জন্মদিনের কড়চা

নিজের জন্মদিন নিয়ে এত কথা এত কবিতা পৃথিবীর আর কোনো কবি লিখেছেন কিনা আমাদের জানা নেই। জন্মদিনে বলে আস্ত একটা কবিতার বই-ই আছে তার। রবীন্দ্রসাহিত্য ঘেঁটে কয়েকটি লেখা আমরা তুলে এনেছি পরস্পরের পাঠকদের জন্য। এর বাইরেও রয়ে গেল আরও কিছু কবিতা ও টুকরো কথামালা। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জন্মদিন নিয়ে লেখা গানটিই রবীন্দ্রনাথের শেষ গান এক হিশেবে। এর লিরিক যদিও নতুন নয়, কিন্তু গানের প্রয়োজনে নতুনভাবে সজ্জিত। তার শেষ লিরিক আশলে 'ওই মহামানব আসে'। শেষ সুরারোপ 'হে নূতন, দেখা দিক আর-বার'।

      
—সোহেল হাসান গালিব

জন্মোৎসব

বক্তার জন্মদিনে বোলপুর ব্রক্ষ্মবিদ্যালয়ের নিকট কথিত

আজ আমার জন্মদিনে তোমরা উৎসব করে আমাকে আহ্বান করেছ,—এতে আমার অনেকদিনের স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে।

জন্মদিনে বিশেষভাবে নিজের জীবনের প্রতি দৃষ্টি করবার কথা অনেকদিন আমার মনে জাগে নি। কত ২৫শে বৈশাখ চলে গিয়েছে, তারা অন্য তারিখের চেয়ে নিজেকে কিছুমাত্র বড়ো করে আমার কাছে প্রকাশ করে নি।

বস্তুত, নিজের জন্মদিন বৎসরের ৩৬৪ দিনের চেয়ে নিজের কাছে কিছুমাত্র বড়ো নয়। যদি অন্যের কাছে তার মূল্য থাকে তবেই তার মূল্য।

যেদিন আমরা এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলুম, সেদিন নূতন অতিথিকে নিয়ে যে উৎসব হয়েছিল, সে আমাদের নিজের উৎসব নয়। অজ্ঞাত গোপনতার মধ্য থেকে আমাদের সদ্য আর্বিভাবকে যাঁরা একটি পরমলাভ বলে মনে করেছিলেন, উৎসব তাঁদেরই। আনন্দলোক থেকে একটি আনন্দ-উপহার পেয়ে তাঁরা আত্মার আত্মীয়তার ক্ষেত্রকে বড়ো করে উপলব্ধি করেছিলেন, তাই তাঁদের উৎসব।

এই উপলব্ধি চিরকাল সকলের কাছে সমান নবীন থাকে না। অতিথি ক্রমে পুরাতন হয়ে আসে—সংসারে তার আর্বিভাব-যে পরমরহস্যময় এবং সে-যে চিরদিন এখানে থাকবে না, সে-কথা ভুলে যেতে হয়। বৎসরের পর বৎসর সমভাবেই প্রায় চলে যেতে থাকে—মনে যয়, তার ক্ষতিও নেই বৃদ্ধিও নেই, সে আছে তো আছেই—তার মধ্যে অন্তরের প্রকাশ আর আমরা দেখতে পাই নে। তখন যদি আমরা উৎসব করি, সে বাঁধা প্রথার উৎসব—সে একরকম দায়ে পড়ে করা।

যতক্ষণ মানুষের মধ্যে নব নব সম্ভাবনার পথ খোলা থাকে, ততক্ষণ তাকে আমরা নূতন করেই দেখি; তার সম্বন্ধে ততক্ষণ আমাদের আশার অন্ত থাকে না, সে আমাদের ঔৎসুক্যকে সমান জাগিয়ে রেখে দেয়।

জীবনে একটা বয়স আসে যখন মানুষের সম্বন্ধে আর নূতন প্রত্যাশা করবার কিছুই থাকে না; তখন সে যেন আমাদের কাছে একরকম ফুরিয়ে আসে। সেরকম অবস্থায় তাকে দিয়ে আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার চলতে পারে কিন্তু উৎসব চলতে পারে না; কারণ, উৎসব জিনিসটাই হচ্ছে নবীনতার উপলব্ধি—তা আমাদের প্রতিদিনের অতীত। উৎসব হচ্ছে জীবনের কবিত্ব, যেখানে রস সেইখানেই তার প্রকাশ।

আজ আমি উনপঞ্চাশ বৎসর সম্পূর্ণ করে পঞ্চাশে পড়েছি। কিন্তু আমার সেই দিনের কথা মনে পড়ছে যখন আমার জন্মদিন নবীনতার উজ্জ্বলতায় উৎসবের উপযুক্ত ছিল।

তখন আমার তরুণ বয়স। প্রভাত হতে না হতে প্রিয়জনেরা আমাকে কত আনন্দে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ‘আজ তোমার জন্মদিন’। আজ তোমরা যেমন ফুল তুলেছ, ঘর সাজিয়েছ, সেইরকম আয়োজনই তখন হয়েছে। আত্মীয়দের সেই আনন্দ-উৎসাহের মধ্যে মনুষ্যজন্মের একটি বিশেষ মূল্য সেদিন অনুভব করতুম। যেদিকে সংসারে আমি অসংখ্য বহুর মধ্যে একজনমাত্র, সেদিক থেকে আমার দৃষ্টি ফিরে গিয়ে যেখানে আমি আমিই, যেখানে আমি বিশেষভাবে একমাত্র, সেখানেই আমার দৃষ্টি পড়ত—নিজের গৌরবে সেদিন প্রাতঃকালে হৃদয় বিকশিত হয়ে উঠত।

এমনি করে আত্মীয়দের স্নেহদৃষ্টির পথ বেয়ে নিজের জীবনের দিকে যখন তাকাতুম, তখন আমার জীবনের দূরবিস্তৃত ভবিষ্যৎ তার অনাবিষ্কৃত রহস্যলোক থেকে এমন একটি বাঁশি বাজাত যাতে আমার সমস্ত চিত্ত দুলে উঠত। বস্তুত, জীবন তখন আমার সামনেই—পিছনে তার অতি অল্পই। জীবনে যেটুকু গোচর ছিল, তার চেয়ে অগোচরই ছিল অনেক বেশি। আমার তরুণ বয়সের অল্প কয়েকটি অতীত বৎসরকে গানের ধুয়াটির মতো অবলম্বন করে সমস্ত অনাগত ভবিষ্যৎ তার উপরে অনির্বচনীয়ের তান লাগাতে থাকত।

পথ তখন নির্দিষ্ট হয় নি। নানা দিকে তার শাখাপ্রশাখা। কোন্‌দিক দিয়ে কোথায় যাব এবং কোথায় গেলে কী পাব, তার অধিকাংশই কল্পনার মধ্যে ছিল। এইজন্য প্রতিবৎসর জন্মদিনে জীবনের সেই অনির্দেশ্য অসীম প্রত্যাশায় চিত্ত বিশেষভাবে জাগ্রত হয়ে উঠত।

ঝরনা যখন প্রথম জেগে ওঠে, নদী যখন প্রথম চলতে আরম্ভ করে, তখন নিজের সুবিধার পথ বের করতে তাকে নানা দিকে নানা গতিপরিবর্তন করতে হয়। অবশেষে বাধার দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়ে যখন তার পথ সুনির্দিষ্ট হয়, তখন নূতন পথের সন্ধান তার বন্ধ হয়ে যায়। তখন নিজের খনিত পথকে অতিক্রম করাই তার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।

