ইহুদি তরুণী হানা হেনেস ও তার কবিতা

সমকালের ইহুদি এবং ইসরাইলের ইতিহাসে হানা সেনেস (১৯২১-১৯৪৪) যেন এক পৌরাণিক চরিত্র। প্রতিভাবান ক্ষণজন্মা এই নারীর জীবন ও কবিতা আজ কিংবদন্তিতুল্য। ইহুদি হানা সেনেস জন্মেছিলেন হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে। ১৯৩০ সালে তিনি প্যালেস্টাইনে অভিবাসী হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাকে এক গোপন সামরিক অভিযানে সংযুক্ত করা হয়। তিনি স্পেশাল অপারেশনন্স এক্সিকিউটিভ (এসওই)-এর সদস্য হন। ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে প্যারাট্রুপার দলের সঙ্গে তিনি যুগোস্লাভিয়ায় অবতরণ করেন। হাঙ্গেরিতে বন্দি ইহুদিদের উদ্ধার করা এবং নাৎসি সৈন্যদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করার কথা ছিল তার। প্রায় তিন মাস যুগোস্লাভিয়ায় সঙ্গীদের সঙ্গে অবস্থান করেন তিনি। কিন্তু জুন মাসে হাঙ্গেরিতে প্রবেশের সময় সীমান্ত অঞ্চলে তিনি ধরা পড়েন।

জার্মানরা তাকে কারাগারে বন্দি করে, প্রবল নির্যাতন চালায় তার উপর। কিন্তু শত নির্যাতনে তিনি কোনো স্বীকারোক্তি বা তথ্য দেন নি। জার্মান নাৎসি বাহিনী বারবার রেডিও কোড জানতে চেয়েছে তার কাছে। ব্যর্থ হয়ে নাৎসি বাহিনী তার মাকে গ্রেফতার করে নির্যাতনের হুমকি দেয়। কিন্তু তাতেও হানা মুখ খোলেন নি। হানাকে বলা হয়, সে তথ্য সরবরাহ করলে মা, মেয়ে দুজনকেই ছেড়ে দেয়া হবে। কিন্তু হানা নিজ দেশ ও জাতির সাথে প্রতারণার চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে রাজি হন। পাঁচ মাস বন্দিশিবিরে নির্যাতন করার পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে নাৎসি বাহিনী হানা সেনেসকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলে করে মারে।

যুদ্ধ শেষ হয়। হানা সেনেসের মা তার মেয়ের লেখা কবিতা, নাটক প্রকাশ করেন। বিশ্ববাসী এক সাহসী যোদ্ধা নারীর কবিতা, গান, নাটকে মুগ্ধ হয়।

বিশেষ করে হানা’র লেখা কবিতা ‘এলি এলি’ (সিজারিয়ার হাঁটার পর) দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি হাঙ্গেরিতে তাকে ভুলে গেলেও ইসরাইলে তার নামে একাধিক সড়কের নামকরণ করা হয়। শুরুতে হাঙ্গেরীয় ভাষায় কবিতা লিখলেও পরবর্তীতে তিনি হিব্রু ভাষাতেই কবিতা লেখেন। 

আজকের দিনে এসে হানা সেনেসের জীবন ও কর্ম নিয়ে একাধিক বই লেখা হয়েছে, নাটক রচিত ও মঞ্চস্থ হয়েছে এমনকি চলচ্চিত্রও হয়েছে। ইসরাইলের একটি গ্রামের নাম রাখা হয়েছে ইয়েদ হানা। ১৯৮৮ সালে হলিউডে ‘হানা’স ওয়ার’ (Hanna's War) নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ইহুদি পরিচালক ম্যানহেম গোলান। ২০০৮ সালে ‘ব্লিসড ইজ দ্য ম্যাচ : দ্য লাইফ এণ্ড ডেথ অব হানা সেনেস’ (Blessed Is the Match: The Life and Death of Hannah Senesh) নামে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন মার্কিন পরিচালক রবার্তো গোসম্যান। ইসরাইলের নাট্যকার আহরোন ম্যাগেড রচনা করেছেন নাটক ‘দ্য লিজেন্ড অব হানা সেনেস’ (The  Legend of Hannah Senesh) নাটক।


এক নির্বাসিত বালিকার জন্য হোরা

একটি হোরা, হল্লা, তুমুল, আলোকছটা আমার চারপাশে
রহস্যময় ছন্দ, ফুর্তি আর বন্ধন,
এটা টান দেয় আমার দেহে আর হৃদয়ে
পায়েরা তাল মেলায়, পিঠে কম্পন, প্রজ্জ্বলিত গান, তীব্র কোরাস
নাচ আর গান, একটি শব্দহীন প্রার্থনা,
জয় হোক ভবিষ্যতের, জয় হোক সৃষ্টির
তারপর আমি দেখেছি এক স্পন্দন আমার চোখের সামনে
আমার হাত পালিয়ে গেছে বন্ধুর আলিঙ্গন থেকে
আমার হৃদয় প্রত্যাখান করে উত্তেজক গান, 
কাছে আর দূরে এটা গ্রাস করে আমার সমস্ত
নীল চোখ
এমন এক বিমুঢ় দৃষ্টি
এক বিষণ্ন নীরবতা আর জেদি মুখের
স্থবিরতা আমার ভেতরে জন্মায়
আমি দাঁড়িয়ে থাকি 
একা, শতেক ভিড়ের মাঝে একা, মেয়েটি আর আমি।

অনুবাদকের টিকা : হোরা (Hora) এক ধরনের দলীয় নৃত্য। দল বেঁধে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে এ নাচ পরিবেশন করা হয়। গ্রিক খোরোস (khorós) শব্দের অর্থ নাচ, সেখান থেকেই এই হোরা শব্দের উৎপত্তি। ইসরাইলে তো বটেই, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এবং রোম, বুলগেরিয়া, তুরস্ক সহ একাধিক দেশে এই নাচ দেখা যায়। ইহুদি ছাড়াও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বলয়েও এ নাচ রয়েছে।

আছে এমন নক্ষত্র

এমন নক্ষত্রও আছে যাদের আলো পৃথিবীতে কেবল তখনই পৌঁছায় যখন তারা ক্ষয়িত হয়ে গেছে এবং তারা আর নেই। আর এমন মানুষও আছে যাদের উজ্জ্বল স্মৃতির আলো পৃথিবীকে আলোকিত করে কেবল তারা চলে যাওয়ার পরই। এইসব আলো যারা অন্ধকার রাত্রিতে জ্বলে এবং আমাদেরকে পথ দেখাবে বলেই তারা দ্যুতিময়...


এখন

এখন—এখন আমি কিছু বলতে চাই,
নিছক শব্দের চেয়ে বেশি কিছু,
রঙের চেয়ে বেশি রঙিন,
গানের চেয়ে বেশি তালময় কিংবা ছন্দময়,
এমন কিছু যা লক্ষ লক্ষ লোকেরা আগে বলে নি বা শুনে নি।

স্রেফ কিছু একটা।
জমিন সম্পর্কে সব কিছু নীরব, শুনছি,
অরণ্য আমাকে দেখছে, প্রত্যাশায়।
আকাশ আমাকে দেখছে কৌতূহলী চোখে।
সব কিছু নীরব। আর আমিও তাই।


চৌরাস্তায়

একটা কণ্ঠ ডেকেছিল।
আমি গিয়েছিলাম। ডেকেছিল তাই গিয়েছিলাম।
গিয়েছিলাম অন্তত যেন পড়ে না যাই।
চৌরাস্তায়,
আমি দু’কানই বন্ধ করেছিলাম সাদা তুষারে।
আর কেঁদেছিলাম
যা হারিয়েছি তার জন্য। 


সিজারিয়ায় হাঁটার পর

ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার
আমি প্রার্থনা করি যে এইসব যেন কখনো না ফুরায়,
বালু আর এই সমুদ্র,
জলের কলকল,
আকাশের বিদ্যুৎ,
মানুষের প্রার্থনা।

অনুবাদকের টিকা : ১৯৪১ সালে প্যালেস্টাইনের সিজারিয়ায় ভূমধ্যসাগরের তীরে হেঁটে এসে তিনি এই বিখ্যাত কবিতা ‘এ ওয়াক টু সিজারিয়া’ রচনা করেন। এই কবিতাটি ‘এলি এলি’ শিরোনামে অধিক জনপ্রিয়। কবিতার প্রথম লাইন ‘এলি, এলি’ হিব্রু শব্দ যার অর্থ হলো আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর। ১৯৪৫ সালে ইসরাইলের বিখ্যাত সুরকার ডেভিড জেহাবি এই কবিতাটিকে গানের সুর দেন এবং গানটি এত জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তীকালে এটিকে ইসরাইলবাসীরা অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গণ্য করে। নাৎসি বাহিনী কতৃক ৬০ লক্ষ ইহুদি নিধনের স্মরণে আজও ইসরাইলবাসীরা তাদের গণহত্যা দিবস পালনের সময় এ গান গেয়ে থাকেন। প্রার্থনার মতো, কান্নার মতো এই গান চাইলে ইউটিউবে শুনতে পারেন। Eli, Eli অথবা A Walk to Caesarea লিখলেই এ গান একাধিক কণ্ঠে শুনতে পারবেন। 

একটি কবিতা

ধন্য সেই দেশলাই যে ক্ষয় হয়ে যায় ধিকিধিকি আগুনের শিখায়।
ধন্য সেই অগ্নিশিখা যা জ্বলে হৃদয়ে গোপন গহ্বরে।
ধন্য সেই হৃদয় যে সম্মানের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার শক্তি রাখে। 
ধন্য সেই দেশলাই যে ক্ষয় হয়ে যায় ধিকিধিকি আগুনের শিখায়।


আমার মায়ের প্রতি 

তুমি কোত্থেকে শিখলে চোখের জল মুছে ফেলা,
নীরবে বেদনা বইতে শেখা
বুকের ভেতরে লুকাতে কান্না, আঘাত,
যন্ত্রণা আর অভিযোগ? :

শোনো এই বাতাসকে!
এর খোলা মুখগহ্বর
চিৎকার করে পাহাড় আর উপত্যকা জুড়ে
দ্যাখো এই সমুদ্রকে...
বিশাল পাথরগুলোতে,
ক্রোধে আর ক্ষুব্ধতায় ছুড়ে মারে ঢেউ।

প্রকৃতি সব ধুয়ে দেয়, বয়ে যায় সব।
ভেঙে দেয় সব রকমের আকার আর বন্ধন
তোমারই বুকের ভেতরের এই স্তব্ধতা থেকে
যেখান থেকে শিখেছ তুমি শক্তি অর্জন করতে। 


মরে যাওয়া
(নাহালাল ১৯৪১)

মরে যাওয়া... এত কম বয়সে... না, না, আমি না।
আমি ভালোবাসি উষ্ণ রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ,
আলো, গান, উজ্জ্বল চোখ,
আমি কোনো যুদ্ধ চাই না, লড়াইয়ের কান্না চাই না—  
না, না, আমি না।

তবে যদি এমন হয় আমি বেঁচে আছি আজ
রক্ত আর মৃত্যু নিয়ে প্রত্যেক হাতে,
প্রশংসা করছি উনার, আমি বলব
বাঁচতে, যদি আমি এই দিন মরে যাই...
তোমার মাটিতে, আমার ঘরে, আমার ভূমিতে

অনুবাদকের টিকা : নাহালাল হলো ইসরাইলের কৃষকদের সমবায় সমিতি, moshav ha'ovdim (workers settlement)। এটা উত্তর-ইসরাইলে অবস্থিত প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটারের একটি অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। জার্জেল উপত্যকায় অবস্থিত এই অঞ্চলের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯২১ সালে। হিব্রু বাইবেলে বর্ণিত ঈশ্বরের চোখের আদলে এই সুগঠিত, পরিকল্পিত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। চারদিকে শস্যক্ষেত্র আর মাঝখানে মানুষের বসবাস নিয়ে গড়ে উঠেছে নাহালাল। ২০১৯ সালের হিসেবে এখানকার অধিবাসী সংখ্যা ৯৩০ জন।


ইয়ম ক্যাপুরা

যুদ্ধের আগুনে, শিখায়, স্ফুলিঙ্গে,
চোখের অন্ধত্বে, ঝলকানিতে খুঁজি
আমার ছোট্ট লণ্ঠন উঁচিয়ে
খুঁজি, খুঁজতে থাকি সত্যিকার মানুষ।  

ঝলকানিতে, আমার লণ্ঠনের আলো জ্বলে টিমটিম,
আগুনের তীব্রতায় আমার চোখ দেখতে পায় না;
কেমন করে দেখব, তাকাব, জানব
কখন সে দাঁড়াবে, আমার মুখোমুখি?

একটা নিশানা দেখাও, ও প্রভু, একটা নিশানা রাখো তার কপালে
উত্তাপে, আগুনে আর পোড়ার কালে আমি হয়তো
জানতে পারব বিশুদ্ধকে, অনন্ত স্ফুলিঙ্গে
আমি যা খুঁজি : সত্যিকারের মানুষ।     

অনুবাদকের টিকা : ১৯৪০ সালে লেখা এই কবিতাটিই ক্ষণজন্মা কবির লেখা প্রথম কবিতা। ইয়ম ক্যাপুরা (Yom kippur) হলো ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র দিন। হিব্রু ভাষায় ইয়ম ক্যাপু শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো প্রায়শ্চিত্তের দিন। দিনব্যাপী উপবাস পালন, পাপস্বীকার আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়। 

এক, দুই, তিন...

এক-দুই-তিন... আট ফুট লম্বা
দুই ধাপ পেরিয়ে, বাকিটা অন্ধকার...
জীবন ক্ষণস্থায়ী এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন
এক-দুই-তিন... হয়তোবা আরেকটা সপ্তাহ।
কিংবা পরের মাসেও আমাকে এখানে খুঁজে পাবেন,
কিন্তু মৃত্যু আমার মনে হচ্ছে খুব কাছেই।
আমি আগামী জুলাইয়ে ২৩ হতে পারতাম
আমি তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই জুয়া খেলেছি, 
পাশা নিক্ষেপ করা হয়ে গেছে।
আমি হেরে গেছি। 

অনুবাদকের টিকা : ১৯৪৪ সালে লেখা এই কবিতাটিই হানা সেনেসের লেখা শেষ কবিতা। পড়েই বোঝা যাচ্ছে, জেলখানার কক্ষে বসে তিনি কবিতাটি লিখেছিলেন। তারপর মৃত্যু এসে স্তব্ধ করে দিয়েছে প্রতিভাবান এই কবিকে। জীবন আর দেশের জন্য যে জুয়া খেলেছিলেন তিনি। তাতে কিন্তু তিনি হারেন নি। কারণ, কবিরা তো বেঁচেই থাকে, তাই না?
মুম রহমান

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।...বিস্তারিত