আমার একলা পথের সাথি : ১৭

পর্ব-১৬

পর্ব-১৭

গল্পের বই প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে আমি পাণ্ডুলিপি গোছাতে শুরু করলাম। মুক্তকণ্ঠের ‘খোলা জানালায়’ প্রকাশিত ‘লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা’ গল্পটিকে নামগল্প ভেবে রেখে অন্যান্য গল্প থেকে যাচাইবাছাইয়ের কাজ চূড়ান্ত করে ফেললাম। শুধু বাংলাবাজারে গিয়ে মাহমুদ ভাইয়ের হাতে পাণ্ডুলিপি পৌঁছানোর কাজটা বাকি। হঠাৎ একদিন এক নারীকণ্ঠের ফোন এলে আমি তাঁর কণ্ঠ চিনতে পারলাম না। কারণ তাঁর সঙ্গে আমার ইতঃপূর্বে কথা বা পরিচয় হয় নাই। তখন সে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল—আমি অদিতি ফাল্গুনি।

নাম বলার পর আমি তাঁকে চিনতে পারলাম। ‘প্রথম আলোর’ সাথে আগাগোড়া যুক্ত থাকার সুবাদে এই নাম আমার অপরিচিত থাকার কথা নয়। কারণ ‘প্রথম আলো’ যে লেখককে যখনই টেনে তুলতে চেয়েছে, তাঁকে নিয়ে এমন নির্লজ্জ কাজকারবার শুরু করেছে যে,  চিনতে না-চাইলেও যে কোনো পাঠককেই তাঁকে চিনতে হতো বা হয়। অর্থাৎ ‘প্রথম আলোর’ পাঠক হলে তাঁকে চিনতেই হবে। এমনই প্রথম আলোর বিজনেস-স্ট্র্যাটেজি। এবং বলাই বাহুল্য, প্রথম আলো তাদের নির্বাচিত লেখকদের নিয়ে যেসব আদিখ্যেতা করে , তা একেবারে চক্ষু-লজ্জা-ছাড়া পর্যায়ের। এই অদিতি ফাল্গুনি গায়েনসহ অনেককে নিয়েই প্রথম আলোর চূড়ান্ত রকমের আদিখ্যেতা ছিল বা আছে। কিছুদিন পরপরই অবশ্য প্রথম আলো তাদের ‘আদিখ্যেতার’ আদল বদলে নতুন নতুন মুখ পাঠকের সম্মুখে হাজির করে ।


তুমি কী করেছ পাপড়ি? তুমি ওই মেয়ের হাতে পাণ্ডুলিপি দিয়েছে কেন? ও তো খুবই পরশ্রীকাতর এক মেয়ে।


[যদিও আমার এসব বলতে অত্যন্ত সংকোচ লাগছে। শরমিন্দিতও বোধ করছি। তবুও এসব কথা কেউ কোনোদিন বলে নাই বা বলবে না। তাছাড়া আমি হাজার বললেও তো ‘প্রথম আলো’ তাদের চিরাচরিত স্ট্র্যাটেজি বদলে ফেলবে না। কেউ কেউ ভাবতে পারে ‘মেয়েলী ঈর্ষার’ বশবর্তী হয়ে আমি এসব বলছি। আদতে তা নয়। কারণ আমার ছাইপাঁশ যা-কিছু লেখাপত্র, সেসব নিয়ে আমি যারপরনাই আনন্দিত। আমি জানি, এর চাইতে ভালো কিছু লেখা আমার পক্ষে আর সম্ভবপর হয়ে উঠবে না! (জীবনের আলোও তো ক্রমান্বয়ে ফুরিয়ে আসছে!) প্রথম আলোর একই কুমিরছানার প্রদর্শনের রাজনীতি ব্যতীতও কেউ কেউ যে ‘ভালো লেখকের’ মর্যাদা প্রাপ্ত হয়, বা হতে পারে তার ভূরিভূরি উদাহরণ এক্ষণে টানা যাবে। একজন অচেনা ও নিভৃতচারী লেখকের মানসম্মত টেক্সটের কাছে ‘সাহিত্য রাজনীতি’ খুব একটা সুবিধা করতে পারে বা পারবে বলে আমার মনে হয় না

