ঈদ সংখ্যার কবিতা - ২

মুক্তি মণ্ডল

সূর্যের ছায়া

. অনেক পথ পার হয়েই জলের কাছে সূর্যের তেজ শরীরে মেখে দাঁড়িয়ে আছি। ডালিমাভার আলগা রোদে ঝলসে উঠা আত্মগ্লানির নির্জন মঠে সব হারিয়ে তোমার জন্য খুলে রেখেছি অশান্ত দোর। দেখার মতো তোমার দেহ নদীর বুকে ঢেউয়ে-স্রোতে ছড়িয়ে যায় শান্ত স্বভাবে, আমরা দেখি আমাদেরই গোপন মায়া, সে ধুধু জলে ডুবে যাওয়া সূর্যের ছায়াতে মুছে যেতে যেতে হাসে।

কৌশিক বাজারী

তার নাম বলি?

. তুমি এসে বসে থাকো খাটিয়ার একপাশে,                                    স্বপ্নে, চুপ করে। ঘুমন্ত আমার মুখে দীর্ঘশ্বাস ফ্যালো। আমি ঘুম ভেঙে শুয়ে থাকি, তাকাতে পারি না, জানি, এইখানে জারিজুরি নেই কোনো, ছাড় নেই, সূচ্যগ্রভূমি তুমি নাহি দিবে অন্য কারে, জানি, তবু তোমারও তো সূক্ষ্ম দেহ, জন্মান্তর, হাওয়ার ভেতর থেকে ফুটিয়ে তুলেছ পদ্মফুল, আমি পাশফিরে তার গন্ধ পাই                          জলের ভেলায় ভাসি বলো বলো, এবারেও ধরা পড়ে গেছি হাতে নাতে! মানভঞ্জনের পরে অগুরুচন্দনগন্ধে ভারি হয়ে আছে ঘর। রাগ পড়ে গেছে? বলো? এইবার বলি তার নাম?

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

যেভাবে হাসির শব্দ

. ক আমরা নেমে এসেছিলাম যে রাস্তায় তার পাশে  শুধু ভাঙা কয়েকটা দরজার ফ্রেম, আমাদের প্রতিদিনের নেমে আসা মাথা বস্তুত উত্তর না পাওয়াগুলো ঢেকে যাচ্ছিল মেয়েদের উন্মাদ হাসিতে . খ এভাবে আসলে নিজের চামড়ার বাইরে বারবার ভেবেছি প্রেম তো আঙুলের খোলস আর নড়াচড়া জমিয়ে রাখে ফেলে দেয়  না-বোঝা স্বাদের মধ্যে কর্কশ ভাষাদাত্রী— তারপর অপেক্ষা লেখা কাগজটাকে কুটিকুটি করে ভাসানো যেভাবে হাসির শব্দ হালকা বৃষ্টির মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছিল

জাকির জাফরান

জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় : ১৭

. পোড়ামাটির বাটিতে হৃদয় নাচে দ্যাখো, কৈ মাছের নৃত্য যেন, আকাশী কানকো দিয়ে রচিত ঝুমুর। নলখাগড়ার দেহ দিয়ে প্রত্ন-শয্যা রচনা করেছ, এখন দেয়াল গলে নেমে আসে উড্ডীন পুকুর। চন্দ্রদ্বীপ জনপদে কে আছে চন্দ্রিমা তুমি ছাড়া বৃষ্টিবিনা তোমাকে ছোঁবো না, তবু দ্যাখো স্পর্শ-হারা হয়ে আছে এ-পুণ্ড্রনগর, তুমিবিনা বৃষ্টি নামে, ভিজে যায় মহাজনপদ, আর পিঙ্গল চোখের তারা। সমতটে, ঢিবির আড়ালে আমাদের দেখা হলো, যেখানে শিরীষডালে বসে চন্দ্রগ্রস্ত মাছি ভাবে— সহস্র বছর পর হয়তো এ-পাললিক ভূমি জন্ম দেবে এক সিংহশাবকের, অন্তিম শয়ানে যার রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে নীল সমুদ্রে জড়াবে, সেই জলরাজ্যে, জনপদে, জলকন্যা হবে তুমি।

অনন্ত সুজন

শঙ্খ

. যেন খ্যাতির সম্রাট, সুরের শোভাকর মৃত্যুর পরই সুগন্ধ আর সুনাম ছড়ায় শঙ্খ ও তার ধ্বনি—উপভোগ্য তাই মর্মের আফিম! যে কোনো বিবেকহীন সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা কিংবা রাতে। আত্মছায়া অতিক্রমণেই মহাকাল-মন্দির সমকাল যদিও যায় অনুদ্ধারে, স্বীকৃতিহীন হবে হয়তো নিঃসঙ্গ, তবুও অপূর্ব বেঁচে থাকা— দূরের সমুদ্রে গৃহস্থালি, সূর্যোদয়, স্মরণসভা।

তুষার কবির

সান্ধ্যগান

. সরাইখানার সান্ধ্যগান ঢের শোনা হলো এই গোধূলির ধূলিওড়া পথে— ময়ূরীর মনোলগ শুনে শুনে কেটে গেল কুঠুরির রক্তস্বর ভোর! দূরের বেহালাধ্বনি যেন আজ আছড়ে পড়ল এই ঘুমঘোর সরোবরে— ফেলে দেয়া স্বরগ্রামে শুধু যেন বাজতে থাকল অন্ধ নর্তকীর কান্না! শ্বেতপায়রার পালকের নিচে দ্যাখো আমি ঠায় বসে আছি—তার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় রক্তাভ মাংসের আভা— তার ডানা চিরে দ্যাখো হানা দেয় মদ, মধু আর ধাঁধা! কার্নিশের ছায়াভ্রমে লেখা হলো এই সান্ধ্যগান—ডাকিনীর ডাকবাক্সে জড়ো হলো যত মনোব্যথা—পাখসাটে মৃদুশব্দে কোথাওবা বাজতে থাকল শুধু বিষাদের দাহগাথা!

চন্দন চৌধুরী

ধানজ্যোৎস্না

. আমি জানি, আমার থেকে আমার বয়স কত কম আমার হারানো বয়সগুলো উঠে গেছে নৌকোয় ভিড়ে গেছে তোমাদের ঘাটে তোমরা নৌকো থেকে ধান তুলে নিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছ উঠোনে উঠোনে তোমাদের উঠোনজুড়ে আজ ধানজ্যোৎস্না হয় আর তোমাদের বাড়ির দিকে তাকালে আমার হারানো বয়সের কথা মনে হয়

তানভীর মাহমুদ

পূর্বগামী

. এ হাত তৈরি রাখি, কল্লোল প্রখর হয় শ্রুতির উজান, দেখার ওপারে ঝরে বিহ্বল আরাধ্য অবোধ আঁকগুলো, অনিয়ত এরা—ঘূর্ণিসরল, সৌম্য, উচ্ছল। প্রতীক্ষায় থাকা ঝরোকায়, রাতুল নিজেকে ঢালে গোলাপে। শাঁসালো নির্জনে পিষ্ট কুসুম হয় সুরভি উজল। সেসব সংকেতের দাসানুদাস এই হাত স্বাক্ষ্য ও উপস্থিতি পূর্বগামীর...

সজল সমুদ্র

অদল-বদল

. জলে পা ডোবানোর স্মৃতি আবার তোমার পাশে বসতে বলছে। ধীর গলায়, নিচু স্বরে। সন্ধ্যায় দুই দোয়েলের কথা যেভাবে হয়। যদিও উনিশশো নব্বই আজ লুপ্তপ্রায় নদী; তার ঢেউগুলো হয়তো বৃষ্টিবাহিত এইদিনে মৃত কোনো হাসের পালক হয়ে ঘুরছে কোথাও! যেভাবে গড়াতে গড়াতে বাঁশপাতা উড়ে চলে পাখির ভূমিকায়— সাতাশ বছর পরে বৃষ্টিবহুল এরকম কোনো কোনো রাতে, মনে হয় মাছ হই, কারো কারো জালে ধরা পড়ি, ভূমিকা বদলাই...

জুননু রাইন

শিরোনামহীন : দশ

. তাহলে চলো হাটে যাই অতীতের ডালায় তোমার ফুলগুলো সাজাই তোমার চোখের ভালোবাসার জলের দোহাই ক'ফোঁটা আবেগ ছিটিয়ে নদীটি জাগাই যেতে যেতে সে রাতের গল্প করি গল্পে বাঁধি সত্য, তুমি সত্যের কারবারি এখনো তোমার অভিমান— রাতের মিনারে নীল নামে ফোটে এখনো তোমার নামে পাখির গানেরা— সুরহীন পাহাড়ের বোবা সুরে রটে চলো যাই তোমাকে খুঁজেতে খুঁজতে পৃথিবীর হাতে মুখে ফসলের গন্ধ মাখাই তোমার গন্ধের নাম শান্ত সমুদ্রের ঢেউ তোমার চলে যাওয়াটি বটবৃক্ষের ছায়ায় উদ্দেশ্যহীন বসে থাকা কেউ চলো যাই তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে, খুঁজে পেয়ে তোমার হাতে তোমাকে গুঁজে দিই ... চলো না হাটে যাই।

অমিত চক্রবর্তী

স্মৃতি

. বিস্তৃত হলুদ হাইওয়ের দু’পাশে শস্যক্ষেত আর কিছু নেই শস্যের উচ্চতা ভেদ করে কদাচিৎ দৃশ্যমান হয় কৃষকের টুপির ত্রিভুজ কিশোরেরা, অদৃশ্য, আইল ধরে হেঁটে যাচ্ছে ওয়াপাকোনেটা গ্রামে সম্বিৎ ফিরে আসে সৌরালোকের নিচে আচমকা লাফ দিয়ে ওঠে স্মৃতি বল লক্ষ করে যেরকম জর্মন সেন্টারহাফ

কুশল ইশতিয়াক

বাউন্ডুলে

. জগৎ আমারে কিছুটা উন্মাদ বানায় কিছুটা উন্মাদ বানাও তুমি কিছুটা উন্মাদ নিজেই নিজেরে বানাই পাগল হবার মোটামুটি দূরত্বে আছি হাতের ভিতরে রাখি জমানা, মন্তর দিয়ে জাদুর গোলক করি ফুঁস কোথা থেকে আসি, কোথা যাই—জানি না বৃষ্টিছটায় ভিজে যায় মনের ভিতর মুখ বাতাস মূলত প্রার্থনা স্তিমিত সাদাকালো দিনে যেভাবে দাঁড়ায় এলোমেলো একটি গাছ; অথচ ভিতরে ভিতরে গাছও খোঁজে বাহানা; অনুরূপ এক শরীরে ঝুঁকে পড়ার আমি তোমার দিকে দু পা আগাই, তিন পা ফিরি নিজের দিকে মুখের দিকে তাকিয়ে বদলাই নিজের রঙ অর্ধেক আলো, অর্ধেক আন্ধার মেখে ফিরে আসি পথের ধারে, যেথা তোমারে বিদায় দিছিলাম কিছুটা উন্মাদ আমারে জগৎ বানায় কিছুটা উন্মাদ বানাও তুমি তোমারে খুঁজে পাই, পাই না খোদা পাগল হবার কাছাকাছি দূরত্বে আছি।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

ইমেজ

. রাজহাঁস—নদীতে ফেলে যায় ডাকের প্রতিধ্বনি। নির্বিশঙ্ক বাতাস নদীতে শুয়ে মিশে কম্পনসুরে। নদী জেনে গেছে ঢেউ না পেলে মরে যাবে মাছের প্রেম। নদীও প্রেমে পড়ে—ঢেউয়ে ঢেউয়ে জোয়ার তুলে মিশে নদের গায়ে। অথচ মানুষ প্রেমে পড়লেই খুনি হয়ে যায়। ঘুম খুন করে মিশে রাতের শরীরে। অতঃপর শিশ্ন আর যোনির ছটফট—ফুটফুটে চিৎকার কানে আসে। সকাল উঠানে দাঁড়ায় রাতের স্তব্ধতা ঘুচিয়ে। নিমগাছ কাছে এলে রোদ ঘেঁষে পাতার কাছে। আর পাতার মর্মরে শিস রেখে উড়ে যায় প্রতিটি পাখির সকাল।


নুসরাত নুসিন

ডুবগান

. যারা সবুজ পাতার চাহনি ভালোবাসে তারা আজ একখণ্ডকাল তাকিয়ে থাকতে পারে একটি সুতরু পাতার অভিমুখে আর নিজেদের উজ্জ্বল হিমোগ্লোবিনে সাঁতার দিতে পারে আরো খণ্ড তন্দ্রাকাল— নিয়মিত ছায়ারা ফিরে গেছে । এখন পাতার ফাঁকে ফাঁকে সুডৌল ডালিমফুলের গান, যথেষ্ট বাতাস। এখন যেকোনো ডানার মতো উজ্জ্বলতর সুরে ঝলকে যেতে পারে যেকোনো সূচনাবিন্দু, দিনের নাভিবিন্দু আর জলপাই চোখের বিবিধ রহস্য! কামনা তো মধ্যবর্তী দোলক, ছায়ারা পরাশ্রয়ী হলে— মাঝে মাঝে এরকম সহজিয়া দোল আসে ।

অনুপম মণ্ডল

ডানা

. সংকল্প হতে আরেকবার উৎপন্ন হও তুমি বিমূঢ় মনটাকে টেনে তুলতে তুলতে বললাম তাকে তার বুদ্ধি নির্মল; চিত্ত তৃপ্ত ছোট ছোট মাটির ঢেলা পেরিয়ে, বাতাস বয়ে চলেছে 'কে শরণ যথার্থ নিতে পারে' দেখি তার চক্ষুর কাতর দৃষ্টি আজ ছিঁড়ে পড়ছে শান্ত মেঘখণ্ডের মতোই উড়ছে তার ছিন্ন বসন

তানভীর আকন্দ

সনাতন

. ধনুকের বক্রতায় বাজে এই রাত, লুটিয়ে পড়েছে যেন— শিকারের রুদ্ধশ্বাস ছুটন্ত তারার পিছে পিছে, সহস্র ব্যাধের গল্পে এই ব্যাসার্ধ বিবৃতি শুনি, মৃতচাঁদ কোথায় পেয়েছে ঠাই, কোন মরুভূমে? কুয়াশার স্মৃতি ভুলে বাজিয়ে গিয়েছে কারা ভঙ্গুর এস্রাজ? ফুল থেকে ফুলে জন্মসারাৎসার মেখে চলে গেছে, অবারিত পালকের নিচে, সহসা সলাজ মুখে দেখি ঘুঙুরের নীতি লেখা আছে, অসহ দর্পণে আছে সুর, আছে রচিত সুঘ্রাণ— এইসব কথকতা ভুলে যাও, ভেঙে দাও রাতের আসরে দেখা নাচ, মোহিনীঅট্টম।

হুজাইফা মাহমুদ

আরোহী

. নিঝুম সে পাহাড়ের মন বেয়ে উৎসারিত যে কল্লোল ঝর্না, আর তার নিচে অগণিত নুড়ি আর পাথর, নিশ্চুপ, অন্তর্গত সুর বুকে নিয়ে যারা ধ্যানে ও ঘুমে, সেদিকেই যাই, হারানো চিহ্ন খুঁজে খুঁজে, পেছনে ফেলে আসি ঘোলাটে রাত, হরিণ-বালিকার পানশালা, স্থির তরঙ্গের মতো এই ঢালু পথ বেয়ে তবু ক্রমশ উঠি আর নামি, ঊর্ধ্বে ও নিম্নে, বেয়াড়া বাহনের পিঠে চেপে পারব কি পৌঁছাতে কোনোদিন, ঝর্না ও আাঙুরের বনে? পরাহত চোখে ধরে রাখি গুঞ্জনরত দৃশ্যাবলি, আর দৃশ্যের ভারে নুয়ে পড়ে মাথা ও চোখ, আমি সেই একাগ্র বাদক, গভীরতর পাহাড়ের মন ছুঁয়ে দিনমান একই লয়ে বাজাই নির্জন ঘণ্টা, আর একাকী ঘূর্ণ্যমান পৃথিবী ডুবে যেতে থাকে এক বিপন্ন ভাবনায়!


আরও পড়ুন : ঈদ সংখ্যার কবিতা ১
সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা