বারীন ঘোষাল—এই অনন্যসাধারণ কবি, প্রাবন্ধিক, চিন্তক ও 'নতুন কবিতা'র তাত্ত্বিক চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। কিন্তু তার সৃষ্টি ও চিন্তার মৃত্যু নেই। বারীনের প্রস্থান হয় না, হয় অন্যকবিতা যাত্রা।
তাকে উৎসর্গীকৃত কবিতায় পরস্পরের শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাই তো তার সহযোদ্ধা কবি স্বপন রায় বলেছেন— 'কান্না নয়। কবিতার উল্লাস করো সবাই। বারীনদা কান্না পছন্দ করত না। বারীনদাকে কবিতা দাও। দিয়ে বলো চিয়ার্স! ইয়াং ম্যান খুশি হবে!'
● ● ●
ধীমান চক্রবর্তী সুরকার
শীতকালের কিছু ভালোবাসার গান থাকে। ভাড়াগাড়িতে বালি, ঝিনুক আর নীল জল। এ শহর ছাড়িয়ে চলে যায় ব্যবসার কাজে। পার্কের ওপাশে বহু কারণের জন্য বেঁচে গাছপালা, কাঠের বেঞ্চ ও রোদ্দুর। সেই মেয়ে। কম্বল ছড়িয়ে ওম দিল ওদের। যে দু শ বছর আগে জেগে ছিল তৈলচিত্রে। পটাপট খুলে যাওয়া বোতাম আনমনে ব্যাগ গুছিয়ে দেয় ললিপপের। রেস্তোরাঁর এক কোণে বসে, দূরত্ব মাপি খুলে যাওয়া সেলাইয়ের। শামিয়ানার নিচে নববর্ষ। ক’দিন পর তার সোনালি এবং অন্ধকার সাজিয়ে রাখব তেপান্তরে। টুপি খুলে অভিবাদন জানায় পরিপাটি বিছানা। হেসে ওঠে বাদামি সিলিংফ্যান, প্রাণায়াম। চিলেকোঠায় বসে তুড়ি দিয়ে বাজাতে থাকি শূন্যের যোগফল। মায়া।
সৌমনা দাশগুপ্ত ধানের ভেতর অন্ধকার
১ একটা খাতা পুড়তে তিন থেকে চার মিনিট লাগে। আমার আপাতত তত উৎসব নেই। ধর্মবক কড়া নাড়ছে। এদিকে ঘরের ভেতর বসে ছবি আঁকছি। আমাদের তো এমনি এমনি রং। মাটি ঘষে ময়ূর ঘষে শেষ অব্দি বকের পালক অব্দি টাঙিয়ে দিয়েছি ক্যানভাসে। তোমারও চাষাবাদ অল্প। এ বছর শিমুল তুলোর জন্য অনেক গান জমা করব। স্নানের ভেতর তোমাকে ভাবতে গিয়ে আমি ভ্রমণ ভেবে ফেলছি। আর সাবান জমে যাচ্ছে আর সাবান জমে যাচ্ছে। জলের সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতিস্থাপকতা শুধুমাত্র হাঁসেরাই জানে। আমি তো সমুদ্র চিনি না। জাহাজও দেখেছি শুধু দূর থেকে। ওদিকে যুদ্ধের গন্ধ আছে। ঢেউ এবং সংকেত। তোমার আয়নাতে প্রতিদিন মেঘের দাগ লেগে যাচ্ছে। চিঠি পাঠালেই ভালো হতো, ই-মেইল। নিদেনপক্ষে রাতের এসএমএস চালাচালি। আমি পোর্ট্রেট আঁকতে আঁকতে ঘুমিয়ে পড়ছি। আমি পোর্ট্রেট আঁকতে আঁকতে জেগে উঠছি। আর মেঘের ভেতর শকুন ঢুকে যাচ্ছে, মেঘের ভেতর কবরখানা ঢুকে যাচ্ছে। তুমি বলেছিলে এ কবর বেওয়ারিশ লাশেদের। এত সব সামলানো তোমার কর্ম নয়। তুমি বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠেছিলে আর তোমার আয়না ভিজে যাচ্ছিল বরফ পতনের শব্দে। প্রতিদিন দুতিন ডোজ ঘুম খুঁজতে খুঁজতে আমি হাওয়ার দিকে চলে যাচ্ছি, মেষপালকের দিকে
সৌমিত্র সেনগুপ্ত অ্যাসাইলাম- ২৭
দূরত্বেও তোমার পরছাঁই দিন ভাঙার শব্দে দু-চার পশলা আভাস যেন ধ্বনিমাত্রার বদলে এখুনি জেগে উঠবে ঘুমশহর নেকাব সরিয়ে চোখ রাখবে নথনীর পাথরে আকাশ স্যালাইনে
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় জানি না বারীনদা
তোমার জলপাইগুড়ি আর তোমার বাড়ি তোমারই থাকল। এই শীতে আবার জন্মদিন। পায়েস আড্ডা বোরোলি মাছ আর কবিতা আর তুমি আর তুমি আর তুমি আর তুমি। আমি গাড়ি নিয়ে স্টেশনে থাকব বস।তুমি একদম চিন্তা করো না। বাড়িতে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। এই শহর তোমার জন্য হা করে বসে আছে। আমাদের কমরেড আসছে। ইন্দু বাবানি দেখ জানালায় হা করে দাঁড়িয়ে। মা চা বানাচ্ছে বারীনদা। মন্দিরা চাপড়ঘণ্ট রেডি করছে। বাবা তোমার হাসির অপেক্ষায়। আর আমি জানি না বারীনদা। প্লিজ আসো। এবার শীতে আসতেই হবে। আমি যাব জামশেদপুর। বল... আমি গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসি।
সব্যসাচী সান্যাল খুব সম্ভবত একটি প্রেমের কবিতা
আমাকে কে ডিফাইন করে? আমার অবস্থান নাকি তোমার ও আমার অবস্থানগত কনফ্লিক্টগুলি আমার চশমার ডাঁটি বেয়ে রোদ তোমার রুমালে চাঁদের মহড়া আমি আসিব না আসিব না ফাগুন গেলে মানে আসব না, আসিব না এখানে ফাগুন ছাড়া আমার অবস্থান ভিন্ন-অক্ষাংশে ঘাসে ঘাসে হেলানো ভায়োলেট তুমি তো ওহো ফাগুন ফুরায় যদি তবে থাকো পুরোনো বাংলা গানে ডাকো আমি তো হলাম না মানে, খুব ডেফিনিট হলাম না কনফ্লিক্টের দারুণ অভাবে খুব ভাসা ভাসা দৃশ্যত অস্পষ্ট শ্রবণে প্রকট এই আমলকি বনে তুমিও হলে না।
মুক্তি মণ্ডল স্বপ্ন
(বারীন ঘোষাল-কে) প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখি গভীর কুয়াশার ভেতর পড়ে আছে ব্রাত্যজনের ফসিল ভাঙাচোরা সহস্র খুলির গর্ত থেকে হেসে ওঠে জলমগ্ন বৃক্ষদের হাসি পোকায় খাওয়া সবুজ ফলের অভ্যন্তরে আমি লুকিয়ে ফেলি ভদ্রতাবোধ সমাজচ্যুত মনুষ্য হাহাকার খুঁজে ফিরছি একা কোথায় পড়ে আছে রীতিশূন্য ধূলিবসনের প্রণীত আঁধার দেখছি চারিদিকে উড়ে চলেছে সঙ্গোপনে বোবা মানুষের অসংখ্য চোখের জ্যোতি
তুষ্টি ভট্টাচার্য কমলা বাগান- ১০
গাছের গোড়ায় থেকে যেতে পারে বিষাক্ত সাপ ঘাসের নিচে লুকনো কীট দংশন করতেই পারে এসব ভাবার মতো কিছু নয়, ভয়ের ভাবনা ছেড়ে এখানেই খোলস খুলেছে মেয়ে বৃষ্টির ধারা ভেজায় যেভাবে, শুকিয়ে পড়ে পাতা হেমন্ত থেকে বসন্তের মাঝে শীত থাকে থেকে যায় ফলের পেকে উঠার মরশুম ওগো মরশুমি ফল, তুমি কি ফুলের কাছে ঋণী? ঋণ লুকিয়ে থাকে যেভাবে চাষীর ব্যস্ততায়, অনাদায়ে আত্মঘাত?
চন্দ্রা দাস রায় বারীনদা
রক্ত মাংসে কারীকাতুয়া হয়ে যাচ্ছ না হয়ে কথা না বলা জামা জুতো প্যান্ট হওয়া তার চেয়ে ভালো মাটির কষ্ট দেখে অন্ধ থাকা যায় নদীর বিষাদ দেখে চুপ ধুলো মাড়ানোর কষ্টগাথা নিঃসাড় রোমকূপ নিয়ে চুপকথা তোমার বৈতালিক শুনে অন্ধ বাউলের ঠাট্টা জঞ্জাল স্তূপে শিস দেওয়া বাতাস লজ্জা পাওয়া চিতাকাঠ মানুষের গহনা স্বভাব জন্ম হলে থাকে আর কিরীটের গুড়ো গুড়ো রেণু মানুষের মৃত্যু নিয়ে নৌকো ছোটে গঞ্জে হাঁকাহাঁকি, হাটে হাটে ব্যাপারী গেণ্ডুয়া জমে ওঠে, আতা গাছে তোতা পাখি দোলে আর দাঁড়ে কাকাতুয়া—
শঙ্খদীপ কর বারীনদা'র জন্য
আপস পেরিয়ে আসা মানুষটা অন্য মানুষ নিচু দরজা আবাদঘর
মাজুল হাসান চির ফেব্রুয়ারি
হাসান রোবায়েত স্যালারির চিঠি
এইখানে দুপুর ডালিম অব্দি যেতেই ফেটে লাল তখন ঘড়ির ভেতর বসে বসে কেউ একজন ফুলচারা লাগাচ্ছেন—অনেক দূরের থেকে সেসব ফুটে ওঠা কল্পনা দুলছে ব্যথায়— পাতাটা ভাষার দিকে ঝুঁকে আছে যেন তোমাকে ডাকছে লাল এলাচ ফুলের হাওয়া— মাটি ও ঝরার পাশে হাঁসেদের বক্রতার দিন অনন্ত ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে আবার যতটা ভর রাখে একটি মৌমাছি এলাচ ফুলের উপর— অন্ধ লোকগুলো সমুদ্রের ঢেউকে ভেবে নেয় যেন হিমজুঁই ফুটে আছে রক্তহাওয়ার ভেতর একটি ধানের শীষ হেলে আছে চাঁদের আলোর ভারে— কারো স্যালারির চিঠি ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টিতে
মাহমুদ টোকন বারীনদা
ঘুমজাদুকর তুমি কবিতা শেখো নি তাহলে চৈত্র মাসে ফাগুনের ভ্রূণ খাতা খোলে?
পর্ণমোচী অনিন্দিতা গুপ্ত রায়
উদ্দেশ্য বা বিধেয় কোনোকিছুই বিবেচ্য ছিল না সামান্য পথের তফাতে পৌঁছনোর কথাও ছিল না অনভ্যাসের চিহ্ন ক্রমশ সারিয়ে তুলছে এই মরশুমি অসুখ প্রতিটি জুলাই থেকে তুলে রাখার ছিল যে সমস্ত একটা জীবনে কিরকম অগোছালো হয়ে আছে আসক্তিহীন তাই পাঁজর অবধি গেছে তির, তার নিচে পর্ণমোচীর একা পাতা খসবার যত উদাস লিখিত
বিদ্যুৎলেখা ঘোষ আর্দ্রা নক্ষত্রের রাতে
ইশরাত তানিয়া সম্মত
বৃষ্টির ছেনালিপনা আর বখাটে হাওয়ায় বেয়াড়া হুড থাকে না গড়িয়ে পড়ে সবুজনীল ঘণ্টিরা অন্য কথা বলো আয়না কী গল্প এলো মাঝরাতে?