অদিতি ফাল্গুনি গায়েন আমাকে ফোন করে যা বলল, সেটার মর্মার্থ এরকম—

কানাডা প্রবাসী দুই/চারজন বাঙালি মিলে নতুন একটা প্রকাশনায় যাচ্ছেন ‘খনা’ নামে। তাঁদের মাঝে আছেন আলম খোরশেদ ও অন্য একজন লোপা তাসনীম। এঁরা দুইজনই বুয়েটিয়ান। তাঁরা বাংলাদেশে অত্যন্ত ভালো গল্প লিখছে এমন নারী-লেখকের বই করতে চান। অদিতি ফাল্গুনির বিবেচনায় আমি সেই লেখক। এখন আমি যদি রাজি হই অদিতির প্রস্তাবে। আর ‘খনা’ প্রকাশনের প্রকাশিত ওই বই কানাডা থেকেও ইংরেজি ভার্সনে বের হবে। মোটামুটি বহির্বিশ্বেও বইটি প্রচার পাবে।

আমি পড়ে গেলাম বিপাকে। এদিকে আমি ‘মাওলা ব্রাদার্সের’ মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ করে রেখেছি। অদিতিকে আমি বললাম, আমি আপনাকে পরে জানাচ্ছি।

কিন্তু পরের দিনই অদিতির উপর্যুপরি ফোন আসতে লাগল—

পাপড়ি আপা, বলেন আপনি ৪০% রাজি কিনা?

আবার একঘণ্টা পরেই ফোন, বলেন ৫০% রাজি কিনা?

ফোন আসতেই থাকল। আমি সত্যি সত্যি ফ্যাসাদে পড়ে গেলাম। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার দিদির কথা বারংবার মনে পড়ছিল—

সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে হয় না…

অদিতি ফাল্গুনি গায়েনের ক্রমাগত ফোন-কলের জ্বালায় ও সবগুলো গল্প ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে যাবে এই ভরসায় আমি ‘খনাকে’ পাণ্ডুলিপি দিতে রাজি হলাম। কথা হলো, স্পাইরাল বাইন্ডিং করে আমি অদিতিকে তা পৌঁছে দেবো। অদিতি তারপরেও এমন তাড়া দিতে লাগল যে, আমাকেও তাড়াহুড়া করতেই হলো। অদিতি তখন লালমাটিয়ার কোনো একটা এনজিওতে বসে। আমি একদিন চলে গেলাম তাঁর অফিসে। আমাকে দেখে অদিতি বলল—

ও আপনি সালোয়ার-কামিজ পরে এসেছেন! ভাগ্যিস শার্ট-প্যান্ট পরে আসেন নি!

আমি বুঝতে পারলাম না লেখালেখির সঙ্গে আমার পোশাকের সম্পর্ক কী?

পাণ্ডুলিপি দিয়ে এসে বুঝতে পারলাম, কোন গর্তে আমি পা ফেলেছি? আমি অদিতিকে অফিসে ফোন করছি সে ফোনই ধরছে না! ওই পাণ্ডুলিপির দুইটা গল্প তখনও অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিল। অদিতি ফোন ধরছে না দেখে আমি দুশ্চিন্তা আর ভয় নিয়ে শাহরিয়ার ভাইকে সবকিছু খুলে বললাম। শাহরিয়ার ভাই শুনেই আঁতকে উঠে বললেন—

আরে সর্বনাশ! তুমি কী করেছ পাপড়ি? তুমি ওই মেয়ের হাতে পাণ্ডুলিপি দিয়েছে কেন? ও তো খুবই পরশ্রীকাতর এক মেয়ে। ওর কাজ হলো অন্যের ক্ষতি সাধন করা। তোমার বই ও ‘মাওলা ব্রাদার্স’ থেকে কিছুতেই প্রকাশ হতে দেবে না। হয়তো ও কোথাও থেকে শুনে থাকবে যে, তুমি মাওলাকে পাণ্ডুলিপি দিতে যাচ্ছ।


সামান্য লেখালেখি করতে এসে আমার যত ক্ষতি নারীরা করেছে, পুরুষরাও একইরকমভাবে তা করতে চেয়েছে।


শাহরিয়ার ভাইয়ের কথা শুনে তো আমার আত্মা থেকে পাখি উড়াল দেয় দেয় অবস্থা। আমি একেবারে বেদিশা হয়ে গেলাম।

এর মাঝে একদিন অদিতি ফোন ধরলে আমি শুধু কোনোরকমে বলতে পারলাম, আলম খোরশেদের ফোন নাম্বার বা ই-মেইল আইডিটা আমাকে দেয়ার জন্য। উদ্দেশ্য, আসল ব্যাপার কী সেটা আমি আলম খোরশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেই জেনে নেব।

শুরু হলো আদিতির নানান তালবাহানা। আমি ওকে বাসায় ফোন করলে বলে, অফিসে রাখা আছে ই-মেইল আইডি। অফিসে ফোন করলে বলে, বাসায় রেখে এসেছি। আমি তখন পাণ্ডুলিপি ফেরত চাইলে সে বলে দিল যে, পাণ্ডুলিপি অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছি!

[এক্ষণে আমি ‘উচিত কথা’ বললে তথাকথিত নারীবাদীরা আমাকে তুলোধুনো করে ফেলবেন। সামান্য লেখালেখি করতে এসে আমার যত ক্ষতি নারীরা করেছে, পুরুষরাও একইরকমভাবে তা করতে চেয়েছে। এঁদের কেউ-ই কিছু কম ভোগায় নি আমাকে। কিন্তু আমার তবুও লজ্জা হয় না, আমার কিছুতেই লজ্জা নাই। সম্প্রতি এক লেখক যশোপ্রার্থী নারী, যার পশ্চিমবঙ্গের এক লিটল-ম্যাগ প্রকাশনা থেকে বই না হওয়াতে সে প্রায় উন্মাদ হতে চলেছিল, বইমেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও সেই বই আমি এক প্রকাশককে বলে ২০১৮-র বইমেলাতেই প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেই। কিন্তু সে আমাকে মই হিসেবে ব্যবহার করে তাঁর স্বার্থ ১০০% উদ্ধার করে সটকে পড়েছে এবং এখন নানান বানোয়াট বদনামি করে চলেছে! তবুও আমার অন্যদের উপকার করার স্পৃহা কমে না! আজব এক নির্লজ্জ মানুষ আমি! অবশ্য আমার তো জানার কথাও নয়, বন্ধুর ছলে কোন গুপ্তঘাতক এসে আমাকে ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত করে পালিয়ে যাবে?

আমি সত্যিই পড়লাম মহা ফ্যাসাদে। আলম খোরশেদের ই-মেইল আইডি বা ফোন নাম্বার কিছুই আমি সংগ্রহ করতে পারছিলাম না! ফের সাজ্জাদ ভাই আমার ভরসা! সমস্ত মুশকিলের আসান। আমি ‘অদিতিকাণ্ডের’ কোনোকিছুই তাঁকে না বলে আলম খোরশেদের ই-মেইল আইডিটা চাইলাম। সাজ্জাদ ভাই যথারীতি আন্তরিক কণ্ঠে বললেন—

ওহো সে তো আমার বন্ধু মানুষ। দাঁড়ান দিচ্ছি আপনাকে তার ই-মেইল আইডি।

এবং সাজ্জাদ ভাই তৎক্ষণাৎ আমাকে তা লিখে দিলেন।

আজ থেকে ২১/২২ বছর আগে ইন্টারনেটের এমন ইজি-এক্সেস ছিল না। পা বাড়ালেই এরকম পিচঢালা মসৃণ পথও ছিল না। মোদ্দাকথা সমস্ত বিশ্ব এরকম হাতের মুঠোতে ছিল না। আর মিরপুরও এত নাগরিক জৌলুসে ঝলমলে ছিল না। আমি মিরপুর এক নাম্বারের এক প্রায়ান্ধকার মার্কেটের নিচতলার ঘুপচি সাইবার ক্যাফেতে বসে আলম খোরশেদকে মেইল করলাম। ‘অদিতিকাণ্ডের’ বিস্তারিত লিখে জানতে চাইলাম আসল ব্যাপার কী?

আজ একথা স্বীকার করতেই হচ্ছে, আমার পাশে যেমন বর্ণচোরা গুপ্তঘাতকেরা ছিল, তেমনি পুষ্প-চন্দনে সুবাসিত অন্তরের মানুষের সংখ্যাও অপ্রতুল ছিল না। আলম খোরশেদ আমার মেইলের এমন এক আন্তরিক জবাব দিলেন যে, তা আজও আমার পিসির ফোল্ডারে সংরক্ষিত করা আছে। আলম ভাই আমাকে লিখেছিলেন—বইটা ‘খনা’ থেকে হচ্ছে এ-কথা সত্য, কিন্তু কানাডা থেকে এই বইয়ের কোনো ভার্সন হচ্ছে না। এবং ইংরেজিতে তো নয়ই। আমাকে অদিতি ভুল-ইনফরমেশন দিয়েছে। সেজন্য উনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমি চাইলে আমার পাণ্ডুলিপি তুলে নিতে পারি। এবং তা তুলে নিলে ‘খনার’ কোনো আপত্তি নাই।

আলম ভাইয়ের মেইল পড়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এত সৎ এবং উদার একজন মানুষ! এবং উনি এও জানালেন আমার বইয়ের কাজ চট্টগ্রাম থেকে হবে। এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ড. শাহীন আক্তার নামক একজন অধ্যাপককে। আমার পাণ্ডুলিপি কম্পোজের কাজ তিনি ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন।


অদিতি ‘সিন’ থেকে সেই যে ‘আউট’ হয়েছিল, সে তেমনই আউট রইল।


আলম ভাই আমাকে আরও লিখেছিলেন, আমি বাংলাদেশের যে কোনো বড় শিল্পীকে দিয়েই প্রচ্ছদ করাতে পারি। শুধু শিল্পীকে অবশ্যই ফিমেল হতে হবে।

আমি লেখালেখির শুরুতেই এক ধনুক-ভাঙা-পণে অবিচল ছিলাম—অর্থ বিনিয়োগ করে কোনোদিনই আমি নিজের বই প্রকাশ করব না। এমনকি কোনোদিন যদি আমার একটা বই-ও পাবলিশড না-হয় তবুও নয়। ‘খনা’ কর্তৃপক্ষ আমাকে সে-সম্মানটুকুও জানিয়েছিলেন। শুধুমাত্র আলম ভাইয়ের উদার ও আন্তরিক মেইলটির জন্য শেষ অব্দি আমি ‘খনা’কেই পাণ্ডুলিপি দেবো বলে মনস্থির করলাম।

অদিতি ‘সিন’ থেকে সেই যে ‘আউট’ হয়েছিল, সে তেমনই আউট রইল। আমার সঙ্গে ‘খনার’ হয়ে যোগাযোগ শুরু করলেন ড. শাহীন। এবং নানান সময়ে তিনি আমার বইয়ের আপডেট জানাতে লাগলেন।

আমি শিল্পী বিপুল শাহের [বিপুল গিয়াসের বন্ধু বিধায় আমাদেরও বন্ধু ছিল কাছ থেকে জেনে নিলাম নারী-চিত্রীদের মাঝে কে ভালো প্রচ্ছদ করে? বিপুল জানালো ড. ফরিদা জামানের কথা। আমি চারুকলায় গিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করে নামগল্পের সিনোপসিস লিখে দিয়ে এলাম। আর অপেক্ষায় থাকলাম—কবে আমার বইয়ের প্রচ্ছদ হাতে পাব?


 পর্ব ১৮

পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা