পর্ব-৩১
কোন গইনে ফুটে ফুলরে কোথায় জ্বলে মণি/ বিধাতা শিরজিল কন্যা জনমদুঃখিনী।।/ কও কও পঙ্কী আরে কও তরুলতা।/ ঢেউয়ের কুলে পইড়া বন্ধু এখন গেল কোথা।।/ শুন আরে বাঘ-ভালুক পরে আমার খাও।/ বন্ধুর উদ্দেশে মোরে পরখাইয়া জানাও।।/ জলে থাকে জলের কুম্ভীর সদা দেখতে পাও।/ কোথায় ভাস্যা গেল বন্ধু খবর দিয়া যাও।।/ আছিলাম বাদ্যার নারী ভরমিতাম দেশ দেশ।/ পরদেশী বন্ধুরে নিয়া ছাড়িলাম দেশ।।/ ডালেতে বসিয়া আছ ময়ুরাময়ুরী।/ তোমরা কি জানহ কথা কহ সত্য করি।।/ দরিয়ায় গলিয়া পড়ে আমার গলার হার।/ বিধাতা করিল দুঃখী দুষ বা দিয়াম কার?।।/
[মহুয়া, মৈমনসিংহ গীতিকা
সম্পাদনা: সৈয়দ আজিজুল হক, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯, মাওলা ব্রাদার্স
বহুবার ঠকে যাওয়ার পরও আমি কেনই-বা মানুষের ওপর এমন অন্ধবিশ্বাস রাখি?
আব্বা লোকান্তরিত হওয়ার পরে যে অদেখা-অনতি-তরুণ-কবির চিঠি মানসিক ভারসাম্যহীনতার পতন থেকে আমাকে আগলে রেখেছিল—কী ছিল ওইসব চিঠিতে? পূর্বেই বলেছি—ছিল বৃক্ষ আর বিহঙ্গদের কথালাপ। ছিল আগডুম আর ঘোড়াডুম। ছিল কমলাফুলির টিয়ে আর সূয্যিমামার বিবাহ দেখার প্রস্তাব। আদতে তেমন সিরিয়াস কিছুই না, সাতরঙা এক অচেনা-ফুল থেকে একেকটা পাপড়ি উড়িয়ে দেবার ফ্যান্টাসি। ঠাকুরমার ঝুলি খুলে হঠাৎ বের হয়ে পড়া কিছু রূপকথা। সিরিয়াস কিছু তো ছিলই না, সিরিয়াস কিছু হওয়ার উপায়ও ছিল না—সমাজ, সংস্কার ও সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট এক নারীর মুক্তি কি অতই সহজ নাকি? এক রাক্ষসপুরীতে বন্দি করে রাখা রাজকন্যার আসানও কি হয় এত নিমিষেই? পথের ভিখারিনীর ছেঁড়া কাঁথায় মুখ ঢেকে রেখে জগতের ক্লেদাক্ততা থেকে পালানোর হাস্যকর কায়দা ছাড়া সেসবকে আর কিছুই বলা যায় না। আর সেই অদেখা তরুণকেও একেবারে ইউরোপিয়ান চিন্তাধারার আলট্রামডার্ন কোনো কবি ভাবলে চলবে কী করে? মফস্বলের জল-হাওয়ার বেড়ে ওঠা এক পশ্চাদপসরণ কবি যশোপ্রার্থী—সেও তো প্রাচীনতার ঘোলাজলে খাবি খাওয়া বহু পুরাতনী এক মীন! যার আঁশে আঁশে গাঁথা রয়েছে সমাজের কুসংস্কার আর ট্যাবু। যে নরমাল-জীবন বলতেই বোঝে—নারীর চেষ্টিটি! যার কাছে ‘কুমারী নারীর প্রণয়’ ভিন্ন আরাধ্য আর কিছুই নাই। সে তো আর রাইনার মারিয়া রিলকে বা গর্সিয়া লোরকা নয়—যার ফলে চিঠিগুলিতে লুকিয়ে রাখার মতো গোপন কিছু ছিল না। ঘুণাক্ষরেও আমার কোনোদিনই মনে হয় নাই এসব লুকিয়ে রাখা দরকার। চিঠিগুলি রাখা ছিল আমার লেখার টেবিলের উপর, একটা মামুলি কাগজের শপিং ব্যাগে। বছর জুড়ে প্রভাত-সূর্যের-আলো আর রাতের চন্দ্রছায়া নিরিবিলি হেঁটে গিয়েছে সেসব চিঠির ‘পরে। অতি-সাধারণ-কাগজ আর কালিতে লেখা ওইসব মামুলিচিঠিও যে তালাবদ্ধ করে রাখতে হয়, তেমনটি আমার কখনোই মনে হয় নাই। কিন্তু আমার মনের মতো সকল কিছুই ঘটবে, আমি তেমনটিই-বা ভেবেছি কেন? বহুবার ঠকে যাওয়ার পরও আমি কেনই-বা মানুষের ওপর এমন অন্ধবিশ্বাস রাখি? কেনইবা ঘরের পরিচারিকাকে দরিদ্র বলে বেশি মায়া করি? আর তাকে দেই মানুষের মর্যাদা? তাকে আমার সম-কাতারের মানুষ ভাবি? কেন ভুলে যাই তারও রয়েছে অন্যদের মতোই লোভ-লালসা আর যৌনঈর্ষা। রয়েছে অধীনস্ত থাকবার জন্য ঊর্ধ্বতনের ওপর সুপ্ত-ক্রোধ। কেন ভুলে যাই—কারো দীর্ঘদিনের গোপন করে রাখা ব্যভিচার উন্মোচিত হয়ে গেলে, তারও থাকতে পারে ভয়ানক প্রতিশোধ স্পৃহা? কেন বিস্মৃত হই—নানারকম গুণাবলির জন্য কেউ অন্যদের অতি প্রিয়পাত্র হলে পাশের মানুষটিরও জমতে পারে তার ওপর পাহাড়-সমান আক্রোশ?
আমি যত সরলভাবে সবকিছু দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, পৃথিবী আদতে তেমন নয়। পৃথিবী হলো কুচক্রিদের জন্য বড়ই আমোদের স্থান। ঈর্ষাতুরদের জন্য বাগিচাবাগান। কিছু মানুষের অন্যকে হেয় করতে পারার বিকৃত-আনন্দ উদ্যাপনের জন্য চিরস্থায়ী কোনো সরাইখানা এই পৃথিবী।
বহুকাল পোড় খেয়ে খেয়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার পরে আমি জেনেছি—বাস্তব হইল নির্জলা সেই সোমরস, যা বুক থেকে জ্বলতে জ্বলতে অন্ত্রে নেমে যায়!
আহা! কত জন্ম ধরে পাঠ করে যাওয়া সেই রূপকথার কাহিনি বুঝি-বা বাস্তবেও ঘটে! ফলত রাজরানিকে পেতে হয় চাকরানির মর্যাদা। আর চাকরানিই কিনা হয়ে ওঠে দুয়োরানি
হায়রে আমার বাম দিকে হেলে থাকা বিধি! তোমার লীলা বুঝে ওঠা সত্যিই ভার!
গ্রহণ ছাড়িলে যেমন চান্দের প্রকাশ।/ কুমারে দেখিয়া কন্যা পাইল আশ্বাস।।/ প্রভাতের ভানু জিনি ছুরতসুন্দর/ একে একে দেখে কন্যা সর্ব্ব কলেবর।//
কন্যারে দেখিয়া কুমার লাগে চমৎকার/ এমন নারীর রূপ না দেইখ্যাছে আর।।/ পরথম যৌবনে কন্যা হীরা-মতি জ্বলে।/ কন্যারে দেখিয়া কুমার কহে মিঠা বুলে।।/
‘কোথা হতে আইল্যা কন্যা কিবা নাম ধর।/ কিবা নাম বাপ মার কোন দেশে ঘর।।/ কিসের লাগিয়া কন্যা ভ্রম বনে বনে।/ স্বরূপ উত্তর দেও এই অভাজনে।।/ মা ত নিঠুরা তোমার বাপ ত নিঠুর।/ ঘরের বাইর কর্যা তোমায় দিল বনান্তর।।/’’
আগু হইয়া পরিচয় কহে কাঙ্কন দাসী।/ “কঙ্কনে কিনিয়াছি ধাই নাম কাঙ্কন দাসী।।”/ রাণী হইল দাসী আর দাসী হইল রাণী।/ কর্ম্মদোষে কাজলরেখা জন্ম-অভাগিনী।।/
[কাজলরেখা, মৈমনসিংহ গীতিকা
সম্পাদনা: সৈয়দ আজিজুল হক, প্রথম প্রকাশ—১৯৯৯ ,মাওলা ব্রাদার্স
বোকা নারী! যে কিনা সর্পকে অসংখ্যবার রজ্জু ভেবে সহস্রবার ভুলের নদীতে ডুবে মরে!
এসব কথা বলতেও আমার অত্যন্ত লজ্জা লাগছে, লজ্জায় আমি নুইয়ে পড়ছি মাটির ‘পরে ঝরে-যাওয়া পুষ্পদলের মতো—তবুও এ জীবনের পাষাণ-ভার বুঝি-বা কিছুটা লাঘব হওয়ার আশায় গেয়ে যাচ্ছি এই মর্সিয়া। দিগন্ত-রেখার ওপারে চিরবিদায়ে মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বে বলে যেতে চাইছি গোপন-অশ্রুজল আর মর্মবেদনার সুতোতে গাঁথা স্পর্শকাতর মালিকাটির কথা।
আমার সাংসারিক কাজকর্মে সাহায্যকারিণী যুবতীটির কাছ থেকে নেয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে একদিন পশ্চিমের আকাশ ধূমল মেঘে ছেয়ে গেল। আমার পার্টনারের হস্তগত হয়ে গেল লেখার টেবিলে ফেলে রাখা ‘খোলাচিঠি’! আর চিঠিগুলির মর্ম উদ্ধার না-করেই আমার ওপর সে একেবারে ক্ষুধার্ত-নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চিঠির সমস্ত গোপনীয়তা ফটোকপি-মেশিনের আলোতে উন্মোচিত হলো। চিঠির সরল-বাক্যগুলিও লালকালিতে আন্ডারলাইন করে করে বিলি করতে লাগল সে! আমার মা-ভাই-চাচা-মামা-ফুপু-খালা-মেয়েরা কেউ-ই বাদ গেল না সেসব চিঠির পাঠ থেকে! এমনকি আমার বন্ধুদের হাতেও অনায়াসে চলে গেল চিঠিগুলি।
মধ্যযুগীয় বর্বর কায়দায় আমার উপর চলতে লাগল অকথ্য নির্যাতন। শুধু আমার পার্টনার নয়, পার্টনারের মা, ভাই ,ভাবিসহ সমস্ত পরিবার যুক্ত হলো সেসব নির্যাতনে। আমার পার্টনারের ভাবি সেই যুবতী গৃহপরিচারিকাকে মহল্লার প্রতিটা বাড়িতে পাঠাল আমার নামে বদনাম রটিয়ে আসার জন্য। সমস্তই আমি বোবা-চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। দেখলাম মানুষের আসল রূপ! দেখলাম তাদের বিকৃত-উল্লাস! আমি বিস্মিত হতেও ভুলে গেলাম, যখন দেখলাম নিজের পরিবারের প্রতিটা অত্যাচার আর কদর্য-কর্মে সায় দিয়ে চলেছে আমার পার্টনার। যেন এই লোক আমার চিরকালের অপরিচিত! যেন তার সন্তানদের আমি গর্ভে ধরি নি কোনোদিন! দীর্ঘ সতেরো বছরের তাপ-অনুতাপে কোনোদিন আমি যেন আমি তার পাশে ছিলাম না। সঙ্গিনী ছিলাম না তার কোনো দুর্যোগের! [অথচ এই ‘চিঠি লেখার অপরাধে’ দণ্ডিত হওয়ার মাত্র অর্ধ-যুগ পূর্বেও আমার পার্টনারের নানাবিধ কীর্তিকলাপ দেখে, জেনেও তাকে ছেড়ে যাই নি আমি বা যেতে পারি নি বা সেসব অন্যদের কাছে প্রকাশও করি নি! এবং সেসব ঘটনা আমি এখানেও উহ্য রেখে গেলাম। সেসব বলার মতো বা লেখার মতো রুচি আমার কোনোদিনই হবে না হয়তো হায়! চিরকালের বোকা আমি, যে কিনা সর্পকে রজ্জু ভেবে ভুলই করে যায়
এবং এরকম অবর্ণনীয় অত্যাচারের মাঝে আমি যখন ঢলে পড়ছি, বিষের পাত্র উজাড় করে গলায় ঢালছি কিংবা দাউদাউ-আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছি—তখনই ঘটল আসল মাজেজা! একেবারে বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্য! না কোনো পুলিশ এল না গ্রেফতারের জন্য। পুলিশ না এলেও সিনেমার মেলোড্রামাকে পূর্ণতা দিতে সেই কবি যশোপ্রার্থী তরুণই হাওয়া হয়ে গেল! নাই, নাই, নাই—সে কিনা কোথাও নাই! আজ সেসব কাণ্ড ভেবে হাসতে হাসতে আমার পেটে খিল ধরে যায়—ভাবালুতায় পরিপূর্ণ এক কবির বায়বীয়-কথামালাকে, আগডুমবাগডুম-মার্কা শব্দাবলিকে আমি ধ্যানজ্ঞান করে কত অসহনীয় সন্তাপের মুহূর্তই না আমি কাটিয়ে দিয়েছি! হায়! বোকা নারী! যে কিনা সর্পকে অসংখ্যবার রজ্জু ভেবে সহস্রবার ভুলের নদীতে ডুবে মরে!
আমি তো জানিই, এ জীবনের অভিজ্ঞতার কিছুই যাবে না ফেলা!
আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হলো। গৃহে অন্তরীণ করে রাখা হলো আমায়। বহু পরে জেনেছিলাম—আমার পার্টনারের ধামকি খেয়ে সেই অনতি-তরুণ-কবি নাকি পগাড়-পার হয়েছিল। আমি অবশ্য এসবের কোনোকিছুই না-জেনে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। শুধু তাকে এটুকু বলতে চেয়েছিলাম—আগডুম আর বাগডুম লেখা নিরাপরাধ পত্রাবলির জন্য কত ধরনের মাশুল আমায় যে দিতে হচ্ছে! বলতে চেয়েছিলাম—সর্প আর রজ্জুর খেলাটা কতটা রিস্কি—যখন কেউ রজ্জু ভ্রমে সত্যি সত্যিই কোনো জাতগোখরার কবলে পড়ে! এসব কিছুই তাকে বলা যায় নাই—সে আমার ফোন রিসিভ করেই কর্কশ স্বরে ‘হ্যালো’ বলে কল কেটে দিত! নতুবা বলত—হ্যালো কী বিষয়? যেন আমি কোনো আগন্তুক! যেন তার সাথে আমার কোনোদিন চিনপরিচয় ছিল না! যেন কোনো উটকো আপদ তাকে ফোন করেছে!
আজ এসব লিখতে বসে বেদনা জাগার পরিবর্তে সবকিছুই কেমন যেন হাস্যকর ঠেকছে!
আমার জন্য এসবই ছিল জীবন অভিজ্ঞতা! নইলে আমি কী করে জানতাম—
ক্রুশবিদ্ধ যিশুর-মুখ কী করে ওমন নির্লিপ্ত হতে পারে? সেই নির্লিপ্ত অবয়বে কেনই-বা স্বর্গীয় আলো বিচ্ছুরিত হয়? আমি তো জানিই, এ জীবনের অভিজ্ঞতার কিছুই যাবে না ফেলা!
নগ্ন দাঁড়িয়ে থাকা বাতাসে এবং রৌদ্রে/ গ’লে ঝরে যাওয়া/ এর বেশি মৃত্যু আর কী/
শ্বাস-নেওয়া বন্ধ করা মানে তো মুক্তি দেওয়া শ্বাস-প্রবাহকে/ অবিশ্রাম ওঠা-পড়া থেকে—/ এবার যা অব্যাহত ঈশ্বরকে খুঁজে নেবে ক্রমশ বিস্তারে… /
নীরবতার নদী থেকে যখনই করবে তুমি পান/ তখনই উঠবে জেগে গান।/ যখনই শীর্ষদেশ পেয়ে যাবে তোমার নাগালে/ তখনই নামার পথ পেলে।/ যখনই ধুলোতে তুমি শরীর মিশিয়ে দিয়ে আছ/ তখনই আসলে তুমি নাচো।/
[দ্য প্রফেট, কাহলিল জিব্রান
অনুবাদ: অজিত মিশ্র, কলিকাতা পুস্তক মেলা, জানুয়ারি ১৯৯১