সইঘ্রাণ
সইঘ্রাণ-এর বিভাব কবিতা
◘
বিনা জল মেটে না কি
চাতকের তৃষা
তুমি মদ তুমি গান
ঘাতকের সীসা
কাচবনে ফিরে যাই
অন্ধ জোছনায়
অক্ষ নাই বলে পাখি
ডানা ঝাপটায়
টাল খায় ঘুরে মাথা
ভবিতব্যে ত্রুটি
কৌতূহলে ফিরি পাশ
দেখি ফল দুটি
পেকে আছে বোঁটাসহ
কালো চারিধার
আতাবনে খুঁজি পথ
কসম আল্লার
গুনে দেখি ডাক নাম
শত ছিল প্রায়
হারিয়েছি, কৃপা করো
এখন আমায়—
১.
কী যে ভাবে দিঘি-জলা
সোনাঝুরিবন
মেদিনী বিদার হয়ে
ঘুরি প্রাণপণ—
আলোর হ্রেষায় কাঁপে
গৃহদীপাবলি
তারাধূলিপথে আমি
একা একা চলি
এক তার বাজে রোদে
এক তার জলে
সারাদিন চরাচর
সেই কথা বলে
২.
এক ধারে তীর ভেজে
এক ধারে স্নান
চোখের হাওয়ায় কাঁপে
মূক অভিমান
যাতনা-বিভাব এই
লঘু ইস্পাতে
কী জানি কী হয়ে যায়
আমাদের সাথে
মাটিতে এসিড-দ্রব
ধান পুড়ে ছাই
গরলের ছাঁচে বাজে
বিবাহ-সানাই
৩.
কোনদিকে প্রতিবেশী
নদী পানিহীন
শিমুল তুলার নিচে
ঝরে পড়ে দিন
কে যে বিষ কে যে রেণু
কে যে মূল সাঁই
পাখিদের ছবি এঁকে
কাগজে উড়াই
জোয়ারে প্রতিধ্বনি
অহেতু-অপার
আমার শরীরে আমি
ছায়াকারাগার
৪.
ছেঁড়া জুতা পড়ে থাকে
পথ বিপরীতে
ঝরে যাওয়া পাখি গুনি
মরা করবীতে
টুকরো হাসির বনে
ধু ধু চোরাবালি
আত্মহত্যা বলে
দুই হাত খালি—
যেতে পারি সন্দেহে
প্রতারণা-স্রোতে
মাংস পোড়ার ঘ্রাণ
ভাসে রেডিওতে
৫.
তোমার শেকল পরা
দুপায়ের ক্ষত
নাচের ছায়ায় কাঁপে
ফণা উদ্ধত—
ফোটার ভাবনা ফেলে
গূঢ় সঙ্কেতে
দমকল উড়ে আসে
কৃষিভূমি-খেতে
তুমি এসো, এসো তুমি
এইসব ক্ষয়ে
কারা যেন ফাঁদ পাতে
কূট বিনিময়ে
৬.
কে বা কারা সারাদিন
ছড়িয়েছে ঘৃণা
আগুনের গাঙ বেয়ে
ফোটে ব্যালেরিনা
আয়ুর ভেতরে নাচ
চরাচর মৃত
চেরা জিভ সুনসান
কাঁপে আরোপিত
বিষ জ্বলে, জ্বলে হাসি
লকলকে ভোর
কফিন শুকাও রোদে
কাঠের দোসর
৭.
ওই ট্রেন থেমে গেল
তোমাকে উঠাবে
স্লিপারে জোছনা জমে
হুইসিল ভাবে
কাদের আসার কথা
আসবে না আর
গভীর রাতের ধারে
পোড়ে সালফার
এখানে অনেক ঝুল
মাকড়শা ঘরে
এবারে না হোক, এসো
জন্মান্তরে
৮.
জানু ডুবে চেয়ে আছি
অথৈ খরায়
পাথরে ডেগার রেখে
লু হাওয়া জড়ায়
ফিরে এসে একদিন
হাড়-কঙ্কালে
আবার পড়ব ধরা
ধীবরের জালে
আমাদের কৃষিখেতে
ধু ধু মারী-ক্ষয়
তোমাকে পাবার পথে
শুধু দেরি হয়
৯.
কোথাও বেরিয়ে পড়ো
যেন বহুদিন
মেঘের অহেতু বনে
বাজে ভায়োলিন
বলিও রূপের কথা
বাতাসে ও মদে
এ শরীর শস্যের
ভরা জনপদে
রেণু ওড়ে সারাদিন
বাঙ্ময় ত্রাসে
যে যায় নিজের কাছে
সে-ই ফিরে আসে
১০.
অরূপে সাধন তুমি
একা চারিধার
সন্তাপ ভাসে রোদে
মেদিনী-বিদার
ঢেউ দাও সে ভিড়ুক
তোমার ভাষায়
দেখেছি কাঠের নিচে
দিন চলে যায়
ঢেউ-অভিনয়ে ভাসি
অন্তর্জলী
তারার অধিক কাঁপে
গৃহদীপাবলি
১১.
লেবুফুলে হেলে রোদ
দূরে দিন যায়
অসুখে দাঁড়াল ট্রেন
জামের ছায়ায়
নদীবায়ু পথহীন
পশুপাখিহেম
মাকালের পাশে ফোটে
আমাদের প্রেম
ঠোকরায় পাখি আর
হাকাও সময়
তুমি বিনে মহাকাল
এ মাঠে ঘুমায়—
১২.
কোথায় কোথায় তুমি
খুঁজছি নয়ান
বঁধুয়া লেবুর পাতা
ঝরে সইঘ্রাণ—
আমের ফুলের ব্যথা
বাতাসে-ছায়ায়
সিনায় বর্শা বেঁধে
কূট ভরসায়
কসম আল্লাপ্রভু
নিম-জয়তুন
মনে না পড়ার তুমি
খাঁ খাঁ ফাল্গুন—
১৩.
অনেক অনেক কথা
বঁধুয়া সিঁথান
আমরা ছড়ায়ে পড়ি
নয়ানে নয়ান
তোমার ছ্যামায় শুনি
ভাটিয়ালি স্বর
কারা যেন ফুটা করে
লোহার বাসর
প্রতিবেশী গোখরারা
চরাচরহীন
তিস্তা নদীতে জ্বলে
দাউ দাউ বীণ
১৪.
কোথাও দূরের মেঘে
ভাঙছে বাথান
মোষের খুরের নিচে
রাত খান খান
জলাতে পানির তৃষা
হাতাশে দু চোখ
করলা বাগানে কাঁপে
ফুলভরা শোক—
তোমাকে মানত করি
তিলতিশি চাষ
শিঙের ঘাইয়ে ফোটে
ফুলের বাতাস
১৫.
কেন যে নিজের কাছে
বাঁধা শামিয়ানা
ছায়া দেয় মায়া দেয়
সহজিয়া ডানা
আল্লা-রাসুল ডাকি
ফোটে শিমফুল
ইহ-পর হারায়েছি
একূল ওকূল
সাপের চলন মাঠে
ভান করে ঘাস
গরুর দু বাঁট চোষে
বাস্তু দাঁড়াশ
১৬.
কোথাও শিমের ফুল
ঝরছে বেগনি
পাপড়ি দু ফাঁক করে
দেখি খোলা যোনি
নদী-গাঙ ঢেউ দেয়
ভেতরে তাহার
প্রজাপতি বয়ে যায়
রোদের পাহাড়—
পিতার আঙুল ধরে
যাই মসজিদে—
পড়ে আছে দাহকাল
শ্মশানের ঈদে
১৭.
নদী ভাঙে মাঝরাতে
তোমার সিঁথান
ভেসে যায় চরাচর
গোস্তবিতান
ঘটিবাটি মোষ ভাসে
গরুর গোয়াল
কার বানে ফেটে গেল
মাটির চোয়াল
মেঘের আয়ুতে কাঁদে
কোন সে গুণিন
আচমকা ভেঙে যায়
বঁধুয়ার নিন—
১৮.
পুবের বাতাসে কার
ভাসে সইঘ্রাণ
ছটফট মরে হাওয়া
নাই কি নিদান—!
রাতের কেশরে ওড়ে
পুদিনার ঝাড়
হাঙরের গলা যেন
বালির ড্রেজার
কালো মেয়ে গোঙরায়
কিস্তি ও লোনে—
মাবুদ দেখিয়ো তাকে
কৃষিরসায়নে
১৯.
লতা-পাতা গুল্মও
হাতাশ প্রচুর
ছেড়ে দাও কথা কাটে
মূষিক চতুর
চোখের গর্তে ঢুকে
দেখি ধান জমা
আজীবন করে চাষ
তিশি আর ক্ষমা
ধার-বাকি যাই হোক
বিদেহ বাউল
সময়ের ফাঁকে ফোটে
পলাশ-পারুল—!
২০.
কে যে আসে কে যে যায়
বুঝি না কিছুই
আমার নয়ানে বেঁধে
তোমাকেই ছুঁই
মাঠের ঘাসের কাছে
পায়ের আওয়াজ
বকুলের ফুলে শুনি
ঘ্রাণ খোলে ভাঁজ
মুখ থেকে মুখে ফিরি
অচেনা সবাই
দুপুরে তোমার ডাক
বুকে তোলে ঘাই
গার্মেন্টস শেষে তুমি
ভিড়ে হাঁটো ফের
বিকাল গুটিয়ে নেয়
বোরকা রোদের
হাতের টিফিনবাটি
আধো ঝোলে ভাত
তোমার দু চোখ যেন
সুরার আয়াত
মুখ যেন কী সরল
পাতাটি পানের
তোমাকে সদকা দিই
আমার জানের
প্রবল জ্বরের পাশে
কাঁপে দীপাবলি
যা কিছু বলার কথা
তোমাকেই বলি
হাসান রোবায়েত
জন্ম ১৯ আগস্ট, ১৯৮৯; বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী...
বিস্তারিত
জন্ম ১৯ আগস্ট, ১৯৮৯; বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী আজিজুল হক কলেজ; বগুড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত বই — ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬ ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [ভারতীয় সংস্করণ, বৈভাষিক, ২০১৮ মীনগন্ধের তারা [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮ আনোখা নদী [কবিতা; তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ২০১৮ এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে [কবিতা; ঢাকাপ্রকাশ, ২০১৮ মাধুডাঙাতীরে [কবিতা; ঐতিহ্য, ২০২০ ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com (স্বল্প)