তিন লাইন

ভূমিকা

তিন লাইন বললেই সারা বিশ্বের কবিতাপ্রেমীদের মনে ‘হাইকু’র কথা মনে আসে। জাপানি এই ধ্রুপদি সুর বাংলায় তুলে আনার সাধ্য আমার নাই, তবে সাধ তো থাকেই। সেই সাধ পুরনো একটা চেষ্টা এই ‘তিন লাইন’। একেক ভাষার চলন-বলন একেক রকম, একেক দেশের ঋতুও আলাদা। জাপানিদের তো মূলত চারটি ঋতু। ইউরোপ আমেরিকাতেও গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত আর বসন্তে ঋতুচক্র শেষ। তারা বর্ষা ঋতুকে আমাদের মতো করে দেখে না, হেমন্ত তো না-ই বললেই চলে। অথচ আমাদের রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে নিয়ে কী মাতামাতিই করেছেন, জীবনানন্দ দাশ তো হেমন্তেরই কবি। মোদ্দা কথায় এই যে ছয় ঋতুর দেশ, সেখানে কবিতায় ঋতুর চেহারাটা কদাচ দৃষ্ট। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ’র কবিতায় বাংলার প্রকৃতি আর ঋতু এসেছে নানা সাজে। কিন্তু আধুনিক কবিরা বোধহয় ঋতুবৈচিত্র্যকে ভুলে গেল। শহরের ফ্লাটবাড়িতে ঋতুবৈচিত্র্য কোথায়! আর ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নামের এক দৈত্য ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলছে প্রকৃতি আর বাংলার ঋতুবৈশিষ্ট্য।

আমি সচেতনভাবেই একেকটা ঋতু নিয়ে বারোটি করে হাইকু লেখার চেষ্টা করলাম। অন্য অর্থে, এই বারোটি হাইকু মিলেও একটা কবিতা হতে পারে হয়তোবা। এটা কিছুই নয়। গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নয়। এ কেবল একটা চেষ্টা। আমাদের ঋতুবৈচিত্র্যকে কুর্নিশ জানানোর চেষ্টা। আমি কবি হলে হয়তো এই চেষ্টাটা কাজে লাগত। কিন্তু ওই যে সাধ্য না-থাকা সত্ত্বেও সাধ পূরণের একটা সুযোগ নিয়ে নিলাম।

সত্যিকার কবিরা যদি দয়া করে ভাবে, তবে হয়তো আধুনিক বাংলা কবিতায় ঋতুবৈচিত্র্যের সম্ভার দেখা যাবে।

জয় হোক বাংলা কবিতার। ভালোবাসা প্রিয় কবিতাপ্রেমী ও কবিদের।

- মুম রহমান


গ্রীষ্ম


১ বিষাক্ত সাপ আড়মোড়া ভাঙলো, গ্রীস্ম এসেছে।

২ লাল সবুজ তরমুজের ফালি গ্রীষ্মে আদর।

৩ নিঃসন্তান, চাঁদ মামাকে ডাকি এই গরমে।

৪ পাখির ঠোঁটে পোকার মৃত্যুদণ্ড গ্রীষ্মসকালে।

৫ তীব্র গরম আলোহীন বিষাদ লাগছে ভালো।

৬ শরীরে তাপ মনে উত্তাপ পাগলও তৃষ্ণার্ত।

৭ শুকনা নদী ক্ষুধার্ত মাটি কোথা সে ছায়া সখী!

৮ পুকুরপাড় লেবুর গাছ একে অপরকে দেখে।

৯ বাসররাত জামাই-বউ— অর্থহীন গরম।

১০ আম কাঁঠাল গ্রীষ্মের ছুটি শুধুই স্মৃতি আজ

১১ স্মৃতি রঙিন পুরনো দিন দুলছে তালপাখা

১২ আইপিএস জেনারেটর বস্তির ঘরে যাও।


বর্ষা


১ পালকে বৃষ্টি চড়ুই তবু জানে, রোদ আসবে।

২ উত্তাল ঢেউ— মেঘকে চুমু খাবে লাফাচ্ছে তাই।

৩ বৃষ্টি পড়ছে সমুদ্রের শরীরে— স্বর্গীয় দৃশ্য।

৪ এক বর্ষার স্মৃতিতে ভিজে বাকি জীবন কাঁদি।

৫ আজ শ্রাবণ মন কাঁদছে? ডাকছে হুমায়ূন।

৬ রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টির স্বরলিপি লিখে গেছেন।

৭ মেঘ পাঠালো বারান্দায় আদর বৃষ্টির খামে।

৮ বাইরে যাও মুম, কান্না থামাও— বৃষ্টিতে ভেজো।

৯ বৃষ্টিতে ভেজা গাছের পাতা— সেই কোমল হাত।

১০ আমিই বৃষ্টি সারাদিন ঝরছি— বুঝতে পারো?

১১ বৃষ্টিকে ঘৃণা যা ঘটেছিল বৃষ্টির অজুহাতেই।

১২ এই বৃষ্টিতে মাতাল কই মাছ ডাঙায় লাফায়।


শরৎ


১ বর্ষা বিদায় প্রজাপতি বেরুলো শরত এল।

২ ও কাশফুল মালতী, জুূঁই, হেনা— ছিলে কি চেনা?

৩ নীল আকাশে ছেনালি অবিরাম সাদা মেঘের।

৪ শিউলি ভোর, গাছের নিচে মায়া— ঝরে পড়েছে।

৫ অক্লান্ত তারা গর্ভবতী আকাশ— ক্ষুদ্র পৃথিবী।

৬ শান্ত, মধুর সাদা কাশ, উড়ুক্কু মেঘ— প্রতিযোগিতা!

৭ ভরা পূর্ণিমা শান্ত শারদ বায়ু— তবু বেদনা।

৮ ভাদ্র আশ্বিন মাতাল চোখ দেখে শুভ্র বালিকা।

৯ শরৎকাল শহরে পলাতক— গ্রামে ঘুমায়।

১০ নীল শাড়িতে শরতের আকাশ প্রেমিকা সাজে।

১১ শরৎ-রাত্রি হাসনাহেনা ঢালে— গোপন গন্ধ।

১২ মাছেরা দেখে জলের আয়নাতে শরৎশশী।


হেমন্ত


১ হৃদয়ে নিয়ে জীবনানন্দ— জেগে থাকে হেমন্ত।

২ হেমন্ত এল হলুদ তুলি আঁকছে ভ্যান গগ।

৩ বাতাসে সুখ দীর্ঘশ্বাস পালায় নবান্ন আজ।

৪ অগ্রহায়ণ ধান কাটা চলছে পাখির ঈদ।

৫ হেমন্ত হাসে নতুন ধানের গন্ধে ইঁদুর আসে।

৬ নায়র যাব হেমন্তের সকালে বাপের বাড়ি।

৭ পিঠা, পায়েস আয়েশি রোদ, ওম— ঢেঁকির গান।

৮ শৈশবে ছিল ডাঙগুলি খেলার হেমন্তমাঠ।

৯ পোয়াতি ধান বাতাসে দারবিশ সুফি হেমন্ত।

১০ নিশ্চুপ হেমন্ত ভয়ে রাত জাগছে বিবর্ণ পাতা।

১১ মৃদু হাওয়া কাচপোকারা নাচে শাপলাবিলে।

১২ হেমন্তরাত ভরা জোছনাসুধা— মুম নির্ঘুম।


শীত


১ নকশি কাঁথা শরীরকে সাজাচ্ছে উষ্ণ আদরে।

২ পাতারা ঝরে— আয়নায় তখন নিজেকে দেখি।

৩ কুয়াশা থাক পুরনো প্রেম সে— আড়ালে রাখ।

৪ শীতের পাখি তোরে মায়া করি না যাবি তো চলে।

৫ ঈশ্বর হাসে ভোরের অজুহাতে— শীত-সকালে।

৬ রোদ পোহাবো শীত রোদ আসে না, দালান ভাঙো।

৭ শয্যায় শীত গুটি মেরে ঘুমায় ফাঁটা ঠোঁটে।

৮ কম্বলে মোড়া ঝাপসা স্মৃতি এলো কুয়াশা রাতে।

৯ কাঁপে শরীর কাঁপে অন্তর একাকী শীতকাল।

১০ ঝরা পাতারা চুপচাপ নিথর আমার মতো।

১১ পোড়াচ্ছি সুখে অপ্রয়োজনীয় যা শীত পোহাতে।

১২ শীতের রাতে শিশির ঝরে পড়ে ইট ভাটায়।


বসন্ত


১ ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে গেলে জানি— তুমিও হাসবে।

২ কাঠ-ঠোকরা ঠোঁটের ঠুকঠুকু এই বসন্তে।

৩ নতুন ডালে পাখিদের সঙ্গম যৌনবসন্ত।

৪ বসন্ত-চাঁদ জানালায় প্রেমিকা— পুরুষ ব্যস্ত।

৫ হাইব্রিড প্রতাপে ছাদে বসন্ত— প্রাণ ছোঁয় না।

৬ পাখি গাইছে ফুল ফুটছে তুমিহীন বসন্তে!

৭ কী ফুল ফোটে অলৌকিক ফাল্গুনে? বেদনা স্থায়ী।

৮ জানি কোকিল প্যারাসিটামল— আমি ক্যান্সার রোগী।

৯ চিরন্তন বসন্ত স্বপ্নে দেখেছো— বাস্তবে নয়।

১০ প্রেম চাই না ফিরে যাও বসন্ত— কান্নাই ভালো।

১১ শীতের পর বসন্ত আসে— জীবন ভালো লাগে।

১২ বসন্ত যায় ফুল পাখি বিষণ্ন— পাতারা খুশি

মুম রহমান

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।...বিস্তারিত