আমারও জীবনের ধারা যখন ঘাতপ্রতিঘাতের মাঝখান দিয়ে আপনার পথটি তৈরি করে নিলে, তখন বর্ষার বন্যার বেগও সেই পথেই স্ফীত হয়ে বইতে লাগল এবং গ্রীষ্মের রিক্ততাও সেই পথেই সংকুচিত হয়ে চলতে থাকল। তখন নিজের জীবনকে বারংবার আর নূতন করে আলোচনা করবার দরকার রইল না। এইজন্যে তখন থেকে জন্মদিনে আর-কোনো নূতন আশার সুরে বাজতে থাকল না। সেইজন্যে জন্মদিনের সংগীতটি যখন নিজের ও অন্যের কাছে বন্ধ হয়ে এল, তখন আস্তে আস্তে উৎসবের প্রদীপটিও নিবে এল। আমার বা আর-কারো কাছে এর আর-কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

এমন সময় আজ তোমরা যখন আমাকে এই জন্মোৎসবের সভা সাজিয়ে তার মধ্যে আহ্বান করলে, তখন প্রথমটা আমার মনের মধ্যে সংকোচ উপস্থিত হয়েছিল। আমার মান হল, জন্ম তো আমার অর্ধ শতাব্দীর প্রান্তে কোথায় পড়ে রয়েছে, সে-যে কবেকার পুরানো কথা তার আর ঠিক নেই—মৃত্যুদিনের মূর্তি তার চেয়ে অনেক বেশি কাছে এসেছে—এই জীর্ণ জন্মদিনকে নিয়ে উৎসব করবার বয়স কি আমার?

এমন সময় একটি কথা আমার মনে উদয় হল, এবং সেই কথাটাই তোমার সামনে আমি বলতে ইচ্ছা করি।

পূর্বেই আভাস দিয়েছি, জন্মোৎসবের ভিতরকার সার্থকতাটা কিসে। জগতে আমরা অনেক জিনিসকে চোখের দেখা করে দেখি, কানের শোনা করে শুনি, ব্যবহারের পাওয়া করে পাই; কিন্তু অতি অল্প জিনিসকেই আপন করে পাই। আপন করে পাওয়াতেই আমাদের আনন্দ—তাতেই আমরা আপনাকে বহুগুণ করে পাই। পৃথিবীতে অসংখ্য লোক; তারা আমাদের চারিদিকেই আছে কিন্তু তাদের আমরা পাই নি, তারা আমাদের আপন নয়, তাই তাদের মধ্যে আমাদের আনন্দ নেই।

তাই বলছিলুম, আপন করে পাওয়াই হচ্ছে একমাত্র লাভ, তার জন্যেই মানুষের যত-কিছু সাধনা। শিশু ঘরে জন্মগ্রহণ করবামাত্রই তার মা বাপ এবং ঘরের লোক এক মুহূর্তেই আপনার লোককে পায়—পরিচয়ের আরম্ভকাল থেকেই সে যেন চিরন্তন। অল্পকাল পূর্বেই সে একেবারে কেউ ছিল না—না-জানার অনাদি অন্ধকার থেকে বাহির হয়েই সে আপন-করে-জানার মধ্যে অতি অনায়াসেই প্রবেশ করলে; এজন্যে পরস্পরের মধ্যে কোনো সাধনার, কোনো দেখাসাক্ষাৎ আনাগোনার কোনো প্রয়োজন হয় নি।

যেখানেই এই আপন করে পাওয়া আছে সেইখানেই উৎসব। ঘর সাজিয়ে বাঁশি বাজিয়ে সেই পাওয়াটিকে মানুষ সুন্দর করে তুলে প্রকাশ করতে চায়। বিবাহেও পরকে যখন চিরদিনের মতো আপন করে পাওয়া যায়, তখনও এই সাজসজ্জা, এই গীতবাদ্য। ‘তুমি আমার আপন’ এই কথাটি মানুষ প্রতিদিনের সুরে বলতে পারে না—এতে সৌন্দর্যের সুর ঢেলে দিতে হয়।

শিশুর প্রথম জন্মে যেদিন তার আত্মীয়েরা আনন্দধ্বনিতে বলেছিল ‘তোমাকে আমরা পেয়েছি’—সেইদিনে ফিরে ফিরে বৎসরে বৎসরে তারা ওই একই কথা আওড়াতে চায় যে, ‘তোমাকে আমরা পেয়েছি। তোমাকে পাওয়ায় আমাদের সৌভাগ্য, তোমাকে পাওয়ায় আমাদের আনন্দ, কেননা তুমি-যে আমাদের আপন, তোমাকে পাওয়াতে আমরা আপনাকে অধিক করে পেয়েছি।’

আজ আমার জন্মদিনে তোমরা যে উৎসব করছ, তার মধ্যে যদি সেই কথাটি থাকে, তোমরা যদি আমাকে আপন করে পেয়ে থাক, আজ প্রভাতে সেই পাওয়ার আনন্দকেই যদি তোমাদের প্রকাশ করার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তা হলেই এই উৎসব সার্থক। তোমাদের জীবনের সঙ্গে আমার জীবন যদি বিশেষভাবে মিলে থাকে, আমাদের পরস্পরের মধ্যে যদি কোনো গভীরতর সম্বন্ধ স্থাপিত হয়ে থাকে, তবেই যথার্থভাবে এই উৎসবের প্রয়োজন আছে, তার মূল্য আছে।

এই জীবনে মানুষের যে কেবল একবার জন্ম হয়, তা বলতে পারি নে। বীজকে মরে অঙ্কুর হতে হয়, অঙ্কুরকে মরে গাছ হতে হয়—তেমনি মানুষকে বারবার মরে নূতন জীবনে প্রবেশ করতে হয়।

একদিন আমি আমার পিতামাতার ঘরে জন্ম নিয়েছলুম—কোন্‌ রহস্যধাম থেকে প্রকাশ পেয়েছিলুম, কে জানে। কিন্তু জীবনের পালা, প্রকাশের লীলা সেই ঘরের মধ্যেই সমাপ্ত হয়ে চুকে যায় নি।

সেখানকার সুখদুঃখ ও স্নেহপ্রেমের পরিবেষ্টন থেকে আজ জীবনের নূতন ক্ষেত্রে জন্মলাভ করেছি। বাপমায়ের ঘরে যখন জন্মেছিলুম তখন অকস্মাৎ কত নূতন লোক চিরদিনের মতো আমার আপনার হয়ে গিয়েছিল। আজ ঘরের বাইরে আর-একটি ঘরে আমার জীবন যে জন্মলাভ করেছে এখানেও একত্র কত লোকের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ বেঁধে গেছে। সেইজন্যেই আজকের এই আনন্দ।

আমার প্রথম বয়সে, সেই পূর্বজীবনের মধ্যে আজকের এই নবজন্মের সম্ভাবনা এতই সম্পূর্ণ গোপনে ছিল যে, তা কল্পনারও গোচর হতে পারত না। এই লোক আমার কাছে অজ্ঞাতলোক ছিল।

সেইজন্যে আমার এই পঞ্চাশ বৎসর বয়সেও আমাকে তোমরা নূতন করে পেয়েছ; আমার সঙ্গে তোমাদের সম্বন্ধের মধ্যে জরাজীর্ণতার লেশমাত্র লক্ষণ নেই। তাই আজ সকালে তোমাদের আনন্দ-উৎসবের মাঝখানে বসে আমার এই নবজন্মের নবীনতা অন্তরে উপলব্ধি করছি।

এই যেখানে তোমাদের সকলের সঙ্গে আমি আপন হয়ে বসেছি, এ আমার সংসারলোক নয়, এ মঙ্গললোক। এখানে দৈহিক জন্মের সম্বন্ধ নয়, এখানে অহেতুক কল্যাণের সম্বন্ধ।

মানুষের মধ্যে দ্বিজত্ব আছে; মানুষ একবার জন্মায় গর্ভের মধ্যে, আবার জন্মায় মুক্ত পৃথিবীতে। তেমনি আর-একদিক দিয়ে মানুষের এক জন্ম আপনাকে নিয়ে, আর-এক জন্ম সকলকে নিয়ে।

পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে তবে মানুষের জন্মের সমাপ্তি, তেমনি স্বার্থের আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে মঙ্গলের মধ্যে উত্তীর্ণ হওয়া মানুষের জন্মের সমাপ্তি। জঠরের মধ্যে ভ্রূণই হচ্ছে কেন্দ্রবর্তী, সমস্ত জঠর তাকেই ধারণ করে এবং পোষণ করে, কিন্তু পৃথিবীতে জন্মমাত্র তার সেই নিজের একমাত্র কেন্দ্রত্ব ঘুচে যায়—এখানে সে অনেকের অন্তর্বর্তী। স্বার্থলোকেও আমিই হচ্ছি কেন্দ্র, অন্য-সমস্ত তার পরিধি—মঙ্গললোকে আমিই কেন্দ্র নই, আমি সমগ্রের অর্ন্তবর্তী; সুতরাং এই সমগ্রের প্রাণেই সেই আমির প্রাণ, সমগ্রের ভালোমন্দই তার ভালোমন্দ।

পৃথিবীতে আমাদের দৈহিক জীবন একেবারেই পাকা হয় না। যদিও মুক্ত আকাশে আমরা জন্মগ্রহণ করি বটে, তবু শক্তির অভাবে আমরা মুক্তভাবে সঞ্চরণ করতে পারি নে; মায়ের কোলেই, ঘরের সীমার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকি। তার পরে ক্রমশই পরিপুষ্টি ও সাধনা থেকে পৃথিবীলোকে আমাদের মুক্ত অধিকার বিস্তৃত হতে থাকে।

বাইরের দিক থেকে এ যেমন, অন্তরের দিক থেকেও আমাদের দ্বিতীয় জন্মের সেই-রকমের একটি ক্রমবিকাশ আছে। ঈশ্বর যখন স্বার্থের জীবন থেকে আমাদের মঙ্গলের জীবনে এনে উপস্থিত করেন, তখন আমরা একেবারেই পূর্ণ শক্তিতে সেই জীবনের অধিকার লাভ করতে পারি নে। ভ্রূণত্বের জড়তা আমরা একেবারেই কাটিয়ে উঠি নে। তখন আমরা বলতে চাই, কারণ চারিদিকে চলার ক্ষেত্র অবাধ-বিস্তৃত—কিন্তু চলতে পারি নে, কেননা আমাদের শক্তি অপরিণত। এই হচ্ছে দ্বন্দ্বের অবস্থা। শিশুর মতো চলতে গিয়ে বারবার পড়তে হয় এবং আঘাত পেতে হয়; যতটা চলি তার চেয়ে পড়ি অনেক বেশি। তবুও ওঠা ও পড়ার এই সুকঠোর বিরোধের মধ্য দিয়েই মঙ্গললোকে আমাদের মুক্তির অধিকার ক্রমশ প্রশস্ত হতে থাকে।

কিন্তু শিশু যখন মায়ের কোলে প্রায় অহোরাত্র শুয়ে-কাটাচ্ছে তখনও যেমন জানা যায়, সে এই চলা-ফেরা-জাগরণের পৃথিবীতেই জন্মগ্রহণ করেছে এবং তার সঙ্গে বয়স্কদের সাংসারিক সম্বন্ধ অনুভব করতে কোনো সংশয়মাত্র থাকে না, তেমনি যখন আমরা স্বার্থলোক থেকে মঙ্গললোকে প্রথম ভূমিষ্ট হই তখন পদে পদে আমাদের জড়ত্ব ও অকৃতার্থতা সত্ত্বেও আমাদের জীবনের ক্ষেত্রপরিবর্তন হয়েছে, সে-কথা একরকম করে বুঝতে পারা যায়। এমন কি, জড়তার সঙ্গে নবলব্ধ চেতনার বহুতর বিরোধের দ্বারাই সেই খবরটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বস্তুত, স্বার্থের জঠরের মধ্যে মানুষ যখন শয়ান থাকে, তখন সে দ্বিধাহীন আরামের মধ্যেই কালযাপন করে। এর থেকে যখন প্রথম মুক্তিলাভ করে, তখন অনেক দুঃখস্বীকার করতে হয়, তখন নিজের সঙ্গে অনেক সংগ্রাম করতে হয়।

তখন ত্যাগ তার পক্ষে সহজ হয় না কিন্তু তবু তাকে ত্যাগ করতেই হয়, কারণ এ লোকের জীবনই হচ্ছে ত্যাগ। তখন তার সমস্ত চেষ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ আনন্দ থাকে না, তবু তাকে চেষ্টা করতেই হয়। তখন তার মন যা বলে, তার আচরণ তার প্রতিবাদ করে; তার অন্তরাত্মা যে-ডালকে আশ্রয় করে, তার ইন্দ্রিয় তাকেই কুঠারাঘাত করতে থাকে; যে শ্রেয়কে আশ্রয় করে সে অহংকারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে, অহংকার গোপনে সেই শ্রেয়কেই আশ্রয় করে গভীরতররূপে আপনাকে পোষণ করতে থাকে। এমনি করে প্রথম অবস্থায় বিরোধ-অসামঞ্জস্যের বিষম ধন্দের মধ্যে পড়ে তার আর দুঃখের অন্ত থাকে না।

আমি আজ তোমাদের মধ্যে যেখানে এসেছি, এখানে আমার পূর্বজীবনের অনুবৃত্তি নেই। বস্তুত, সে জীবনকে ভেদ করেই এখানে আমাকে ভূমিষ্ঠ হতে হয়েছে। এইজন্যেই আমার জীবনের উৎসব সেখানে বিলুপ্ত হয়ে এখানেই প্রকাশ পেয়েছে। দেশালাইয়ের কাঠির মুখে যে-আলো একটুখানি দেখা দিয়েছিল, সেই আলো আজ প্রদীপের বাতির মুখে ধ্রুবতর হয়ে জ্বলে উঠেছে।

কিন্তু এ-কথা তোমাদের কাছে নিঃসন্দেহই অগোচর নেই যে, এই নূতন জীবনকে আমি শিশুর মতো আশ্রয় করেছি মাত্র, বয়স্কের মতো একে আমি অধিকার করতে পারি নি। তবু আমার সমস্ত দ্বন্দ্ব এবং অপূর্ণতার বিচিত্র অসংগতির ভিতরেও আমি তোমাদের কাছে এসেছি, সেটা তোমরা উপলব্ধি করেছ—একটি মঙ্গললোকের সম্বন্ধে তোমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমি তোমাদের আপন হয়েছি, সেইটে তোমরা হৃদয়ে জেনেছ—এবং সেইজন্যেই আজ তোমরা আমাকে নিয়ে এই উৎসবের আয়োজন করেছ, এ কথা যদি সত্য হয়, তবেই আমি আপনাকে ধন্য বলে মনে করব; তোমাদের সকলের আনন্দের মধ্যে আমার নূতন জীবনকে সার্থক বলে জানব।

