পর্ব-৪১
পর্ব-৪২
পূর্বেই বলেছি আমার উপন্যাস বয়ন নিয়ে বেশকিছু আলোচনা হয় ।
তন্মধ্যে যে কয়টির সফটকপি হাতে পেয়েছি, সেগুলিই আমি সংরক্ষণ করতে পেরেছি । বাদবাকি সব কালের ধুলায় বিলীন হয়ে গেছে, তেমনও নয়। আমি সকলই বড় যত্ন করে আগলে রাখতে চেয়েছি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা কথা বলে গিয়েছেন—
যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর?
যা হারিয়ে যাবার তা হারিয়ে যাবেই। যে ইচ্ছে করে হারিয়ে যেতে চায়, সেও আরও দ্রুত হারিয়ে যাবে। যায়। কিচ্ছুটি করার নেই। যারা আগলে বসে থাকতে চায়—তারা বোকা বই অন্য কিছু নয়। তারা পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নয়।
বয়নের সব কয়টি রিভিউই আমাকে নতুন করে ছুটে যাবার প্রেরণা জুগিয়েছে। হোক না সেসব নেগেটিভ। আমি সকল নেগেটিভের মাঝেও বিন্দুসম-পজিটিভ অনুসন্ধানরত এক মানুষ।
সমকালীন লেখকদের মধ্যে পাপড়ি রহমানের বয়ন আবশ্যিকভাবে আলোচ্য। তার ভাষার কাজও মনোযোগ দাবি করে।
আহমাদ মাযহারের ‘বইয়ের জগতে’ প্রকাশিত কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের আলোচনাটির প্রথম লাইন আজও আমি স্মরণ করতে পারি। এবং স্মরণের বালুকাবেলায় যেসব ফিরতি-ঢেউ অশ্রুজলের চিহ্ন রেখে যায়, সেসব লুকোবার বা মুছে ফেলবার কোনো চেষ্টাও আমি করি না। এই অকাল-প্রয়াত কথাসাহিত্যিকের জন্য আজও আমি অশ্রুভারানত হয়ে উঠি। বুকের গহিন-কন্দর থেকে উঠে আসা কান্নার-বেগ আমাকে আজও বাষ্পাচ্ছন্ন করে তোলে।
‘বইয়ের জগতের’ কোন সংখ্যায় আলোচনাটি ছাপা হয়েছিল আজ তা বিস্মৃতির-কুয়াশায় অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তিনি কী লিখেছিলেন তার মর্মার্থ আজও অমলিন হয়ে আমার স্মৃতিকে বিমর্ষ করে রেখেছে।
আমাদের বাংলাদেশে অনেক কিছুই নাই, কিন্তু বয়নের মতো উপন্যাস আছে।
[রিভিউটি কেউ পড়তে চাইলে আহমাদ মাযহার ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলে পাওয়া যেতে পারে
বয়ন প্রকাশিত হওয়ার পরে আমাকে অনেক রিভিউই বিস্মিত করে দিয়েছিল। মাহবুব মোর্শেদ সম্পাদিত ওয়েব-পত্রিকা সাময়িকী ডট কমে প্রকাশিত হয়েছিল এক তরুণ কথাসাহিত্যিকের ক্ষুরধার-আলোচনা। যা আজও আমি নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রেখেছি। একেবারেই নবীনতম কথাসাহিত্যিক সালাহ উদ্দিন শুভ্র লিখেছিল নিম্নোক্ত আলোচনাটি। আমি তখন এই তরুণকে একদমই চিনতাম না। তার নামও তেমন করে কোথাও চোখে পড়ে নাই। একেবারে অচেনা এক নবিশের কলমে উঠে এসেছিল নিম্নোক্ত আলোচনাটি—
পাপড়ি রহমানের বয়ন—জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ে যাওয়া নকশা—
এই শিরোনামে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল।
পাপড়ি রহমান বয়ন উপন্যাসটা ভালোই লিখছেন। তরুণ কোনো বাংলা লেখকের এত বড় একটা উপন্যাস এবং তা জীবন ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে—দার্শনিক বোধবুদ্ধির প্রচেষ্টা আছে—আছে জাদুবাস্তবতার খেল—ইলিয়াসের প্রভাব—তাঁতিদের ব্যবসার হিসাব-ক্ষরণ আর স্বপ্ন, অনেক কিছুই আছে। কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীরে নিয়া লেখা উপন্যাস একই সাথে সেই জনগোষ্ঠীর আওতাভুক্ত মানুষদের জীবন যাপন বা আসলে যে বস্তুরে কেন্দ্র কইরা তাদের ঘরসংসার-ভিটাবাটি খাড়া হয়া থাকে আবার একই সাথে তাদের বস্তুরেও ছাড়ায়া গিয়া আধ্যাত্মিক মনোজগৎ সবকিছুরে ধরবার আকাঙ্ক্ষা পাপড়ি রহমানের আছে। তিনিও মার্কসবাদীদের মতো উৎপাদন পদ্ধতির জমিনে বসবাস করতে থাকা বয়নকারীদের যে জীবন তুলে আনলেন সেখানেও অন্য জনগোষ্ঠীদের মতো এই উৎপাদন পদ্ধতি তাদের সংস্কৃতি তৈরি করে। বয়নকারীদের বসবাসের জমিন বাবলাপাতার কাঁটায় আচ্ছন্ন। তাঁতের পয়সা ঘরে আসে না। ঘরে ঘরে বিদ্বেষ-ইতিহাস কাইটা নিছে বৃদ্ধাঙ্গুল। পুকুর জলে তলিয়ে গেছে তাঁত কল-তাঁতিদের লাশ। সেই জলে-বাতাসে বাস করা লোকেরা, পয়রন বিবিরা বা সবেদআলিরা, মোহিতনরা, জজমিয়া-সাধু সবাই না ধুলা-না সোঁদা-মাটি মাটি গন্ধের তালাশে জীবন পার করে দেয়। সেই জীবনে আছে মৃত্যু—আছে দুঃখ বিরহ—দহনও লাগে কিন্তু শান্তি কিন্তু আনন্দ জাগে না। আর যে অনন্ত তা অদেখাই থাকে তা আসলে পয়রন বিবির হারানো মানিক রোশনা-অসুখে মারা যায় যে মেয়ে সে আসলে পয়রন বিবর-ই হারানো জীবন—জীবনের সুখ। সেই রোশনা মরে গিয়ে আকাশে ঘুড়ি হয়ে ওড়ে।
আরেক জীবনের দেখা পাইতে যাইতেছিল যে সাধু সেও মারা যায়—চিলুনিকইন্যার খোঁজ করতে গিয়ে। ফলে শীত আসে যেমন জাঁকিয়ে বয়ন উপন্যাসের মুগরাকুল গ্রামে—বসন্ত আসে শিমুলে-পলাশে, স্বস্তি তেমন আসে না। বয়ন উপন্যাসে জীবনের ঘটনাবলি আছে ঠিকই। কিন্তু পাপড়ি রহমান সময়টারে বুঝতে দেন নাই তার উপন্যাসে। উপন্যাস পাঠে মনে হইতে পারে এর সময়কাল মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দশকের। তার মানে আশি বা মধ্য আশি-নব্বই। জনগোষ্ঠীরে নিয়া উপন্যাস লিখতে গেলে সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ এরা দেশীয় পরিস্থিতির বাইরে বিরাজ করে না। পাপড়ি রহমান এই বিষয়টা বোধহয় খেয়াল করেন নাই। কোনো এলাকার বা পেশার মানুষের জীবন তার সমসময় দ্বারা প্রভাবিত হয়-ই। সমসময়ের রাজনীতি আর সংস্কৃতির আগ্রাসনে তারা বিপর্যস্ত হয়। বয়ন উপন্যাসে মুগরাকুল বা দীঘিবরাবো এলাকায় বেঁচে থাকা মানুষেরা একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়া পড়লেন। তারা আর বাইরে যান না বা বাইরের কেউ তাদের গ্রামে আসে না। তাছাড়া বয়নকারীদের যে রুচি সংস্কৃতিও তিনি তুইলা ধরলেন—বিভিন্ন গীত যেমন চিলুনিকইন্যার কাহিনি-বিয়া এসব কিছুও আসলে সনাতন বা আশির দশক পরবর্তীতেও একইরকম ছিল কি-না এইটা ভাবার বিষয়। জনগোষ্ঠীরে নিয়া উপন্যাস লিখতে গেলে তা একরকম ডকুমেন্টশনের কবলে পড়ে।
বয়ন উপন্যাসে এই প্রভাবটা আছে। বিশেষত লেখক যদি সেই জনগোষ্ঠীর লোক না হন বা তিনি যদি স্রেফ আগ্রহের বশেই সেখানে গিয়া তাদের সাথে মেলামেশা করেন এবং ঔপন্যাসিকের যেমন দেখার চোখটাই আসল—চোখেই শিল্প ফোটে, তাকে আবার ঠিক যেমন দূতিয়াল হইলে চলে না, তাকে নীতিবান হইলেও চলে না। তাকে দর্শক হইতে হয়—পাপড়ি রহমান তার চোখে বয়নকারীদের যা দেখলেন তা একটা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণা দিতে পারছে ঠিক-ই কিন্তু একটা বার্তা দিতে পারে নাই। বয়ন উপন্যাস একটা গন্তব্যহীনতার দিকেই ধাবিত হইছে শেষ পর্যন্ত। এর একটা যেমন বোঝা যায় সাধুর মৃত্যু-তে বা মুল্লুকচানের মৃত্যু-তে, হুটহাট কিছু মৃত্যু ঘটাইছেন লেখক শেষদিকে আইসা। অথবা পয়রন বিবিও অন্ধ হয়া পড়ার ক্ষণটাও জুইতের হয় নাই। লেখকরে নির্বিকার হইতে হয় অনেক সময়—একই সাথে চতুরও। এই উপন্যাসের প্রত্যেকটা চরিত্রই ভালো লাগার মতো কিন্তু সামাজিকতায় জড়ায়া বা ইতিহাসে জড়ায়া বা বর্তমান খুঁইজা না পায়া তারাও উদ্দেশ্যহীন হয়া পড়ে।
রাজনীতি যেমন নাই এই উপন্যাসে, মানে ইতিহাস আছে—নিপীড়িতের হাহাকার আছে—কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতাটা নাই।ধর্মের বিষয়টাও বলা যায় যে সম্প্রীতি আছে তা বুঝা যায়—কিন্তু পরিস্থিতি হিসাবে ধর্ম নাই। বিভিন্ন চরিত্র ঐতিহ্য পালন করতেই ব্যস্ত—তারা খালি শাড়ি-সুতা বুনতেই ব্যস্ত—এর বাইরের জীবনটা অপ্রকাশিত-সংকীর্ণ, ফলে এই উপন্যাসে উপভোগ্য কিছু চরিত্র পাওয়া যায় ঠিক-ই, তাদের জীবনে জলা-ধুলাও আছে, কিন্তু আবার সমাজের শাসনটা নাই। সমাজ মানেই কেবল ক্ষুন্নিবৃত্তি না। এর শাসনটাও জরুরি—আলাউদ্দিন আর আতিমুনর ঘটনাটা যেমন, সেখানে সমাজ পাওয়া গেলেও, গোটা উপন্যাস বিবেচনায় তারেও মনে হয় যেন লেখক সমাজের চাইতে আতিমুনিরে কই পাঠাইবেন তার ঠিকুজিতে ব্যস্ত আছিলেন। উপন্যাসের এই দৃশ্য তারপরও অন্য ঘটনাবলির চাইতে আলাদা মনোযোগ দাবি করে। ইলিয়াসের প্রভাব যে এই উপন্যাসে আছে তা বুঝতে পারা যায় শুরুতেই। সবেদআলির না সোঁদা না ধুলাটে না মাটি-মাটি গন্ধের তালাশেই বুঝতে পারা যায় যে সবেদআলি নিরুদ্দেশে যাইতে চয়—এই নিরুদ্দেশ উদ্দেশ্যহীন না-এর গন্তব্য তৈরিও করা নাই—এই গন্তব্য সময়-সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতি-আধ্যাত্মিকতা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সবেদআলি আসলে তার ছেলে মাধুকে খুঁজে, সবেদআলি হয়তো পয়রন বিবির ছেলেদের খুঁজে-আতিমুনিকেও সে খুঁজতে পারে। এটা যখন বুঝতে পারা যায় তখন না ধুলা না মাটির কাব্যময়তা-অন্বেষাটা আর থাকে না। আর এই প্রভাব কাটাইতে না পারার কারণে বয়ন উপন্যাস মেদহীন না। এমনকি দ্বিরুক্তিও চোখে পড়ে—যা পাঠকের জন্য বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
নারী পুরুষ প্রসঙ্গেও বলা যায় যে একইভাবে তা টিপিক্যাল। নারীকে বা পুরুষকে দেখবার মধ্যবিত্তীয় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাড়িত। লেখক বরং এসব প্রশ্নে নির্বিকার বইলাই মনে হইছে। ফলে বাংলাভূমের জনতারা একভাবে বিচার্য হয় যখন তারা আসলে তাদের পেশা দ্বারাই পরিচিত যারা আসলে তাদের কপালের ফেরে তাড়িত যদিও পাপড়ি রহমান দার্শনিকতার সন্ধানে নামছিলেন এই উপন্যাসে। কিন্তু এখানেও এক-ই সমস্যা, তা আবদ্ধ তা দারিদ্র্যপীড়িত, অন্নাভাবে আর অর্থাভাবে বিপর্যস্ত। সবেদআলি ঘর ছেলে সংসার ছেড়ে একেবারে দেউড়িতেই বাস করাটা এত সহজ না—পয়রন বিবির দার্শনিকতার ঝোঁক তারে সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত করল। আতিমুনি দার্শনিক হইতে গিয়া বিপদে পড়ল। এই দাশর্নিকতা আসলে বয়নের কাপড়ের রং-নকশা ছাইড়া বারাইতে পারে নাই দেইখা বয়ন উপন্যাসে যেমন এর বাইরের তেমন কোনো চিত্র পাওয়া যায় না, তেমন অন্য পেশার মানুষেদেরও দেখা যায় না, আলাদা কোনো চিত্রকল্পের মেঘও আকাশে হাজির হয় না।
চিলুনিকইন্যার তামাশায় বিপর্যস্ত সাধু অকালে মারা যায়। তাঁতিদের প্রযুক্তি জ্ঞানের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে পারতেন লেখক। কিন্তু লিপিবদ্ধ কিছু যন্ত্রাংশের নাম আছে। চাঁদবিবির নানার এক অজানা রং করার কৌশল আছে। সেই কৌশলসমূহও আসলে বয়নকারীদের জীবন। এই বিষয়ক তাদের সংস্কারও উঠে এসেছে পাপড়ি রহমানের উপন্যাসে। গীতবাদ্য, মুল্লুকচান উপন্যাসে আলাদা স্বাদ যুক্ত করে। এই বইয়ের প্রচ্ছদ ভালো হয় নাই। উপন্যাসটায় অনেক ধরনের মজা আছে। প্রচ্ছদে এমন কিছুই পাওয়া যায় না। বইয়ের ফ্ল্যাপেও বলা আছে বয়নকারীদের নিতিদিনলিপি এই উপন্যাসের কেন্দ্রকাহিনি। তো দিনলিপি থাকলেও বা আঁচ করতে পারা গেলেও কাহিনি তেমন জমে নাই। শত বছরের নির্জনতায় তাদের কল্পনা করতে গিয়া সময় শত বছর পার করলেও চরিত্রগুলা করতে পারে নাই, তারা কেমন জানি শতবছর আগেই থাইকা গেছে। উপন্যাসের শরীরে-গঠনেও নতুন কিছু নাই। সনাতন ভাবটা আছে। সমকালীন লেখকদের মধ্যে পাপড়ি রহমানের বয়ন আবশ্যিকভাবে আলোচ্য। তার ভাষার কাজও মনোযোগ দাবি করে। যে পেশার মানুষদের নিয়ে তিনি লিখেছেন তা প্রকৃতই ক্ষয়িষ্ণু এক জনগোষ্ঠী যারা রাজনীতি-ইতিহাস-সাম্রাজ্যবাদের হাতে বিপর্যস্ত। সেই বিপর্যস্তার আখ্যান বয়ন-পাঠককে বয়নকারীদের সম্পর্কে মানবিক আর সচেতন করে তুলবে…।