জয়শীলা গুহবাগচী আত্মঘাতী
(১)
অতনু সিংহ বারীনদাকে
শব্দের ছাল ছাড়িয়ে কুসুমের ভিতর কী খুঁজেছিলে কাপ্তেন? কীভাবে নিজেকে ছাড়ালে আর আমাদের কুয়াশাপ্রহরে একাকী বাজালে বিউগল, একা একা সব তাপ কীভাবে নেভালে শেষের এ শলাকায়! আর দপদপ দপদপ অক্ষর, শব্দ ও যতির কর্ষনে কোন অতল পেলে আজ, কোন মদ পেলে, কোন সে জ্যামিতি ভাঙা নৈঃশব্দের তটে জমলো উন্মাদনার হাশিস আকাশ আর ঝিম ঝিম, অনর্গলের ঝিম, ঝিম থেকে খুলে যাচ্ছে একেকটি শব্দের, যতির, বাক্যের শাঁস, বীজ, তন্ত্র, বেদনা, হুল্লাট প্রথমে বাক্য থেকে তুলে নিয়েছ নিজেকে তারপর বাক্যের সকল পরিসর, যেমন রেললাইন, মালভূম জিপ, অরন্যের ফিসফাস, ময়দানের ঘোড়া, কফির টেবিল, গেলাস চলকে পড়া মদ, আকন্ঠ কবিতা, কবিতায় শ্বাসাঘাত, সাউন্ডস্কেপের প্রশান্ত এলাকা, আর অহেতুক ঝাঁপিয়ে নামা গঞ্জের ভিড়, এসকল পরিসর থেকে পাত্তারি গুটিয়ে নিলে হইসেল বাজালে নিজেই, নিজেই ধুয়ে নিলে পাহাড়ের ফুটবল... আমরা দেখলাম, নিরুত্তর শব্দের ভিতর একাকী সিঁড়ি দিয়ে আলো কেটে কেটে আলোর আড়ালে চলে যাচ্ছেন কাপ্তেন বারীন ঘোষাল!
বহতা অংশুমালী বারীনদা
যেসব দোকানে ভালোবাসা পাওয়া যায় আমি পারলেই ফাঁকতালে ঢুকি না ঢুকতে পারলে তাদের কাঁচের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি কে কার কানের পাশে চুল সরিয়ে দিলো কে যেন কাঁদছিলো আর কে পাশে চুপটি বসে ছিল হাতে হাত রেখে ঠাণ্ডার সময়ে সেই কথা সব নকশা কাটে দোকানের কাঁচে মিঠে মিঠে ওম ওঠা ছোট ছোট কথা!
জয়িতা ঘোষ বারীনদা, শোনো
শুভঙ্কর পাল ঈশ্বরকেই সর্বনামে
ঈশ্বর দাঁড়িয়ে আছে কেলাসন ভেঙে নীল পাতনে যে লোকটি গ্লাস তুলে নিয়েছিল হ্রদের ধারে তিনিও ঈশ্বর আগুনের শিখায় উষ্ণতা শরীরের ভিতরকার দ্বিধাগ্রস্ত রাতের কাছে বোহেমিয়ান ক্রিয়াপদগুলি শুতে চাইছে বালিশে কম্বলে। ঋতু নয়, উপনিবেশের বিরামহীন চিৎকারে ডাকঘর থেকে ফিরে গেছে কার্নিভ্যাল টাকার পুরুষাঙ্গে বাহবা দিচ্ছে কেউ কিছুই লুকোবার নয় পাহাড়ের কাছেই গ্রীবা পেতে রাখা একটি চাঁদের চেয়ে দ্রুতগামী নকশা, আর—নক্ষত্রপুঞ্জের জলাধারের সুখ। পেঁচারা আঁতকে ওঠে প্রবীণ বৃদ্ধের মতো শোকের ছায়া নামার স্পষ্ট অবসর জলের ওপর ম্লান হয়ে আসে ছায়া তরঙ্গ কিংবা একলা মোমবাতি হাতে ঈশ্বরকেই সর্বনামে গ্লাসে চুমু খেতে হলো...