লেখাটি শুরু করতে চাই আমাদের প্রধান সমালোচক, গদ্যের শিরোমণি, প্রবন্ধের জ্যোতির্ময় সিদ্ধিদাতা গণেশ বুদ্ধদেব বসুর একটি উক্তি দিয়ে:
বিশ্ববিদ্যালয়িক মহলে ‘প্রভাব’ শব্দটি যান্ত্রিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে: ইবসেনের ‘প্রেত’ নাটক পড়ে বর্নার্ড শ লিখলেন ‘বিপত্নীকের গৃহ’, এলিয়ট ভগবদ্গীতার ভাবানুবাদ ও ভাষ্য রচনা করে হিন্দু মানসের কাছে ঋণ স্বীকার করলেন। এই রকম প্রত্যক্ষ প্রভাব বা ঋণগ্রহণ সাহিত্যের ইতিহাসে অনবরত দেখা যায়, এবং যাঁরা বিধিবদ্ধভাবে গবেষণা করে থাকেন তাঁদের পক্ষে এই সম্বন্ধগুলোই খনিস্বরূপ। কিন্তু অন্য এক রকমের প্রভাব আছে যা গোপন বা লুক্কায়িত, যার বিষয়ে কবি নিজেও স্পষ্টত সচেতন নন; যা সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার অর্ধালোক থেকে বাইরে ভেসে ওঠে না কখনো, বা উঠলেও, ডক্টরেট-ডিগ্রিপ্রার্থীদের পরিশ্রমী মুষ্টিকে ফাঁকি দেয়। এবং এইসব গোপন প্রভাবই সবচেয়ে স্থায়ী ও গভীর।
(বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধসমগ্র, বুদ্ধদেব বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০১০, পৃ ২৪৯)
বুদ্ধদেব বসুর এই উক্তি থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে শিল্পী বা লেখকের মহিমাকে ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে ‘ডক্টরেট-ডিগ্রিপ্রার্থীদের’ প্রভাববিষয়ক অহেতুক চাঞ্চল্যে তিনি বিরক্ত। কেবল এই ‘বিশ্ববিদ্যালয়িক মহলে’ই নয়, আমাদের লেখকদের মধ্যেও ‘প্রভাব’ শব্দটি নিয়ে একটা অহেতুক অস্বস্তি সব সময়ই কাজ করে। কারণ শব্দটিকে আমরা সদর্থে বিবেচনা করি নি কখনো, এখনও না। আমাদের এখানে এটা এক সাহিত্যিক কুসংস্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো কখনো হয় হেয় কিংবা অন্যদিকে পরাক্রান্ত হিসেবে দেখাবার জন্য আড্ডায় আলোচনায় আমরা হামেশাই বলে থাকি 'ওমুক লেখক তমুককে প্রভাবিত করেছে' বা 'ওমুক লেখক তমুকের দ্বারা প্রভাবিত'।
এইভাবে দেখানোর মধ্যে দোষের কিছু নেই। কারণ প্রভাবিত হওয়া এবং প্রভাবিত করা শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ এমন কোনো মৌলিক লেখক বা শিল্পী নেই যিনি কোনো না কোনোভাবে তার পূর্বসূরিদের দ্বারা প্রভাবিত নন। আবার এমন কোনো প্রভাবিত গৌণ লেখকও নেই যিনি কোনো না কোনোভাবে মৌলিক নন। মৌলিক হওয়া এবং প্রভাবিত হওয়া সব শিল্পী ও লেখকের এক অনিবার্য নিয়তি।
এমনকি আমরা যাকে একটা সময় নিজেদের ঐতিহ্য বলে দাবি করি, তাও আসলে শতভাগ মৌলিক কিছু নয়, বরং অন্য কোনো সংস্কৃতির সংস্পর্শ থেকে আসা উপাদানের যোগফল। সাহিত্যের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটে বলে অক্তাবিও পাস আমাদেরকে এই বলে সচেতন করে দেন যে:
আমাদের ঐতিহ্যের মহান সব রচনাসম্ভারই হয়ে উঠেছে অন্য সব রচনার ফলাফল, কখনোবা প্রতিরূপ।
Todas las grandes obras de nuestra tradicion han sido concequencia –a veces la replica—de otras obras.(Octavio Paz, In/Meditaciones, Seix Barral, 1979, P 39)
এমনকি যে ভাষায় আমরা লেখালেখি করি সেই ভাষাটিও অসংখ্য বিদেশি ভাষার শব্দরাশির যোগফল কিংবা প্রভাবেরই ফলাফল। সুতরাং প্রভাব এড়িয়ে নতুন কিছু নির্মাণ বা সৃষ্টি অসম্ভব। খাঁটি বাঙালি বলে গর্ব করার মতো মৌলিক জিনিস হাতেগোনা এতই অল্পকিছু বিষয় আছে যা নিয়ে বড় কারবারি হওয়া সম্ভব নয়।
লেখালেখির শুরুর দিকে আমার এক সহযাত্রী বন্ধুর কাছে একদিন আড্ডার মধ্যে জানতে চেয়েছিলাম ইদানীং কী পড়ছেন। তিনি বললেন, আমি খুব কম পড়ি বা পড়িই না বলা যায়। কারণ পড়লে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা। উত্তর শুনে আমি না হেসে পারি নি। যদিও তিনি ঠিকই বলেছেন, কারণ যা কিছুই পাঠ করুন না কেন তার প্রভাব তো পড়বেই কোনো না কোনোভাবে লেখার প্রকাশ্য বা পরোক্ষ কোনো স্তরে গিয়ে। কিন্তু তিনি যেটা বোঝেন নি তা হলো কোনো প্রভাবই মৌলিকতার জন্য অন্তরায় হতে পারে না। আমি বরং সন্দেহ করব এমন কোনো লেখক বা শিল্পীকে যিনি শতভাগ মৌলিক বলে পরিচিত হয়ে উঠতে চান। আমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন যিনি প্রভাবিত নন বরং পুরোপুরি মৌলিক বলতে পারলে শ্লাঘাবোধ করেন।
কিন্তু আমি শ্লাঘাবোধ করব বরং উল্টোটা বলতে পারলে। কারণ প্রত্যেক লেখকই তা সে যত গৌণই হন না কেন—বোর্হেসের সেই অমোচনীয় উক্তির প্রতিধ্বনি করে বলা যায়—'সৃষ্টি করেন তার পূর্বসূরি।' প্রভাব কোনো লেখককে গৌণ করে না, গৌণ হন তখনই যখন তিনি প্রভাব থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাড় করতে ব্যর্থ হন বা প্রভাবকে সৃষ্টিতে রূপান্তরিত করতে পারেন না।
অগ্রজ লেখকদের সাথে সম্পর্কের সূত্রে বোর্হেসীয় এই ধারণার একটি পূর্বধ্বনি বা সমধ্বনি (প্রতিধ্বনি নয়) হঠাৎই লক্ষ করলাম ভূমেন্দ্র গুহের লেখা 'আলেখ্য: জীবনানন্দ' নামক বইটিতে। জীবনানন্দের কাছে তারই কবিতার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন যে, 'তাঁর কাব্যের সঙ্গে শেলি কিটস হুইটম্যান থেকে শুরু করে ইয়েটস-রিলকে-এলিয়ট পেরিয়ে ডিলান টমাস পর্যন্ত কবিদের কবিতার আত্মীয়তা।' এই ব্যাখ্যা জীবনানন্দের মধ্যে হয়তো খানিকটা অস্বস্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল। জীবনানন্দ কি ভাবছিলেন যে সঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁকে প্রভাবিত বলে ভুল করছেন? সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পরবর্তী উক্তিটি ছিল বিপরীত স্রোতের সেই অভ্রান্ত কিন্তু দুর্লভ উপলব্ধি যা একই সঙ্গে ভ্রান্তিমোচন ও স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছিল জীবনানন্দের মধ্যে: 'আপনি এদের বংশপরম্পরার, এরা আপনার উত্তরাধিকার; আমি তাই বলতে চাইছি।' বোর্হেসের মতোই ঠিক বিপরীত দিক থেকে সম্পর্কের অনিবার্যতাকে আবিষ্কার করে ‘পূর্বসূরি’ নয়, বলেছিলেন 'এঁরা আপনার উত্তরাধিকার।' জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার সাথে অ্যালান পো-র ’To Helen’ কবিতার সম্পর্কের কথা অনেকেই বলেছেন, সত্য বটে, অনেক সাযুজ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু যেটি আরও বেশি সত্য তা হলো এই সাযুজ্য, জীবনানন্দের ক্ষেত্রে কাজ করেছে স্বাতন্ত্র্যের উপায় হিসেবে, যে স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করে তুলেছে মৌলিকতাকে।
