আল মাহমুদ : নিবেদিত পঙ্‌ক্তিমালা

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

প্রধান ইমাম

যেন বখতিয়ারের ঘোড়া চড়ে এলে বাংলা কবিতায় পুরুষের পৌরুষ জ্বালিয়ে—যেন বীর তোমার কবিতা। ধু-ধু উড়ছে পতাকা—লোক লোকান্তরে, যবে নিরাশার কাক উড়ে জিনের গভীরে। শুধু রক্তহীন ব্যক্তি-প্রেম, হিংসায় আকীর্ণ পুরসভা—রাজ সিংহাসন। যখন বিকল ইটপাথরের জনাকীর্ণ—বাংলা পদাবলি। তুমি এলে—যখন কাবিনহীন লক্ষ যুবক যুবতী দেহ-মনের মিলন নেই, পুরুষ নির্বীজ ঘর পরিবার। মানুষ একার পূজা করে, দূর থেকে দূরে জ্বলে কওমের ঘর যেন তুমি ইউসুফের ভাতৃক্ষমায় শানিত—যূথবদ্ধ হিজাজের জল। তুমি দেখিয়েছ—কিভাবে মায়াবি পর্দা দুলে ওঠে কিভাবে আজান আসে মিনার মিনার ছেড়ে—লালরেখা বাংলা কবিতায়। দেখালে কেমন—আমাদেরও বদর আছে, আছে পয়গম্বর কামেল লিখে দিলে—কিভাবে কোরান পড়ে ‘মক্তবের মেয়ে আয়েশা আক্তার’। না হলে যে জীবন বাবুর মত দেখতাম দূর থেকে রূপসি বাঙলা জানতাম না যে উগোল মাছের মত কিভাবে নারীর প্রণয় নিতে হয়। বুঝতাম না যে কিভাবে কাবিলের বোন পড়ে আদমের সঙ্গী হতে হয়, তুমি আমাদের আল মাহমুদ—বাংলা কবিতার প্রধান ইমাম।  

মৃন্ময় চক্রবর্তী

তিতাস নদীর হরিয়াল

দাঁড়াও দাঁড়িয়ে যাও ইশারাকে হাত নেড়ে দিয়ে যাচ্ছি তোমার কাছে কোথা যাও হরিয়াল টিয়ে এখানে তিতাস ছুঁয়ে উড়ে যায় পাখির হৃদয় আকাশে ফুটেছে ফুল তোমারই ছোঁয়ায় নিশ্চয় ধানের গভীর শাঁসে যে গোপন সমতার সুর অনুবাদ করে তুমি দিয়েছিলে কালের নূপুর মাটির গভীর থেকে কান পেতে শুনি সেই গান জীবনানন্দে ক্ষত ছেঁড়া দেশকাল অভিমান খরস্রোতের বাঁকে কিছু খুঁত ছুঁয়েছে আঙুল আমরা রাখি নি মনে সাগরের জলে কত ভুল তুমি তো সবুজ টিয়ে টেনে আছ শিকড়ের দিকে শব্দস্বদেশে ঘুরি, প্রতিদিন পাঠ নিই শিখে জমা করি ঘন পাপ, সোনালি কাবিনে রাখি খুদ দাঁড়াও নক্ষত্রগাছ হরিয়াল আল মাহমুদ।  

সুজাউদ্দৌলা

কবি এক অবিমৃষ্যকারী

মানুষ ছাঁচে ফেলে দেখতে চায় মানুষকে পোশাকের মতো মাপতে চায় গজ ফিতায় মনস্কামনার অ্যাকুরিয়ামে রেখে দিতে চায় জিয়ানো মাছের মতো মনোহর এইসব গড়পড়তা মানুষের সাথে কবিকেও একই কফিনে ভরে একই কবরে রাখে কিন্তু কবি তো কফিনে থাকে না কবরেও নয়     কবি থাকে কেবল কবিতায় ভক্তের বন্দনা আর নিন্দুকের কুৎসা কোনোটাই কবিকে মাপতে পারে না কবি কোনো ফরমায়েসি জামা নয় ছাঁচে ঢালা প্রতিমূর্তি নয় এক অবিমৃষ্যকারী সত্তার নাম কবি।  

সারাজাত সৌম

আল্লাহর আস্তিন

কবিকে ভালোবাসার দায়ে— আমি পুড়ে যেতে পারি অনর্গল                                     শব্দে—দৃশ্যে পাগলের মতো কাঁদতে পারি হামেশায়— নগ্ন শরীরে। রাস্তার মেয়েমানুষদের ডেকে এনে বলতে পারি— এই তোমরা কি শুনছ না, কবির যথেষ্ট বাসভূমি নেই আর এখানে! অথচ ভালোবাসার দায়ে— জীবনটা কেমন অতিষ্ঠ হয়ে মারা গেছে সে                                    ফুলের পাশে! এ শুধু দরদিয়া কাঁচের পাখি— পালকের নিচে ঘাম পুষে রাখা পিতা—পুত্রের হাসি, কেমন হিবিজিবি লাগছে আজ— জলের নিচে তবে ঘুরেফিরে              মারা যায়, যাক সোনার সব মাছ তারা কে এখানে, কেইবা কার? যত উচ্ছ্ল তরুণী—                   হলুদাভ দিন বেণীতে গুঁজে রাখুক সন্ধ্যার বাতাস— হা-হুতাস এই পাপ ও পালঙ্কের স্মৃতি আর এখন তোমার ছেলেদের ফিরিয়ে নাও— ঠিক চিবুকের মাঝখান থেকে,                                 বাঁকা মুখে— এই অভিশাপে— তারাও যেন মরে যায় কবিতার মহারোগে তবু মানুষের হৃদয়ে— শিমুল ফেলে রেখে, কে যায় আজ নিরুদ্দেশ! তাকে বাঁধা দাও— ডেকে আনো তোমাদের মাঝে বারবার, যেমন বসন্ত আসে আর ফিরে যায় বুকের কাছে ব্যাথা রেখে বলো, কে যায়— নিশ্চুপ আল্লাহর আস্তিনে লুকিয়ে।  

