মুক্তি মণ্ডল মানুষ
অসম্পূর্ণ জীবনেও মুঠো-ভর্তি সরল রোদের অট্টহাসিতে মানুষ নতজানু হয়েও ভালোবাসতে পারে ঘাসের মুকুট। অনর্থক করোটির মানচিত্রে আলোছায়ার তরঙ্গ বয়ে আনতে পারে জেব্রা কলোনির ভোর। ভোরের হাওয়া ঠেলে নিতে পারে দলিত রোদের পিঠে। মানুষ তৃণদল-মথিত অজস্র হাড়ের গুঞ্জনে ভেজা কাঠের অন্তরে ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন থেকে উড়াতে পারে সময়ের পাড় ভাঙা শব্দের মাতম। কোথাও হয়তো খুলে পড়ে সঙ্গহীন মানুষের ক্রোধ তবু অবুঝ লোহার আওয়াজ পেয়ে বাসনার ডানায় ঘুমন্ত মুখের ছায়া আঁকতে পারে তারা। চাকার ঘূর্ণনে লৌহ তরঙ্গের মুক্ত সুরের ভিতর বোবাজাহাজের কান্না শুনতে শুনতে মানুষেরা দেখতে পারে শুভ্রপথের বাঁক মুছে যাওয়া।তুষার কবির বীণা
দূরের সরোদ শুনে কার মুখ ভেসে ওঠে—বুঝি নি এখনো! তবে তোমাকে দেখছি এ সন্ধ্যায়, বীণা হাতে, কেয়াবন থেকে কিছুটা আড়ালে, বসে আছ এক গানঘরে। যেখানে হারিয়ে যাওয়া পয়ারের ঘ্রাণে ছুটে আসে এক বিষাদ ময়ূর! বীণা হাতে তুমি বাজিয়ে চলেছ দরবার-ই-কানাড়া, এ সন্ধ্যায়, গোধূলির লালাভ আলোতে! তোমার ভারি নিতম্ব পেঁচিয়ে ধরা কোটা শাড়িতে, তোমার বসে থাকার ঠাটে, সাক্ষাৎ সরস্বতীর মতোই লাগছে তোমাকে! তোমার বীণার সুরে বন থেকে ছুটে আসছে ডাগর হরিণ—উড়ে আসছে তিরতিরে আমলকী পাতা—ঠান্ডা সরোবরে ফুটে উঠছে রক্তাভ কোরক—আঙুরলতার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে সোনাঝুরি সর্পডাক! জানি, এ সন্ধ্যায়, বীণা হাতে তুমি বসে আছ—কেয়াবন পার হয়ে এক গানঘরে!
আবু মুস্তাফিজ গোলাপফুল
নগরের শেষ গোলাপফুল ফুটেছিল ভাগাড়ে অচেতন... পড়েছিলাম দুর্গন্ধে কেউ আমারে মেরে ফেলে রেখেছিল হতে পারে র্যাব পুলিশ কিম্বা সরকারি মস্তান অন্নসংস্থান দুরূহ বিধায় মানুষ মানুষকে ভালোবাসে না কেবলই নিজেরে কেবলই নিজেরে ভালোবেসে নিঃশেষ হয়ে গেলে গোলাপফুল ফুটে ওঠে ভাগাড়ে বাকিসব পোষা মানুষ ফসল হিসাবে ওদের বিক্রি করেছিল মানুষের কাছেপাপিয়া জেরীন এইসব দৃশ্যরা তোমার ইটভাঙা শ্রমিকের হাতুড়ি দেখা যায়— অতর্কিতে বেরিয়ে আসে পাথরের গোপন ফাটল, কামিজে ঝনঝন করে পুরোনো মোহরের মতো দুধ; টং দোকান থেকে দুজন বুড়ো আদম শাবল গেঁড়ে দেখে প্রত্নঘটী যদিওবা বেঞ্চিতে ঠেকে আছে ফলদ প্রোস্টেট, ফুঁসে ওঠা কেতলির ভেতর নেতিয়ে পড়ছে চা একটা দুইটা হলিউড পুড়ছে মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে গার্মেন্টস— হাতে টিফিন ক্যারিয়ার চুল চুয়ে নেমে গেল রাতের গলদঘর্ম। —পথের পাশে এইসব দৃশ্যরা তোমার অথচ, তুমি একটা ক্লোজশট হয়ে ফ্রেমে— মেডিক্যালে পড়ে আছ চোখ স্থির, নুয়ে আছে ঝড়ে ভাঙা ডানা!