এইসঙ্গে একটি কথা তোমাদের মনে করতে হবে, যে লোকের সিংহদ্বারে তোমরা সকলে আত্মীয় বলে আমাকে আজ অভ্যর্থনা করতে এসেছ, এ লোকে তোমাদের জীবনও প্রতিষ্ঠালাভ করেছে, নইলে আমাকে তোমরা আপনার বলে জানতে পারতে না। এই আশ্রমটি তোমাদের দ্বিজত্বের জন্মস্থান। ঝরনাগুলি যেমন পরস্পরের অপরিচিত নানা সুদূর শিখর থেকে নিঃসৃত হয়ে, একটি বৃহৎ ধারায় সম্মিলিত হয়ে নদী জন্মলাভ করে—তোমাদের ছোটো ছোটো জীবনের ধারাগুলি তেমনি কত দূরদূরান্তর গৃহ থেকে বেরিয়ে এসেছে—তারা এই আশ্রমের মধ্যে এসে বিচ্ছিন্নতা পরিহার করে একটি সম্মিলিত প্রশস্ত মঙ্গলের গতি প্রাপ্ত হয়েছে। ঘরের মধ্যে তোমরা কেবল ঘরের ছেলেটি বলে আপনাদের জানতে—সেই জানার সংকীর্ণতা ছিন্ন করে এখানে তোমরা সকলের মধ্যে নিজেকে দেখতে পাচ্ছ—এমনি করে নিজের মহত্তর সত্তাকে এখানে উপলব্ধি করতে আরম্ভ করেছ, এই হচ্ছে তোমাদের নবজন্মের পরিচয়। এই নবজন্মে বংশগৌরব নেই, আত্মাভিমান নেই, রক্তসম্বন্ধের গণ্ডি নেই, আত্মপরের কোনো সংকীর্ণ ব্যবধান নেই; এখানে তিনিই পিতা হয়ে, প্রভু হয়ে আছেন—য একঃ, যিনি এক—অবর্ণঃ, যাঁর জাতি নেই—বর্ণান্‌ অনেকান্‌ নিহিতার্থো দধাতি, যিনি অনেক বর্ণের অনেক নিগূঢ়নিহিত প্রয়োজনসকল বিধান করেছেন,—বিচৈতি চান্তে বিশ্বমাদৌ, বিশ্বের সমস্ত আরম্ভেও যিনি পরিণামেও যিনি—স দেবঃ, সেই দেবতা। স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনক্তু। তিনি আমাদের সকলকে মঙ্গলবুদ্ধির দ্বারা সংযুক্ত করুন। এই মঙ্গললোকে স্বার্থবুদ্ধি নয়, বিষয়বুদ্ধি নয়, এখানে আমাদের পরস্পরের যে যোগসম্বন্ধ সে কেবলমাত্র সেই একের বোধে অনুপ্রাণিত মঙ্গলবুদ্ধির দ্বারাই সম্ভব।


 

॥ গান ॥

[শেষ জন্মদিনে গীত; লিখিত ৬ মে ১৯৪১
      
হে নূতন, দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ॥ তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন সূর্যের মতন। রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন। ব্যক্ত হোক জীবনের জয়, ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়। উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে,  মোর চিত্তমাঝে চিরনূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ॥
  
            
     
মূল কবিতা—
     
       

       পঁচিশে বৈশাখ

       
               রাত্রি হল ভোর।                    আজি মোর               জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,          প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি               হাতে করে আনি              দ্বারে আসি দিল ডাক               পঁচিশে বৈশাখ।            
      
             দিগন্তে আরক্ত রবি; অরণ্যের ম্লান ছায়া বাজে যেন বিষণ্ন ভৈরবী।       শাল-তাল-শিরীষের মিলিত মর্মরে            বনান্তের ধ্যান ভঙ্গ করে।            রক্তপথ শুষ্ক মাঠে, যেন তিলকের রেখা সন্ন্যাসীর উদার ললাটে।         
       এই দিন বৎসরে বৎসরে    নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর ’পরে— আতাম্র আম্রের বনে ক্ষণে ক্ষণে সাড়া দিয়ে,        তরুণ তালের গুচ্ছে নাড়া দিয়ে, মধ্যদিনে অকস্মাৎ শুষ্কপত্রে তাড়া দিয়ে,        কখনো বা আপনারে ছাড়া দিয়ে          কালবৈশাখীর মত্ত মেঘে             বন্ধহীন বেগে।        আর সে একান্তে আসে             মোর পাশে পীত উত্তরীয়তলে লয়ে মোর প্রাণদেবতার          স্বহস্তে সজ্জিত উপহার—       নীলকান্ত আকাশের থালা, তারি ‘পরে ভুবনের উচ্ছলিত সুধার পিয়ালা।
      
     এই দিন এল আজ প্রাতে যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,      তাহার নির্ঘোষ বাজে  ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।                জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,             সে আজি মিলাল।                শুভ্র আলো          কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে                 শূন্য দিল ভরে।              আলোকের অসীম সংগীতে     চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।
                উদয়-দিক্‌প্রান্ত-তলে নেমে এসে                     শান্ত হেসে          এই দিন বলে আজি মোর কানে,     ‘অম্লান নূতন হয়ে অসংখ্যের মাঝখানে          একদিন তুমি এসেছিলে               এ নিখিলে          নবমল্লিকার গন্ধে, সপ্তপর্ণ-পল্লবের পবনহিল্লোল-দোল-ছন্দে,          শ্যামলের বুকে,     নির্নিমেষ নীলিমার নয়নসম্মুখে।          সেই-যে নূতন তুমি,            তোমারে ললাট চুমি               এসেছি জাগাতে          বৈশাখের উদ্দীপ্ত প্রভাতে।                 
      
                  ‘হে নূতন, দেখা দিক্‌ আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।       আচ্ছন্ন করেছে তারে আজি শীর্ণ নিমেষের যত ধূলিকীর্ণ জীর্ণ পত্ররাজি।          মনে রেখো, হে নবীন,
            তোমার প্রথম জন্মদিন                ক্ষয়হীন— যেমন প্রথম জন্ম নির্ঝরের প্রতি পলে পলে;       তরঙ্গে তরঙ্গে সিন্ধু যেমন উছলে                 প্রতিক্ষণে          প্রথম জীবনে।                 হে নূতন,          হোক তব জাগরণ         ভস্ম হতে দীপ্ত হুতাশন।               
     
               ‘হে নূতন, তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্‌ঘাটন          সূর্যের মতন।        বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি—        সেই মতো, হে নূতন, রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।      ব্যক্ত হোক জীবনের জয়, ব্যক্ত হোক তোমা-মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।’     
     উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।                    মোর চিত্তমাঝে          চির-নূতনেরে দিল ডাক             পঁচিশে বৈশাখ।
     
[পূরবী

আরও কিছু কবিতা


         জন্মদিন        

রবিপ্রদক্ষিণপথে জন্মদিবসের আবর্তন            হয়ে আসে সমাপন।      আমার রুদ্রের      মালা রুদ্রাক্ষের     অন্তিম গ্রন্থিতে এসে ঠেকে রৌদ্রদগ্ধ দিনগুলি গেঁথে একে একে।      হে তপস্বী, প্রসারিত করো তব পাণি                   লহো মালাখানি।  উগ্র তব তপের আসন,            সেথায় তোমারে সম্ভাষণ            করেছিনু দিনে দিনে কঠিন স্তবনে, কখনো মধ্যাহ্নরৌদ্রে কখনো-বা ঝঞ্ঝার পবনে।        এবার তপস্যা হতে নেমে এসো তুমি—        দেখা দাও যেথা তব বনভূমি ছায়াঘন, যেথা তব আকাশ অরুণ        আষাঢ়ের আভাসে করুণ। অপরাহ্ণ যেথা তার ক্লান্ত অবকাশে      মেলে শূন্য আকাশে আকাশে বিচিত্র বর্ণের মায়া; যেথা সন্ধ্যাতারা                   বাক্যহারা               বাণীবহ্নি জ্বালি নিভৃতে সাজায় ব'সে অনন্তের আরতির ডালি।             শ্যামল দাক্ষিণ্যে ভরা               সহজ আতিথ্যে বসুন্ধরা                  যেথা স্নিগ্ধ শান্তিময়,    যেথা তার অফুরান মাধুর্যসঞ্চয়                  প্রাণে প্রাণে বিচিত্র বিলাস আনে রূপে রসে গানে। বিশ্বের প্রাঙ্গণে আজি ছুটি হোক মোর,                   ছিন্ন করে দাও কর্মডোর।                   আমি আজ ফিরিব কুড়ায়ে উচ্ছৃঙ্খল সমীরণ যে কুসুম এনেছে উড়ায়ে             সহজে ধুলায়,            পাখির কুলায়       দিনে দিনে ভরি উঠে যে-সহজ গানে, আলোকের ছোঁওয়া লেগে সবুজের তম্বুরার তানে।                এই বিশ্বসত্তার পরশ, স্থলে জলে তলে তলে এই গূঢ় প্রাণের হরষ              তুলি লব অন্তরে অন্তরে— সর্বদেহে, রক্তস্রোতে, চোখের দৃষ্টিতে, কণ্ঠস্বরে,             জাগরণে, ধেয়ানে, তন্দ্রায়,    বিরামসমুদ্রতটে জীবনের পরমসন্ধ্যায়।          এ জন্মের গোধূলির ধূসর প্রহরে                   বিশ্বরসসরোবরে          শেষবার ভরিব হৃদয় মন দেহ    দূর করি সব কর্ম, সব তর্ক, সকল সন্দেহ,            সব খ্যাতি, সকল দুরাশা, বলে যাব, ‘আমি যাই, রেখে যাই, মোর ভালোবাসা।'
 
[পরিশেষ
          

     

পঁচিশে বৈশাখ

শ্রীমান অমিয়চন্দ্র চক্রবতী কল্যাণীয়েষু
 
          পঁচিশে বৈশাখ চলেছে               জন্মদিনের ধারাকে বহন করে                            মৃত্যুদিনের দিকে।               সেই চলতি আসনের উপর বসে           কোন্‌ কারিগর গাঁথছে                    ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায়                       নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা।               রথে চলে চলেছে কাল,                    পদাতিক পথিক চলতে চলতে                               পাত্র তুলে ধরে,                           পায় কিছু পানীয়;                                পান সারা হলে                               পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে;                                    চাকার তলায়                               ভাঙা পাত্র ধুলায় যায় গুঁড়িয়ে।                           তার পিছনে পিছনে                                নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে,                                     পায় নতুন রস,                               একই তার নাম,                                     কিন্তু সে বুঝি আর-একজন।                           একদিন ছিলেম বালক।                               কয়েকটি জন্মদিনের ছাঁদের মধ্যে                                সেই যে-লোকটার মূর্তি হয়েছিল গড়া                                    তোমরা তাকে কেউ জান না।                                      সে সত্য ছিল যাদের জানার মধ্যে                                                   কেউ নেই তারা।                    সেই বালক না আছে আপন স্বরূপে                          না আছে কারো স্মৃতিতে।                          সে গেছে চলে তার ছোটো সংসারটাকে নিয়ে;                          তার সেদিনকার কান্নাহাসির                                 প্রতিধ্বনি আসে না কোনো হাওয়ায়।                          তার ভাঙা খেলনার টুকরোগুলোও                                               দেখি নে ধুলোর 'পরে।                    সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে                          সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।                 তার বিশ্ব ছিল                 সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে।     তার অবোধ চোখ-মেলে চাওয়া          ঠেকে যেত বাগানের পাঁচিলটাতে                 সারি সারি নারকেল গাছে।                      সন্ধ্যেবেলাটা রূপকথার রসে নিবিড়,                  বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে                             বেড়া ছিল না উঁচু,          মনটা এদিক থেকে ওদিকে                             ডিঙিয়ে যেত অনায়াসেই।     প্রদোষের আলো-আঁধারে          বস্তুর সঙ্গে ছায়াগুলো ছিল জড়িয়ে,                 দুইই ছিল একগোত্রের।     সে-কয়দিনের জন্মদিন          একটা দ্বীপ,                 কিছুকাল ছিল আলোতে,                     কাল-সমুদ্রের তলায় গেছে ডুবে।                 ভাঁটার সময় কখনো কখনো                     দেখা যায় তার পাহাড়ের চূড়া,                      দেখা যায় প্রবালের রক্তিম তটরেখা।          পঁচিশে বৈশাখ তার পরে দেখা দিল                 আর-এক কালান্তরে,                      ফাল্গুনের প্রত্যুষে                           রঙিন আভার অস্পষ্টতায়।                 তরুণ যৌবনের বাউল                           সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে,                 ডেকে বেড়াল                           নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে                      অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে।     সেই শুনে কোনো-কোনোদিন বা                 বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীর আসন টলেছিল,     তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন         তাঁর কোনো কোনো দূতীকে               পলাশবনের রঙমাতাল ছায়াপথে                     কাজ-ভোলানো সকাল-বিকালে।         তখন কানে কানে মৃদু গলায় তাদের কথা শুনেছি,               কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝি নি।               দেখেছি কালো চোখের পক্ষ্মরেখায়                     জলের আভাস;     দেখেছি কম্পিত অধরে নিমীলিত বাণীর                                  বেদনা;               শুনেছি ক্বণিত কঙ্কণে                  চঞ্চল আগ্রহের চকিত ঝংকার।     তারা রেখে গেছে আমার অজানিতে               পঁচিশে বৈশাখের           প্রথম ঘুমভাঙা প্রভাতে            নতুন ফোটা বেলফুলের মালা;               ভোরের স্বপ্ন                     তারি গন্ধে ছিল বিহ্বল।           সেদিনকার জন্মদিনের কিশোর জগৎ                ছিল রূপকথার পাড়ার গায়ে-গায়েই,                জানা না-জানার সংশয়ে।     সেখানে রাজকন্যা আপন এলোচুলের আবরণে           কখনো বা ছিল ঘুমিয়ে,         কখনো বা জেগেছিল চমকে উঠে'         সোনার কাঠির পরশ লেগে।                              দিন গেল।                       সেই বসন্তীরঙের পঁচিশে বৈশাখের                              রঙকরা প্রাচীরগুলো                                         পড়ল ভেঙে।     যে পথে বকুলবনের পাতার দোলনে         ছায়ায় লাগত কাঁপন,               হাওয়ায় জাগত মর্মর,                     বিরহী কোকিলের                           কুহুরবের মিনতিতে                           আতুর হত মধ্যাহ্ন,                মৌমাছির ডানায় লাগত গুঞ্জন                   ফুলগন্ধের অদৃশ্য ইশারা বেয়ে,                      সেই তৃণ-বিছানো বীথিকা                      পৌঁছল এসে পাথরে-বাঁধানো রাজপথে।               সেদিনকার কিশোরক                      সুর সেধেছিল যে-একতারায়                              একে একে তাতে চড়িয়ে দিল                            তার পর নতুন তার।                                সেদিন পঁচিশে বৈশাখ                            আমাকে আনল ডেকে                                      বন্ধুর পথ দিয়ে                    তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে।                          বেলা-অবেলায়               ধ্বনিতে ধ্বনিতে গেঁথে                          জাল ফেলেছি মাঝদরিয়ায়;                    কোনো মন দিয়েছে ধরা,                    ছিন্ন জালের ভিতর থেকে                                কেউ বা গেছে পালিয়ে।     কখনো দিন এসেছে ম্লান হয়ে,          সাধনায় এসেছে নৈরাশ্য,          গ্লানিভারে নত হয়েছে মন।                    এমন সময়ে অবসাদের অপরাহ্নে          অপ্রত্যাশিত পথে এসেছে                  অমরাবতীর মর্ত্যপ্রতিমা;                        সেবাকে তারা সুন্দর করে,          তপঃক্লান্তের জন্যে তারা                   আনে সুধার পাত্র;                         ভয়কে তারা অপমানিত করে                               উল্লোল হাস্যের কলোচ্ছ্বাসে;                         তারা জাগিয়ে তোলে দুঃসাহসের শিখা                                ভস্মে - ঢাকা অঙ্গারের থেকে;                         তারা আকাশবাণীকে ডেকে আনে                                    প্রকাশের তপস্যায়।                         তারা আমার নিবে-আসা দীপে                               জ্বালিয়ে গেছে শিখা,                                শিথিল-হওয়া তারে                                 বেঁধে দিয়েছে সুর,                                 পঁচিশে বৈশাখকে                                   বরণমাল্য পরিয়েছে                                     আপন হাতে গেঁথে।                    তাদের পরশমণির ছোঁওয়া                         আজও আছে                               আমার গানে আমার বাণীতে।          সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে                      দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত                           গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।          একতারা ফেলে দিয়ে                কখনো বা নিতে হল ভেরী।                  খর মধ্যাহ্নের তাপে                     ছুটতে হল                          জয়পরাজয়ের আবর্তনের মধ্যে।                পায়ে বিঁধেছে কাঁটা,                      ক্ষত বক্ষে পড়েছে রক্তধারা।                 নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ                     আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে—          জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে                        নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে।          বিদ্বেষে অনুরাগে                          ঈর্ষায় মৈত্রীতে,                  সংগীতে পরুষ কোলাহলে                          আলোড়িত তপ্ত বাষ্পনিশ্বাসের মধ্য দিয়ে                 আমার জগৎ গিয়েছে তার কক্ষপথে।             এই দুর্গমে, এই বিরোধ-সংক্ষোভের মধ্যে                 পঁচিশে বৈশাখের প্রৌঢ় প্রহরে                        তোমরা এসেছ আমার কাছে।             জেনেছ কি—                 আমার প্রকাশে                    অনেক আছে অসমাপ্ত,                                 অনেক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন,                                      অনেক উপেক্ষিত?                 অন্তরে বাহিরে              সেই ভালো মন্দ,                  স্পষ্ট অস্পষ্ট,                      খ্যাত অখ্যাত,                 ব্যর্থ চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণের মধ্য থেকে                           যে আমার মূর্তি                 তোমাদের শ্রদ্ধায়, তোমাদের ভালোবাসায়,                                 তোমাদের ক্ষমায়                           আজ প্রতিফলিত—                 আজ যার সামনে এনেছ তোমাদের মালা,                        তাকেই আমার পঁচিশে বৈশাখের                             শেষবেলাকার পরিচয় বলে                             নিলেম স্বীকার করে,                         আর রেখে গেলেম তোমাদের জন্যে                                আমার আশীর্বাদ।        যাবার সময় এই মানসী মূর্তি                      রইল তোমাদের চিত্তে,                কালের হাতে রইল বলে                      করব না অহংকার।                তার পরে দাও আমাকে ছুটি                জীবনের কালো-সাদা সূত্রে গাঁথা                         সকল পরিচয়ের অন্তরালে,                  নির্জন নামহীন নিভৃতে;                  নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে                       সুর মিলিয়ে নিতে দাও                               এক চরম সংগীতের গভীরতায়।  
[শেষ সপ্তক : ৪৩
   

জন্মদিন

 
আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে মরণের ছাড়পত্র নিয়ে। মনে হতেছে কী জানি পুরাতন বৎসরের গ্রন্থি বাঁধা জীর্ণ মালাখানি সেথা গেছে ছিন্ন হয়ে; নবসূত্রে পড়ে আজি গাঁথা নব জন্মদিন। জন্মোৎসবে এই-যে আসন পাতা হেথা আমি যাত্রী শুধু, অপেক্ষা করিব, লব টিকা মৃত্যুর দক্ষিণ হস্ত হতে, নূতন অরুণলিখা যবে দিবে যাত্রার ইঙ্গিত।                      আজ আসিয়াছে কাছে জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে, দুই আলো মুখোমুখি মিলিছে জীবনপ্রান্তে মম রজনীর চন্দ্র আর প্রত্যুষের শুকতারাসম— এক মন্ত্রে দোঁহে অভ্যর্থনা।                     প্রাচীন অতীত, তুমি নামাও তোমার অর্ঘ্য; অরূপ প্রাণের জন্মভূমি, উদয়শিখরে তার দেখো আদিজ্যোতি। করো মোরে আশীর্বাদ, মিলাইয়া যাক তৃষাতপ্ত দিগন্তরে মায়াবিনী মরীচিকা। ভরেছিনু আসক্তির ডালি কাঙালের মতো; অশুচি সঞ্চয়পাত্র করো খালি, ভিক্ষামুষ্টি ধূলায় ফিরায়ে লও, যাত্রাতরী বেয়ে পিছু ফিরে আর্ত চক্ষে যেন নাহি দেখি চেয়ে চেয়ে জীবনভোজের শেষ উচ্ছিষ্টের পানে।                                         হে বসুধা, নিত্য নিত্য বুঝায়ে দিতেছ মোরে—যে তৃষ্ণা, যে ক্ষুধা তোমার সংসাররথে সহস্রের সাথে বাঁধি মোরে টানায়েছে রাত্রিদিন স্থূল সূক্ষ্ম নানাবিধ ডোরে নানা দিকে নানা পথে, আজ তার অর্থ গেল কমে ছুটির গোধূলিবেলা তন্দ্রালু আলোকে। তাই ক্রমে ফিরায়ে নিতেছ শক্তি, হে কৃপণা, চক্ষুকর্ণ থেকে আড়াল করিছ স্বচ্ছ আলো; দিনে দিনে টানিছে কে নিষ্প্রভ নেপথ্যপানে। আমাতে তোমার প্রায়োজন শিথিল হয়েছে, তাই মূল্য মোর করিছ হরণ, দিতেছ ললাটপটে বর্জনের ছাপ। কিন্তু জানি, তোমার অবজ্ঞা মোরে পারে না ফেলিতে দূরে টানি। তব প্রয়োজন হতে অতিরিক্ত যে মানুষ তারে দিতে হবে চরম সম্মান তব শেষ নমস্কারে। যদি মোরে পঙ্গু কর, যদি মোরে কর অন্ধপ্রায়, যদি বা প্রচ্ছন্ন কর নিঃশক্তির প্রদোষচ্ছায়ায়, বাঁধ বার্ধক্যের জালে, তবু ভাঙা মন্দিরবেদীতে প্রতিমা অক্ষুণ্ন রবে সগৌরবে; তারে কেড়ে নিতে শক্তি নাই তব।
                    ভাঙো ভাঙো, উচ্চ করো ভগ্নস্তূপ, জীর্ণতার অন্তরালে জানি মোর আনন্দস্বরূপ রয়েছে উজ্জ্বল হয়ে  সুধা তারে দিয়েছিল আনি প্রতিদিন চতুর্দিকে রসপূর্ণ আকাশের বাণী; প্রত্যুত্তরে নানা ছন্দে গেয়েছে সে ‘ভালোবাসিয়াছি'। সেই ভালোবাসা মোরে তুলেছে স্বর্গের কাছাকাছি ছাড়ায়ে তোমার অধিকার। আমার সে ভালোবাসা সব ক্ষয়ক্ষতিশেষে অবশিষ্ট রবে; তার ভাষা হয়তো হারাবে দীপ্তি অভ্যাসের ম্লানস্পর্শ লেগে, তবু সে অমৃতরূপ সঙ্গে রবে যদি উঠি জেগে মৃত্যুপরপারে। তারি অঙ্গে এঁকেছিল পত্রলিখা আম্রমঞ্জরীর রেণু, এঁকেছে পেলব শেফালিকা সুগন্ধি শিশিরকণিকায়; তারি সূক্ষ্ম উত্তরীতে গেঁথেছিল শিল্পকারু প্রভাতের দোয়েলের গীতে চকিত কাকলিসূত্রে; প্রিয়ার বিহ্বল স্পর্শখানি সৃষ্টি করিয়াছে তার সর্বদেহে রোমাঞ্চিত বাণী, নিত্য তাহা রয়েছে সঞ্চিত। যেথা তব কর্মশালা সেথা বাতায়ন হতে কে জানি পরায়ে দিত মালা আমার ললাট ঘেরি সহসা ক্ষণিক অবকাশে, সে নহে ভৃত্যের পুরস্কার; কী ইঙ্গিতে কী আভাসে মুহূর্তে জানায়ে চলে যেত অসীমের আত্মীয়তা অধরা অদেখা দূত, বলে যেত ভাষাতীত কথা অপ্রয়োজনের মানুষেরে।
                              সে মানুষ, হে ধরণী, তোমার আশ্রয় ছেড়ে যাবে যবে, নিয়ো তুমি গণি যা-কিছু দিয়েছ তারে, তোমার কর্মীর যত সাজ, তোমার পথের যে পাথেয়, তাহে সে পাবে না লাজ; রিক্ততায় দৈন্য নহে। তবু জেনো অবজ্ঞা করি নি তোমার মাটির দান, আমি সে মাটির কাছে ঋণী— জানায়েছি বারংবার, তাহারি বেড়ার প্রান্ত হতে অমূর্তের পেয়েছি সন্ধান। যবে আলোতে আলোতে লীন হত জড়যবনিকা, পুষ্পে পুষ্পে তৃণে তৃণে রূপে রসে সেই ক্ষণে যে গূঢ় রহস্য দিনে দিনে হত নিঃশ্বসিত, আজি মর্তের অপর তীরে বুঝি চলিতে ফিরানু মুখ তাহারি চরম অর্থ খুঁজি। যবে শান্ত নিরাসক্ত গিয়েছি তোমার নিমন্ত্রণে তোমার অমরাবতী সুপ্রসন্ন সেই শুভক্ষণে মুক্তদ্বার; বুভুক্ষুর লালসারে করে সে বঞ্চিত; তাহার মাটির পাত্রে যে অমৃত রয়েছে সঞ্চিত নহে তাহা দীন ভিক্ষু লালায়িত লোলুপের লাগি। ইন্দ্রের ঐশ্বর্য নিয়ে হে ধরিত্রী, আছ তুমি জাগি ত্যাগীরে প্রত্যাশা করি, নির্লোভেরে সঁপিতে সম্মান, দুর্গমের পথিকেরে আতিথ্য করিতে তব দান বৈরাগ্যের শুভ্র সিংহাসনে। ক্ষুব্ধযারা, লুব্ধ যারা, মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনাকুণ্ড তব ঘেরি বীভৎস চীৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি, নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি।
