রোহিঙ্গা : রক্তের রজনীগন্ধা

মাসুদ খান

অহিংসা, শান্তি ও প্রেম

. আমরা অহিংসায় বিশ্বাসী— আমাদের এ-কথায় বিশ্বাস না গেলে কিছুটা তো সহিংস হতেই হয়! সহিংস হয়েই বোঝাতে হয় অহিংসার মর্ম। জীবহত্যা মহাপাপ বটে, নরহত্যা নয়। এভাবেই আমাদের অহিংসার জয়। আমরা শান্তির ধারক, বাহক ও নিষ্ঠ সেবক— আমাদের এই এত সুন্দর শান্তিবাগে না এলে, শান্তিসেবা না নিলে কিছুটা তো অশান্তি করতেই হয়! অশান্তি করেই বোঝাতে হয় শান্তির মাজেজা। আমরা প্রেমের পূজারি। আমাদের প্রেম—ক্ষারকের মতো খর।

মজিদ মাহমুদ

মানুষ

. আমার ঘরের দরোজা আজ খুলেছি রাতে কুকুরের তাড়া খেয়ে যে সব মানুষ রয়েছে তফাতে যে সব শিশু ডুবিছে পানিতে তাদের তরুণ দেহখানি তুলে নিতে আমিও যে মানুষ ছিলাম অন্তত গল্পে শুনেছি তার পরিচয় কখনো কি দিয়েছি কখনো কি নিজের ব্যঞ্জন থেকে একটি শাকের ডাঁটা দিয়েছি তাদের দিকে কখনো কি বলেছি—এসো ভাই যে সব জানোয়ার তোমাদের তাড়ায় আমরা তাদের সাথে নাই এসো ভাই—এই নাও তৃষ্ণার জল আমাদেরও নাই খুব বেশি সহায় সম্বল যদিও আমাদের বাড়ির আঙিনা আমাদের থাকার জন্য যথেষ্ট না তবু মানুষ ডুববে পানিতে মানুষ মরবে উত্তরের শীতে বুলেটের তাড়া খেয়ে যারা এসেছে পালিয়ে যাদের ঘরবাড়ি শিশুদের দিয়েছে জ্বালিয়ে তাদের কি এখনো বলব তফাত তাদের কি বলব তোমরাও বজ্জাত এখানে হবে না তোমাদের ঠিকানা এখানে কুকুর ও মানুষের প্রবেশ মানা আমার অন্তর আজ এইসব জিঘাংসার অপরাধে নীরবে নিভৃতে একাকী কাঁদে তাই আজ রাতে খুলেছি আমার ঘরের কপাট দিয়েছি লিখে এই নিঃস্বদের রাজ্যপাট অনেক হয়েছে ভাই—এবার ধরো প্রতিরোধের লাঠি আঁকড়ে ধরো মা মাটি মারো—মরো নিজের মৃত্তিকায় আমরা সাথে আছি—তোমাদের ভাই দানব বধের মন্ত্র আমাদের আছে জানা মানুষ বিপন্ন হলে আমরা নিশ্চুপ থাকি না।

চন্দন চৌধুরী

লাল শার্টে নিজেকে রোহিঙ্গা লাগে

. কিছু মৃত্যু বিক্রি করে ফিরছিলাম, যেরকম সবজিবিক্রেতা নিজের জন্য রেখে দেয় শাকের শেষ আঁটি, তেমনি আমারও আছে একটি লাল শার্ট। আজ সেই শার্ট গায়ে তুমিও পাহাড় দেখতে পারো, সবুজ দেখতে পারো, নদী এবং সাগর দেখতে পারো, তারচেয়ে  বেশি দেখতে পারো আগুন; শুধু মানুষ দেখছ না।

কেননা মানুষ শুধু জাতিসংঘে থাকে।

আজ লাল শার্ট গায়ে দিতেই নিজেকে রোহিঙ্গা লাগছে। মনে হচ্ছে নাফের নীল জলে শঙ্খচিলের ধারালো ঠোঁটে একটি রক্তাক্ত মাছ হয়ে খুঁজে ফিরছি মানুষের মুখ।