স্কেচ : পাপিয়া জেরীননুসরাত নুসিন ইঙ্গিতউত্তরের হাওয়া একটা মাধবীফলের ঘ্রাণ নিতে পশ্চিমের দিকে। আমিও বেঁধেছি ঘটিবাটি, নদীতে নোঙর ফেলব। নদীতে তুফান এলে বাঁকে বাঁকে মাছের কোলাহল ভালো লাগে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব রেখে বুকের ধানগুলো কামনার ফসল ফলিয়েছে।
সে আছে চতুর আবাহনে—যে মাতাল ভ্রমের পাখি। তার বক্ষে বিষ আর ধুতুভরা হিসহিস। সে নদীতীরের প্রণয়ের সঙ্খ বোঝে নাই। নদীজল মিথ্যে নয়। বুকের ধানফুল মিথ্যে নয়—সত্য খোঁজে নাই।
এ ভূমিতে ফুটে আছে অনন্ত সাপের ইঙ্গিত। শ্বাসবনে ফুটে আছে শাশ্বত গতি। একটা পাখির দেখা পেলে তাকে দেবো কলসির সুডৌল রতি।
সমিধ বরণ জানা নিঃশব্দের দিকে যাত্রা
যেখানেই পা ফেলছি কলকল করে উঠছে কথা সমুদ্রের সঙ্গে কথা বলছে বালু মাছের সঙ্গে কথা বলছে ঝিনুক নুড়ি-পাথরের সঙ্গে কথা বলছে তৃণভূমি পাতার সঙ্গে কথা বলছে পক্ষিশাবক অস্ত্রের সঙ্গে কথা বলছে সৈন্যদল কথা বলে উঠছে রণসাজে সজ্জিত হাতি-ঘোড়া দ্বাদশীর চাঁদের সঙ্গে কথা বলছে উদ্যান তারা সবাই দাবি করছে, মাটি খোঁড়ো, জল আনো মাটির ডেলার মুণ্ডু বানাও আমাদের মুখের উপরে সব কাটাছেঁড়া আঁকো পরিপাটি নৈবেদ্য সাজিয়ে দাও তারপরে বন্ধন ছিঁড়ে অচেনা নির্বাসনের দিকে ঠেলে দাও আমরা নিঃশব্দ হইঅনুপম মণ্ডল গন্ধর্ব নগর
কত দূর থেকে মৃদু, হাওয়ার আর্তনাদ ভেসে আসছে—আর ডালে ডালে ভিজে পালকের মতো, শিশিরেরা, শুয়ে আছে, চুপে। যেন কোনো বন্ধন নাই। যেন, ক্ষীণ দীপালোকে, ঐ মেঘভার শ্লোকবারি, তার, রুদ্ধ অশ্রুজলে কেঁপে কেঁপে ওঠে।
* একটি সুকঠিন নিঃসঙ্গতার ভেতর, জোনাকির ঝাঁক জ্বলিতেছে। কোথাও, হয়তো শান্ত জলের ধারে নত হয়ে আছে এই সূর্যাস্ত, বট, পিয়ালের ছায়া। হয়তো, কেউ নাই ঘাটে—দূরে, বিস্তীর্ণ বটের মাথায় ধূসর সন্ধ্যা নেমেছে!
* শান্ত হও—পরাজয়ের নিরুদ্ধ বাণীগুলোকে বলি, শান্ত হও! এখন, দু'একটি ক্ষীণ তারা, ঘাসের বনের আড়ালে, শক্ত লতার মতন এঁকেবেঁকে ঢলে পড়েছে। দেবদারু গাছটি, কেমন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছে! বুঝি, কোথাও, একটি মলিন তৃণখণ্ড খসে পড়বার শব্দ হলো বলে মনে হয়!
হাসান রোবায়েত তারাধূলিপথ : ৩৪
ভাবছি, একদিন আমাদের ফেরা হলো না আর নিসর্গের নৈঃসঙ্গ্য, তামাম আস্তাবলের থেকে এই রূপ-অরূপের মধ্যে যেখানে একটি পুকুর সন্ধ্যায় দেখেছিল পটপটি ফুলের উপর দৌড়ে যাচ্ছে হাওয়ায় বিলীন ঢেউ—সমস্ত দূরান্ত জুড়ে ফাঁকা মাঠ, বাতাসে শুয়ে পড়ছে কণ্ঠির বিস্তীর্ণ গুল্ম, সন্ধ্যার শরীর ধরে গুল্মেরা উড়ে যাচ্ছে বহুদূর পীতরাজবনের চূড়ায়, বাতাসেরা ভ্রমণক্লান্তির সুরে যেখানে পেয়েছে ঘুম ও সরাইখানার আলো—পৃথিবীর এপার-ওপার যেন একটি তার ঝুলে আছে এবং হাজার হাজার কাপড় একবার উত্তর একবার দক্ষিণের হাওয়ায় ক্রমমুক্তির নীলিমায় উড়ে যেতে চাচ্ছে সন্ধ্যার ময়াল নদীর তীরে—
সমুদ্র ও আস্তাবলের এই খাঁড়ি এই তুষার-নিস্তব্ধতার ভেতর ছোট ছোট বাচ্চা রোদের থেকে গল গল করে নেমে আসছে ভেড়াদের স্রোত যেন বরফের তুলা যেন মিহিন মাখন উড়ে যাচ্ছে হিমখণ্ডের উপর—তাদের বিষাদ ধরে একলা তিতি বাতাসের নকশা কেটে কেটে যেন কোথাও কোনো এক মহিরুহপথে অনেক কালের ছায়ায় জমে থাকা তুষারস্তূপ, মাধুডাঙার কচুরি ফুলে মিশে যাবে ধান-উনুনের হেমে—তখন, গুল্মকুণ্ডলীর নিচে জামের গভীর ঘ্রাণ, সেইসব ঘূর্ণিবহুল মঞ্জরির পিছে পিছে কখনো দৌড়ে যাচ্ছে তিতি—ভেড়া আর বিষ্ণুবৃক্ষের পাশে একটি ঢালুপথ, অরণ্যানীর ঠান্ডা গাছপালা, সমাহিত নৈঃসঙ্গ্য, পাথরের বহুকাল নিচে জীবাশ্মের রোদন এক এক করে মিশে যাচ্ছে তুষার খাঁ-খাঁয়—খাঁড়িটা পার হলেই পীতরাজ ফলের বাগান, পৃথিবীর দূরারোহ সবচেয়ে শান্ত দুপুরের থেকে ভেসে আসছে শাল্মলীর হাওয়া, একটা উপত্যকা, যে কেবল দূরবসন্তের মধ্যে শবগামী চিলের ব্যথা, একটা তৃষ্ণা, যে কেবল মৃত্যুর শিশে হাই তোলে অনুগামী অশ্বারোহণের পর—
গভীর সেই পীতরাজ বাগানের মধ্যে শতাব্দী-পাথর এক হাওয়া তারাদের সৌরভ দিয়ে ঢেকে রাখছে ঝরে পড়া পাতাদের স্মৃতি, আর সেসব শিশুদের নাম ঘুমের মধ্যে যারা আঙুল চুষতে চুষতে পার হয়ে যায় দুপুরের অন্ধ চড়ুই, লেবু গাছের মৃত্যুতে যারা বোবা হয়ে সমুদ্রের বেগনি বাতাস চোখে মেখে ছড়িয়ে পড়ে অগ্নি ও নৈর্ঋত কোণে, মৃত্যু যাদের পাশে শুয়েছিল তুলার বল হয়ে—আর সেসব জেলেদের নাম, মাছের পেট চিরে চিরে যারা ফুঁ দিয়ে ঢুকিয়ে দেয় গান, ডাহুকের অমৃত-বাসর, এতকাল পানির মধ্যে থেকে কেবল ভাসমান দেখেছিল যাদের—আর সেসব কৃষকের নাম, বাদামফুলের খেতে যারা খুঁটে খুঁটে বসিয়ে দিয়েছিল ভেড়ার নাকের উপর জমে থাকা শিশির আর বুনন-কৌশল জানা মায়ের অজস্র সুখ-দুঃখের ছায়া—একজন জেলে আর একজন নাবিকের মধ্যে কেবল গানের পার্থক্যটুকুই আমি জানি—যেমন জানি একটা পীতরাজ আর লটকন সমসুগোল হলেও তাদের রয়েছে রঙ করা মিহিন বাতাসের পার্থক্য—
অরণ্যঘাসের কাছেই আমাদের দেখা হয় অন্তহীন তৃণখেত, তিতি আর ভেড়াগুলো চেয়ে থাকে মন্দিরের যুগযুগ নিঃসঙ্গতার দিকে যেন মৃত্যুও বহুদূর উড়ে যাওয়া বিবাহ-বাসর—কে যেন বলবান মোষের শিং এঁকে তুলছে দেয়ালে দেয়ালে, কণ্ঠি ফুলের অজস্র লণ্ঠন জ্বালিয়ে তার পাশেই মোষের দড়ি খুলে রাখছে কেউ—ধইঞ্চাবনের ধারে একটা শিস কেবল পাতার মর্মরকে জাগিয়ে আবার শুয়ে পড়ছে কোথাও—
তার সেই পরদেশী বন্ধুর কাঁধে তখন তারারা নেমে এসে ঘুঘুভরা বাতাসের ছায়ায় দেখছে তিতির আঙুল—নদীর প্রতিশ্রুত শোর—
সেসব তামাটে সন্ধ্যার ওপার কোথাও তুমি আছ—! যেখানে হাওয়ার মরণ ছড়িয়ে পড়ছে নক্ষত্রের শিস থেকে বনের সান্দ্র পাতায়—