পর্ব-২৫
পথের ধারে ইলেক্ট্রিক তারে বসে তুমুল ঝড়বাদলে ভিজতে থাকা এক অসহায় কাকের সত্যিকার অবস্থা অনুধাবন করার মতো তেমন কেউ-ই পাশে ছিল না। এইরকম স্থবির দিনকালের মাঝেও হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যান অবিরাম ডোরবেল বাজিয়ে যেতে লাগল। ভ্যানগগের সানফ্লাওয়ার রঙের ইউনিফর্ম পরিহিত ডাকপিয়ন তাঁর চিঠির ঝাঁপি আমার উঠোনে উজাড় করে দিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু মাথার ভেতরের থইথই অন্ধকারে শত-সহস্র জোনাকির অবিশ্রাম ওড়াউড়িতে দিনকে দিন আমি কেমন যেন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে লাগলাম। চোখের জলে সব ঝাপসা দেখতে দেখতে স্তূপ এনভেলোপ খুলে খুলে পড়তে লাগলাম। আর লেখা বাছাই করতে লাগলাম ‘ধূলিচিত্রের’ চতুর্থ বর্ষ, প্রথম-দ্বিতীয় সংখ্যার জন্য। চিঠির স্তূপের মাঝ থেকে একদিন একটা চিঠি আমাকে বেশ খানিকটা অবাক করে দিল। চিঠির প্রেরক আমার পূর্বপরিচিত কেউ নন। অন্যান্য অপরিচিতর মতোই সে। কিন্তু তার হস্তাক্ষর ও চিঠির ভাষা বেশ আকর্ষণীয়। যদিও চিঠিটা লেখা হয়েছে অনেক চিঠির মতোই কম দামি অতি সাধারণ কাগজে। এনভেলোপের বুকে পিঠেও কোনো শিল্পের স্পর্শ নাই—যথারীতি পোস্ট অফিসের সেই চিরচেনা ডালভাতের মতো মনোটোনাস হলুদ খাম। [আমি আবার চিঠির যাবতীয় কিছুকেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইতাম। ফলত এনভেলোপ হিসেবে ব্যবহার করতাম নানারকম শৌখিন ‘এয়ার মেইল’, সেই সব ‘এয়ার মেইলের‘ উপর আলাদা করে ডাকটিকিট কিনে সেঁটে দিতাম। অত্যন্ত দামি কলম, রুচিকর ও মসৃণ মূল্যবান কাগজে চিঠি লিখতাম, তা যাকেই লিখি না কেন? কারণ আমার মনে হতো, চিঠির মাঝ দিয়েও প্রকাশ পেতে পারে একজন মানুষের রুচি, চিন্তা কিংবা তার জীবনযাপনের চিত্র। শুধু চিঠিই-বা বলছি কেন? মানুষের প্রতিটা কাজ থেকেই তো চেনা যায় তাকে। বোঝা যায় তার মনোজগৎ।
লেখালেখি থেকে আমার এই অনুপস্থিতিতে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। আমি যেন তাঁকে আমার এই নীরবতার কারণ জানাই।
চিঠিটা শুরু হয়েছে ‘পাপড়ি রহমান’ এই সম্বোধনে।
[চিঠির প্রেরক বেশ আধুনিক! আমার নামের সাথে আপা, মাদাম, খালা, চাচি, ফুপু, ভাবি ইত্যাদি জুড়ে দেন নাই! দেখে আমিও বেশ অবাক! মফস্বলের জলহাওয়ায় বসবাসরত কোনো অনতি-তরুণ-কবির কাছ থেকে অমন সম্বোধন—আমি সত্যি বিশ্বাস করতেও পারছিলাম না!
এই তো গেল ‘সম্বোধনের’ কথা। কিন্তু চিঠিটা শুরু হয়েছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এক বিখ্যাত কবিতার লাইন দিয়ে!
অবনী বাড়ি আছ/ অবনী বাড়ি আছ/ দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া/ কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া/ ‘অবনী বাড়ি আছ?’/
চিঠির প্রেরক জানতে চেয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে কেন কোথাও আমার কোনো লেখাপত্র দেখা যাচ্ছে না? আমার এই নীরবতাতে তিনি ভাবছেন, আমি কোনো বড় কাজে রত আছি হয়তো। লেখালেখি থেকে আমার এই অনুপস্থিতিতে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। আমি যেন তাঁকে আমার এই নীরবতার কারণ জানাই।
চিঠিটা পড়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। আমি যে দীর্ঘদিন কিছুই লিখছি না, কোথাও আমার লেখাপত্র ছাপা হচ্ছে না—এটাও অত দূরে বসে কেউ খেয়াল করছে? বিচিত্র অভিজ্ঞতা যাকে বলে!
যে আমি প্রায় কারোর চিঠিরই জবাব দেই না বা দেয়ার টাইম পাই না বা দিতে ইচ্ছে করে না—সেই আমি কিনা ওই চিঠির উত্তর লিখলাম! [কপালে দুর্গতি থাকলে কতই কী-ই না হয় এ জীবনে। নিজের অগোচরে বিষবৃক্ষের চারা রোপিত হয় আর কপালকুণ্ডলাকেও সলিল সমাধি বরণ করতে হয়!
চিঠির জবাবে ওই অপরিচিতিকে আমি জানালাম যে, আমার বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন, আমি ভয়ানক এক দুঃসময়ের মাঝ দিয়ে যাচ্ছি। তাই লেখালেখি শুধু নয়, সমস্ত কিছু থেকেই বহু দূরে আছি। কবে আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব, আমি তা জানি না।
দিন কয়েক বাদে এক দুপুরে ডাকপিয়ন যথারীতি তার রহস্যঝুলি উপুড় করে দিয়ে যাওয়ার পর দেখি, সেই পরিচিত নান্দনিক-হস্তাক্ষর! সেই ডাকবিভাগের মনোটোনাস হলদেটে খাম! [যে খামগুলো দেখলেই সর্বাগ্রে মনে আসে গরিবিয়ানার কথা খামের ভেতরে সস্তাদরের কাগজে লেখা আড়াইপাতার চিঠি!
[কবি চন্দ্রাবতীকে জয়চন্দ্র সন্ধ্যামালতির ফুলের নির্যাস দিয়ে আড়াই অক্ষরে লিখেছিল চিঠি!
কিন্তু চিঠি খুলে আমি অঝরো-অশ্রুজলে ভেসে যেতে লাগলাম। যেন তখনি কোনো পূর্বমেঘ বেগবান-হাওয়ার টানে উড়ে এল! আর ঝরিয়ে দিলো মুষল-শ্রাবণ।
তোমার ধারাজলে ভীষণ দাবদাহ নিবলো যার, সেই আম্রকূট/ সাদরে টেনে নেবে বুকে তার, জুড়োবে ভ্রমণের পরিশ্রম;/ বন্ধু যদি চায় শরণ, তবে তার অতীত-উপকার-স্মরণে/ ক্ষুদ্রজন সেও থাকে না উদাসীন, কী আর কথা হবে তবে মহতের।/
[পর্ব-১৭, পূর্বমেঘ কালিদাসের মেঘদূত : ভূমিকা-অনুবাদ-টিকা: বুদ্ধদেব বসু তৃতীয় সংস্করণ : চৈত্র ১৩৬৯, মার্চ ১৯৬৩
আমি চোখ বুজে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার শরীরের উপর দিয়ে চলে যাক কোনো ভারী যান। বা দূরপাল্লার কোনো যাত্রীবোঝাই বাস।
চিঠির সমস্ত অক্ষরগুলো তুমুল মেঘজলে ভাসতে ভাসতে একসময় স্পষ্ট হলো।
চিঠির সমস্ত শরীর জুড়ে বিছিয়ে আছে সুজিত সরকারের কবিতা।
মাটি সব ধ'রে রাখে।/ ঝ'রে যায় যত পাতা, যত ফুল/ ম'রে যায় যত পশু, যত পাখি/ মাটি সব ধ'রে রাখে।/ গাওয়া হয়ে গেছে যত গান/—সব মিশে আছে হাওয়ায় হাওয়ায়।/ কিছুই হারায়নি, কিছুই হারায় না—/ সব থাকে, থেকে যায়, আকাশে, মাটিতে।/ কিছুই হারায় না/
সুজিত সরকারের এই কবিতাখানি পড়ার পর সহসা অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এল আমার মন ও শরীরে। আব্বার সঙ্গে আমার যেরকম সম্পর্ক ছিল—শূন্যলতার সাথে বৃক্ষের যে নিবিড়-বোঝাপড়া—তা যেন আমি মুহুর্তেই ফিরে পেলাম। আমি আমার চারপাশের সবকিছুতেই আব্বাকে অনুভব করতে লাগলাম। কিন্তু আব্বাকে আমি আর কোনোদিন স্পর্শ করতে পারব না, তীর্থের কাকের মতো আব্বা আমার পথপানে তাকিয়ে তাকিয়ে আর কাঁদবে না, আমাকে দিন কয়েক না-দেখলে টেলিফোন করে বলবে না—কী আসবা নাকি? না থাক, আইসো না। আব্বার সাথে আর কোনোদিন আমি একটা কথাও বলতে পারব না—এই বোধ আমাকে প্রায়শই উন্মাদগ্রস্ত করে তুলত। আর আমি ভয়ানক অবসাদে বিপন্ন হয়ে যেতাম। আমার মনে হতো আমি ছুটে চলে যাই দিনরাত্রি কোলাহলে ডুবে থাকা সামনের বড় রাস্তাটিতে—অগণন চলন্ত-গাড়ির বহরের সামনে আমি চোখ বুজে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার শরীরের উপর দিয়ে চলে যাক কোনো ভারী যান। বা দূরপাল্লার কোনো যাত্রীবোঝাই বাস।
সারারাত জেগে থেকে ভোরের দিকে দুচোখ সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে মাথার ভেতর এক বিশাল সরীসৃপের ফণাতোলার হিশহিশানিতে ফের আমি তন্দ্রাহীন হয়ে যেতাম। সেই সরীসৃপ আমাকে তার প্রকাণ্ড ফণা দুলিয়ে হাসতে হাসতে যেন ইশারা করত—যাও, যাও, চারতলার ছাদ থেকে ঝাঁপ দাও। একবার ঝাঁপি দিয়ে দেখোই না। তুমি তখন ঠিকই উড়ে বহু দূর যাবার জন্য দুটো ডানা পেয়ে যাবে।
এরকম নাজুক মানসিক পরিস্থিতির মাঝে কোনোকিছুর ভূতভবিষ্যৎ বর্তমান নিয়ে ভাবার মতো অবস্থায় আমি ছিলাম না। সেই অদেখা-তরুণের সাথে আমার অনিয়মিত পত্র যোগাযোগ শুরু হলো। প্রথমে মাসে একটা চিঠি। পরে দিন পনেরো অন্তর একটা করে চিঠি। ক্রমান্বয়ে তা হপ্তায় গিয়ে দাঁড়াল। আহা! সেই হলুদরঙা-চিঠিযুগের দিনরাত্তির! পায়রা-ওড়ানো-সুবর্ণসময়ের অবিরাম পাখসাট! আর দামাল-হাওয়ার ডানায় ভর করে উড়ে আসা পূর্বমেঘ-উত্তরমেঘ-শব্দাবলি!
আমার অনুনয়ে, নিজেরও লাভহেতু, আয়ূষ্মন, তুমি বলবে:/ ‘তোমার সহচর যদিও বিবাহিত, জীবিত আছে রামগিরিতে।/ অবলা, তোমাকে সে কুশল জিজ্ঞাসে, প্রথমকৃত্য এ-প্রশ্ন, /কেননা প্রাণীদের জীবন অস্থির, বিপদ ঘটে অতি সহজেই।/
[পর্ব ১০৪, উত্তরমেঘ কালিদাসের মেঘদূত : ভূমিকা-অনুবাদ-টিকা: বুদ্ধদেব বসু তৃতীয় সংস্করণ : চৈত্র ১৩৬৯, মার্চ ১৯৬৩
আজ খুব বিস্ময় নিয়ে ভাবি, আমার মতো ভাবালুতায় পরিপূর্ণ, অতি মাত্রার সেন্টিমেন্টাল মানুষ বুঝি-বা এ জগৎসংসারে আর দ্বিতীয়টি নাই। নইলে গাছপালা-তরুলতা-ফুলফল নিয়ে নিত্যদিনের জার্নাল লেখার মতো ওই চিঠিগুলোর জন্য সারা হপ্তা জুড়ে কেন ছিল অধীর প্রতীক্ষা? আমি তাকে চিনি না-জানি না, জানি না তার বয়স কত? সে কী করে? কোথায় সাকিন? আমি এসব কিচ্ছু জানার প্রয়োজনও কোনোদিন অনুভব করি নাই। আমার মাথার ভেতরের নিশ্ছিদ্র-অন্ধকারের মাঝে কেবল কিছু হস্তাক্ষর ভোরের শিউলির মতো ফুটে উঠতে শুরু করল!
আমি ক্রমশ অজানা এক ব্যাধির দিকে ধাবিত হলাম। যেন আমি অগাধ জলে তলিয়ে যাচ্ছি, জলের প্রচণ্ড-তোড়ে আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে।
আমার দিন-হপ্তা-মাস সবই পত্রাবলির ফুল্লকুসুমে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে লাগল। মাসে চার কি পাঁচটা চিঠিই হয়ে উঠল আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন। আমার পৃথিবীতে যেন আর কেউ নাই, কিচ্ছু নাই। কিংবা আমি যেন চিরকালের কোনো অন্ধ, যে এই প্রথম ব্রেইল পদ্ধতিতে অক্ষরের সাথে পরিচিত হতে চলেছে!
অজস্র শব্দের ভুলভুলাইয়ার মাঝে পতিত হয়েও আব্বাকে আমি প্রতিক্ষণেই ফিল করতাম। আব্বাকে ফিল করতাম একেবারে বুকের পাঁজরের ভেতর থেকে। আমার সমস্ত রোগ-দুঃখ-শোক-বেদনা-ভালোবাসা-সাফল্যে যে মানুষটিকে আমি চিরদিন আমার শিয়রে ঠায় দাঁড়ানো পেয়েছি—সে আব্বা! আব্বাই একমাত্র!
আব্বার অনুপস্থিতি আমাকে একেবারে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কোনো বদ্ধ-উন্মাদের অনুরূপ অপ্রকৃতিস্থ করে দিল। আমি ক্রমশ অজানা এক ব্যাধির দিকে ধাবিত হলাম। যেন আমি অগাধ জলে তলিয়ে যাচ্ছি, জলের প্রচণ্ড-তোড়ে আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে—কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য কোনো পথই আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
My world falls apart, crumbles, ‘The center cannot hold.’ There is no integrating force, only the naked fear, the urge of self-preservation. I am afraid. I am not solid, but hollow. I feel behind my eyes a numb, paralyzed cavern, a pit of hell, a mimicking nothingness. I never thought. I never wrote, I never suffered. I want to kill myself, to escape from responsibility, to crawl back abjectly into the womb. I do not know who I am, where I am going—and I am the one who has to decide the answers to these hideous questions. I long for a noble escape from freedom—I am weak, tired, in revolt from the strong constructive humanitarian faith which presupposes a healthy, active intellect and will. There is nowhere to go.
[Sylvia Plath, The Unabridged Journals