আবু মুস্তাফিজ

রোহিঙ্গা

. মিস্টার টী, পবিত্র গাছের গোড়ায় পানি ঢালা বন্ধ করো কী ঠ্যাকা পড়ছে তুমার গাছরে বাঁচানির তার চাইতে আহো পকেট থিক্যা একটা কুঠার বাইর করি আর গাছের গোড়ায় কোপ দিতে থাকি গাছটা যখন পইড়া মইরা যাইব তখন তার ডাইলে বাসাবান্ধা পাখিরা চিক্যার পাড়তে পাড়তে উইড়া যাইব সে দৃশ্য দেখতে না পারলে এ জীবন বৃথা..


স্বরূপ সুপান্থ

গণিতের গান

. অতন্দ্রিলা তোমার লাস্য ও লীলা এই জলে ডুববে না শুধু ঘর-পলাতক নিরুপায় মানুষের লীলা সাঙ্গ হবে জবাই করা মুরগির ফিনকি ছোটা রক্ত নিয়ে সীমানার ভেতরে অধিক নৃত্য সহ্য করা হবে না কানের কাছে শুধুই গুঞ্জরন—ঘুড়ির বোকাট্টা ধ্বনি কে থাকে পাহাড়ে সাঁওতালদের গ্রামে বিষাদ বড় ঠেলে গণিতের গান নিয়ে সীমান্তপারে থাকে অতন্দ্র প্রহরী বোঝাও অতন্দ্রিলা লাস্য ও লীলা কেন এত ঝরে!

আলমগীর নিষাদ

রোসাঙ্গের জাহাজ

. রোসাঙ্গ থেকে নূহের জাহাজ আসবে মাস্তুলে পতপত করে উড়ছে পতাকা, দীনেশচন্দ্র এখনো আসন গ্রহণ করেন নাই তিনি এলেই সাইরেন বাজবে। তাদের সম্ভাষণ জানাতে আসাম থেকে ত্রিপুরা থেকে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিহার ও উড়িষ্যা থেকেও স্বজনেরা এসে জড়ো হচ্ছে আরাকান-প্রান্তে নাফ নদীর কিনারে হাশর বসেছে। সবাই এসেছে, কেবল জিন্নাহ আসে নি নেহেরু আসবে না মুজিবর স্মৃতিভ্রষ্ট। নাফ নদীর ওপারে শরশয্যায় আলাওলের ঘোড়া। রোসাঙ্গ থেকে শেষ-বাঙালির জাহাজ আসছে নাফ নদীর প্রান্তরে জমা হচ্ছে পিঙ্গল দাওয়াতির ভিড়।

মাইবম সাধন

রোহিঙ্গা

. ওপারে বলে বাঙালি এপারে ডাকে মুসলিম মধ্যিখানে নাফ স্রোতস্বী জলে ডুবে জলে ভাসে জাতি-ধর্ম-বর্ণে বিচূর্ণ জাহান!  

রোহিঙ্গা-২

. পথের প্রান্ত কি জানে মেঘের গূঢ়তা? হয়তোবা, মেঘেই লুকানো বৃষ্টির ব্যঞ্জনা থকথকে রোদ, অবিশ্রান্ত চোখ আকার-প্রকারে প্রখর নদীভয়, ঢেউ— তুমুল সাঁতারে না-ফেরা কন্যা, দুধশিশু মাইলের পর মাইল বাক্স-পেটরা হা-ভাতে শীর্ণ দেহ, প্রান্তর-পোড়া ভিটে জেনো—একটি ইতিহাস দুয়ার খুলেছিল শোনো—একটি ইতিহাস দুয়ার বন্ধ করেছিল সে ইতিহাস বৃষ্টি ঝরে                             শরণার্থী শিবিরে                                                        কত-শত ব্যঞ্জনাশেষে বৃষ্টিও রেখে যায়—গভীর ক্ষত!
সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা