জ্যঁ লুক গদারের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত থাকলে তার ডাকনাম রাখতাম ‘জঁ গতি’ আর আসল নাম রাখতাম ‘লুক দ্য বদল’। নামকরণটা অনেকটা বাংলা সিনেমার মতো হয়ে গেল। তাই তো হওয়া উচিত। এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, শুধু ফরাসি, জার্মান, ইতালি ইত্যকার সিনেমা দেখলেই হবে না। দিনশেষে আমি তো বাংলাদেশের, বাংলাদেশ তো আমার দিনযাপনে, ভাবনায়। অতএব আমার সিনেমা-ভাবনাতেও বাংলা সিনেমা থাকবে অনিবার্য। জহির রায়হান থেকে তারেক মাসুদ হয়ে আমার বাংলা সিনেমার মনন রচিত। এর মধ্যে আবার বাংলাদেশের একজন চলচ্চিত্র-লেখক-আলোচক হিসেবে আমাকে তো অনন্ত জলিলের জ্বলন্ত সিনেমাও দেখতে হয়, ‘পরাণ’-এ মন ডুবিয়ে দিতে হয়, আবার বাজার-চলতি ‘হাওয়া’-তেও চোখ ভাসাতে হয়।
এটা দুঃখজনক যে, এইসব ডোবা-ভাসার মধ্যে আমরা এখনও বাংলা সিনেমায় তেমন কোনো ‘অঁতর ফিল্মমেকার’ পাই নি, যিনি একাই বদলে ফেলবেন, গতি আনবেন, একটা দেশের, এমনকি পুরো মহাদেশের সিনেমাতেই। হয়তো জহির রায়হান পারতেন, হয়তো তারেক মাসুদ পারতেন, আমাদের ‘অঁতর ফিল্মমেকার’ হতে। তাদের সিনেমাতেই ছিল একটা নিজস্ব ভঙ্গি, চিন্তা, দর্শন এবং সিনেমার প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের চিন্তার প্রয়োগ। অঁতর ফিল্মপরিচালক তারাই যারা নিজের সিনেমার গল্প, সংলাপ, অভিনয়, সম্পাদনা, সঙ্গীত সকল ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখেন। অন্য পরিচালকদের সঙ্গে ‘অঁতর পরিচালক’দের পার্থক্য হলো, ‘অঁতর চলচ্চিত্র পরিচালক’ নিজের সিনেমাটির উপর সম্পূর্ণভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখেন। তার সিনেমাটি আগাগোড়াই তার নিজস্ব ভাবনা ও দর্শনের প্রতিফলন। এই যে সিনেমার একক লেখক হয়ে ওঠা, অঁতর ফরাসি শব্দের বাংলা কিন্তু লেখকই, সেই গুণটি ছিল আমাদের জহির রায়হান আর তারেক মাসুদের ক্ষেত্রেও। তারা দুজনেই আমাদের চলচ্চিত্রকে সমুন্নত করতে পারতেন নিজস্ব সাক্ষর দিয়ে। সিনেমা তো অনেকেই বানায়, কিন্তু সবাই তো আর নিজের সিনেমা বানায় না। ব্যাপারটা অনেকটা জীবনানন্দের ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’-এর মতো। সকলই সিনেমা অঁতর নয়, কেউ কেউ সিনেমা অঁতর। আমাদের তারেক মাসুদ আর জহির রায়হান তেমন হতে পারতেন। কিন্তু দুজনই আমাদের তীব্র বেদনায় ও দুর্ভাগ্যে রেখে চলে গেছেন কোন অনন্ত অজানায়। গদারও গেলেন অনন্তের পথে। আদতে আমরা সবাই যেতে বাধ্য। কিন্তু গদার সেইসব সৌভাগ্যবানদের একজন যিনি নিজের মৃত্যু স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন আর আমাদের জহির রায়হান এবং তারেক মাসুদ অসময়ে, অনিচ্ছায় চলে যেতে বাধ্য হলেন। যাক, সে আফসোস বা বেদনাভার বইবার জন্য এ রচনা নয়। আমি বরং আমার গদারের কথা বলি, যে গদার গতি আর বদলের প্রতিনিধি।
ফরাসিদের সৌভাগ্য যে তারা গদারকে পূর্ণাঙ্গভাবে পেয়েছেন এবং এই মর্তধামে তিনি যথেষ্ট সময় কাটিয়েছেন। যথেষ্ট সিনেমা বানানোর সুযোগ তিনি পেয়েছেন। কিন্তু কখনো সে সুযোগের ভুল ব্যবহার করেন নি। এই পৃথিবীতে গদার সেইসব দুর্লভ চলচ্চিত্র-পরিচালকদের একজন যে নিজেই নিজেকে নিয়মিত ভেঙেছেন, গড়েছেন। গদারের সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো গদার নিজেকেই বারবার নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী করেছেন। সেটা কিভাবে সম্ভব? বড় মাপের শিল্পী এভাবেই কাজ করেন যে নিজে নিজের অনুসরণ করেন না। পাবলো পিকাসো তার নয় দশকের জীবনে প্রায় ৫০ হাজার শিল্পকর্ম রেখে গেছেন, কিন্তু পিকাসো বরাবরই নতুন, আর নিয়মিত সৃষ্টি করেছেন নতুন নতুন সব ভঙ্গি ও আঙ্গিক। আর গদারও ঠিক পিকাসোর মতোই ৯১ বছরই বেঁচেছেন এবং কখনো নিজের পুনরাবৃত্তি করেন নি। প্রায় ১০০ সিনেমা এক জীবনে তৈরি করা, সেই সব সিনেমায় সিনেমার চেনা আঙ্গিককেই ভেঙে দেয়া কোনো সহজ কথা নয়। গদার তার সুদীর্ঘ সিনেমা-জীবনে এত মত, এত পথে সিনেমাকে চালিত করেছেন যেন বিশ্ব-সিনেমায় তিনি একাই ১০০ লেখকের ভূমিকা নিয়েছেন। গদার সকল অর্থেই একজন পূর্ণাঙ্গ পরিচালক। ‘অঁতর ফিল্মমেকার’দের মধ্যে গদার সুনিশ্চিতভাবেই সেরা।
ফিরে আসি কেন আমি গদারকে ‘জঁ গতি’ বা ‘লুক দ্য বদল’ বলতে চাই। এটা কিন্তু জানা কথাই, গতিই বদল আনে। আর গদার তার গতিময় চিন্তা, গতিশীল সিনেমা কৌশল দিয়ে বদলে দিয়েছেন ফরাসি সিনেমাকে, এমনকি বিশ্ব-সিনেমাকে। প্রথম সিনেমা ‘ব্রিথলেস’ দিয়েই গদার বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিলেন, সেই সিনেমার মূল শক্তি ছিল গতি। যে তীব্র ব্রেকহীন গতিময় জীবন ইউরোপ-আমেরিকায় চলছিল তারই তাত্ত্বিক ও নান্দনিক ব্যবহারের প্রয়োগ ঘটালেন গদার তার ‘জাম্প কাট’ নামের সম্পাদনা-কৌশল দিয়ে। এই ‘জাম্প কাট’ এনে দিল গতি। সেই কারণেই গদার মানে ‘জ্যঁ গতি’। আর গদারের সিনেমা মানেই একটা ভিন্ন দৃষ্টি বা লুক থাকে। বড় লেখক, বড় চিত্রকরের যেমন নিজের ভাষা তৈরি হয়ে যায় তেমনি বড় চলচ্চিত্রকারও তার সিনেমায় নিজস্ব ‘লুক’ আনতে পারেন। এই নিজস্ব ‘লুক’ একজন অঁতর ফিল্মমেকারের সবচেয়ে বড় দিক। সেটা জ্যঁ লুক গদারের ছিল। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আনার কারণে, বিশ্ব-সিনেমায় নিজের দৃষ্টি দিয়ে বদল আনাতেই তাকে বলা যায় ‘লুক দ্য বদল’।
আদতে, বিশ্ব-সিনেমাকে সবচেয়ে বেশিবার চ্যালেঞ্জ করেছেন, সবচেয়ে বেশি করে বদলে দিয়েছেন জ্যঁ লুক গদার একাই। একদম ‘একা’ বলাটা হয়তো ঠিক হবে না, কেননা ফরাসি নয়া তরঙ্গ (ন্যুভেল বাগ) বিশ্ব-সিনেমায় যে বদল ও গতি এনেছে তাতে গদারের আগে ছিলেন ত্রুফো। ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’ নামক পত্রিকায় সিনেমা নিয়েই সমালোচনা ও বিশ্লেষণ দিয়েই গদার, ত্রুফোর মতো চলচ্চিত্রকারদের বিকাশ। এই পত্রিকার সূত্র ধরেই আদ্রে বাজিনের মতো চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকের বিকাশ হয়েছে। এটা লক্ষণীয়, আমাদের বাংলাদেশে সে অর্থে এখনও চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক আলোচনা হয় না এবং দুঃখজনক যে আমাদের সিনেমার বড় একটা অংশই সে অর্থে শিক্ষিত নয়। তার চেয়েও দুঃখজনক যে আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশও চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। ফলে, আমাদেরও একটা ‘নয়া তরঙ্গ’-এর অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে। বাংলা সিনেমাতেও সুদিন আনতে গেলে, বিশ্বদরবারে বাংলা সিনেমাকে নিয়ে যেতে হলে, আমাদের সিনেমা সমালোচনা ও বিশ্লেষণে নতুন ভঙ্গি আনা জরুরি। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের আরেক আইকনিক নির্মাতা আলমগীর কবির চলচ্চিত্র-নির্মাতার পাশাপাশি তাত্ত্বিকও ছিলেন। অনেকেরই ধারণা সিনেমা একটা প্রায়োগিক মাধ্যম, প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু গদারের সিনেমা তা নয়। এখানে সিনেমার তাত্ত্বিক দিকটা হলো আত্মা, সিনেমার প্রায়োগিক দিকটা হলো বাইরের কাঠামো। ভেতরে বা গভীরে যতো যাব গদার ততই ভাবাবে। তাত্ত্বিকভাবে সিনেমাকে দেখা, সিনেমাকে বিনোদনের পাশাপাশি বৌদ্ধিক জগতে নিয়ে যাওয়া গদারই শিখিয়েছেন আমাদের। সিনেমার বৌদ্ধিক চর্চার জন্য হলেও বাংলা সিনেমাকে আজ গদার, ত্রুফো, শ্যাবরলের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে গদারের কাছে, কেননা, গদার বহুমাত্রিক।
গদারের আগে শুরুটা করেছিলেন ফাঁসোয়া ত্রুফো। তিনি তার ৫২ বছরের স্বল্প সময়ের জীবনে ২৫টি সিনেমায় কাজ করেছেন। তার নির্মিত প্রথম ছবি ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লো’ ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায়। গদারের ‘ব্রিথলেস’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে। গদারের ‘ব্রিথলেস’ সিনেমার গল্প নির্মাণ করেছেন ফ্রাঁসোয় ত্রুফো এবং নয়া-তরঙ্গের আরেক পরিচালক ক্লদ শ্যাবরল। ত্রুফোরও আগে ‘লা বু সার্জ’ ছবি দিয়ে ১৯৫৮ সালে ফরাসি নয়া তরঙ্গের যাত্রা শুরু হয়েছিল ক্লদ শ্যাবরলের হাত ধরেই। তবে আগে বা পরে কে ছিলেন, তার চেয়েও বড় কথা, গদার ক্রমশ একাই একশ হয়ে উঠেছেন। গদারের মধ্যে নিজস্বতা, এককত্ব এত বড় আর এত বেশি রকমের যে গদারকেই আমার ফরাসি সিনেমা মনে হয়। কেননা, গদার একই সঙ্গে ধ্রুপদি এবং সমকালীন। এমন নজির বিশ্ব-সিনেমায় খুব কম। সত্যজিৎ রায় আর কুরোশাওয়াকেও আমি একই সঙ্গে ধ্রুপদি আর সমকালীন, আধুনিক ও চিরন্তন বলতে চাই।
‘ব্রিথলেস’ মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে। সেই সিনেমা দেখে বিশ্বের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র-সমালোচক রজার এবার্ট বলেছিলেন, ‘আধুনিক সিনেমার শুরু এখানেই।’ বলা যায় আজ থেকে ৬২ বছর পরও সে সিনেমা আধুনিকই রয়ে গেছে এবং একই সঙ্গে ধ্রুপদি সিনেমার মর্যাদাও পেয়েছে। কারণ, গদার একই সঙ্গে চিরন্তন ও আধুনিক। তার ভাবনা ও দর্শনের মূল ভিত্তি হলো বন্ধনহীনতা। সকল রকমের পুরনো বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাকে ছুড়ে ফেলেন তিনি। তার দর্শনের আধুনিকতা, চিন্তার আধুনিকতা হলো এই যে, তিনি সদাই নতুনকে আমন্ত্রণ জানান। নিজের জীবনে, কার্যকলাপে এবং চিন্তাধারাতেও গদার চিরনতুন এবং পুরনো সকল সংস্কারবিরোধী। আর গদার এতটাই আধুনিক যে, গত ষাটোর্ধ বছরকাল ধরে তিনি একের পর এক সিনেমা বানিয়ে গেছেন এবং প্রত্যেকটি সিনেমাই আলাদা এবং প্রায় প্রতিটি সিনেমায় আমাদের প্রচলিত, পুরনো প্রথাকে, ধারণাকে আঘাত করে। ফলত বিপ্লবী গদার ষাট বছর আগের সিনেমা নিয়েও আধুনিক দর্শকের সামনে উপস্থিত হন তরতাজা অনুভূতিসহ। এই কারণেই গদার আধুনিক ও ধ্রুপদি। তার ‘ব্রিথলেস’ সিনেমার নায়িকা প্যাট্রেসিয়া যখন লেখক পারভ্যুলের সাক্ষাৎকার নেন তখন দুটো প্রশ্ন করেন—
‘‘আপনি কি এখনও আমাদের সময়ের ভালোবাসার উপরে বিশ্বাস রাখেন?’’
‘‘কামনা আর ভালোবাসার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে?’’
বলা দরকার, সিনেমার লেখকচরিত্র পারভ্যুলে এ প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারেন নি, আর আমরা আজকের দিনে এসে আমাদের যাপিত জীবনে আজও খুঁজছি এমন প্রশ্নের উত্তর। আজকের এই ইনবক্স, স্ন্যাপচ্যাট, টিন্ডারের যুগে এসে আমরা নিজেদেরকেই প্রশ্ন করতে পারি কথিত আধুনিককালে ধ্রুপদি ভালোবাসায় সত্যিই বিশ্বাস বা আস্থা রাখা যায় কি না? আর কামনা, বাসনা ও ভালোবাসার ফারাকটুকু কতটা রয়েছে আজ? গদারের প্রাসঙ্গিকতা এইখানেই যে তিনি প্রশ্নগুলো জারি রেখেছেন। তিনি সিনেমা দেখানোর নামে আমাদেরকে ফ্রেমের পর ফ্রেম কেবল আনন্দ দিয়ে জান নি, তিনি আমাদের ভাবিয়েছেন। সিনেমাকে ভাবনার, চিন্তার, দর্শনের আসনে ঠাঁই দিয়েছেন গদার। প্রশ্ন করতে পারা, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার দায়টা যেন গদার নিজেই কাঁধে তুলে নেন।
সিনেমাকে এতবার দুমড়ে-মুচড়ে আর কেউ দেন নি। বোর্হেস যেমন করে গল্পকে, প্রবন্ধকে বারবার দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছেন, গদার সেভাবে সিনেমাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছেন। বোর্হেস তার গল্পকে সাজান প্রবন্ধের ছদ্মবেশে, প্রবন্ধের মধ্যে আনেন গল্পের মেজাজ, আর গদার তার সিনেমাকে কখনো প্রতিবাদে ঠাঁই দেন, কখনো নির্জলা প্রবন্ধের মতো আলোচনা নিয়ে আসেন সিনেমায়। রাজনীতি, যৌনতা, আধুনিকতা, ইউরোপ ও মার্কিন সভ্যতা ইত্যাদি নিয়ে সারা জীবন খেলেছেন গদার। সিনেমা-বিশ্বকে নিয়ে এক বিরাট প্রভুর মতো খেলেছেন তিনি। ব্যাকরণ বা চলতি পথ তো তিনি মানেন নি। কখনো সেই না মানাটা খুব গম্ভীর, গূঢ়, কখনো তা রীতিমতো রসিকতাময়। আমার কেন জানি মনে পড়ে যায়, সুকুমার রায়কে। গদার নিয়ে ভাবতে ভাবতে সুকুমার রায়ের অনবদ্য চারটা লাইন পড়লে ক্ষতি হবে না মনে করি—
হাঁস ছিল, সজারুও, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে ‘বাহবা কি ফূর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।
গদার যেন সুকুমার রায়ের প্রথম বন্ধনীতে লেখা সেই ‘ব্যাকরণ মানি না’ বলা লোকটি। যিনি চাইলেই মার্কিন সিনেমার প্রচলিত আদল ভেঙে নয়া ফরাসি সিনেমা বানাতে পারেন। যিনি সিনেমার তথ্যচিত্র, কাহিনিচিত্রের বিভাবজনকে ভেঙে ফেলেন। যার ব্যাকরণ না-মানা বিশ্ব-সিনেমায় নতুন ব্যাকরণ তৈরি করে দেয়।
২০১৪ সালে এসে গদার যখন থ্রি ডি সিনেমা ‘গুডবাই টু ল্যাঙ্গুয়েজ’ বানান তখন যথার্থ অর্থেই তিনি সিনেমার প্রচলিত ভাষাকে অস্বীকার করেন। এটি ছিলো গদারের ৪২তম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, কিন্ত সিনেমা-প্রকল্প হিসেবে ১২১তম। এই সিনেমায় এসে গদার যে একই চরিত্রে দুজন করে নায়ক, নায়িকা ব্যবহার করলেন তাই শুধু নয়, রীতিমতো একটা কোনো রকমের গল্পের আদলে বিরাট আলোচনা ফেঁদে বসলেন। ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা তো আছেই, তার সঙ্গে প্রচুর শিল্পকর্ম, দর্শন আর বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে তিনি বুনে দিলেন একটা কাহিনিচিত্র। সিনেমার মধ্যে প্রবন্ধের বিস্তার, বুদ্ধিদীপ্ত দার্শনিক তর্ককে উসকে দেয়ার প্রবণতা গদারের মধ্যে বিস্ময়করভাবেই ছিল। গদার এতই বিস্ময়কর যে, এই সিনেমাতে নিজের কুকুর রক্সিকে অভিনয়ে কাজে লাগালেন এবং তার চেয়েও বিস্ময়কর যে, সেই কুকুর রক্সি কান ফিল্ম ফ্যাস্টিভালে বিশেষ পুরস্কারও পেয়ে যায়। থ্রিডি সিনেমা দেখার সময় হলে আমাদেরকে একটা চশমা দেয়া হয়। সেই চশমার দুচোখে দুটো রঙ থাকে তা সিনেমার দৃশ্যকে ত্রিমাত্রিক করে তোলে। গদার নাকি এই চশমার দুচোখের জন্য দুরকম দৃশ্য ধারণ করেছেন। যেহেতু সেই চশমা আমাদের নেই এবং আমাদের সিনেমা হলে সে সিনেমা দেখার সুযোগ নেই সেহেতু দুই চোখে দুই দৃশ্য দেখার বিস্ময়কর অভিজ্ঞতাও আমাদের নেই।
এত ‘নেই’-এর মধ্য থেকে আমরা তো গদারের কাছ থেকে শিখতে পারি সমকালকে কেমন করে সিনেমায় তুলে ধরতে হয়, কেমন করে সিনেমাকে বিনোদনের পাশাপাশি বৌদ্ধিক চূড়ায় নিয়ে যেতে হয়, কেমন করে বহুমাত্রিক চিন্তা করতে হয়। অন্তত চিন্তার জন্য, ভাবনার জগতে আলোড়নের জন্য, অচালয়তন ভাঙার জন্য আমার গদারের কাছে আপনাদের আসা উচিত, বারবার।