                               শুনি তাই আজি মানুষ-জন্তুর হুহুংকার দিকে দিকে উঠে বাজি। তবু যেন হেসে যাই যেমন হেসেছি বারে বারে পণ্ডিতের মূঢ়তায়, ধনীর দৈন্যের অত্যাচারে, সজ্জিতের রূপের বিদ্রূপে। মানুষের দেবতারে ব্যঙ্গ করে যে অপদেবতা বর্বর মুখবিকারে তারে হাস্য হেনে যাব, বলে যাব, ‘এ প্রহসনের মধ্য-অঙ্কে অকস্মাৎ হবে লোপ দুষ্ট স্বপনের; নাট্যের কবররূপে বাকি শুধু রবে ভস্মরাশি দগ্ধশেষ মশালের, আর অদৃষ্টের অট্টহাসি।' বলে যাব, ‘দ্যূতচ্ছলে দানবের মূঢ় অপব্যয় গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিবৃত্তে শাশ্বত অধ্যায়।' বৃথা বাক্য থাক্‌। তব দেহলিতে শুনি ঘণ্টা বাজে, শেষপ্রহরের ঘণ্টা; সেই সঙ্গে ক্লান্ত বক্ষোমাঝে শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে। জীবনের স্মৃতিদীপে আজিও দিতেছে যারা জ্যোতি সেই ক' টি বাতি দিয়ে রচিব তোমার সন্ধ্যারতি সপ্তর্ষির দৃষ্টির সম্মুখে; দিনান্তের শেষ পলে রবে মোর মৌন বীণা মূর্ছিয়া তোমার পদতলে। আর রবে পশ্চাতে আমার, নাগকেশরের চারা ফুল যার ধরে নাই, আর রবে খেয়াতরীহারা এ পারের ভালোবাসা—বিরহস্মৃতির অভিমানে ক্লান্ত হয়ে রাত্রিশেষে ফিরিবে সে পশ্চাতের পানে।  
[সেঁজুতি
   

জন্মদিন

 
দৃষ্টিজালে জড়ায় ওকে হাজারখানা চোখ,                ধ্বনির ঝড়ে বিপন্ন ওই লোক। জন্মদিনের মুখর তিথি যারা ভুলেই থাকে, দোহাই ওগো, তাদের দলে লও এ মানুষটাকে— সজনে পাতার মতো যাদের হালকা পরিচয়,           দুলুক খসুক শব্দ নাহি হয়।           সবার মাঝে পৃথক ও যে ভিড়ের কারাগারে                    খ্যাতি-বেড়ির নিরন্ত ঝংকারে।           সবাই মিলে নানা রঙে রঙিন করছে ওরে,                 নিলাজ মঞ্চে রাখছে তুলে ধরে,                    আঙুল তুলে দেখাচ্ছে দিনরাত; লুকোয় কোথা ভেবে না পায়, আড়াল ভূমিসাৎ।                    দাও-না ছেড়ে ওকে স্নিগ্ধ-আলো শ্যামল-ছায়া বিরল-কথার লোকে,                    বেড়াবিহীন বিরাট ধূলি-'পর, সেই যেখানে মহাশিশুর আদিম খেলাঘর। ভোরবেলাকার পাখির ডাকে প্রথম খেয়া এসে           ঠেকল যখন সব-প্রথমের চেনাশোনার দেশে, নামল ঘাটে যখন তারে সাজ রাখে নি ঢেকে, ছুটির আলো নগ্ন গায়ে লাগল আকাশ থেকে—           যেমন করে লাগে তরীর পালে, যেমন লাগে অশোক গাছের কচি পাতার ডালে।            নাম ভোলা ফুল ফুটল ঘাসে ঘাসে                    সেই প্রভাতের সহজ অবকাশে। ছুটির যজ্ঞে পুষ্পহোমে জাগল বকুলশাখা, ছুটির শূন্যে ফাগুনবেলা মেলল সোনার পাখা। ছুটির কোণে গোপনে তার নাম আচম্‌কা সেই পেয়েছিল মিষ্টিসুরের দাম; কানে কানে সে নাম ডাকার ব্যথা উদাস করে           চৈত্রদিনের স্তব্ধ দুইপ্রহরে। আজ সবুজ এই বনের পাতায় আলোর ঝিকিমিকি           সেই নিমেষের তারিখ দিল লিখি।
তাহারে ডাক দিয়েছিল পদ্মানদীর ধারা, কাঁপন-লাগা বেণুর শিরে দেখেছে শুকতারা;           কাজল-কালো মেঘের পুঞ্জ সজল সমীরণে নীল ছায়াটি বিছিয়েছিল তটের বনে বনে;           ও দেখেছে গ্রামের বাঁকা বাটে       কাঁখে কলস মুখর মেয়ে চলে স্নানের ঘাটে;           সর্ষেতিসির খেতে দুইরঙা সুর মিলেছিল অবাক আকাশেতে ;       তাই দেখেছে চেয়ে চেয়ে অস্তরবির রাগে—           বলেছিল, এই তো ভালো লাগে। সেই-যে ভালো-লাগাটি তার যাক সে রেখে পিছে, কীর্তি যা সে গেঁথেছিল হয় যদি হোক মিছে,           না যদি রয় নাই রহিল নাম— এই মাটিতে রইল তাহার বিস্মিত প্রণাম।  
[সেঁজুতি
   

জন্মদিন

 
              তোমরা রচিলে যারে                    নানা অলংকারে                তারে তো চিনি নে আমি,                    চেনেন না মোর অন্তর্যামী তোমাদের স্বাক্ষরিত সেই মোর নামের প্রতিমা।          বিধাতার সৃষ্টিসীমা                    তোমাদের দৃষ্টির বাহিরে।          কালসমুদ্রের তীরে                    বিরলে রচেন মূর্তিখানি          বিচিত্রিত রহস্যের যবনিকা টানি                    রূপকার আপন নিভৃতে।                         বাহির হইতে                    মিলায়ে আলোক অন্ধকার      কেহ এক দেখে তারে , কেহ দেখে আর।          খণ্ড খণ্ড রূপ আর ছায়া,               আর কল্পনার মায়া,      আর মাঝে মাঝে শূন্য, এই নিয়ে পরিচয় গাঁথে                    অপরিচয়ের ভূমিকাতে।               সংসারখেলার কক্ষে তাঁর          যে খেলেনা রচিলেন মূর্তিকার      মোরে লয়ে মাটিতে আলোতে,                    সাদায় কালোতে,          কে না জানে সে ক্ষণভঙ্গুর      কালের চাকার নিচে নিঃশেষে ভাঙিয়া হবে চুর।          সে বহিয়া এনেছে যে দান      সে করে ক্ষণেকতরে অমরের ভান—          সহসা মুহূর্তে দেয় ফাঁকি,                    মুঠি-কয় ধূলি রয় বাকি, আর থাকে কালরাত্রি সব-চিহ্ন-ধুয়ে-মুছে-ফেলা।          তোমাদের জনতার খেলা                রচিল যে পুতুলিরে          সে কি লুব্ধ বিরাট ধূলিরে               এড়ায়ে আলোতে নিত্য রবে।          এ কথা কল্পনা কর যবে                    তখন আমার               আপন গোপন রূপকার          হাসেন কি আঁখিকোণে,                    সে কথাই ভাবি আজ মনে।  
[নবজাতক
   

জন্মদিনে : ১

 
সেদিন আমার জন্মদিন। প্রভাতের প্রণাম লইয়া উদয়দিগন্ত-পানে মেলিলাম আঁখি, দেখিলাম সদ্যস্নাত উষা আঁকি দিল আলোকচন্দনলেখা হিমাদ্রির হিমশুভ্র পেলব ললাটে। যে মহাদূরত্ব আছে নিখিল বিশ্বের মর্মস্থানে তারি আজ দেখিনু প্রতিমা গিরীন্দ্রের সিংহাসন-'পরে। পরম গাম্ভীর্যে যুগে যুগে ছায়াঘন অজানারে করিছে পালন পথহীন মহারণ্য-মাঝে, অভ্রভেদী সুদূরকে রেখেছে বেষ্টিয়া দুর্ভেদ্য দুর্গমতলে উদয়-অস্তের চক্রপথে। আজি এই জন্মদিনে দূরত্বের অনুভব অন্তরে নিবিড় হয়ে এল। যেমন সুদূর ওই নক্ষত্রের পথ নীহারিকা-জ্যোতির্বাষ্প-মাঝে রহস্যে আবৃত, আমার দূরত্ব আমি দেখিলাম তেমনি দুর্গমে— অলক্ষ্য পথের যাত্রী, অজানা তাহার পরিণাম। আজি এই জন্মদিনে দূরের পথিক সেই তাহারি শুনিনু পদক্ষেপ নির্জন সমুদ্রতীর হতে।
 

জন্মদিনে : ৫

  জীবনের আশি বর্ষে প্রবেশিনু যবে এ বিস্ময় মনে আজ জাগে— লক্ষকোটি নক্ষত্রের অগ্নিনির্ঝরের যেথা নিঃশব্দ জ্যোতির বন্যাধারা ছুটেছে অচিন্ত্য বেগে নিরুদ্দেশ শূন্যতা প্লাবিয়া দিকে দিকে, তমোঘন অন্তহীন সেই আকাশের বক্ষস্তলে অকস্মাৎ করেছি উত্থান অসীম সৃষ্টির যজ্ঞে মুহূর্তের স্ফুলিঙ্গের মতো ধারাবাহী শতাব্দীর ইতিহাসে। এসেছি সে পৃথিবীতে যেথা কল্প কল্প ধরি প্রাণপঙ্ক সমুদ্রের গর্ভ হতে উঠি জড়ের বিরাট অঙ্কতলে উদ্‌ঘাটিল আপনার নিগূঢ় আশ্চর্য পরিচয় শাখায়িত রূপে রূপান্তরে। অসম্পূর্ণ অস্তিত্বের মোহাবিষ্ট প্রদোষের ছায়া আচ্ছন্ন করিয়া ছিল পশুলোক দীর্ঘ যুগ ধরি; কাহার একাগ্র প্রতীক্ষায় অসংখ্য দিবসরাত্রি-অবসানে মন্থরগমনে এল মানুষ প্রাণের রঙ্গভূমে; নূতন নূতন দীপ একে একে উঠিতেছে জ্বলে, নূতন নূতন অর্থ লভিতেছে বাণী; অপূর্ব আলোকে মানুষ দেখিছে তার অপরূপ ভবিষ্যের রূপ, পৃথিবীর নাট্যমঞ্চে অঙ্কে অঙ্কে চৈতন্যের ধীরে ধীরে প্রকাশের পালা— আমি সে নাট্যের পাত্রদলে পরিয়াছি সাজ । আমারও আহ্বান ছিল যবনিকা সরাবার কাজে, এ আমার পরম বিস্ময়। সাবিত্রী পৃথিবী এই, আত্মার এ মর্তনিকেতন, আপনার চতুর্দিকে আকাশে আলোকে সমীরণে ভূমিতলে সমুদ্রে পর্বতে কী গূঢ় সংকল্প বহি করিতেছে সূর্যপ্রদক্ষিণ— সে রহস্যসূত্রে গাঁথা এসেছিনু আশি বর্ষ আগে, চলে যাব কয় বর্ষ পরে।  

জন্মদিনে : ২৮

 
নদীর পালিত এই জীবন আমার। নানা গিরিশিখরের দান নাড়ীতে নাড়ীতে তার বহে, নানা পলিমাটি দিয়ে ক্ষেত্র তার হয়েছে রচিত, প্রাণের রহস্যরস নানা দিক হতে শস্যে শস্যে লভিল সঞ্চার। পূর্বপশ্চিমের নানা গীতস্রোতজালে ঘেরা তার স্বপ্ন জাগরণ। যে নদী বিশ্বের দূতী দূরকে নিকটে আনে, অজানার অভ্যর্থনা নিয়ে আসে ঘরের দুয়ারে। সে আমার রচেছিল জন্মদিন— চিরদিন তার স্রোতে বাঁধন-বাহিরে মোর চলমান বাসা ভেসে চলে তীর হতে তীরে। আমি ব্রাত্য, আমি পথচারী, অবারিত আতিথ্যের অন্নে পূর্ণ হয়ে ওঠে বারে বারে নির্বিচারে মোর জন্মদিবসের থালি।
সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা