ঈদসংখ্যার কবিতাগুচ্ছ - ১

গৌতম বসু সুকুমারীকে না-বলা কথা

ফিরে যাবার সময় যখন আসবে, কী হবে কে জানে। খড়ের বিড়ের ’পরে রাখা, জলের সেই বিরাট জালা, মনে পড়ছে? বিড়ের ভিতর থেকে বিছে বেরিয়ে এলে তোমার কী দশা হতো, মনে পড়ে? প্রত্যহ, আমি ঘাতক। তোমায় বলা হয় নি, কবেকার কথা, তবু সিরাজুল এখনও ভাইয়ের নামে গঞ্জে মামলা ঠোকার কথা ভাবে। আমি ভূপৃষ্ঠে জল ঢালি, কোথা যায় প্রশান্ত জলধারা? আদালতের বারান্দায় ঐ ঘোরে ক্রুদ্ধ, দুঃখী সিরাজুল। তোমার জন্যে চটি হাতে ছুটেছিলাম বিছের পিছনে, বলেছিলাম ‘লড়াই গেছে থেমে’; তোমারই জন্যে ভূপৃষ্ঠে জল ঢেলেছিলাম, যদি কখনও সিরাজুল রাগদুঃখ ভুলে গ্রামের পথে ফেরে, যদি বিছে ন’ড়ে ওঠে আবার ৷৷  

গৌতম চৌধুরী আরবচৈত্রের দিন কী শ্রেয়? যাহা সকলেই জানে। যাহা সবার অজানা, সেই রহস্য তবু বহু মঞ্চসাফল্যের পরে একদিন ভয়াবহ আগুন, অহো সংলাপগুলি ওড়ে নভে নভে চিত্রিত ফানুস, ঘোড়সওয়ার, চাকায় পিষিয়া-যাওয়া আদর্শলিপি তবু ছাই কুড়ায় হৃতবস্ত্র অবোধ, মাখে লজ্জাস্থানে, অহো কী কার্যকারিতা *** ছিল না কোথাও এই দিন আরবচৈত্রের, মহাযোগিনীর ঘুম ছিল না উপলক্ষের মতো বাতাস ছিল না, অনুতাপ আত্মনির্যাতন—কিছু না এই দিন ছিল না, নাই, রহিবে কি রহিবে কি—কী যে বোকার মতো প্রশ্ন, যা তা উচ্চাশার সংজ্ঞার মতো ঘুঘু ওড়ে, ওড়ে মেঘ, পথনির্দেশিকা নাকি? ছিঃ, চুপ *** শব্দ অপক্ষপাতী, যেমন পরিস্থিতি, তাহা শুধুই থিতু হইবার নয় ডানা মুড়িয়া বসিয়া-থাকা পাখির অন্তকাল ঘনাইল ঠাহর হয় বা, উড়াল দিবার আগে পলকের জবুথবু, স্থাপনার ভিতরের স্থায়িত্ব যেন কল্পনার শুভাশুভে ঘটনা বদলায়, বদলায় ব্যাখ্যা, ভাবসম্প্রসারণ *** একটু বাতাস থাক, থাক স্নায়ু, রক্ত চলাচল, ধরা খাইয়া বোকা বোকা হাসি ছিঁচকে চোর পুরা দৌলতের খবর রাখে না, তাহার ঘুরঘুর অল্প নেশার জন্য ইহা কোনও জখমের গোঙানি নয়, নয় চাকাভাঙা রথের ভৌতিক দৌড় জোসনা পার হইয়া যায় অনায়াসে, পিছনে প্রান্তর ও সময়, রক্তের দাগ, তীব্র, অনাহত  

মাসুদ খান ব্যাপন গোয়ালিনীর ছোট্ট মেয়ে, মনের আনন্দে একটু একটু করে পানি মিশিয়ে চলেছে সারি-সারি দুগ্ধভাণ্ডে, অলক্ষে সবার। আহা, কী যে অনাবিল দুধে-জল-মেশানোর সুখ! খিলখিল হাসি-মেশানো, স্নিগ্ধ ফাঁকি-মেশানো ঊনঘনত্বের ওই দুধ মুগ্ধমনে যাবে মদিনায়, মথুরায়, উরুবিল্ব, নিশাপুর... ছলকে ছলকে দেশ-প্রদেশ পেরিয়ে দেশান্তরে, অনাবিষ্কৃত উপমহাদেশে ননিচোরের ননি ও মাখনে, সুজাতার পরমান্নে, দরগার শিরনিতে, ঠাকুরের প্রসাদে, বেদুইন পশুচারকের গামছায়-বাঁধা কাঁচা-কাঁচা ক্ষীরশায়, খাঁ-খাঁ রোদ্দুরের মধ্যে হঠাৎ গায়েবি অনুশাসন থেকে বিকীর্ণ-হওয়া হাওয়াই সন্দেশে, সংশয়ে...  

কুমার চক্রবর্তী তোমার ধ্বনিময়তায় তন্ত্রমুদ্রার মতো দু-দুটো তিল পাহারা দেয় তোমার শরীর যেন শুক আর সন্ধ্যাতারা —অদৃশ্যভাবে পাহারা দেয় অসম্ভব-আকাশ। তোমার অস্তিত্বরাশি যেন ভাটিভূমে নেমে আসা সালসাবিল, মধুবনে ঘুমিয়ে পড়া মধুপবন, কার পরশে যে সংবেশিত আজ! এখনই নদীর জল ফিরে যাবে উলটোপথে, নিয়ে আসবে মালভূমির পূর্বরাগ আর চন্দনবনের নিদ্রালু হাওয়ার ঘুমধ্বনি। আমি টের পাই সময়ের স্মৃতি হয়ে যাওয়া, আর স্মৃতিও আবার জন্ম দিতে থাকে অজস্র আয়নামুহূর্তের, যা কিনা তোমাকে উদ্ভাসিত করতে চায় গুলশানমুখরিত হর্ষময়তায় —যা আজ সুর হয়ে, রাগ হয়ে, তান হয়ে, আমাকে বিবশ করে যায়!  

মুজিব মেহদী ডাকহরকরা পাশের বাড়ির গোঁফো বিড়াল লম্বা এক চিঠিসহ লাফিয়ে পড়ল ঘুলঘুলি পথে অভিবাসনের সুপারিশসহ ওর মালকিনের কোনো অনলাইন সুবিধা নেই ছুটিতে বেড়াতে যাবে তারা ফুটোফাটা বন্ধ করে সব দিনকয় গোঁফো তাই থাকবে এখানে আমাদের এঁটোকাঁটা সনে আমি ডাক বিভাগের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাঝেসাঝে ভাবি ডাকবাক্সগুলো মরিচার খাদ্য হলো অতিমাত্র বছরকয়েকে অবিশ্বাস্য লাগে ইমেইলের বিরুদ্ধে এমনকি ওরা একটা মিছিলও করে নি দাবিও তুলে নি কোনো সাইট-টাইট নিষিদ্ধ করার ভাবছি, বিড়ালটাকে একটা মিনি আইপ্যাড কিনে দেবো ভবিষ্যতে যাতে মন্ত্রী হতে পারে খোদ তথ্যপ্রযুক্তির খুলে দিতে পারে যাতে তার ও আমার মধ্যে দূরত্ব রচনা করে থাকা সব ভার্চুয়াল বাঁধ যোগাযোগভীতু সন্ধ্যা আজ গালে হাত দিয়ে বসে আছে স্মৃতিতে দৌড়াচ্ছে তার লণ্ঠন ও বর্শা হাতে নৈশপোস্টম্যান  

হিন্দোল ভট্টাচার্য ঝড় ঠিক কতদূর তুমি যেতে পারো বলো হাওয়া অর্বাচীন মৃত পাতা শুকনো বুড়ো মন নিয়ে ওড়ে আমি তো উত্তাপ বুঝি মাটি শুঁকে শ্বাপদ যেমন কিভাবে অতীত গেছে বুঝে নেয় মধু থেকে                                                  মাংসের ভিতর— সে আমাকে খুঁজে নেবে ভেবেছি অনেকদিন কুয়াশায় ধাক্কা খেয়ে জড়িয়ে আলগোছে শোয়                                        অরক্ষিত চাঁদ। বুকের ভিতরে কেন লোকগীতি ফোঁপায় আমি বুঝি না আকাশ তুমি ঠিক কতদূর থেকে আমাকে মায়ের কাছে রেখেছিলে                                        শ্রাবণআঁধারে— এত অনিশ্চিত কেন এভাবে জীবন বলো পৃথিবীর সব রান্নাঘর নিজেই নিজেকে খায় বিস্ফোরণ হয়ে যেন জল থেকে উঠে আসে                                                 তরুণী পৃথিবী! যারা দুঃখ পায় তারা শোনে কি                  এমন হাওয়া ছদ্মবেশে লিখে রাখে অনন্তের আকুলিবিকুলি?  

গৌতম মণ্ডল একটি কবিতা জল ও স্থলের মাঝে যে শূন্যতাটুকু আছে সেখানে একা একা মাঝে মাঝে দাঁড়াই দূর থেকে মেঘ ও রৌদ্র আসে অনাগত বৃষ্টিতে ভিজে যায় চুল ভেজা চোখ নিয়ে আরও একবার তাকাই দেখি, মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সার সার বালিহাঁস ওড়ে বাঁশপাতা ও বিষণ্নতা ক্রমশ বুঝতে পারি, আমি একা নই আমার সঙ্গে আছে সমগ্র পৃথিবীলোক ওই বিপুল শূন্যতা  

মেঘ অদিতি ছবি অথবা জীবন বিষয়ক

একটা সেতু অবধি স্মৃতি। ততোধিক বিস্মৃতি। শূন্যে টানটান শরীরে তখন এক মিলিয়ন সংলাপ। বাতাসে ঘাসের গন্ধ। এইসব ভ্রমণপ্রণালির ভেতর ধীরে ধীরে তৈরি হয় আগুনের পথ। আরও ধীরে সংঘটিত হয় ব্যক্তিগত বিপ্লব।

যোগাযোগ মূলত সেই অভিপ্রায় যেখানে মিথ্যাও স্ফটিক বাক্য। গ্রীষ্মকালীন ধ্বনি বাজছে। লু হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে বিবিধ সম্পর্ক ও প্রণয়প্রহার।

শোভা পাচ্ছে ফ্রিদা কাহলো-র একশ তেতাল্লিশটি স্থিরচিত্র।


ঈদসংখ্যা ২০১৯
সম্পাদক

সম্পাদক


এই লেখকের সব লেখা