নরকের সহস্র তোরণ : ১

পর্ব-১

‘মান আরাফা নাফছাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।’
‘যে নিজেকে চিনেছে, সে তার খোদাকে চিনেছে।’


আভা

পত্রিকায় কী সংবাদ পড়বে মেয়েটি? এখন যেকোনো দৈনিকের পাতা খুললেই খুন, ধর্ষণ, দখল, দমন, পেষণ, বেলেল্লাদুর্নীতি আর পরিবেশ বিপর্যয়ের কালো কালো শিরোনামগুলো তার মন-মতি একেবারে মাটি করে দেয়, উদ্ধারহীন নিরাশার অন্ধকার তার চেতনাকে তুলে-মূলে গ্রাস করে। সময়ের নির্মমতা আর নিজের বুদ্ধি-বিবেক থেকে সে জেনেছে, মানুষের ভেতরের মানুষটা মরে গেলে জঘন্যসব পথে অফুরন্ত বিত্তসঞ্চয়ের নেশা তাকে ভূতের মতো পেয়ে বসে। তখন সে জগৎ-জীবনের সবকিছুই টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করে। তার শয়নে-স্বপনে শুধু টাকা! টাকা! তাই প্রয়োজনে জানোয়ার হয়ে উঠতে সে দ্বিধা করে না। উপমাটা আভার মন মতো হলো না। কারণ মানুষ ছাড়া জগতের কোনো প্রাণী ভবিষ্যতের জন্য কিছুই মজুত করে না। মতলব থেকে মজুত। পেট সর্বস্ব মানুষের কুমতলবে তিরিশ লাখ শহিদের রক্তে কেনা বাংলাদেশ আজ মাৎস্যন্যায়ের উর্বর ভূমি।

প্রতিদিন পাঁচবার আজানের সময় ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহ সবচে বড়’ পবিত্র এই উচ্চরবের ঘোষণায় এই দেশের মাটি, আকাশ-বাতাস বারবার আলোড়িত হয়। দেশে লক্ষ লক্ষ মন্দির-মসজিদ-মাদরাসা, এত এত টুপি-পৈতা, ধূপ আর আতরের গন্ধ, এত এত ওয়াজ মাহফিল, এত এত পুরোহিতের পবিত্র মন্ত্র ‘যদা যদাহি ধর্মস্ব গ্লানি...’, দেওয়ালে দেওয়ালে এত মানবতার বাণী, প্রতি বছর গরিব আর ছোট এই দেশ থেকে আল্লাহ-নবীর দিদার লাভের বাঞ্ছায় পবিত্র মক্কার পথে লক্ষ লক্ষ হাজীদের বিশাল কাফেলা ছুটে যায়। কোরবানি ঈদের আগেই বড়ত্বের, বীরত্বের, অর্থের ঝনঝনানিতে মুখরিত হয়ে উঠে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ত্যাগের মহিমা নয়, বড়ত্বের বিক্রম দেখাবার জন্য অবলা পশুর আকার-প্রকার ও সংখ্যা দিয়ে তারা এই দেশটাকে তখন একটা প্রদর্শনী করে ফেলে। আর দেশের গরিব, অনাথ আশি শতাংশ মানুষ তাদের এই বীরত্ব, মহত্ত্ব দেখে, তাদের কাছ থেকে এক-দেড় কেজি মাংস পেয়ে খুশিতে পাদতে থাকে।


রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তি আজ ফেউ; উন্নয়ন ও জিডিপির পারদ-ই হচ্ছে শেষ কথা।


আমাদের ঘরে ঘরে কালার টিভি, হাতে হাতে স্মার্টফোন, ডিশ আর নেটের সংযোগে আমরা তাবৎ দুনিয়ার মুখোমুখি থাকি চব্বিশ ঘণ্টা। আমাদের ঘরে ঘরে তালেবে এলেম, আইএ বিএ পাশ তরুণ, ঘরে ঘরে শিক্ষিতা মা। আমরা ঘর থেকে বাইরে পা ফেললেই দেখি ইমানদার নামাজি, দেশদরদি গরিবের বন্ধু লিডার। নেতাদের মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি, নামের আগে আলহাজ্ব। মঞ্চে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বড়ো পরহেজগারের সুরে বলতে শুনি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানুর রাহিম’। তার পরেই তিনি অবলীলায় ইহলীলার রাজনীতির কথা বলতে থাকেন। বলতে থাকেন তাদের মহিমার কথা, বড়ত্বের কথা। তিনি আতরের সুবাসে, টুপির বিজ্ঞাপনে, বিসমিল্লাহর মহিমা দিয়ে লুকাতে চান তার হাতের রক্ত, দুর্নীতির দুর্গন্ধ, মিথ্যাচার, কোন্দল। তারা দেশের অভিভাবক হয়ে মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে এই করতে থাকেন, এই বলতে থাকেন। তখন দেশের আশি শতাংশ মানুষ মুখ টিপে হাসে, মিথ্যাচারের বদ গন্ধে টেকনাফ থেকে তেঁতুুলিয়ার সবাই নাকে রুমাল চেপে ধরে আর মনে মনে ‘ইয়া নাফছি...ইয়া নাফছি’ যপে।

