুল্লি, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির ম্যাচের বারুদ নরকেরও রয়েছে প্রান্তর, মাঠ, স্বচ্ছতোয়া নদী; নরকের নদীজলে ধুতুরা ও মদ নিয়ে পৃথিবীর নৌকা ভেসে চলে নরকেরও মাঠে আছে ঘাস-দূর্বা, নম্র শালিক। নরকের অরব উদ্যানে এক ঝিমধরা পড়ন্ত বিকেলে পরকীয়া প্রেমে-কাত দুটি পাখি ডালে এসে বসে; তারপর ধীরে তারা জাফরান পেখম ছড়ায়। নরকে তো কেউ কারো সাতে-পাঁচে নেই; কস্মিনকালেও কোনো বাজপাখি, রাষ্ট্র বা পুলিশ শালিকের পিছু নেয় না। ঘুণাক্ষরে বিরক্ত করে না!হোসেন দেলওয়ার
ভাইফোঁটা
. আবার আসব কিনা ভেবে দেখা যাক। কতদূরে যাওয়া তবে সংশয়-ফাৎনা ফেলে রেখে দ্বিধাহীন এই আসমুদ্র দোলাচলে
দোলপূর্ণিমার রাতে চুপিসারে ফোটে যে দোলনচাঁপা তার আরতি কতটা আকুল, শুকনো পাতা ঝরে পড়বার আগে লিখে রাখে তা। কোথাও বজ্রপাত হয়—সহসা বৃষ্টির ছাঁটে বাদামের ডালে লুকিয়ে থাকা ফিঙের বাঁকানো লেজে কতটা জল চুইয়ে চুইয়ে পড়ে, এই দৃশ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বৃক্ষের কোনো অভিযোগ নেই বেদুঈন মাছি কেবল পরিহাসপ্রিয়। শীতঋতু চলে গেছে কতদিন দেখা নাই তার সাথে। হলুদ শস্যের ক্ষেতে এলিয়ে পড়া ঢেউ তবে কার প্রতীক্ষা করে? খড়কুটো নয়, ভাইফোঁটা ঠোঁটে নিয়ে উড়ে আসে কোন পাখি?