এপার ওপার

ঘর, বাড়ি, আঙিনা
সমস্ত সন্তর্পণে দিয়ে মামিমা
ভেজা পায়ে চলে গেল খালের ওপারে সাঁকো পেরিয়ে—
ছড়ানো পালক, কেউ জানে না!

(রাঙামামিমার গৃহত্যাগ, শঙ্খঘোষ)

১.
আমরা সবাই কইতাম মামিমা। হিন্দুগো মাসি আমাগোর খালা, হিন্দুগো পিসি আমাগোর ফুপু। কিন্তু মামা, মামির কোনো হিন্দু মুসলমান নাই। আমরা সবাই তাই কইতাম চপল মামা আর রাঙামামিমা। মামার সঙ্গে কিন্তু বাবা জাতীয় শব্দ মিলাইতাম না। মানে মিলানির নিয়ম ছিল না, আমার আম্মা কইতো মামা হইল দুইটা মা। কিন্তু চপল মামারে কোনোভাবেই একটা মা কিংবা অর্ধেক মা মনে হওয়া সুযোগ ছিল না। তাই বইলা রাঙামামিরে খুব মা মা মনে হইতো, তা না। কিন্তু আমরা সবাই মামির সঙ্গে আরেকটা মা যোগ কইরা দিতাম। আদতে মামি হইলো দুইটা মা। মামিমা, আগে মা, পরে মা। কিন্তু মিছা কথা কমু না বাপ, রাঙা মামিমারে আমার কোনোদিনই মা মনে হইতো না। বরং আমার মুখে যখন থাইকা গোঁফের রেখা দেখা গেছে তখন থাইকা তার জন্যই আমার পরান পুড়ছে গো। তখন কে জানি কইছিলও, শ্রীরাধা সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণের মামি ছিল। সেই থাইকা নিজেরে কেমন শ্রীকৃষ্ণ কৃষ্ণ মনে হইতো। দুধটা, মাখনটা চুরি করার কিংবা নৌকা বিলাসের সুযোগ ছিল না। তয় তালের পিঠা, তিলের নাড়ু, লুচি, আলুর দম মামির হাতে খুবই খাইতাম। বুঝলা নাতি, তোমাগোর পোলাপান এখন কয় না, ক্রাশ খাইছে, আমি তখন ক্রাশ খাইছিলাম। খালি রাঙামামির আগেপিছে ঘুরতাম। বয়স তো কম ছিল। সবার দেখাদেখি মামিমা কইতাম, কিন্তু মা-মি খুব টেনে কইলেও ‘মা’ টুকু টুক করে গিলে ফেলতাম। মা শব্দটা কোনো সময় কইলেও সেটায় জোর দিতাম না মোটেও। এইসব অবশ্য তখন বুঝি না। কেন মামির দীর্ঘ টানের পর হ্রস্ব করে মা বলতাম কিংবা বলতে চাইতাম না সে দ্বিধার কারণ জানতে জানতে আমার যৌবনকালটাই খরচ হয়া গেল। কোন সময় যে রাঙামামির আলতাপরা হাত-পায়ের চিন্তায় শৈশবকালটা হারায়া ফেললাম তাও ঠিক কইরা বুঝি নাই তখন। আরও সোজা কইরা কইলে, শৈশব, কৈশোর না, আমি তো ভার্জিনিটি হারাইলাম। না ফিজিকাল না, মেন্টাল ভার্জিনিটি। চিন্তার সতীত্ব হারাইলাম। খাঁড়াও, মুইতা আসি, তারপরে তোমারে এই বিষয়টা আগে কই। লুজিং মেন্টাল ভার্জিনিটি, মানসিক সতীত্ব হারানো, এইটা আজকের দিনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

হুম। চাপ, তলপেটের নিচে চাপ মারাত্মক জিনিস রে নাতি। তা যা কইতাছিলাম, তখন পড়ি কলকাতায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হইছি মাত্র। যথাবিহিত আড্ডা চলত কলেজ স্ট্রিটেই। সেইখানেই পড়ার বইয়ের বাইরে নানান জ্ঞানচর্চা। নানা জ্ঞান নেই, তেলেভাজা খাই আর সারা রাইত গ্যাস নির্গত করি। মনে করো, জ্ঞানেরও একটা বদহজম আছে। পাঠ্য বই পড়ি না। পড়ি দেশ পত্রিকা, মানিক, বিভূতি, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ। তা সেই সময়ই এইসব পার হইয়া তিন দাড়িঅলার সঙ্গে পরিচয় হইল। পরিচয় মানে, এগোর নাম-ধাম শুনছি, এগোর কথা শুনছি। এদের লেখার সঙ্গে পরিচয় হইতে শুরু করল। কথা সত্য, এদের সঙ্গে ডাইরেক্ট পরিচয় নাই, কিন্তু এরা আমার ডাইরেক্ট ক্ষতি করছে। এই তিন দাড়িঅলা বদমাইশ কেমনে আমার ডাইরেক্ট ক্ষতি করছে সেইটা বলি। এটার সঙ্গে ভার্জিনিটি লুসের সম্পর্ক আছে। তো একটার নাম হইলো ডারউইন। বিরাট দাড়িঅলা। সে কইলো কি, বির্বতন হইতেছে, হইছে, হইবে। মানে সবকিছুই একটা প্রাকৃতিক সিস্টেমে, প্রসেসে বদলাইছে। এই যে মানবজন্ম, এই যে শুয়োর, কুত্তা, বিলাই, আম গাছ, জাম গাছ, আঙুর, বেদানা—সবই জন্মাইছে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়া। একটা প্রাকৃতিক পদ্ধতি আর লড়াই করে যে জাতি টেকার সে টিকতেছে। তা টিকুক কিংবা হারিয়ে যাক। তাতে অসুবিধা কী! অসুবিধা একটাই, তাইলে তো কোনো পরম থাকল না, পরম বোঝো? এবসুলেট পাওয়ার। মানে তাইলে তো একজন সৃষ্টিকর্তা থাকল না। পবিত্র বাইবেল, কোরান শরিফ, ভগবদ গীতা সবই তো মিছা হইয়া গেল। এই যে আমরা জানতাম, মানতাম যে স্বর্গের ফ্যাক্টরিতে আমাগোরে বানাইছে স্বয়ং বিধাতা, সেইটা তো মিথ্যা হইয়া গেল। সেইটা মিথ্যা হইলে তো আমরা এতিম হয়ে গেলাম। মানুষের মা-বাপ না-থাকলে কেমুন অসহায় লাগে, আর যদি ঈশ্বর না থাকে তাইলে কেমুন লাগে কও! 

আইচ্ছা, মনে করো ঘটনাক্রমে আমরা এতিম, আমরা অসহায়, ঈশ্বরহীন। তাইলেও তো মাইনষের সঙ্গে মাইনষের একটা মিল আছে, মহব্বত আছে, বন্ধন আছে। তুমিও এতিম, আমিও এতিম। এতিম এতিম ভাই-ভাই, আমাগো কোনো ঈশ্বর নাই। কিন্তু সেইটাও ভাইঙ্গা দিল আরও দুই দাড়িঅলা মিল্লা। একজন কইলো জগতের সকল মানুষ দুই শ্রেণির, শাসক আর শোষিত। তুমি হয় শাসক নয়, শোষিত। এই যে তুমি আর আমি কথা কইতাছি। আমি বুইড়া, তোমার বড় দাদা, ঘাটের মড়া, সিনিয়র, অতএব তুমি শুনতে বাধ্য। শুধু শুনতাছো না, রেকর্ড করতাছো। নিশ্চয়ই কোনো ফায়দার চিন্তায়। তোমরা তো ইংরেজি শিক্ষায় বড় হইছো, ফায়দা ছাড়া কিছু বোঝো না। যাক, যা কইতেছিলাম, আমি এখন শাসক, তুমি শোষিত। আমি যা কমু তুমি তা শুনতে বাধ্য। তো এই দাড়িঅলা, সে কইলো মানুষে মানুষে এক না, আলাদা। তো সে ভালোমানুষ ছিল। তাই সে ছিল শোষিতের পক্ষে। আর তখন তো কলকারখানার যুগ। শোষিত মানুষ মানেই কারখানার মজুর। তো সে হাঁক দিল, দুনিয়ার মজদুর এক হও। তার হাঁকডাক কলকাতায় আইসা পৌঁছাইল। সেই ডাকে কোনো কোনোখানে মনে করো মজদুররা এক হইল। তখন কী তামসাটা হইল! মজদুররা এক হইলে কি লড়াই লাগব না! লাগব তো। আর লড়াই লাগলে কি হইব, মালিকরা আঙুল চুষব? না। তাদের টেকা আছে, বুদ্ধি আছে, পোষা দালাল আছে। ফলে তারা আরও প্যাঁচ খেলব। আরও গিট্টু লাগব। বুঝছো তো, কার কথা কই? সে ভালো কইরা গিট্টু লাগায়া দিল। এই গিট্টুর ঠেলায় দেশে দেশে যুদ্ধ লাইগা যায়। 

কিন্তু হের চেয়েও বড় গিট্টু লাগায়া দিলো ফ্রয়েড। খেয়াল করো, সেও দাড়িঅলা। সে কি কইলো, যৌনতা, বুঝলা সবই হইলো সেক্সের খেলা। আইজকা তো তোমরা বাস করো ফ্রি সেক্সের দুনিয়ায়। যে যার সাথে পারো কাম সারলেই আধুনিক হয়া গেলা। শরীরের স্বাধীনতার কথা তোমরা কও। আমার দেহ যারে খুশি তারে দিমু, যেমনে খুশি তেমনি দিমু। মাশাল্লা! কিন্তু আমাগোর কথা ভাবো? যখন এইসব পড়লাম, শরমে মাটির তলে যাইতে মনে চাইত। ঘিন্না লাগল নিজের উপরেই। এই যে পোলায় ভালোবাসে মায়েরে, বাপে ভালোবাসে মাইয়ারে—এর মধ্যেও আছে লিঙ্গের খেলা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। ছি, ছি, ছি! এইসব কথা শোনার পরে কি আর সতীত্ব থাকে মিয়া! কিন্তু এইসব পড়তে পড়তেই বুইঝা গেলাম রাঙামামি হিন্দু, আমি মুসলমান, রাঙামামিরা বড়লোক, আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আর কী বুঝলাম, রাঙামামিরে আমি ভালোবাসি। তার রাঙা গায়ের রঙ আমারে টানে। তার ভারী বুক-পাছা, গোলগাল গড়ন, টকটকা রঙ, টসটসা ঠোঁট আমার চাই। কি মিয়া, শরম পাইতাছো নি! আরে আছে, কাহিনির মধ্যে আরও শরম আছে। এখনই উশপিশ কইরো না।

তো মনে করো সতীত্ব হারাইয়াই কলকাতা থাইকা ফিরছি। ফিরছি মানে, ফিরতে বাধ্য হইছি। ওই যে ইংরেজ জাত। তারা কি চাইব, ভারতবর্ষের সবাই মিলামিশা থাক। তারা বিভাজনের আরও টেকনিক বাইর করল। তারা করল কি, হিন্দু-মুসলমানে লাগায়া দিল চির-শত্রুতা। কইলো, হিন্দু আর মুসলমান আলাদা থাকব। তারাও তো আঙুলচোষা পাবলিক না। তাগোরও ক্ষমতা ছিল, চামচা ছিল, দালাল ছিল, বুদ্ধি ছিল। দিল লাগায়া দাঙ্গা। তো মূলত দাঙ্গার ভয়েই কলকাতা ছাড়লাম। আমি তো মুসলমান, তারপরে আবার বাঙাল। ভয় তো ছিলই। কাজেই ফিরা আসলাম। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। তখন আমি জান নিয়া পলাইছি বইলাই তো তুমি দুনিয়া দেখতাছো। নাকি?

তো কলকাতা থাইকা ফিরাই মনে পড়ল রাঙামামিমার কথা। সে তো হিন্দু, চপল মামার বউ। আমি যেমন কলকাতা থাইকা আইসা পড়তে বাধ্য হইছি, তাগোরেও তো বাংলাদেশ থাইকা চইলা যাইতে হবে এখন। মার্কসের ডাক জার্মানি থাইকা কলকাতায় আসে আর কলকাতার দাঙ্গার বাতাস আমাগোর কলমাকান্দায় আসব না? ঠিকই আসছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতেই খবর পাইলাম চক্কোবত্তিগো বাড়ি আগুনে পুড়ায়া দিসে। অনিমেষরা কেউ নাই। জ্যোতি, বিথিরে ধর্ষণ করছে। আমার মনে হইল, এই কলমাকান্দা আমার চেনা মাটি না। কেমন যেন রক্তের ঘেরান, হিংসার ঘেরান। বাড়ি ফিরা তিনদিন আমি ঝিম মাইরা থাকি। কলকাতায় একরকম দাঙ্গা দেইখা আসছি, এইখানে আইসা আর দাঙ্গা দেখি না, এইখানে দেখি একতরফা হামলা। যদিও কলমাকান্দায় হিন্দুরাই ছিল বড়লোক। তাগোরই পাকা বাড়ি। কেউ স্বর্ণকার, কেউ বণিক, কেউ গোমস্তা। কিন্তু সবাই কেমন দিশাহারা। বাড়িঘর ছাড়তে লাগল রাতের আন্ধারে। ডর, ভয়, এইগুলা হইল আসল জিনিস। ওই যে কয় না, মনের বাঘে আগে খায়।

তো আমাগোর তিন বাড়ি পরেই ছিল রাঙামামির পাকা বাড়ি। বাড়ির সামনেই বিরাট গেট। রাস্তার লগেই গেট। রাস্তার উপরে একটা বড় ছাতিম গাছ। ছাতিম গাছটা পুরা বাড়িটারে আড়াল কইরা রাখত। এই ছাতিম গাছটার সাথে আমার জন্মের একটা ইতিহাস আছে। আমাগো তো জন্মদিনফিন ছিল না, এইসব বার্থ সার্টিফিকেট, ন্যাশনাল আইডি কার্ড, এইগুলা অনেক পরে হইছে। দেশভাগের পরে কলকাতা গেছি দুইবার। তখন তো পাসপোর্টের কারবার ছিল না। যাক, কইতেছিলাম, আমার জন্মের কথা। পেরেশান হইয়ো না, বয়স হইছে কম কইরা হইলেও নব্বই। আমার দোস্তরা তো কেউ বাঁইচা নাই। এই বয়সে সব কথা গুছায়া কইতেও পারি না। তো আমার জন্ম হইছে কোনো এক জৈষ্ঠ্যের রাতে, তীব্র ঝড়ের সময়। সাল-তারিখ কেউ হিসাব কেউ রাখে নাই। আম্মায় বলছিল, ওই দিকে সাহা গো বাড়ির সামনের বিরাট ছাতিম গাছটা হুড়মুড় কইরা ভাইঙ্গা পড়লো রহমানগোর বাড়ির ওঠানে আর এইদিকে আমি পেটে থেইকা বাইর হইয়া চিক্কুর দিলাম। ব্যাপারটা কেমন সিনেমা সিনেমা না? মনে করো প্রথম দৃশ্যে দেখাইলা একটা বিরাট মহীরুহ ভাইঙ্গা পড়ছে, পরের দৃশ্যে দেখাইলা একটা টিংটিংয়া বাচ্চা পয়দা হইছে আর নিজের শরীরের চেয়ে বড় চিৎকার দিতাসে। 

তো আমি যখন কলকাতা যাই পড়তে, ভাঙা ছাতিম গাছটা তখনও ছিল। ওটা প্রায় দশ ফুটের মতো উঁচুতে গিয়া ভাঙছিল। সেই ভাঙা মাথার নিচ থেকে ডালপালা ছড়াচ্ছিল খুব। শেকড় তো ছিল। গাছটা মরে নি। কিন্তু কলকাতা থেকে ফিরে দেখি গাছটা নাই। শেকড়ও নাই। মজার বিষয় হইল কলকাতা থেকে ফিরেই তিন দিন আমি ঝিম মাইরা থাকলাম। আর তারপরই আমার প্রথমে মনে পড়ল ছাতিম গাছটার কথা, তার বাদে মনে পড়ল রাঙামামির কথা। তো ছাতিম গাছটা তো স্বচক্ষে দেখলাম, নাই। শিকড়বাকড় সহ নাই। কোনো চিহ্ন নাই। এইখানে যে পুরা একটা বাড়ি ঢাইকা রাখার ছায়া ছিল সেইটা নাই। বাড়িটা এখন ন্যাংটা দেখা যায়। তো আমি বিজেশরে জিগাইলাম, বিজেশ, ছাতিম গাছটার কী হইল রে? বিজেশ পাল্টা জিগায়, কোন ছাতিম গাছটা? 

আমাগোর সময় তো গ্রামেগঞ্জে ছাতিম গাছের তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। আমাদের কলমাকান্দায় অনেক ছাতিম গাছ ছিল। তাই বিজেশ জানতে চাইতেই পারে, কোন ছাতিম গাছটা? আমি বরং এইবার জানতে চাইলাম, রাঙামামির কী হইল রে?

এইবার আর বিজেশ জিজ্ঞেস করল না, কোন রাঙামামি। কারণ রাঙামামিমা তো আর ছাতিম গাছ না, সে এই গ্রামে একজনই। তারে গ্রামের সবাই চিনত। চিনার মতো রূপ-যৌবন ছিল তার। শাখা, সিঁদুর, পলা, চক্ষে কাজল দিয়া সব সময় সাইজাগুঁইজা থাকত। আলতাও দিত প্রায়ই। লাল টুকটুকা শাড়িও পরত। কুমকুমের টিপ দিত। আর কী যেন গায়ে মাখত। একটা শিউলি ফুল শিউলি ফুল গন্ধ। সন্ধ্যাবেলা যখন পিদিম হাতে তুলসীতলায় আসত, দেখলে তারেই দুর্গা মনে হইত। আহা কী যে অপরূপ ছিল রাঙামামি!

বিজেশ আমারে কইলো, আর রাঙামামিমা, তার কথা কইস না।
আমি ভয় পাইয়া গেলাম। কেন কমু না? মইরা গেছে? মাইরা ফেলছে? ওইপার চইলা গেছে? 
তখন খুব এইপার ওইপার চলতেছে। হিন্দুরা ভারতে যাও, মুসলমানরা বাংলাদেশে আসো। যাও কইলেই কি যাওয়া হয়? বাড়ির তুলসীতলা, বাঁশঝাড়, পুষ্কুরিনির মাছ—এইসব রাইখা তখন যাইতে পারে? মানুষ কি খালি ঘর বানায়? ঘরের লগে স্মৃতি বানায়, প্রেম বানায়। এইসব কি টান দিয়া উঠায়া নেয়া যায়?

দাঁড়াও নাতিন, এট্টু পানি খাইয়া লই। এই এক কাজ আমার। পানি খাই আর মুতি। শোনো, নিয়মিত বিয়াম করবা। ডায়বেটিস হইতে দিবা না। তোমরা নতুন যুগের পুলাপান। তোমাগোরে এইসব রোগ থাইকা দূরে থাকতে হইব। আমরা এক জীবনে যত রোগশোক দেখছি তাতে কইরা আমাদের পোলাপানের পোলাপানগো আর রোগশোক না দেখলেও চলব। আইচ্ছা নাতিন, ডাইবেটিসটা দুনিয়া থাইকা যায় না ক্যা! তুমি তো জ্ঞানী লোক, আমারে কও, দুনিয়াতে কি একটা বিজ্ঞানী নাই যে এই রোগটারে ভালা কইরা দেয়ার ওষুধ দিতে পারে। এমন একটা টিকা দিল যাতে যক্ষ্মার মতো, বসন্তের মতো ডায়বেটিসটা গায়েব হইয়া গেল! নাকি অখনও খালি জ্ঞানপাপীদের রাজত্বই চলতেছে। 

হুম, হুম, আসতেছি। মূল গল্পে আসতেছি। তো, আমাগোর এই গ্রামটা ছিল হিন্দুগ্রাম। তুমি তো জানোই, গ্রামের আদতে ধর্ম হয় না। ধর্ম হয় কেবল মানুষের। কিন্তু মানুষ তো সোজা জন্তু নয়, সে চাইলে সব কিছুর ধর্ম বানায়ে দিতে পারে। খাওয়ার ধর্ম আছে, ভাষার ধর্ম আছে, দেশের ধর্ম আছে। এগুলো মানুষই বানাইছে। দেশভাগ যখন হইল তখন ধর্মের নামে মুসলমানের হলো পাকিস্তান আর হিন্দুর হলো ভারত। আর মুসলমানের হলো উর্দু আর হিন্দুর হলো হিন্দি। কিন্তু আমরা তো কেমন একটা প্যাঁচের মধ্যে পইড়া গেলাম। আমরা তো বাংলা ভাষায় কথা কই। আশেপাশের হিন্দুবাড়িতে যাই, প্রসাদ খাই, ঢাকের বাদ্যে নাচি, নামকীর্তন শুনি। আবার আমাগোর ঈদে, শবে-বরাতে ওরা আসে, হালুয়া, সেমাই, রুটি খায়, পটকা ফোটায়। বিজেশ তো গরুর গোশ খাইত। কুরবানির সময় সবার আগে বিজেশ হাজির। দোস্ত, কলিজা ভুনা করে নাই মাসিমা? সেই বিজেশও দেখি কেমন ছটফট করে। আমারে একদিন কয়, তুই আমার লগে আর মিশিস না। গ্রামের লোক ভালা চোখে দেখে না। আমার ইচ্ছা করে বিজেশরে একটা চটকানা দেই। দেই নাই। আমি বরং কইছি, বিজেশ, রাঙামামির ওখানে যাবি? সে কইলো, তুই যাইস না। আমি যামু কইতে সে খেইপা গেল, সে আমারে কইলো, তুই এত বাল বোঝস আর এইটা বোঝস না, তুই মুসলমান। 

আচ্ছা, আমি যে মুসলমান এইটা বুঝতে বিজেশের তিরিশ বছর লাগল! রাঙামামিরে যে আমি ভালোবাসি সেইটা বুঝতে আমার কলকাতা ঘুইরা আসা লাগল, ফ্রয়েড, মার্কস, ডারউইন পড়া লাগল! দেখো, আমরা কত পিছায়া ছিলাম। একেকটা জিনিস বুঝতে বুঝতেই বছর বছর পার হইয়া যাইত। এখন তো সুইচ টিপলে আলো, কল ঘুরাইলে পানি। দুনিয়াটা এমন সহজ ছিল না। কিন্তু এত কুটিলও তো ছিল না। আদতে মানুষই দুনিয়ারে কুটিল করছে। দেশভাগ দেখলাম, মুক্তিযুদ্ধ দেখলাম আর দেখলাম মানুষ, কিন্তু মানুষ বুঝলাম না। মার্কস, ফ্রয়েড, ডারউইনের দোহাই, মানুষ সবচেয়ে জটিল জাতি। করাপ্ট। বদ। বুঝলা, নিজে রাজনীতি করি নাই, কিন্তু বরাবরই রাজনীতির শিকার হইছি। এখন আমার কী মনে হয় জানো, রাজনীতি না-করাটা সবচেয়ে বড় বোকামি হইছে। হয় তুমি রাজনীতি করবা নয় রাজনীতির শিকার হইবা। এইসব তো সবাইরে বলা যায় না। তুমি বুঝবা। আমি তো এগুলা বুঝতে বুঝতে বুড়া হয়ে গেলাম। তুমি তো অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করছো, তুমি বুঝবা অনেক বেশি। আমি তো স্রেফ কলকাতায় অনার্স পড়তে গেছিলাম। শেষও করতে পারি নাই। দাঙ্গায় পলাইলাম। দাঙ্গা বোঝো? ইতিহাস বোঝো? নিশ্চয়ই বইপত্রে কিছু পড়ছো। তয়, পড়ছো তো ইংরেজিতে, ইংরেজদের বই। ইংরেজরা যে কী হারামি জাত ছিল সেইটা তোমরা চক্ষে দেখো নাই, আন্দাজও করতে পারবা না। তোমার বাপে দেখছে পাকিস্তানীগোর বদমাইশি আর আমি দেখছি ইংরেজগোর বদমাইশি। ইংরেজরা যখন এই ‘সিভিলাইজেশন’, ‘কালচার’ টাইপের শব্দ খুব ঢং কইরা কয় তখন আমার হাসি পায়। এত হাসি পায় যে তিনদিনের জমা হাগা ক্লিয়ার হইয়া যায়। 

হ, হ, কইতাছি, রাঙার কথা কই। হ, তখন আর মামি কইতাম না। কলমাকান্দা প্রায় হিন্দুশূন্য। বিজেশও একদিন কান্নাকাটি কইরা চইলা গেল। রাঙামামির বাড়িতে কেউ নাই। চপল মামার গলাকাটা শরীর পাওয়া গেল পুবপাড়ার এক পাগারে। পাগার বোঝো। এই ময়লা ডোবা টাইপ। বডিটাই পাওয়া গেল। মাথা নাই। সেই বডি পোড়ানোর লোকও নাই। চপল মামা আর রাঙামামিই ছিল। বাড়ির বাকিরা আগেই বর্ডার পার হইছে। মামির জেদেই চপল মামা যায় নাই। এখন মামি কী করবে?

আলতা পরে না, সিঁদুর পরে না, শাঁখা পরে না, থুম মাইরা বইসা থাকে। রান্ধে না, খায় না। আমি একদিন রাইতে গিয়া হাজির হইলাম। মামি দাও নিয়া আগায়া আসলো। 'এক কোপে কল্লা ফালায়া দিমু।' 'রাঙামামি, আমি, আমি হাসান।'
মামি দাও নামাইলো। আমি জিগাইলাম, খাইছো কিছু?
মামি আমার দিকে তাকাইলো। কোন কথা নাই। চোখ দিয়া টপটপ পানি পড়তাছে। আমারে কয়, আইছিস কেন তুই? 
তোমারে দেখতে আইছি।
মারতে আসোছ নাই? আমারও কল্লাটা ফালায়া দিয়া যা। পাগারের পাড়ে খালি দেহটা রাখিস। দাহ করার সুযোগও দিস না। 
রাঙামামি!
আমার কল্লা ছাড়া দেহটা কেমন লাগব রে দেখতে! মারার আগে ধর্ষণ করবি না?
আমার শরীর কাঁপতে লাগল। রাগে, ঘেন্নায় আমি মাটির মধ্যেই ঘুষি দিলাম। মামির লেপাপোছা ওঠানে আমি বইসা থাকলাম সারারাইত। কেউ কোনো কথা কই না। এক রাইত, দুই রাইত, তিন রাইত...। আমি যাইতে থাকলাম। রাইত হইলে একটা নিশিপক্ষীর লাহান আমি যাই। বইসা থাকি। কখনো হাতে কইরা দুইটা চম্পা কলা, কখনো ঠোঙার মধ্যে দুইটা মিষ্টি। মামি ইচ্ছা হইলে খায়, না হইলে নাই। 

এর মধ্যেই এক রাইতে ঘটল ঘটনা। দাওয়ায় বইসা রইছি। মট কইরা শব্দ হইল। ঠ্যাংয়ের নিচে লাঠি ভাঙলে যেমন শব্দ। কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ। তাড়াতাড়ি মামিরে ঠেইলা ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। মামি কী জানি কইতে নিল, আমি তার মুখ চাইপা ধরলাম। লোকগুলা চইলা গেল। কিন্তু জানান দিয়া গেল। তারা বাড়ির ভিতরে ইটা মারতে থাকল। আমি মামির মুখ চাইপা রাখছি। শব্দ করতে দেয় নাই। আমারে এইখানে পাইলে ওরা আমারে জিন্দা পুড়াইব। শুধু আমারে না। আমার বাপ, মা, ভাই, বোন সবাইরে পুড়াইব। কাউরে পুড়াইতে পারলে, উচ্ছেদ করতে পারলেই লাভ। জমিটা, বাড়িঘর, জিনিসপত্র সব ভাগাভাগি কইরা খাইতে পারব ওরা। 

একসময় ওরা চইলা গেল। জানি না, কেন চইলা গেল। ওগোর তো বাড়িতে হামলা করার কথা। রাঙামামি একা ঘরে। যা খুশি করতে পারে ওরা। আমি মামির মুখ থাইকা হাত সরাইলাম। মামি আমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁইজা দিল। আমার বুকটা যেন একটা বালিশ। মামি বালিশচাপা দিয়া কানতাছে। তার পুরা শরীর কানতেছে। কাঁপতেছে। আমি তারে শক্ত কইরা ধরলাম। রাঙা, রাঙা, ও রাঙা, আমি আছি। তোমারে কেউ কিছু করতে পারব না। 

যখন প্রথম কলমাকান্দা আসছিল রাঙামামি, পালকি থাইকা নাইমা এদিক ওদিক চাইতেছিল। আশেপাশের ধানক্ষেত, খাল, ছাতিম গাছটারে যেমনে দেখছিল তেমন কইরা আমারে দেখতে থাকল মামি। অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না। তাই হাত বুলাইতে লাগল। আমার বুকে, মুখে। মনে হয়, ছাতিম গাছটারে খুঁজতাছে, ভরাট হয়ে যাওয়া খালটারে খুঁজতেছে। আমার শরীরের মধ্যে নিজেদের বিরাট ধানক্ষেতগুলারে খুঁজতাছে মামি।

আর আমার শরীরের মধ্যে ফ্রয়েড হালায় কারেন্ট মারতেছে। সেই কানের কাছে ফুসফুস শুরু করছে। ফ্রয়েডে কইতেছে, এই যে দেখ, শিউলি ফুলের ঘেরান, এই যে দেখ কী নরম, কী কোমল, এই যে দেখ তোর শৈশব-কৈশোরের স্বপ্নদোষের কারণ...

কবেকার কথা, দেখ নাতিন, এই দেখ, আমার চক্ষে পানি। আমার জনম গেল এই পানি নিয়া। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ... কত কি ঘটনা? আমার জীবন খালি সেই রাইতের আফসোস, সেই রাইতের ঘেরানে কাটল। আমি আইজ জানি না, সেই রাতে আমি পাপ করছি, না, পুণ্য করছি। আমি রাঙামামিমারে পরান ভইরা রাঙা রাঙা কইরা ডাকছি। সে হাসান, হাসান কইরা আমারে আদর করছে। কানছে আর আদর করছে। আমি শুধু কইছি, রাঙা, আমি তোমারে দেখমু, আমার জান গেলে যাইব, তোমারে আমি যাইত দিমু না। 

পুবপাড়ার খালটার ওইপারেই বর্ডার। একটা বাঁশের সাঁকো ছিলো। সেইটা দিয়া পুরা খাল পার হওয়া যায় না। পানিতে নামতেই হয়। পানি বেশি গভীর না। তবে সাঁকো থাইকা লাফ দিয়া নামতে হয়।

পরদিন, বাজারে একজন কইলো, মাগিরে দেখছি, শাড়ি উঁচা কইরা খাল পার হইতে। 
আচ্ছা নাতিন, খাল পার হইলে কি দুনিয়াটা হাতের মুঠায় থাকে? যার এ পারে শান্তি নাই তার কি ওই পারে শান্তি থাকে? 

২.
হাসান দাদার চোখে পানি। কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি নাই। চোখেও নাই। যেন অন্ধ চোখ থেকে পানি পড়ছে। সে একটা নিমের কাঠি দিয়ে দাঁত খোচাচ্ছে। খায় তো দুধ, কলা, বার্লি। দাঁতে আর কী জমা থাকবে তার। তবু বহু বছরের অভ্যাস। দাঁত খোঁচানোর। দাঁত খুঁচিয়ে যাচ্ছে। হয়তো অভ্যাসবশেই চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। 

আমি রেকর্ডারটা বন্ধ করলাম। দাঙ্গা, দেশভাগের এইসব ব্যক্তিগত ইতিহাস আমার গবেষণায় কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না। আমি ব্যাগ গোছাতে থাকলাম। দ্রুত রওনা হতে হবে। রাত্রি থাকতে থাকতে রওনা দিলে পথে জ্যাম কম পাব। আমি বিদায় নিব।

হাসান দাদা বসে আছে, ঝড়ে পড়ে থাকা একটা ছাতিম গাছের ভাঙা শরীর। যেই ছাতিম গাছটার শেকড়-বাকড়ের চিহ্নও হয়তো বিলীন হয়ে যাবে শিগগিরই। 

মুম রহমান

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।...বিস্তারিত