এন্ডি ওয়ারহল ও তাঁর ২৫টি বিড়াল

ঘুমানো শেষ, বিড়ালটা জেগে উঠল
হাই তুলল, বের হলো
মিলিত হতে।
—হাইকু, কোবিয়াশা ইশা

তখন তিনি ম্যারিলিন মনরো আঁকেন নি, স্যুপের ক্যানের ডিজাইন আঁকেন নি, হয়ে উঠেন নি পপ আর্টের গুরু। এন্ডি ওয়ারহল বিশ্বের অন্যতম দামি চিত্রকর। পপ আর্টের জনক। চিত্রকর্মকে সাধারণ মানুষের হাতে হাতে এনে দিয়ে তাকে জনপ্রিয় করেছেন। জনপ্রিয় অর্থাৎ পপুলার শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো পপ। পপুলার আর্টই পপ আর্ট। পপ আর্ট সম্পর্কে জানতে গেলে শিল্পকলা তথা চিত্রকলার আদি রীতিটা একটু বুঝতে হবে। ব্যাপারটা অনেক বিস্তৃত। শুধু এন্ডি ওয়ারহলের পপ আর্ট বুঝতে গেলে সাধারণভাবে তিনটি প্রবণতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হলেই হলো। প্রথমত, পেইন্টিং বা চিত্রকলা প্রদর্শনী বা মিউজিয়ামের জিনিস। মানে এটা পাহাড় বা সমুদ্রের মতো, ওকে দেখতে হলে ওর কাছেই যেতে হবে। এবং সচরাচর একটা নির্দিষ্ট এলিট শ্রেণি তার ভোক্তা। দ্বিতীয়ত, চিত্রকলার দামও আকাশচুম্বি হয়। সাধারণ মানুষ চিত্রকলা দেখেও না, কেনেও না। ছবি আঁকার ক্যানভাস, রঙতুলির দাম দিয়ে চিত্রকলার দাম নির্ধারণ করা হয় না। কেন তা হয় না সে-আরেক ইতিহাস। বরং চিত্রকলার তৃতীয় প্রবণতার দিকটির কথা জানা যাক। চিত্রকলার আরেকটি প্রবণতা হলো, শিল্পীর আঁকা কোনো ছবি একটাই হয়। অর্থাৎ ভিঞ্চি একটাই মোনালিসা এঁকেছেন, বতিচেল্লি একটাই ভেনাস এঁকেছেন। নিজেদের অসাধারণ ছবিটিরও আরেকটি কপি তারা করেন নি। কাজেই সারা বিশ্বে একটিই মোনালিসা আছে। কাজেই মোনালিসার দাম তো এক ও অনন্য হিসাবেই ধার্য হয়।



এন্ডি ওয়ারহল তার পপ আর্ট আন্দোলনের সুবাদে এই তিনটি প্রবণতাই ভেঙে দিলেন। তিনি আর্টকে নিয়ে এলেন সাধারণ মানুষের কাতারে। ক্যাম্পবল স্যুপ আমেরিকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই স্যুপের কৌটার লেভেলের ডিজাইন করলেন তিনি। সেই ডিজাইন বা চিত্র তিনি আবার প্রদর্শনীতেও ঠাঁই দিলেন। ফলে তার আঁকা জিনিস যারাই স্যুপের কৌটা কিনল তারাই দেখতে পেল। অরিজিনাল নয়, প্রিন্ট। তবু এই প্রথম কোনো চিত্রশিল্পীর আঁকা ডিজাইন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল পণ্যের সাথে। ব্রিল্লো সাবানের বাক্সের নকশাও আঁকলেন তিনি। মোদ্দা কথায়, এখন চিত্রকলা দেখতে তার কাছে যাওয়া লাগবে না, চিত্রকলাই দর্শকের কাছে এসে পৌঁছাবে। এমন একটা ধারণা পোষণ করতে এন্ডি ওয়ারহল। তবে তার আঁকা ছবির দাম কিন্তু আকাশচুম্বিই ছিল। তিনি যে প্রবল পপুলার ছিলেন। কিন্তু মূল্যবান এই সব চিত্রকর্মের ছিটাফোঁটা হলেও (ব্যাপক মুদ্রণের কারণে) সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাত। অন্যদিকে, এক মেরিলিন মনরো কিংবা এলভিস প্রিসলির মতো পপুলার আইকনদের ছবি আঁকলেন তিনি। সেগুলো মোনালিসার মতো একমাত্র ছবি নয়। একাধিক রঙ আর মাধ্যমে প্রায় একই বিষয় নিয়ে একাধিক ছবি এঁকেছেন তিনি। কিন্তু এইসবই চিত্রকলার ইতিহাসের কথা।

এন্ডি ওয়ারহল তখনও চিত্রকলার ইতিহাসের একটা অধ্যায় হয়ে ওঠেন নি। তখন তিনি ছিলেন বিড়ালপ্রেমি। পঞ্চাশ দশকের কথা। তখনও তিনি শিল্পী হওয়ার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বহু ইলাস্ট্রেশন, স্কেচ, নকশা করছেন। নিউইয়র্কে সংগ্রামরত শিল্পীকে সাহায্য করতে এসেছেন মা জুলিয়া। সেই সময় তার অ্যাপার্টমেন্ট ভর্তি ছিল বিড়ালে। শুরুতে ‘হ্যাস্টার’ নামের একটা বিড়াল পুষতেন তিনি। পরে ভাবলেন, হ্যাস্টারের একা একা ভালো লাগে না নিশ্চয়ই। তাই তিনি আনলেন ‘স্যাম’ নামের আরেকটি বেড়াল। তারপর একে একে ২৫টা বিড়াল হলো তার। সেইসব বিড়াল নিয়েই ছবি আঁকা শুরু করলেন এন্ডি ওয়ারহল। এইসব ছবি দিয়েই ১৯৫৪ সালে মা জুলিয়া আর ওয়ারহল নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে একটা বই প্রকাশ করলেন। বইটার নাম ছিল ‘২৫ ক্যাটস নেইম স্যাম অ্যান্ড ওয়ান ব্লু পুসি’। এখানে সবগুলো পেইন্টিং ছিল রঙিন লিথোগ্রাফ।

লিথোগ্রাফ কী তা একটু সংক্ষেপে বলে নেই। যথাবিহিত এটা গ্রিক শব্দ। লিথো মানে পাথর আর গ্রাফ মানে লেখা বা আঁকা। অর্থাৎ পাথরের উপরে কিছু আঁকা। কিন্তু আদতে লিথোগ্রাফ তা থাকে নি। চুনাপাথর, কালি, তেল মিলিয়ে লিথোগ্রাফ করা হয়। এটা আদতে এক ধরনের ছাপচিত্রের কৌশল। তেলে-জলে মিশ খায় না এই ব্যাপারটি লিথোগ্রাফে কাজে লাগে। চুনা পাথরে, আধুনিককালে প্লাস্টিক বা অন্য কোনো ধাতবের উপর কালি বসিয়ে নেয়া হয়, তারপর তেল ও জল মেশানো হয়। এই জটিল প্রক্রিয়ার ফলে তেলঅলা জায়গায় ছবিটি মুদ্রিত হয় আর পানির অংশটি আলাদা হয়ে থাকে। লিথোগ্রাফ বা ছাপচিত্র আধুনিককালে জনপ্রিয় এই কারণে যে এতে করে একই ছবির একাধিক কপি করা যায় এবং ছবির দাম কমে আসে। এন্ডি ওয়ারহল এই লিথোগ্রাফের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারিগর। এন্ডি তার লিথোগ্রাফগুলো ছাপ নেয়ার মতো হাতে রঙিন রং করেছেন। আর এন্ডি ওয়ারহল রং করেন খুব উজ্জ্বলভাবে। কমার্শিয়াল পেইন্টারের মতো তিনি কড়া ও তীব্র রঙে বিড়ালগুলোকে এঁকেছেন। অবশ্য বইটির নাম যাই হোক এতে কিন্তু বিড়ালের ছবি আছে ১৬টি। সম্ভবত ফর্মার হিসাব মিলাতেই এই ১৬টি ছবির সংযোজন। এই রঙিন বেড়ালের ছবিগুলোতে তার মা জুলিয়া ক্যালিগ্রাফি করেছেন। ক্যালিগ্রাফি অর্থ অক্ষরচিত্র, মানে লেখার অক্ষরগুলোকে চিত্রের মতো ব্যবহার করা। মুসলমান চিত্রকলায় ‘আল্লাহু’, ‘মুহাম্মদ’, ‘বিসমিল্লাহ’ ইত্যাদি শব্দ নিয়ে প্রচুর ক্যালিগ্রাফি আছে। যা হোক এন্ডি ওয়ারহল ও তার মা জুলিয়ার যৌথ প্রকল্প হিসাবেই এই বিড়ালের বই। বলা দরকার, চিত্রকলা বিড়ালকে প্রতিষ্ঠা করে দিল এই বই। এই বইয়ের আগেও শিল্পীরা বিড়াল এঁকেছেন। কিন্তু ক্যাট-পেইন্টিং নামের একটা শাখাই চালু হয়ে গেল এই বইয়ের সুবাদে। পরবর্তীতে তারা দুইজন ‘হলি ক্যাট’ নামে আরেকটা বই করেছিলেন। ‘হলি ক্যাট’ বইটি আরো মজার। এই বইয়ে হেস্টারের স্বর্গ অভিযানের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেই সময় এই বইয়ের একেকটি কপি ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে। এন্ডির ভাতিজা জেমস ওয়ারহল পরবর্তীতে পুরা ব্যাপারটা নিয়ে মজার একটা বই লিখেছিলেন। বইটার নাম ‘আঙ্কেল এন্ডি’স ক্যাটস’।



আজ অবশ্য এন্ডি ওয়ারহলের সেই ‘২৫ ক্যাটস নেইম স্যাম অ্যান্ড ওয়ান ব্লু পুসি’র কোনো কপি পাওয়া যায় না। হয়তো বড় কোনো শিল্প সংগ্রাহকের একান্ত ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত আছে। তবে সেই অরিজিনাল ২৫টি লিথোগ্রাফ থেকে এবে বুক কয়েকটি প্রিন্ট করেছেন। সেই সব প্রিন্টের একটা বিড়ালের দাম ৯ হাজার ডলার আর ব্লু পুসির দাম ১৫ হাজার ডলারেরও বেশি। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, ৫০ থেকে ১০০ ডলারের কিছু সস্তার প্রিন্টও করেছে এখনকার কোনো কোনো প্রকাশক। দামের চিন্তা বাদ দিয়ে বিনা পয়সার এন্ডি ওয়ারহলের কিছু বেড়াল আর তার মায়ের অক্ষরলিপি দেখে নিন এখানেই।

বেড়ালপ্রেমিরা আরো দেখে নিতে পারেন পিকাসো, সালভাদর দালী, ফ্রিদা কাহালো’র আঁকা বেড়ালের ছবি। এরাও সব বড় মাপের বেড়ালপ্রেমি শিল্পী। এলিসন নাস্তাসি একটা বই লিখেছেন ‘আর্টিস্ট অ্যান্ড দেয়ার ক্যাটস’ নামে। ২০১৫ সালে ক্রনিকল থেকে এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে।


মুম রহমান

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।...বিস্তারিত