উৎপল দত্ত

লাইফ সাপাের্ট

ঘরের পিছে কার্পাসের ফুল ঝরে গেছে শবরি বালিকা তাই কেঁদে ফিরে যায়— নিশিন্দা নারীও কি হারায় অবেলায়! বিরােধের সীমান্তে গােধূলি ছড়িয়েছে। অস্ত্র ও অশ্রু সমান ধারালাে হয়ে যায় কালিঝুলি, আলাে মাখে না তার গায়। ধূলি ঝেড়ে আজ—এই দিন ছুঁয়ে দেখি ঠিক বেঁচে আছে। হাতের নাগালে, খুব কাছে। লাইফ সাপাের্ট ছাড়া সােনালি কাবিন।  

কাউসার মাহমুদ

বৃক্ষরাজ

দুর্মর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে গেলেন কবি প্রাচীন গুহার ভেতর তপস্যারত নির্মোহ যাযাবর সন্ধ্যার কোটরগুলো কি নিদারুণ অসহ্য বিবাদে ঘেমে গেছে আমি শুনতে পাই শুধু মাহমুদ, মাহমুদ এ আবিল ছড়ানো কুমারী কুসুম নীল আকাশ মেঘ দেয় রাজ্যের পাটাতনে বসে শুনি আর্তনাদ দূরবর্তী কোনো অশ্বের পদধ্বনি ভেঙে দেয় আমাদের বুক তিনি হেঁটে যান, সমস্ত ভীতু ও ব্যর্থ রাষ্ট্রের মৃত্যুর উপর। নতজানু লুক্কায়িত এ অহমের কাছে গাভিরা নুয়ে পড়ে হালের গভীরে বসে তারা ঘাস খায়, শুধু কবিই হেঁটে যান, নিরুত্তাপ স্নিগ্ধ জীবনের ওপারে একটি জলধির পাশ ধরে পরকাল কাছে এসে— তাকে নাড়া দেয়। আমাদের ঘনতৃণ মুলুকের পর ছায়াবিথি দীর্ঘ পথের কোণে একাকী উজ্জ্বল একটি গাছের মতোই দাঁড়ানো বৃক্ষরাজ।  

তুহিন খান

এলিজি ফর আ পোয়েট

আমি তারে চোখে দেখি নাই। ভেবেছিলাম একদিন—নিশ্চয়ই—একদিন তার সাথে দেখা হবে, দাঁড়াব বিষণ্ন তার ছায়ার কাছাকাছি— অথচ এখন, এই অপভ্রংশ সময়ের মোড়ে যারা তারে দেখেছিল তাদের চোখের অন্ধকার ভেজা গন্ধে ঠায় চেয়ে আছি! একদিন বর্তমান ছিল এই ধ্বনি আজ তারা প্রতিধ্বনি হয়ে ঘোরে সময়ের গহ্বরে, কথাগুলো উপকথা হয়ে হাওয়ার লাবণ্য নিয়ে জমে থাকে মানুষের রূপকথাপ্রিয় সব নিশাচর চোখে ও হৃদয়ে!  

নাঈম ওয়াহিদ

আল মাহমুদ স্মরণে

হুঁকোটা পড়ে রইল কবি। পড়ে রইল উঁই-ধরা ভগ্ন জোয়ালটাও; সযত্নে কে আর তুলে আনবে তাদের কবিতায়— নদীর বাঁক ধরে তিরতিরিয়ে বয়ে চলা কোষার গলুইয়ে বসা কিশোরের মতো পাটাতনে হলুদ স্বপ্নের ফুল; এই নিয়ে চলে গেলে! আগ দুপুরের কাঁচা রোদ পিঠে আঁচড়ে পড়ার মতো অনুভূতি কবিতায়— কে আর জাগাতে পারে বলো? চিরযুবা প্রেমিক— তুমি প্রেম দেখেছিলে এঁটো বিচুলি খোঁটা প্রৌঢ়ার বুকে, কাদায় লেপ্টানো শ্যামাঙ্গীর দেহে দুধের সরের মতো প্রেম....  

মাসুদ আল মামুন

আল মাহমুদ স্মরণে

পাপযুদ্ধে জেতে কে! যে জেতে তার হাতে নারী—বিস্ময়গাছ—কবিতাফল দ্যাখো, ঈর্ষার বাষ্প ছাপিয়ে উঠেছে কী-রকম মৌতাত রোদ!

যখন দেহকে চাইল মাটির জ্যামিতি চিরগর্বিত আকাশও কিছুটা নত ঘাসের কাছে ভূ-ভেদী সুগন্ধের প্রাবল্যে

সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা