একদিন সন্ধ্যায় রুমে এসে দেখি হিমেল বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। হিমেল বরকত আমার সহপাঠী, রুমমেট। আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়।
এমনটা হবার কথা নয়। এ সময়ে আমাদের দুজনেরই বাইরে থাকার কথা। হিমেল থাকবে তার প্রেম কিংবা সংগঠন নিয়ে—হৈচৈমুখর টিএসসি অথবা নিরিবিলি কোথাও। আমার থাকবার কথা মাদলের (কবি মাদল হাসান) সাথে ‘প্রান্তিক’ (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট) অথবা সেলিম আল দীন স্যারের বাসায়।
সে-সময়কার নিয়মিত বৈকালিক শিডিউলটা ছিল এমনই। প্রায় প্রতিদিন বিকেলে আমি সেলিম স্যারের বাসায় গিয়ে চা খেতাম। তারপর তার সাথে কয়েকজন দল বেধে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করতাম হেঁটে হেঁটে। প্রান্তিকে এসে বিযুক্ত হয়ে যেতাম। স্যার চলে যেতেন বাসায়, আমরা বসতাম বন্ধুদের সাথে আড্ডায়।
সম্ভবত সেই সন্ধ্যায় সেলিম স্যার ক্যাম্পাসে ছিলেন না। ঢাকায় গিয়েছিলেন আফজাল হোসেনের ‘টকিজ’ অথবা ‘মাত্রা’র অফিসে। মাদলও অন্য কোথাও ব্যস্ত ছিল। যতদূর মনে পড়ে, অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। কাজেই, আমিও আর কোথাও না গিয়ে কামালউদ্দিন হলের নিচে নেমেছিলাম জাস্ট চা খেতে।
আমরা থাকতাম হলের তিন তলায়। ৩১৯ নম্বর রুম। সে সময় রুমের বাসিন্দা আমরা তিন জন। আমি, হিমেল এবং আমাদের একজন অতিথি। হিমেলের সূত্রেই তিনি এসেছিলেন। তার নাম মাহমুদুজ্জামান বাবু। কবিতা লেখেন, গান করেন, হিমেলের সংগঠন ‘সংকীর্তন’-এ গানের রিহার্সেল দেন। তখনও তিনি পাবলিক ফিগার হয়ে ওঠেন নি। একুশে টিভিতে তার ‘বাংলার গান’ তখনও প্রচারিত হয় নি।
বাবু ভাই কেন আমাদের রুমে এসে থাকতেন, সে এক বিরাট ইতিহাস। অন্য এক সময় সে গল্প করা যাবে।
আমি খেয়াল করলাম, হিমেল যে বইটি পড়ছে সেটি আমাদের পাঠ্য বা সিলেবাসের কোনো বই নয়। মলাট দেখে বুঝলাম সেটা শার্লক হোমসের একটা খণ্ড।
বিছানায় পা তুলে বসতে বসতে বললাম, ‘কি রে, গোয়েন্দাগল্প লিখবি?’
ফিক করে হেসে উঠল সে, ‘আরে না।’
- পরীক্ষার আগে হঠাৎ শার্লক হোমস! কোনো কোর্সে আছে নাকি?
- আরে ধুর! মনটাকে চাঙ্গা করছি। মাইন্ডফ্রেশার।
হিমেলের এই গোয়েন্দাগল্প পড়ার ব্যাপারে সে যা বলেছিল সেটা ছিল ফল্স। পরে বুঝতে পেরেছি।
হিমেল বইটাকে বন্ধ করে বিছানায় উঠে বসল। এবং যথারীতি একটা সিগারেট ধরাল। প্রচুর সিগারেট খেত সে। 'ফেলুদা কেমন লাগে তোর?'—জানতে চাইলাম ওর কাছে।
- ফেলুদার এন্ডিংটা একটু হাস্যকর, নাটুকে মনে হয়। সবাইকে ডেকে ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য আয়োজন করে বসা। কেমন সাজানো। কোথাও কোথাও শার্লক হোমসের অনুকরণও।
- শার্লক হোমসও কিন্তু এক অর্থে অ্যাডগার অ্যালেন পো থেকে ধার করা। অগাস্তো দুপোঁ।
- দুপোঁ-টুপো আমি পড়ি নাই।
- ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার দ্যাখ, প্রায় সব গোয়েন্দাকাহিনিতেই দুটি চরিত্র থাকছে। মানিক-জোড়ের মতো আর কি। সে ফেলুদা হোক, কাকাবাবু বা ব্যোমকেশ।
- রবীন্দ্রনাথেরও কিন্তু ডিটেকটিভ গল্প লেখার খায়েশ ছিল।
- উনার ডিটেকটিভের তো খুব করুণ দশা। ঠাকুর মনে হয় স্যাটায়ার করতে চাইছিলেন।
- শেষমেশ একটা পরকীয়া প্রেমের গল্প লিখে ফেলছেন।
আরও কিছু এলোমেলো কথাবার্তা হয়েছিল আমাদের। এই যেমন, রবীন্দ্রনাথের সাথে আর্থার কোনান ডয়েলের দেখা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি।
হিমেলের এই গোয়েন্দাগল্প পড়ার ব্যাপারে সে যা বলেছিল সেটা ছিল ফল্স। পরে বুঝতে পেরেছি। যদিও একটা টনিক হিশেবে এটাকে আমি গ্রহণ করেছিলাম। এর পর কোনো কারণে মানসিক চাপ বা ডিপ্রেশনে থাকলে দুধরনেই বই পড়তাম—প্রথমত শার্লক হোমস, দ্বিতীয়ত হুমায়ূন আহমেদ। সত্যিই এক প্রকার রিলিফ পেতাম। এখনও পাই।
আমাদের জীবনের অজস্র সান্ধ্য আড্ডার ভিড়ে এই সন্ধ্যাটা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ কিছুই নয়। তারপরও এই সন্ধ্যার আবছা মুহূর্তগুলি একটা রহস্যময় বার্তা বা ইঙ্গিত নিয়ে ধরা দিল আমার কাছে। কেমন করে, সেটাই বলছি।
এই ঘটনার কিছুদিন পর একদিন বিকেলে জগলুল আসাদ রুমে এল আমার খোঁজে। ও ইংরেজি বিভাগের ছাত্র, কবি, আমাদের এক ইয়ারের জুনিয়র। ওরা তখন ‘প্রমুক্ত বালার্ক’ নামে একটা ছোটকাগজ করছে। সম্পাদক মঞ্জু মনোয়ারা। সেও ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী, আমাদের ব্যাচমেট। এখন ফরেইন ক্যাডারে কর্মরত। তার লেখালেখির কোনো খবর জানি না।
বলেছিলাম, ওটা ‘বাল’ হবে, ‘বল’ নয়। অবশ্য ‘বল রূপ অর্ক’ সেই অর্থে ‘বলার্ক’ চলতে পারে।
‘প্রমুক্ত বালার্ক’ পত্রিকাটি প্রথম বেরিয়েছিল ‘প্রমুক্ত বলার্ক’ নামে। তখন আমি খুব হাসাহাসি করেছিলাম। বলেছিলাম, ওটা ‘বাল’ হবে, ‘বল’ নয়। অবশ্য ‘বল রূপ অর্ক’ সেই অর্থে ‘বলার্ক’ চলতে পারে। রূপক কর্মধারয়। ইনফ্যাক্ট, সূর্য তো শৌর্য-বীর্যের প্রতীকও বটে।
জগলুল বলল, 'একটা কবিতা দেন আগামী সংখ্যার জন্য।' বললাম, ‘নিশ্চয়ই। কবিতা দেয়ার জন্যই তো বসে আছি হে।’ তখন ও আমাকে একটা লেখা পড়তে দিল, বলল, 'হিমেল ভাই এই কবিতাটা দিয়েছেন।' আমি পড়লাম, বেশ কৌতূহল নিয়েই :
শস্যের পার্বণ
পলির দরদী মেয়ে, শ্যামল কিষানী—
পিতলবরন দেহ কারে দিবি তুই?
সোনার চামচে নিয়ে পরানের চিনি
নাচাবি ময়ূর কার, কার জলাভূঁই?
আষাঢ় শ্রাবণ শেষ, কুমারী ধানেরা
মাপে বিবাহের আয়ু। নোনা তোর হাত
রসুনের কোয়া হয়ে বাজায় দোতারা—
ইছামতি নদী হাসে, হাসে মধ্যরাত।
পক্ষী, কসম দিয়ে ক’—কারে দিলি মন!
রাই শস্যের উঠোনে ঘ্রাণ আর ঘাম।
নেমন্তন্ন জানি, পাবে শুধু একজন—
রসের পিঠার গায়ে লিখা তার নাম।
বছর ফুরায়ে আসে, ওলো ও কিষানী—
উদরে কিসের গান, ভাব কি শুনিনি!
বললাম, 'কবিতাটা সুন্দর। সোনালি কাবিন ছুঁয়ে পরানের গহীন ভিতর থেকে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে।'
ও হেসে বলল, 'ক্রিটিক কইরেন না, এর মধ্যে ক্রিপ্টোগ্রাফির একটা ব্যাপার আছে। খুব ভালো কইরা খেয়াল করেন।'
এই কবিতার প্রতিটি চরণের প্রথম অক্ষর পর পর সাজালে একটা পূর্ণাঙ্গ বাক্য পাওয়া যায় : পপি সোনা আমারই পরানের বউ।
তখনই ব্যাপারটা আমার কাছে ধরা পড়ল, অবশ্যই জগলুলের দেয়া ‘ক্লু’ অনুসরণ করে। এবং আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল কিছুদিন আগে হিমেলের শার্লক হোমস পড়ার রহস্য। এই কবিতার প্রতিটি চরণের প্রথম অক্ষর পর পর সাজালে একটা পূর্ণাঙ্গ বাক্য পাওয়া যায় : পপি সোনা আমারই পরানের বউ।
পপি আমাদের সহপাঠিনী, আর পাঠ-সমাপনান্তে আক্ষরিক অর্থেই হিমেলের বউ।
এই একটি কবিতার ভিতরে ওর আবেগ, বু্দ্ধি এবং তা প্রকাশের সংহতি—সমস্ত কিছুই ফুটে উঠেছে বলে আমার বিশ্বাস। চতুর্দশপদী ফর্ম্যাটে, নিখুঁত অক্ষরবৃত্তের চালে এমন একটা নিটোল কবিতা লেখা সে সময় আমাদের ক্যাম্পাসে অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না বলে মনে করি। খুব অল্প বয়সেই হিমেল বাংলা কবিতার ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিক রপ্ত করে ফেলেছিল। অনায়াস দক্ষতা অর্জন করেছিল সে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, পরবর্তীকালে কবিতায় অতটা অভিনিবিষ্ট সে থাকতে পারে নি। শিক্ষকতা ও গবেষণায় তার সময় ও সত্তার বড় একটা অংশ বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল। তবে তার কাব্যপ্রতিভা নিষ্প্রভ হয়ে যায় নি, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি মত্যুর আগে লেখা চমৎকার কিছু প্রেমের কবিতায়, যেসব কবিতা পত্রিকা মারফত পড়ার সুযোগ হয়েছিল।
কী কারণে জানি না, শেষ কবছর হিমেলের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তেমন একটা ছিল না। কদাচিৎ কথা হতো ফোনে। ফেসবুক মেজেঞ্জারে। জাবি ক্যাম্পাসে এমনিতেই আমার যাওয়া হতো না, বিশেষত সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর। পিএইচডি বাতিল হওয়ার পর সে প্রয়োজন আরও ফুরিয়ে গেল। আমি আর হিমেল একই স্যারের আন্ডারে পিএইচডি কোর্সে ছিলাম। হিমেল তা শেষ করলেও আমি একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে, ঢাকা শহরের কোনো আড্ডায় বা অনুষ্ঠানে তাকে পেতাম না। এমনকি, যে বছর 'পরস্পর' ওয়েবজিনের পক্ষ থেকে হায়াৎ মামুদ স্যারকে 'আজীবন সম্মাননা' প্রদান করা হলো বাংলা একাডেমিতে, আমন্ত্রণ জানাবার পরও জাহাঙ্গীরনগর বাংলা বিভাগের কোনো শিক্ষকই তাতে অংশগ্রহণ করেন নি। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা তাতে অংশ নিয়েছিলেন। এসেছিলেন ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
আমি কিন্তু প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমার বন্ধুর অপেক্ষায় ছিলাম। নীরস অ্যাকাডেমিয়া একদিন হেলায় ফেলিয়া শামিল হবে আমাদের সাহিত্য-আড্ডায়। নিদেন, একদিন হয়তো একটা দুর্দান্ত কবিতার পাণ্ডুলিপি আমাকে পাঠিয়ে বলবে, ‘নে, পড়ে দ্যাখ।’ কিন্তু না, সে রকম কোনো মেসেজ আমি কোনোদিন পাই নি আমার ইনবক্সে। আমিও কোনোদিন আর যাই নি তার কাছে। হয়তো এখন, সে অপেক্ষায় আছে।