শুধু দূরের বা ভিন্ন ভাষারই নয়, এমনকি নিজ ভাষার কবিকুল—নজরুল, মোহিতলাল ও সত্যেন দত্ত থেকে শুরু করে একেবারে সমসাময়িক সতীর্থ অচিন্ত্য সেনগুপ্তের কোনো কোনো কবিতার চূর্ণবিশেষ উদ্দীপক হয়ে উঠেছিল জীবনানন্দের নিজস্বতার উন্মীলনে। অচিন্ত্য সেনগুপ্ত যখন বলেন: 'কীটের পাখার অস্ফুটতম বেদনা আমারে হানে', সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে যাবে জীবনানন্দ—'কীটের বুকেতে যেই ব্যথা জাগে আমি সে বেদনা পাই।' কিংবা জীবনানন্দ যখন এই একই অনুভূতি আরেকটু ঘুরিয়ে বলেন:
কেন এই মৃগদের কথা ভেবে ব্যথা পেতে হবে
তাদের মতোন নই আমিও কি?
আমরা এ কখা বলার প্রলোভন এড়াতে পারি না যে অন্তত এইখানে দুজনের অনুভূতি একই সমতলে এসে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু এ আশ্রয় তাদের স্বাতন্ত্র্যকে লুপ্ত করে দেয় নি। কেবল এই সাযুজ্যের অজুহাতে আজ আর কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয় যে দুজন একই ধারার কবি। কারণ দু’জনের প্রবণতার মৌলিকতা বা স্বাতন্ত্র্য এতই প্রকট যে তা আমরা সহজেই বুঝে ফেলতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার মহান লেখক, যার উপর দেশি-বিদেশি নানা তরঙ্গ তার প্রতিভাকে উত্তাল করে তুলেছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রকাশের স্বাতন্ত্র্যকে তা ব্যাহত তো করেই নি বরং তার স্বাতন্ত্র্যকে আরও বেশি নিশ্চিত ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিলো। চর্যাপদের কবি থেকে ঈষৎ অগ্রজ বিহারীলাল পর্যন্ত ছিল প্রভাবের অন্তহীন ঘুরানো সিঁড়ি, যা কোনো সর্তকতা ছাড়াই তিনি মাড়িয়ে গেছেন স্বাতন্ত্র্যের ঊর্ধ্বলোকে। চর্যাপদের কবি কামলি’র—'সোনে ভরিলী করুনা নাবী।/রূপা থোই নাহিকে ঠাবী'—রজতশোভন এই পঙ্ক্তির মুখোমুখি হওয়া মাত্রই আমাদের মনে পড়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের সুপরিচিত ’সোনার তরী’ কবিতার স্বর্ণোজ্জল পঙ্ক্তিগুলো:
ঠাঁই নাই ঠাঁই—ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
সাদৃশ্যের এই সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আমাদের অনুভূতি শিহরিত ও রোমাঞ্চিত বোধ করতে পারে বটে, কিন্তু তাই বলে একথা বলা যাবে না যে এই প্রভাব রবীন্দ্রনাথের স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ন করেছে। করে নি যে তার কারণ দু’জনের পরিপ্রেক্ষিত ও অভিপ্রায় ভিন্ন আয়োজনের স্মারক হয়ে উঠেছে।
একই রকম সাদৃশ্যের স্মারকচিহ্ন পাওয়া যাবে রবীন্দ্রনাথের ‘১৪০০ সাল’ নামক সুপরিচিত কবিতাটিতেও। ফরাসি জানি না, কিন্তু মুজতবা আলী যার হাতের কাছে, সে তার না-জানাকে নিশ্চিন্তে পুষিয়ে নিতে পারে বিশ্বস্ত দূতিয়ালির বদৌলতে। অতএব মুজতবা আলীর বিশ্বস্ত ঝাল চেখে দেখতে কারোরই আপত্তি থাকবে না আশা করি। রবীন্দ্রনাথের উপর মহাজনদের প্রভাবের সূত্রেই তিনি ফরাসি পঙ্ক্তিগুলোর সন্ধান দিয়েছিলেন আমাদেরকে:
রবীন্দ্রনাথের উপর মপাসাঁর ছায়া পড়েছিল সে-কথা পূর্বেই বলেছি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সহকর্মীরূপে তিনি ফরাসী কবিতানাট্য এমনকি ‘শারাদ’ও পড়েছিলেন। তারই ফলে
Celui qui me lira, dans les
siecle, un soir,
Troublant mes vers—
ইত্যাদি ইংরেজীতে শব্দে শব্দে অনুবাদ:
One who will read me, after centuries, one evening, turning over my verses—
`আজি হতে শতবর্ষ পরে’ হয়ে বেরল। কিন্তু প্রথম কয়েক ছত্রের পরেই রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চলে গিয়েছিলেন।(সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, প্রকাশ: ষষ্ঠ মুদ্রণ, ফাল্গুন ১৩৯৯ পৃষ্ঠা: ৩৪৬)
মুজতবা আলী কিন্তু একটুও মিথ্যে বলেন নি, কারণ তা-ই যদি না হতো তাহলে চৌর্যবৃত্তি বা প্রভাবিত হওয়ার দায়ে রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যের আন্তর্জাতিক আদালতে হেনস্তা করতে ছাড়তেন না প্রাচ্য বা প্রতীচ্যের কোনো পণ্ডিতই।
কোনো এক লেখায় বোর্হেস একবার আমাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন লাতিন এক কবির কবিতার অংশ বিশেষের সাথে—Ars longa, vita brevis যা চসারের হাতে পড়ে দীপ্ত হয়েছিলো এভাবে : The life so short / the craft so long to learn. আর এরও কয়েকশ বছর পরে ফরাসি ভাষার এক কবির পরম প্রশ্রয়ে তা Fleurs du mal-এর Le Guignon শীর্ষক কবিতায় পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল L'Art est long et le Temps est court রূপে, বু্দ্ধদেব বসুর অনুবাদে যার অর্থ দাঁড়ালো ’শিল্প বিশাল, আয়ু অতিশয় হ্রস্ব।’ আমরা যারা বোদলেয়ার পড়ে মাতাল তারা কখনো তলিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করি নি অমূল্য এই হিরের টুকরোটি কোন খনি থেকে এসেছে। আজ কে আর মনে রেখেছে সেই লাতিন কবিকে!
কিন্তু কেবল চূর্ণ রূপেই নয় কখনো কখনো অন্য ভাষার পুরো একটি কবিতাই পরবর্তীকালের অন্য ভাষার কবিতে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে নিশ্চিন্ত ভরসায়। নিচে প্রথম যে-কবিতাটি আমরা দেখতে পাচ্ছি এটি রচিত হয়েছিল পর্তুগিজ ভাষার কবি লুইস দে কামোয়েস (১৫২৪-১৫৮০) কর্তৃক। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল তার মৃত্যুর পর ১৫৯৮ সালে প্রকাশিত Rimas নামক এক গ্রন্থে।
Love is a fire that burns unseen
Love is a fire that burns unseen,
a wound that aches yet isn’t felt,
an always discontent contentment,
a pain that rages without hurting,
a longing for nothing but to long,
a loneliness in the midst of people,
a never feeling pleased when pleased,
a passion that gains when lost in thought.
It’s being enslaved of your own free will;
it’s counting your defeat a victory;
it’s staying loyal to your killer.
But if it’s so self-contradictory,
how can Love, when Love chooses,
bring human hearts into sympathy?
—Luís Vaz de Camões
এবার নিচের কবিতাটি দেখুন যার রচয়িতা স্প্যানিশ ভাষার সেরা লেখকদের একজন ফ্রান্সিস্কো দে কেবেদো (১৫৮০-১৬৪৫)।
It's burning ice, freezing fire
It's burning ice, it's freezing fire,
It's a painful wound that can't be felt,
It's a yearned goodness, a present evil,
It's a brief and extenuating rest.
It's a mistake that makes us cautious,
It's a coward under the guise of a brave,
A lonely walk among the masses,
It's to love being love's prey.
It's a captive freedom that
Lives until the last breath,
An illness that worsens if it's healed.
This is the child Love, this is his abyss.
What a friendship he will have with nothing,
He who is in everything contrary to himself!
মনে হয় যেন কামোয়েসের কবিতাটিরই হুবহু অনুবাদ। সন্দেহ নেই যে এটা সজ্ঞানেই তিনি নিজের ভাষায় কবিতাটিকে হুবহু অনুসরণ করেছেন। কেবেদো নিন্দামন্দের সামান্যতম ভীতি ছাড়াই কেন এমনটি করেছেন? এক. পাঠের পরাক্রান্ত প্রভাব। দুই. মধ্যযুগে পূর্ববর্তী কোনো বিখ্যাত ও ভালো লেখকের অনুকরণ করাকে মোটেই গর্হিত বলে মনে করা হতো না, বরং উল্টোই ভাবা হতো। এমন ভাবার পেছনে মনস্তত্ত্ব ছিল এরকম: উত্তরকালের লেখক নিঃসন্দেহে বিদ্বান এবং ভালো কিছুর গুণগ্রাহী।
প্রভাবের সূত্রে মনে পড়ছে এমার্সনের উপর বোদলেয়ারের প্রভাব নিয়ে আমার সমাধানহীন একটি পর্যবেক্ষণের কথাও। ১৮৫৭ সালে আমেরিকার Monthly Atlantic পত্রিকায় এমার্সনের Brahma নামে একটি কবিতা বেরিয়েছিল যার এক জায়গায় তিনি বলেছিলেন:
If the red slayer think he slays,
Or if the slain think he is slain,
They know not well the subtle ways
I keep, and pass, and turn again.
কিংবা এই কবিতার সর্বশেষ স্তববকের আগেরটিতে যখন ‘সন্দেহকারী’ আর ‘সন্দেহ’-এর অভেদাত্মার উন্মোচন ঘটতে দেখি তখন এমার্সন পরস্পরবিরোধী আলংকারিক দক্ষতায় আমাদেরকে আপাত অসত্য কিন্তু এক গভীরতর অর্থে অন্তর্গত বাস্তবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত রূপটিকে চিনিয়ে দেন এভাবে:
They reckon ill who leave me out;
When me they fly, I am the wings;
I am the doubter and the doubt,
And I the hymn the Brahmin sings.
আশ্চর্য হয়েছিলাম ঐ একই বছর বোদলেয়ারের Les Fleurs du mal ফরাসি সংস্করণে প্রথম প্রকাশের তারিখের কাকতালীয় ঘটনায়। কারণ এই গ্রন্থের L'Héautontimorouménos বা The Man Who Tortures Himself কবিতায় ‘নির্যাতিত’ আর ‘নির্যাতক’ অভিন্ন রূপে হাজির হয়েছে এমার্সনের ধরনে:
I am the wound and the dagger!
I am the blow and the cheek!
I am the member and the wheel,
Victim and executioner!
(William Aggeler, The Flowers of Evil; Fresno, CA: Academy Library Guild, 1954)
(Je suis la plaie et le couteau!
Je suis le soufflet et la joue!
Je suis les membres et la roue,
Et la victime et le bourreau!
(L'Héautontimorouménos, Les Fleurs du mal , 1857)
বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে যার তর্জমা হয়েছিলো এভাবে:
আমিই চাকা, দেহ আমারই দলি!
আঘাত আমি, আর ছুরিকা লাল!
চপেটাঘাত, আর খিন্ন গাল!
আমি জল্লাদ, আমিই বলি।
এমার্সনের পাঠক মাত্রেই জানেন তিনি ফরাসি দার্শনিক মঁতেইগ-এর দ্বারা কতটা উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তবে কি ফরাসি ভাষা জানা আর বোদলেয়ারের প্রতি তার অনুরাগের সূত্রেই বোদলেয়ারের এই কূটাভাসিক আলো এসে পড়েছিল এমার্সনের উপর? নাকি ভারতীয় দর্শন বা উপনিষদের সরাসরি প্রভাবের এক সোনালি শস্য এই কবিতা?
বোর্হেসের উপর অন্যদের প্রভাব এবং তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের সূত্রে ফরাসি সাহিত্য সমালোচক আঁদ্রে মারোয়া বলেছিলেন যে, 'বিশুদ্ধ এবং পান্ডিত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বর্ণিত এই আবিষ্কারসমূহ যার নিশ্চিত যোগসূত্র রয়েছে অ্যালান পোর সাথে যিনি জন্ম দিয়েছেন বোদলেয়ারের, যে-বোদলেয়ার জন্ম দিয়েছেন মালার্মের, যে-মালার্মে জন্ম দিয়েছেন ভালেরির, যে-ভালেরি জন্ম দিয়েছেন বোর্হেসের। "প্রেমে পড়া মানে এমন এক ধর্ম তৈরি করা যার ঈশ্বর হবে নশ্বর।" পুঞ্জীভূত খুঁতের মাধ্যমে, তিনি কখনো কখনো ফ্লবেয়ারকে স্মরণ করিয়ে দেন; বিরল বিশেষণের কারণে সাঁ ঝ পের্স-এর কথা মনে পড়ে যায়। "পাখির করুণ ক্রন্দন।" কিন্তু এইসব সম্পর্কের উল্লেখ সত্ত্বেও, এটা অবশ্যই বলা সম্ভব, বোর্হেসের শৈলী তার ভাবনার মতোই অত্যন্ত মৌলিক।'
পর্তুগিজ ভাষার অগ্রগণ্য লেখক একা দে কেইরোজ-এর কথা অনেকেই জানেন। পর্তুগিজ কথাসাহিত্যের মুক্তিদাতা কেইরোজ ফরাসি ঔপন্যাসিক ফ্লবেয়ার দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। মার্কিন সাহিত্য সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম তার Genuis গ্রন্থে এই প্রভাবের কথা আরও বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। কিন্তু অন্ধ বোর্হেস আমাদেরকে অবাক করে দেন, যখন তার অন্তর্দৃষ্টির নির্ভুল আলো দিয়ে আমাদের বিবেচনাকে বিভ্রান্তির হাত থেকে মুক্ত করেন এইভাবে:
ফ্লবেয়ারের ক্ষেত্রে একা দে কিরোজের উপর তার প্রভাব স্পষ্ট। আমার বিশ্বাস Madame Bovary –এর চেয়ে O Primo Bazilio (cousin Bazilio) অনেক উৎকৃষ্ট, যদিও এটি Madame Bovary অবলম্বনে রচিত।
In Flaubert’s case, the influence on Eca de queiroz is evident. And I believe that O Primo Bazilio (cousin Bazilio) is quite superior to Madame Bovary although evidently it is based on Madame Bovary.
(Seven conversations with Jorge Luis Borges, Fernando Sorrentino, Trans: clark M. Zlotchew, New York, P-41)
মাদাম বোভারির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু মাদাম বোভারির অনুষঙ্গ, সংবেদ ও সংশয়কে ভিত্তি করে অন্য ভাষায় অন্য এক প্রতিভাবানের দ্বারা তারও চেয়ে যে অতিরিক্ত কিছু গড়ে উঠতে পারে তা কেইরোজ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে পাঠের কারণে। প্রতিভাবানের সৃষ্টিশীল পাঠ নিশ্চিত করে তোলে রূপান্তরকে। আমরা কি দেখি নি লুসিয়াস এপুলিয়াস-এর Golden Ass কিভাবে কাফকার Metamorphosis-এর জন্মকে নিশ্চিত করে তুলেছিল আরও বেশি প্রভাবক হিসেবে? এই ধারার আরেক পরাক্রান্ত নজির আমরা স্প্যানিশ ভাষায়, হয়তো গোটা পৃথিবীতেই, প্রথম উপন্যাস El Ingenioso Hidalgo Don Quijote de la Mancha, সংক্ষেপে Don Quijote-র বেলাতেই দেখতে পাব।
কিহোতেকে কী উদ্ধুদ্ধ করেছিল অবাস্তব ও ছন্নছাড়া রোমাঞ্চকর সব অভিযানে? এক কথায় পাঠ। পাঠের উত্তাপ তার সৃষ্টিশীল কল্পনাকে এতটাই তাতিয়ে দিয়েছিল যে, দেখে মনে হয় মধ্যযুগের বীরাকীর্ণ পুঁথিগুলো যেন তাকে পাগল করে তুলেছে। আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না এই দন কিহোতে সের্বান্তেসেরই মুখোশে লেখকের অল্টার ইগো। কী পড়েছিলেন দন কিহোতে, মানে সের্বান্তেস? পড়েছিলেন ফরাসি লেখক জিওফ্রেই দে চার্নির লেখা Livre de chevalerie, যা লেখা হয়েছিল ১৩৫০ সালের দিকে। অনামা লেখকের স্প্যানিশ শিভালরিক রোমান্স Amadis de Gaula বইটিও ছিল তার পাঠের তালিকায় যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৫০৮ সালে। পড়েছিলেন প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত অর্থাৎ ১৪৯০ সালে কাতালান ভাষায় লেখা ভালেন্সিয়ার হোয়ানত মার্তোরেল-এর Tirant lo Blanch নামের আরেক বীরত্বগাথা। বাদ যায় নি ১৫৪০ থেকে ১৫৪৬ সালে পর্তুগিজ ভাষায় লেখা ফ্রান্সিসকো দে মোরায়েস কাব্রালের Palmerin d’Angleterre নামক রোমান্সটিও। সের্বান্তেসের ক্ষেত্রে এইসব পাঠের সামগ্রিক প্রভাবটি ছিল বিপুল ও বিস্ময়কর বিস্ফোরণের মতো। পূর্বসূরি এই লেখকদের চূর্ণবিচূর্ণ নিয়ে যে দন কিহোতে গড়ে উঠেছে তার স্পন্দন ও অভিপ্রায় পুরোপুরি ভিন্ন হয়ে গেছে। আজ ওই বীর-বিষয়ক রোমান্সগুলো বিশ্বব্যাপী যত লোক পাঠ করেন, তার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি পাঠক দন কিহোতে উপন্যাসের পাতায় পাতায় পাঠের আনন্দ খুঁজে পান।
সেকালের বীরত্বগাথাগুলোর প্রতি মিহি বিদ্রূপ আর চিরায়ু শিল্পকৌশলের মাধ্যমে দোন কিহোতে এতটাই ভিন্ন ও স্বতন্ত্র্য হয়ে উঠেছিল যে মৌলিকতার কাছে ঐ প্রভাব-সঞ্চারী উদ্দীপক মূল বইগুলো আজ তার তুলনায় অনেক গৌণ হয়ে পড়েছে। কিংবা যদি গৌণ নাও হয়, অন্তত উত্তরকালের লেখকের সৃজনশীলতার নতুন মাত্রায় সে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। তার মানে পাঠ, অর্থাৎ প্রভাব ও সৃজনশীলতা এক সমান্তরাল ব্যাপার, শুধু সমান্তরালই নয়, একে অপরের উপর নির্ভরশীলও। পরস্পরের এই সম্পর্ক, আর পূর্বসূরির কাছে অধমর্ণ হয়েও কিভাবে উত্তরকালের শিল্পী নতুন মাত্রা যোগ করেন তার কিছু উদাহরণ বোর্হেসে কান পাতলেই শুনতে পাব:
লুগোনেস-এর Romances de Rio Seco বইটি ছাড়া তার অন্য প্রত্যেকটা বইয়ের পেছনে যে-কেউ অন্য লেখকের উপস্থিতি টের পাবেন। যেমন Los crepusculos del jardin বইটির পেছনে যে-কেউ আলবার্ট সামিয়ানকে খুঁজে পাবেন; Lunario Sentimental -এর পেছনে খুঁজে পাবেন জুল লাফর্গকে; অন্য বইগুলোর পেছনে পাওয়া যাবে হুগো এবং প্রায়শই আলমাফুয়ের্তেকে। তারপরও, এই লেখাগুলো লুগোনেস-এরই। অর্থাৎ ফরাসি লেখক বা লাফর্গের মতো বেলজিয় বা সামিয়ান-এর অভিভাবকত্বের উপস্থিতি কেউ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু পাশাপাশি এটাও অনুভূত হবে যে এই কবিতাগুলো লুগোনেস-এরই।
Behind each of Lugones’ books, except for his Romances de Rio Seco, one can sense another author. For example, behind Los crepusculos del jardin one finds Albert Samian; behind Lunario Sentimental one finds Jules Laforgue; behind others one finds Hugo and, often, Almafuerte. Yet those texts are by Lugones, that is, one feels a tutelary presence which could be that of French writer or a Belgian like Laforgue or Samian but one also feels that these poems are by Lugones.
(Jorge Luis Borges and Osvaldo Ferrari, Conversations, Seagull Books, 2016, P 182)
সুতরাং প্রভাবের উপস্থিতি যতই থাকুক না কেন, তা একই সঙ্গে লুগোনেসের জন্য স্বাতন্ত্র্যের হয়ে উঠেছে।
আধুনিক বাংলা সাহিত্য যেমন তেমনি আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যও পশ্চিমের, বিশেষ করে ফরাসি কবিতার প্রভাবকে পুঁজি করেই আধুনিক হয়ে উঠেছিল। স্প্যানিশ ভাষার দুই প্রধান কবি—আটলান্টিকের এক পাড়ে লোরকা কিংবা অন্য পাড়ের রুবেন দারিও—ফরাসি কবিতার দ্বারা এতটাই মথিত ছিলেন যে তাদের বহু কবিতায় লুকিয়ে আছে ফরাসি কবিদের প্রভাব। Edwin K. Mapes-এর L'influence française dans l'oeuvre de Rubén Darío কিংবা Max Henríquez Ureña রচিত Breve historia del modernismo বই দুটি স্প্যানিশ কবিতায় ফরাসি প্রভাব নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা তুলে ধরেছে। যেমনটা দেখা যাবে তিরিশের কবিদের উপরে ইয়োরোপীয় প্রভাব নিয়ে রচিত মঞ্জুভাষ মিত্রের আধুনিক বাংলা কবিতায় ইয়োরোপীয় প্রভাব নামক বইটিতে। কিন্তু আজকাল লোরকা কিংবা দারিও, অথবা আমাদের তিরিশের কবিরা তাদের উপরে ইউরোপীয় প্রভাব নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন ছিলেন না, তেমনি মৌলিকতা নিয়েও ছিলেন না চিন্তিত। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দও এ নিয়ে মোটেই চিন্তিত ছিলেন না। তাহলে আমরাইবা কেন এত উদ্বিগ্ন হচ্ছি প্রভাব নিয়ে?
আমাদের উচিত হবে প্রভাব নামক কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা এবং মৌলিকতা নিয়ে দুর্ভাবনা না করা। যিনি শিল্পী তিনি—চান বা না-চান—তার পক্ষে মৌলিক না হয়ে উপায় নেই, যেমন উপায় নেই প্রভাবিত না হওয়া।