আজ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণ থেকে বৃক্ষ পর্যন্ত আত্মকলহে জর্জরিত, আমিত্বের লড়াইয়ে ক্ষত-বিক্ষত। সেই কালচার সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে উত্তরের গারো পাহাড় পর্যন্ত কলেরার জীবানুর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তাই আমিত্বের লড়াইয়ে তলে তলে তারা নিজের ঘরে একেকজন লড়াইবাজ ষাঁড়। তাই মাথায় টুপি থাকার পরেও খুব সহজে তারা ভুলে যান আল্লাহু আকবর কথাটার অর্থ। তাকে ভুলে থাকতে হয় তার ক্ষমতার আশপাশের মানুষেরাই ঋণখেলাপি নামের তকমায় দেশের ব্যাংকগুলো গিলে বসে আছেন, ভূমির নেশায় আদিবাসী আর সংখ্যালঘু উচ্ছেদ করছেন, ছলে-বলে-কৌশলে ভাইয়ের টাকা-জমি ভাই দখল করছেন। তাই আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত বিকারগ্রস্ত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে, বড়ত্বের লড়াইয়ে ধনী-গরিব, জ্ঞানী-অজ্ঞান সবাই টাকা নামক আফিমের নেশায় লড়ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে। আজ আর চাইলেও দেশের কোনো রাজনৈতিক দল এই কৃষ্ণগহ্বর থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

প্রাণঘাতী ভাইরাস যেমন মুহূর্তে এক থেকে একশ, হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি তেমনি অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতির ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়ারাও অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়েছে দেশের পদে পদে, স্তরে স্তরে। তাই আভার নজর এই নষ্ট সময়ের চোরা খিড়কি-কপাটগুলোর দিকে। যেখান দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে আমাদের তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, বেগম রোকেয়া, বিদ্যাসাগর, শেখ মুজিবের ছয়দফা, বঙ্গবন্ধুর পঁচিশ বছরের লড়াই, কারাভোগ আর একাত্তরে সাড়ে সাত কোটি মানুষের ত্যাগ ও বিশ্বাস। তার বদলে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে আলীবাবা ও চল্লিশ চোর; চিচিংফাঁক’র মন্ত্রবলে গলগল করে এসে ঢুকছে নরকের বিষ-বাষ্প-আগুন! রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তি আজ ফেউ; উন্নয়ন ও জিডিপির পারদ-ই হচ্ছে শেষ কথা।

আভার কাছ থেকে অনেক লম্বা লম্বা আলাপ শোনা হয়েছে তাই কেউ কেউ বদহজমের ফেরে পড়তে পারেন। কারো কারো কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে। কারণ এইসব জ্বরের প্যাঁচাল মাথানষ্ট মানুষ ছাড়া আজ আর কেউ বলে না। আজ আমরা সবাই যার যার আখের নিয়ে একা এবং শুধুমাত্র একা এক ব্যক্তি। তো এবার ইংরেজ আমলের একটা পাতলা গপ্পো শুনুন দেখবেন জোলাপের কাজ দিবে। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে অনেক মেধাবী বঙ্গসন্তানই আইপিএস দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছেন। কেউ কেউ কর্মযোগ্যতায় জেলা-কালেক্টরও। তেমনি একজন বিশেষ বাঙালি ময়মনসিংহের জেলা কালেক্টর হয়ে এলেন। তখন বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল চলছে। সেই সময় দুনিয়াটা আজকের মতো এমন দূষণজর্জর ছিল না যে ফাগুন-চৈত্র মাসেই মেঘ-বাদল শুরু হয়ে যাবে। ঘন ঘন কালবৈশাখীতে লণ্ডভণ্ড হবে গরিবের ভাঙাঘর।

সে-সময় বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালগুলো ছিল রোদ-গরম-ঘামাচি আর খরার দাবদাহে দগ্ধ। চারদিকে শুধু চাষ দেওয়া ধু-ধু মাঠ। বিরাট বিরাট পতিত প্রান্তর রোদে খাঁখাঁ করছে। মাঝে মাঝে আম-জাম বাঁশঝাড় ঘেরা ছোট ছোট গ্রাম। বাড়িগুলোর অধিকাংশই মাটির দেওয়ালের উপর ছনের ছাউনির ছোট ছোট ঘর। বাড়ির সামনেই ফসল মাড়াইয়ে খলা। গরু-বাছুর আর পায়ের তলার মাটি খাঁ খাঁ রোদে দিনমান পুড়ছে। পাশেই শুকনা পুকুর কিংবা ডোবার তলাটাও পুড়তে পুড়তে ফাঁটা বাঙ্গি। শতকরা নব্বইজন চাষার এই বাংলাদেশ। শতকরা সত্তরজন লোক দুই বেলা পেট ভরে খেতে পায় না। হাজার বছরের নির্যাতনে, লুণ্ঠনে নিঃস্ব, দুঃখী কৃষকের যে ক খানা হাড় বাকি ছিল তাও ইংরেজরা চুষতে চুষতে মজ্জা ছাড়া করে ফেলেছে।

তো খরা চলছেই। বৃষ্টির নাম-গন্ধ নাই। কৃষকেরা মাঠের জমি রেডি করে একছাঁট বৃষ্টির অপেক্ষায় নসিবে হাত দিয়ে বসে আছে। বৃষ্টি হলে ধান-পাটের বীজ বুনবে। কিন্তু নীল আসমানটা অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। সারাদিন রোদের নামে আকাশ থেকে খাঁ খাঁ আগুন ঝরে। মাঝে মাঝে দক্ষিণ থেকে হু হু করে ছুটে আসে ধূলা ভরা গরম বাতাস। সাথে মরা পাতা, খড়কুটা। চাষ দেওয়া পতিত মাঠে মাঠে, বাড়ির সামনের খলায় খলায় ঘূর্ণি ওঠে। ধূলায় দুনিয়াটা আউলঝাউল হয়ে যায়। গাঙপাড়ে, বিলপাড়ে কড়ই গাছের উঁচু ডালে বসে লম্বা লম্বা গলায় ডাকে চিল, বাজ, ঈগল। অকরুণ আকাশে উড়ে উড়ে তৃষ্ণার্ত চিউরালি (চাতক পাখি) কাঁদে, চেষ্টা করা... চেষ্টা কর। কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে, আল্লাহ তুই একটা মেঘ দে।


দুই হাজার তিরিশ সালের পর এশিয়ার বড় বড় নদীগুলো অবিশ্বাস্য রকমভাবে ক্ষীণস্রোতা হবে।


তো ময়মনসিংহে আসা নতুন কালেক্টর সাহেব কয়েকদিনের মাধ্যে খবর পেলেন ভালুকা এলাকায় পানির খুব কষ্ট চলছে। ভাওয়ালের শালবন ঘেঁষা রুক্ষ লাল মাটির উঁচু অঞ্চলটার মানুষেরা খাওয়ার পানির অভাবে বিলের দূষিত কাদা-পানি খেয়ে কলেরা, ডায়েরিয়া, আমাশয়ে মশা-মাছির মতো মরছে। একটা পুকুর হলে বছর বছর অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পায়। কালেক্টর সাহেব তত্ত্ব-তালাশ নিয়ে উপরে একটা জরুরি পিটিশন দিয়ে দিলেন।

দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল তবু ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে পুকুরের বরাদ্দ এল না। আরেকদিন অফিসে গিয়ে দেখেন বরাদ্দ এসেছে সাথে তার বদলির ওয়ার্ডারও! তিনি মনে খুব আঘাত পেলেন কিন্তু দমে গেলেন না। কোনো কালেই, কোনো বিপর্যয়েই বঙ্গসন্তানরা দমার পাত্র না। তাই তিনি নিখুঁত হিসাব-নিকাশ করে, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বিকাল নাগাদ পুকুর খননের যাবতীয় ভাউচার-টাউচার রেডি করে ফেলেন। তারপর বরাদ্দটা উঠিয়ে তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে কালেক্টর সাহেব চলে গেলেন নতুন কর্মস্থলে।

ময়মনসিংহে নতুন আরেকজন বাঙালি কালেক্টর সাহেব এসে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ল পুকুর কাটা বাবদ খরচপাতির মেলা কাগজপত্র! সব দেখে-টেখে তার মাথা নষ্ট; এত বড় বরাদ্দ! তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন পুকুরটা শুধু কাগজে-কলেমেই হয়েছে। বাংলাদেশে সামান্য স্বার্থের কারণে ভাই ভাইয়ের ঘাড় মটকে রক্ত পান করলেও পারতপক্ষে আমলা আমলার মাংস খায় না। তাই তিনি মহাফাঁপরে পড়লেন, কী করে মানুষটাকে ব্রিটিশের জেল-জরিমানা থেকে রক্ষা করা যায়? অনেক ভেবেচিন্তে তিনি উপরে আরেকটা পিটিশন দিয়ে জানালেন, জনকল্যাণে সদ্য খনন করা ভালুকার সেই পুকুরটার পাশেই একটা খেলার মাঠ আছে। আশপাশের তিন গ্রামের বাচ্চারা খেলতে এসে প্রায়ই পুকুরে পড়ে ডুবে মরছে। তাই পুকুরটা ভরাট করা খুব জরুরি। চতুর বঙ্গসন্তান এই আবেদনের সাথে পুকুর ভরাট বাবদ বরাদ্দের হিসাবটাও দিতে ভুল করেন না। এবার আর বরাদ্দ পেতে দেরি হয় না। সেই থেকে এই কপালপোড়া বঙ্গদেশে ‘পুকুরচুরি’ কথাটা সমহিমায় প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল। অবশ্য এখন আর কেউ পুকুরচুরি কথাটা ব্যবহার করে না। সবাই আছে সমুদ্র লোপাটের ধন্ধায়।

আভা জামালপুরের বিবি আতুয়াজান হাইস্কুলের শিক্ষিকা। ঢাকাতে এসেছিল পনেরো দিনের একটা প্রশিক্ষণে। কিসের প্রশিক্ষণ! নতুন করে কোনো কিছু শেখার ইচ্ছা অধিকাংশ শিক্ষকেরই নাই। একেকজনের ভাবে বোঝা যায় তারা জীবনে এত শিখেছে, এত জ্ঞানার্জন করেছে যে, জ্ঞানের ভারে আজ বড্ড ক্লান্ত। তাই একটু ফাঁক পেলেই টাকার আলোচনায় মর্চেপড়া ভেতরটাকে উজ্জীবিত করতে চায়। কেউ কেউ তুখোড় গোয়েন্দাদের মতো বলে যায়, আগের ব্যাচে পনেরো দিনের প্রশিক্ষণ শেষ কত করে পেয়েছে। তারা কত করে পাবে এবং এই পাওয়া-পাওয়ির মাঝ থেকে কর্তা ব্যক্তিরা খাবলা মেরে কতটা গোস্ত নিয়ে গেছে।

আভার ব্যাগট্যাগ সব গোছানো আছে। আগামীকাল সকালেই সে চলে যাবে। এইসব বেদনাদায়ক ভাবনার মাঝে আভা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার পত্রিকাটা হাতে নিয়ে এডিটরিয়ালটা পড়তে শুরু করে, ‘পৃথিবীর সকল জীবের মতো মানুষও আদিকাল থেকে নিজের অস্তিত্ব সংকটের তাড়নায় তটস্থ। তাই সম্ভবত এই বুদ্ধিমান প্রজাতিটি এতটা ধ্বংসবিলাসী ও ভোগী। ভোগের ফেনায় সে পৃথিবীর নিরানব্বই ভাগ পানিকে আজ বিষাক্ত করে ফেলেছে। আর মাত্র এক বিন্দু পানি দুনিয়ার শত শত কোটি মানুষের পিপাসার জন্য অবশিষ্ট আছে! পরিবেশবিদগণ বলছেন, দুই হাজার তিরিশ সালের পর এশিয়ার বড় বড় নদীগুলো অবিশ্বাস্য রকমভাবে ক্ষীণস্রোতা হবে। পর্বতগুলো হারাবে তাদের বরফের ঐশ্বর্য। পৃথিবীর এই ভয়াবহ প্রস্তুতি সত্ত্বেও পুড়ছে রেইন ফরেস্ট আমাজান, অনিবার্য হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, ভারত-পাকিস্তান, ভারত-চিন যুদ্ধ; নতুন আঙ্গিকে ফিরে এসেছে সাবেক স্নায়ুযুদ্ধও। বছরের পর বছর যুদ্ধ যুদ্ধ ধামামা বাজাচ্ছে উত্তরকোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র!’

রাত অনেক হয়েছে। পাশের সিটের মেয়েটা ফেসবুকে লাফালাফি, প্রেম-পিরিতির চুমাচাট্টি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল তাকেও বাস ধরার জন্য সকাল সকাল উঠতে হবে। তাই আভা পত্রিকাটা রেখে দেয়। তারপর বালিশটা ঠিকঠাক করে মাথার চুলগুলো সিথানের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। তার বেজার বেজার চোখে পৃথিবীর অনিবার্য বিপর্যয়ের বিষাদ আর স্মৃতির কোষে কোষে মৃত মায়ের মুখ। মা ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও শিক্ষক। রোজ রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমাবার আগে মা মুখে মুখে তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছিল। শিখিয়েছিল বর্ণমালার প্রথম পাঠ থেকে শুরু করে বিতরের নামাজের শেষ রাকাতের দোয়ায়ে কুনুত পর্যন্ত। তাই প্রতিরাতে বালিশে মাথা রাখতেই সে মায়ের গলা শুনতে পায়!

আভা বিছানায় ছোট্ট একটা গড়ান দিয়ে লম্বালম্বি পড়ে থাকা কোলবালিশে একটা পা তুলে দেয়। বালিশটা থেকে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ আসছে! এই ঘ্রাণ নিঃসঙ্গ জীবনের বিষণ্ন-স্বাধীনতার। তাই সে খুব সহজেই বালিশটা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার চিন্তাপ্রিয় মন ঘুমের মাঝেও পৃথিবীর পানি-সমস্যার কথাটাকে আঁকড়ে রাখে!


মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে আর জাতীর পচন শুরু হয় শিক্ষকদের মাঝ থেকে।


তার সারা সিথানজুড়ে ছড়িয়ে থাকা থাক থাক চুল আর বিমনা-মুখের মিষ্টি আদল দেখে  বোঝার উপায় নাই যে, সে নিজের রূপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে একটুও ভাবিত না। আজ তার ট্রেনিং শেষ হয়েছে। ইচ্ছা করলে আরো দুই-একদিন সে ঘুরাঘুরি আর গড়াগড়ি করে কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সে আর একটুও দেরি করতে রাজি না। এখান থেকে ফিরেই সবার আগে মাস্টারি চাকরিটা ছেড়ে দেবে। পরিপার্শ্বিক-অ্যাসিডিটির বিষক্রিয়ায় ওটা এখন আলসারের কাছাকাছি। কারণ আজকাল অনেকেই যে অর্থে শিক্ষকতা করে সেটা সে একটুও মেনে নিতে পারছে না। গত তিন বছর সে শত শত বার বিরক্ত হয়ে মাস্টারি ছেড়ে দেই দেই করেও ছাড়তে পারে নি! কিন্তু এবার এই বিষয়ে সে সিরিয়াস। হিসাব করে দেখেছে, খরচ-ফরচ আর বইটই কেনা বাদে গত তিন বছরে যা অবশিষ্ট আছে তাতে তার একলা পেটের আরো বছরখানেক চলে যাবে। এর মধ্যে কিছু একটা তো হবেই। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে, মানজাদ্দা, ফাওয়া জাদা। যে চেষ্টা করে, সে পায়।’

আগের দিনের জ্ঞানীরা বলতেন, মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে আর জাতীর পচন শুরু হয় শিক্ষকদের মাঝ থেকে। সেই মড়কে আজ দেশে প্রকৃত শিক্ষকের বড়ো অভাব। অতলে ডুবে যাবার এই ক্ষয়িষ্ণু কাল, সময়ের এই নিষ্ঠুর বিবর্তনে আজ নগণ্য সংখ্যক জ্ঞানপিপাসু আলোর ফেরিওয়ালা বাদে বর্তমানের এই টাকা-পাগল, ফাঁকিবাজ, ক্লিকবাজ মাস্টারদের মাঝে আভা খুব আনকমন। খুব বেশি বেমানান। তাই মানুষের সন্তানকে নিজের সন্তান বিবেচনায় মানুষ করে গড়ে তোলার ব্রতে তাকে আজ এই স্বাধীন দেশে, পদে পদে বিষ হজম করতে হয়। শিক্ষক নামের নৈতিকজ্ঞানহীন এইসব মানুষের চিন্তা-চেতনা, কর্মসর্ম দেখে প্রায়ই তার নিজের উপর নিজের-ই ঘৃণা হয়। মাসের পর মাস তাদের সাথে কথা বলার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পায় না সে। কারণ অর্থ চিন্তায় আচ্ছন্ন ক্ষীণদৃষ্টির এই মানুষগুলো বছরকা বছর কয়েকশ শব্দ প্রয়োগেই তাদের জীবন চেতনাকে সন্তুষ্ট রাখে! সঙ্গত কারণেই আভা এইসব মাস্টার আর পানদোকানদারের মাঝে কহতব্য কোনো ফারাক খুঁজে পায় না।


পর্ব-২

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা